Share |

ব্যবহারিক ভাষাকে সহজ করা উচিত

আবদুল গাফফার চৌধুরী
নানাভাবে হুমকির সম্মুখীন বাংলা ভাষার চর্চা, শিক্ষা ও প্রসারকে গুরুত্ব দিয়ে এবারের অমর একুশে উদযাপন করে লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাব। ‘অহংকারের একুশ’ শীর্ষক মননশীল উপস্থাপনায় নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, কবিতা আবৃত্তি, সঙ্গীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে সাজানো অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সমবেত কণ্ঠে অমর একুশের গান পরিবেশনার মাধ্যমে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী/আমি কি ভুলিতে পারি’ সূচনাতে কালজয়ী সেই গান পরিবেশন করেন প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্যরা। এসময় উপস্থিত সূধী দর্শক-শ্রোতাও তাতে কণ্ঠ মেলান। অতঃপর শুরু হয় আলোচনা পর্ব। আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তাগণ ব্রিটেনে বিরাজমান বাংলা ভাষার সংকট নিরসনে অভিভাবক, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও বাংলা গণমাধ্যমে কমরত সাংবাদিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অমর একুশে গানের রচয়িতা, প্রবীণ সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে ভাষা হিসেবে বাংলাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করতে হলে ব্যবহারিক বাংলাকে সহজলভ্য করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেন।  আবুদল গাফফার চৌধুরী তাঁর বক্তব্যের সূচনা করেন ভাষাশহীদ, সদ্যপ্রয়াত বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি আল মাহমুদ এবং ঢাকায় সাম্প্রতিক অগ্নিকান্ডে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। তিনি আল মাহমুদকে পঞ্চাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আখ্যা দিয়ে বলেন, ঢাকায় আমরা অনেকদিন একসঙ্গে থেকে কাজ করেছি এবং মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর অবদান ছিলো। 
সাধারণ গান বাজনার অনুষ্ঠান না করে গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনার আয়োজন করার জন্য তিনি লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আজ এখানে বাংলা ভাষার সংকট সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনাগুলো খুবই মূল্যবান এবং এর আলোকে আমাদের ভবিষ্যত কর্মপন্থা ঠিক হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘ব্রিটেনের শিক্ষা কারিকুলামে বাংলা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চ্যানেল এস’র সিনিয়র সংবাদ পাঠক ও শিক্ষক সৈয়দ আফসার উদ্দিন। তিনি তাঁর প্রবন্ধে ব্রিটেনের উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পড়তে অন্যান্য বিদেশী ভাষার প্রতি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ না কমলেও বাংলার প্রতি তাদের আগ্রহ আশংকাজনকভাব হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি তোলে ধরেন। আর এর জন্য বাংলা ভাষার শিক্ষক ও বিশ্লেষকগণ অভিভাবকদের অসচেতনতা, শ্রেণীকক্ষে বাংলা শিক্ষাদানে পর্যাপ্ত উপকরণ না থাকা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত জীবনে অধিকতর সাফল্যের সুযোগ সৃষ্টির জন্য বাংলা না পড়ে স্প্যানিশ, ফরাসী কিংবা জার্মান নিয়ে পড়ার ইত্যাদি অমূলক ধারণা দেয়াকে দায়ী করেন তিনি। বিপন্নপ্রায় ভাষাকে ধরে রাখার উদ্যোগ হিসেবে বাঙালির সর্ববৃহৎ সমাবেশ বৈশাখী মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাষার ব্যাপক প্রচারের কর্মসূচী গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করে সৈয়দ আফসার। কিছু কিছু স্কুলে কীভাবে কৌশলে ও বৈষম্যমূলকভাবে বাংলার বদলে অন্যান্য ভাষা ও বিষয় চাপিয়ে দেয়া হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সোচ্চার ও সচেতন থাকার আহবান জানান তিনি।
প্যানেল আলোচক হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন সাবেক মেয়র-কাউন্সিলার গোলাম মর্তুজা এবং সাংবাদিক ও কাউন্সিলার সৈয়দা সায়মা আহমেদ। আশির দশকে টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলা স্কুলের সূচনা নিয়ে কথা বলেন গোলাম মর্তুজা। কোনো অর্জনের জন্য আন্দোলনের বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের সময়ে এতো বাঙালি কাউন্সিলার ছিলেন না। বর্ণবাদের মোকাবেলাসহ চরম প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে আমরা বিলেতে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার করার কাজ করেছি। 
