Share |

ব্যাকস্টপে অনিশ্চিত ব্রেক্সিট

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ৪ ফেব্রুয়ারি : আগামী ২৯ মার্চ ইউরোপিয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার কথা। তার আগে সময় আছে মাত্র সাত সপ্তাহ। অথচ এই শেষ সময়ে এসে একটি চুক্তির মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে এই বিচ্ছেদ কার্যকরের বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এখন ব্যাকস্টপে ষ্টপ ব্রেক্সিট।   
সর্বশেষ চুক্তির একটি ধারা পরিবর্তনের দাবি তুলেছে যুক্তরাজ্য। কিন্তু ইইউ সেই পরিবর্তনে নারাজ। শেষ সময়ে এসে দুই পক্ষের দুই মেরুতে অবস্থানের কারণে চুক্তি ছাড়াই বিচ্ছেদ এবং এর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়গুলো বারবার সামনে চলে আসছে।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাসের চেষ্টার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইইউ নেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সম্মত হন। কিন্তু যুক্তরাজ্যের সংসদ সেই চুক্তি প্রত্যাখান করে। আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে চুক্তিতে উল্লেখিত ‘বেকস্টপ’ বিষয়ক ধারাটির গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন করা হলে চুক্তিটি অনুমোদন করবে বলে জানিয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ। কিন্তু ইইউ নেতারা বলছেন, সম্পাদিত চুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
বিচ্ছেদের পর ইইউ’র সদস্য স্বাধীন আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের অংশ নর্দান আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সীমান্ত উন্মুক্ত রাখার কৌশলকে বলা হচ্ছে ‘বেকস্টপ’। এর ফলে নর্দান আয়ারল্যান্ড আইনগতভাবে যুক্তরাজ্যের বাকী অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলে সমালোচনা উঠেছে।  আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই ইইউ’র তরফ থেকে চুক্তি পরিবর্তনের বিষয়টি প্রত্যাখান করা হলেও বিকল্প প্রস্তাবনা তৈরিতে ব্যস্ত যুক্তরাজ্য। ‘বেকস্টপ’ ব্যবস্থার বিকল্প উপায় খুঁজতে ব্রেক্সিটপন্থী এবং ব্রেক্সিটবিরোধী সাংসদদের নিয়ে একটি কমিটি করেছেন মে। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী মে চুক্তি পরিবর্তনের দাবি নিয়ে ইইউতে যাওয়ার কথা। তার আগে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটি বিকল্প খুঁজে বের করতে কাজ করছে ওই কমিটি।  
কিন্তু ইইউ’র পক্ষে প্রধান সমঝোতাকারী মিশেল বার্নিয়ে বলেন, বেকস্টপ ব্যবস্থা চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ইইউ অন্যান্য নেতারাও একই অবস্থানে অনড়।
তবে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটপন্থী রাজনীতিকদের কেউ কেউ বলছেন, ইইউ একেবারে শেষ মুহুর্তে অবস্থান পরিবর্তন করবে। এটাই তাদের কৌশল।  কট্টর ব্রেক্সিটপন্থী রাজনীতিক নাইজেল ফারাজ ১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ইইউ পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে বলেন, চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদ হলে ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ডের বিচ্ছেদ বিল খোঁয়াবে ইইউ। এছাড়া যেসব সদস্য দেশ যুক্তরাজ্যে পণ্য রপ্তানি করে তারাও বড় ক্ষতির শিকার হবে। তাই চুক্তিতে পৌঁছানো ইইউ’র জন্য বেশি জরুরি।  
কট্টর ব্রেক্সিটপন্থী আরেক নেতা জেকব রিচ মগ বলেন, নানা আপত্তি থাকলেও বেকস্টপ ধারা পরিবর্তন সাপেক্ষে ব্রেক্সিট চুক্তি সমর্থন করবেন তিনি। আর কোনো কারণে চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদ হলে তিনি বেশি খুশি হবেন।
