Share |

চ্যানেল এস- এর সংবাদ সম্মেলন : কারি সংকট মোকাবেলায় ভরসা তরুণরা

লন্ডন, ২৫ ফেব্রুয়ারি : ব্রিটেনে স্টাফ সংকটসহ নানান কারনে যেখানে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ হচ্ছে সেখানে আশার আলো নিয়ে এগিয়ে আসছে ব্রিটিশ বাংলাদেশী নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা। বহুল প্রচলিত চিকেন কোরমা ও চিকেন টিকা মাসালার পর এবার নতুন সৃজনশীল হেলদি ডিশ প্রচলের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন নতুন প্রজন্মের কারি শেফরা।
কত কয়েক বছর যাবত কারি শিল্পের সংকট ও সমাধান নিয়ে কেইটরিং সার্কেল  নামে ধারাবাহিক গবেষনামূলক সভা সমাবেশ, সেমিনার করে আসছে চ্যানেল। আগামী ৫ মার্চ  অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চতুর্থ ‘লন্ডন বিজনেস কন্ফারেন্স‘। এই কনফারেন্সকে সামনে রেখে ২২ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জানানো হয় ব্রিটিশ বাংলাদেশী নতুন প্রজন্মের অনেকেই ভালো ভালো চাকুরীর পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট সেক্টরেও বেশ মনোনিবেশ করেছে। রেস্টুরেন্ট সেক্টরে তাদের এই আগ্রহ  আবারো আশা আলো জ্বালিয়েছে ব্যবসায়ীদের।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল  এস এর চেয়ারম্যান আহমেদ উস সামাদ চৌধুরী জেপি, ‘দ্য কেইটারিং সার্কেল শো‘-এর এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার মোহাম্মদ আব্দুল হক, তৌহিদ শাকিল।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয় ব্রিটিশ কারি মেন্যুতে চিকেন টিকা মাসালা যেমন ন্যাশনাল ডিশের মর্যাদা পেয়েছিলো ঠিক তেমনি একটি ডিশ  তৈরির প্রকল্পে এগিয়ে আসার জন্য মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম কেইটরিং সার্কেল আহ্বান জানিয়েছিলো রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান ও সৃজনশীল ব্যবসায়ীকে। তাদের স্বত:স্ফূর্ত সাড়ায় আয়োজিত হলো বছরব্যাপী প্রতিযোগিতা। মাসের পর মাস রিসার্চ, টেস্টিং, ফুড কনসিউমিং, হ্যামারস্মিথ কলেজে প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং চ্যানেল এস টেলিভিশনে লাইভ শোতে ক্রিয়েটিভ ডিশ কম্পিটিশন করার পর নির্বাচিত হলো এক স্টার উইনার ও দুই ফাইনালিস্ট। এই প্রকল্প আসলে শুরু হয়েছিলো ২০১৭ সালে ধারাবাহিকের সীজন টু-তে। সীজন টু-র ১২ জন বিজয়ীই সীজন থ্রি: রেস্টুরেন্ট স্টার শো-তে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তাদের নিয়ে কেইটরিং সার্কেলের চতুর্থ ‘লন্ডন বিজনেস কন্ফারেন্স‘-এ প্রথম বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রেস্টুরেন্ট স্টার শো অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠান। 
নর্থ লন্ডনের মেরিডিয়ান গ্র্যান্ড ভেন্যুতে ৫ই মার্চ ২০১৯ তারিখ সন্ধ্যা ৫টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এই কনফারেন্সে সমগ্র ব্রিটেন থেকে এবারও প্রায় ৬শ‘র বেশী রেষ্টুরেন্ট ও টেইকওয়ে ব্যবসায়ী অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় এখন ব্রিটিশ বাংলাদেশী তরুণ ব্যবসায়ীদের সংখ্যা একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে। কেউ পুলিশের চাকরি ছেড়ে, কিম্বা কেউ ব্যাংকের উুঁচু বেতনের চাকরি ছেড়ে নতুন নতুন কনসেপ্ট, হেলদি ফিউশন ফুডের নানা রকম সৃজনশীল মেনু নিয়ে নামছেন স্বাধীন কারি ব্যবসায়। কারি ইন্ডাস্ট্রির এই সংকটকালীন সময়ে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়ে ক্রমেই সৃষ্টি করছেন সাফল্যের নানা দৃষ্টান্ত।