আর স্কুল ও আফটার স্কুলে বাংলা শিক্ষা এবং কাউন্সিলের ভূমিকা বিষয়ে কথা বলেন সৈয়দা সায়মা আহমেদ। ভাষার অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ওয়েসল, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে নির্দিষ্ট শিক্ষা কাঠামো থাকলেও ইংল্যান্ডে সেটি নেই। তিনি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটাকে একটি বড় ধরনের পলিসি গ্যাপ বলে মন্তব্য করেন। বাংলাভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা উল্লেখ করে সায়মা আহমেদ বিলেতে বাংলা ভাষার প্রসারের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে শুধু একটি কাউন্সিলে নয় সবকটি কাউন্সিলে তা ছড়িয়ে দেয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাবেক চার সভাপতি যথাক্রমে মহিব চৌধুরী, মোহাম্মদ বেলাল আহমদ, নবাব উদ্দিন ও সদ্যসাবেক সভাপতি সৈয়দ নাহাস পাশা। অন্যান্য বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (প্রেস) মোঃ আশিকুন নবী চৌধুরী, ইউকে আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ ও সেক্রেটারি সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক, বিসিএ‘র সাবেক প্রেসিডেন্ট পাশা খন্দকার এমবিই ও সাবেক সেক্রেটারি এমএ মুনিম, ব্রেন্ট কাউন্সিলের সাবেক মেয়র পারভেজ আহমদ, বিমানের বিদায়ী ও সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কান্ট্রি ম্যানেজার যথাক্রমে শফিকুল ইসলাম ও মো. হারুন খান এবং ব্রিটেন সফররত সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি মুহিত চৌধুরী। ২২ ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার সন্ধ্যায় পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত ভাষাদিবসের অনুষ্ঠানে ক্লাবের সাধারণ সদস্য ছাড়াও সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক রাজনীতিকসহ কমিউনিটির বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সদ্যপ্রয়াত বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি আল মাহমুদের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ জুবায়েরের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা পর্বে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সভাপতি মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সহসভাপতি ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী। 
দ্বিতীয় পর্বে প্রেসক্লাবের নির্বাহী সদস্য নাজমুল হোসাইন ও রুপি আমিনের উপস্থাপনায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে কবিতা আবৃত্তি করেন যথাক্রমে ডা. জাকি রেজোয়ানা আনোয়ার, উর্মি মাজহার, দিলু নাসের, শহীদুল ইসলাম সাগর, মুনিরা পারভীন, মিসবাহ জামাল, ইয়াসিন সুলতানা পলিন মাঝি, মোস্তফা জামান নিপুন ও আমিমুল আহসান তানিম। সঙ্গীত পরিবেশন করেন অতিথি শিল্পী ডা. শম্পা দেওয়ান এবং প্রেসক্লাবের সদস্য মোস্তফা কামাল মিলন ও ববি রায়। এছাড়াও ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’ জনপ্রিয় সেই দেশাত্মবোধক গানের সাথে নৃত্য পরিবেশিত হয়। নৃত্যে অংশ নেন মোহাম্মদ দ্বীপ ও শিশুশিল্পী নিঝুম দে। তবলা সঙ্গত করেন শুধাংশু দাস। লাল সূর্যের বুকে ভাষাশহীদদের মুরালের ভাস্কর্য স্থাপন করে আকর্ষণীয় মঞ্চ নির্মাণ করে ইভেন্টটিক। অনুষ্ঠানে স্পন্সর হিসেবে সহায়তা করে চারটি প্রতিষ্ঠান পাম ট্রি ব্যাঙ্কুয়েটিং হল, তাজ একাউন্টেন্ট, রাণীজ সুপার স্টোর ও তসলা। পুরো অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে এলবিটিভি।
উল্লেখ্য, ব্রিটেনে এবছর একুশ বা ভাষাদিবস উদযাপন নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ব্রিটেনের সবচেয়ে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা পূর্ব লণ্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে কাউন্সিলে বাজেট কর্তনের অজুহাতে বাংলা ভাষাসহ আরো ১০টি মাতৃভাষা শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পায়তারা চলছে। এ নিয়ে স্থানীয় কমিউনিটিতে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। এমনই মুহূর্তে মাতৃভাষা শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে বিষয়ভিত্তিক আলোচনাকে প্রাধান্য দেয়া হয় এবারের লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের একুশের অনুষ্ঠানে।