গত ২৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হয়। সম্পাদিত ব্রেক্সিট চুক্তি গত ১৫ ডিসেম্বর বিশাল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। সে কারণেই ব্রেক্সিট কার্যকরে ব্রিটিশ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত কী, তা যাচাইয়ে এই ভোটাভুটি।
ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের গ্রাহাম ব্রাডির আনা এক প্রস্তাবে বলা হয় বিতর্কিত ‘বেকস্টপ’ ধারা বাদ দিলেই তাঁরা সম্পাদিত চুক্তিটি সমর্থন করবেন। ৩১৭ জন আইনপ্রণেতা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আর বিপক্ষে ছিলেন ৩০১ জন।
ওই ভোটাভুটির পর প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেন, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের স্পষ্ট নির্দেশনা পেয়েছেন। ‘বেকস্টপ’ ধারার পরিবর্তনে তিনি শিগগিরই ইইউর সঙ্গে পুনরায় আলোচনার জন্য যাবেন। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সহজ হবে না। কারণ, ইইউ’তে এমন আলোচনার সুযোগ কম। তবে সংসদের সমর্থনের পর তিনি কািিখত পরিবর্তন আদায়ে চেষ্টা আরও জোরদার করবেন। মঙ্গলবারের ভোটাভুটিতে আরও একটি প্রস্তাব পাস হয়। এতে চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট কার্যকর না করার পক্ষে মত দিয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতা। তবে এ প্রস্তাব মানতে বাধ্য নয় সরকার।  
এদিন মোট ৭টি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হয়। এর মধ্যে ৫টিই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চুক্তি পাশে ব্যর্থ হলে ব্রেক্সিটের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার যে দাবি, সেটিও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলছেন যে, বিচ্ছেদ বিষয়ক প্রয়োজনীয় আইন পাশের স্বার্থে বিচ্ছেদের দিনক্ষণ খানিকটা পিছাতে রাজি তাঁরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মে ৩ ফেব্রুয়ারি রোববার আবারও বলেছেন, ২৯ মার্চের নির্ধারিত সময়েই বিচ্ছেদ কার্যকর হবে। চুক্তি হোক বা না হোক ওইদিন রাত ১১টায় বিচ্ছেদ কার্যকর হবে বলে নির্ধারণ করা আছে।
হোম সেক্রেটারি সাজিদ জাভিদ বিবিসিকে বলেন, চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদ হলেও ব্রিটেনের নিরাপত্তার কোনো সমস্যা হবে না। ব্রিটেন নিজের নিরাপত্ত নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতাবান। জাভিদ আরও বলেন, আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তিতেই সমাধান রয়েছে। ব্রিটিশ বর্ডার ফোর্স তাঁকে এমনটি নিশ্চিত করেছেন। সাজিদ জাভিদের এমন কথা থেকে আন্দাজ করা হচ্ছে যে, চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে প্রয়োজনে চুক্তি ছাড়াই ২৯ মার্চ বিচ্ছেদ ঘটাতে প্রস্তুত সরকার।     
এদিকে নর্দান আয়ারল্যান্ডের আইরিশ জাতীয়তাবাদী দল শিন পেইনের প্রধান ম্যারি লু ম্যাকডোনাল্ড গত রোববার বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রেক্সিটের পর আয়ারল্যান্ড সীমান্তে কেনো তল্লাশি চৌকি তারা মেনে নেবেন না। তারা স্বাধীন আয়ারল্যান্ড এবং নর্দান আয়াল্যান্ডের একত্রীকরণের (রিইউনিফিকেশন) দাবিতে গণভোট চাইবেন।  
বিবিসির রাজনীতিবিষয়ক সম্পাদক লরা কুয়েন্সবার্গ বলছেন, মঙ্গলবারের ভোটাভুটি থেরেসা মের জন্য কিছুটা স্বস্তির মুহূর্ত এনে দিয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক খেলার শেষ সময়ে এসে ঠেকেছে। তাঁর মতে, এখন ইইউ নেতাদের কঠিন সিদ্ধান্তের সময়। প্রধানমন্ত্রী মে বলেছেন, ইইউর সঙ্গে আলোচনা শেষে দ্রুত তিনি পার্লামেন্টে হালনাগাদ চুক্তি নিয়ে হাজির হবেন। ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চুক্তি পাশে ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রীকে পরদিন আবারও নতুন প্রস্তাব নিয়ে সংসদে হাজির হতে হবে।