কারি ব্রিটেনের খাবারের তালিকায় প্রথম পছন্দের সারিতে উঠে এসেছে গত শতকের চল্লিশের দশকে। বাংলাদেশী তথা ইন্ডিয়ান কারির প্রতি বৃটিশদের এই ভালোবাসায় ধীরে ধীরে কারি হাউসগুলো ছড়িয়ে পড়ে টাউন সেন্টার থেকে কাউন্টি এরিয়া অর্থাৎ শহর-নগর থেকে শুরু ক‘রে সমগ্র দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমানে ব্রিটিশ বাংলাদেশী মালিকানাধীন ১২ হাজারের বেশী রেস্টুরেন্ট ও টেইকওয়ের বার্ষিক টার্নওভার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশী। অথচ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বন্ধ হবার পথে বসেছে এই ইন্ড্রাষ্ট্রি। আর এই সংকটের সংগে এখন বাড়তি যোগ চলমান ব্রেক্সিট বিষয়ে অনিশ্চয়তা।
এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এরইমধ্যে বৃটেনের জনপ্রিয় বাংলা টেলিভিশন, চ্যানেল এস-এর কেইটরিং সার্কেলের উদ্যোগে ২০১৫ সালে ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডে ৯টি রোড শো অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় ১০ম রোডশো ও প্রথম গ্র্যান্ড বিজনেস কন্ফারেন্স। এদিকে, কারি ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও বেশ সরব। ইকোনোমিস্ট, গার্ডিয়ান, ডেইলি মেইল, মিরর, টেলিগ্রাফ থেকে শুরু ক‘রে প্রায় প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমে কারি শিল্পের বর্তমান বেহাল অবস্থা নিয়ে দফায় দফায় সবিচ্চারে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। এসব প্রতিবেদনে কারি ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যত খুবই অন্ধকার হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
রোড-শো গুলোতে চি?িত কারি ইন্ডাস্ট্রির প্রধান সমস্যাগুলো নিয়ে অনুষ্ঠিত লন্ডন বিজনেস কন্ফারেন্সের পর ২০১৬-র মার্চ মাস থেকে শুরু হয় বছরব্যাপী লাইভ ধারাবাহিক, ‘দ্য কেইট্রিং সার্কেল শো: সীজন্ ওয়ান‘। বছর জুড়ে সম্প্রচারিত লাইভ টক শো-এ কারি শিল্পের উন্নয়ন আলোচনায় ১২টি বিষয়ে যুগান্তকারী সমাধান বেরিয়ে আসে। দ্বিতীয় গ্র্যান্ড বিজনেস কন্ফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় ২৮শে মার্চ ২০১৭ তারিখে। ওই কনফারেন্সে ব্যবসায়িক সাফল্যের কিছু ইতিবাচক কেইস স্টাডি তুলে ধরা হয়। এতে দেখানো হয় সংকটের মুখেও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসায়ীরা কিভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ক‘রে সফলভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। সফল ব্যবসায়ীদের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, যেমন মেনু ইনোভেশন বা মেনুতে সৃজনশীলতা, স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশিাপাশি নতুন রান্নার ধারণা ও কৌশল উদ্ভাবন, বিদেশী কর্মী নিয়োগ, এবং ইপোস (ইলেকট্রনিক পয়েন্ট অব সেইল সিস্টেম), আইপ্যাড প্রভৃতি ডিজিটাল টেকনোলজিতে বিনিয়োগ ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়।
৯ মে ২০১৭ থেকে বছরব্যাপী কেইটরিং সার্কেলের লাইভ টেলিভিশন সিরিজের সীজন টু-তে অনুষ্ঠিত হয় নতুন রিয়েলিটি প্রোগ্রাম, রেস্টুরেন্ট ট্যালেন্ট শো ২০১৭। এতে ৯৬ জন রেস্টুরেটর পার্টিসিপেন্টের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে ২৪ জন ফাইনালিস্ট এবং ঐ বছর জানুয়ারী মাসে গ্র্যান্ড ফাইনাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ১২ জন উইনার নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি এপিসৌডে ৮জন পার্টিসিপেন্টের মধ্য থেকে দু‘জন ফাইনালিস্ট নির্বাচনের জন্য ৩ জন প্যানেল জাজ ও ৮ জন স্পেশ্যল জাজ অংশ নেন। সম্মানিত জাজরা বিশেষভাবে নির্ধারিত সফটওয়ারের মাধ্যমে তাদের রায় দেন। গ্র্যাণ্ড ফাইনালে প্রতি ফাইনালিস্টের জন্য একজন করে মেন্টর এবং প্রতি এপিসৌডের উইনার নির্বাচনের জন্য একইভাবে ৩ জন প্যানেল জাজ ও ৮ জন স্পেশ্যল জাজ অংশ নেন। নির্বাচিত ১২ জন উইনারকে গত বছর ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কেইটরিং সার্কেলের প্রথম রেস্টুরেন্ট ট্যালেন্ট শো অ্যাওয়ার্ডসে ট্রফি প্রদান করা হয়। এ অনুষ্ঠানে ১২ জন্য ফাইনালিস্টকেও তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর চ্যানেল এস-এ গত বছরের জুলাই মাস থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত ৫টি এপিসৌডে অনুষ্ঠিত হয় ‘কেইটরিং সার্কেল স্টার শো’। এই সীজনে ১২জন প্রতিযোগীর মধ্য থেকে ক্রিয়েটিভ ডিশ তৈরী ও প্রচারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন একজন স্টার উইনার ও ২জন ফাইনালিস্ট।
কেইটারিং সার্কেলের ফাউন্ডার ও ‘দ্য কেইটারিং সার্কেল শো‘-এর এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার মোহাম্মদ আব্দুল হক বলেছেন: ‘‘কারি সেক্টরকে রীতিমতো তাদের মেনু রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে কেইটরিং সার্কেল প্ল্যাটফর্ম। কারি শিল্পকে পুনরায় ইজ্জীবিত কোরতে, স্বাস্থ্যসম্মত ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী খাবার তৈরীতে তরুণ ব্যবসায়ীদের নিরলস শ্রম ও চেষ্টায় আমি সত্যিই ভীষণ আনন্দিত এবং অনুপ্রাণিত।’’ চ্যানেল এস টেলিভিশনের চেয়ারম্যান, কেইটারিং সার্কেলের প্রধান উপদেষ্টা এবং এক সময়ের ১০টি রেস্টুরেন্টের সত্বাধিকারী, আহমেদ উস সামাদ চৌধুরী বলেন,
‘‘তৈরী করা নতুন খাবারগুলো সৃজনশীলতা, গুনগত মান, উপস্থাপন শৈলী সত্যিকার অর্থেই প্রেরণা উদ্দীপক। কারী শিল্পের যাবতীয় সংকটের মৌলিক কারণগুলো চি?িত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করে আমাদের এই প্রিয় শিল্পকে বাঁচানোর জন্য সকলের সহযোগিতায় ব্যবসায়-সম্প্রদায়কে রীতিমত চাঙ্গা করে তুলেছে চ্যানেল এস টেলিভিশন এবং কেইটারিং সার্কেল। চলমান ব্রেক্সিট বাস্তবতার এই সংকটকালীন সময়ে সব ধরণের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় আমাদের আরো বেশী ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার।’’
চ্যানেল এস টেলিভিশন-এ আগামী এপ্রিল থেকে শুরু হবে ধারাবাহিক রিয়েলিটি-শো ’কেইট্রিং সার্কেল‘-এর ‘সীজন ফোর‘, ‘রেস্টুরেন্ট ট্যালেন্ট শো ২০১৯‘-এর সরাসরি সম্প্রচার। ধারাবাহিকের পর্বগুলো প্রচারিত হবে পাক্ষিক মঙ্গলবার।