Share |

লরেন্স অলিভিয়ার অ্যাওয়ার্ডস : নৃত্যে সেরা আকরাম খান

তবারুকুল ইসলাম
লন্ডন, ১৫ এপ্রিল : আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী এবং নির্দেশক (কোরিওগ্রাফার) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটি বেশ আগেই সেরে ফেলেছেন তিনি। পেয়েছেন নানা স্বীকৃতি। অপ্রাপ্তি ছিল কেবল একটাই-    যে শহরে তাঁর বেড়ে উঠা এবং নৃত্যচর্চার সকল আয়োজন, সেই শহরের মঞ্চ জগতের সেরাদের কাতারে নিজের নাম লেখানো। অবশেষ সেই কাজটি হলো একেবারে মোক্ষম সময়ে।
বলছি খ্যাতিমান ব্রিটিশ নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আকরাম খানের কথা। নৃত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য যুক্তরাজ্যের মঞ্চ জগতের সেরা স্বীকৃতি লরেন্স অলিভিয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। নিজের সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য একক পরিবেশনা হিসেবে নির্মিত ‘জেনোস’ নৃত্যনাট্যের জন্য গৌরবের এই স্বীকৃতি পেলেন আকরাম।   
গত শনিবার (৬ এপ্রিল) লন্ডনে সাংস্কৃতিক কর্মের  পীঠস্থান বিখ্যাত রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত হয় এবারের আয়োজন। লন্ডন শহরের থিয়েটারগুলোর সংগঠন ‘সোসাইটি অব লন্ডন থিয়েটার’ প্রতি বছর এই অ্যাওয়ার্ডসের আয়োজন করে। এই শহরের মঞ্চ জগতের সেরা প্রযোজনা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক সহ কলাকুশলীদের স্বীকৃতি প্রদানের শীর্ষ আয়োজন এটি। মোট ২৬টি বিভাগে দেয়া হয় পুরষ্কার।   আকরামের পাওয়া এই স্বীকৃতির বিশালত্ব বুঝতে হলে লরেন্স অলিভিয়ার্স অ্যাওয়ার্ডস সম্পর্কে জানাটা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে টিভি পর্দার দৃশ্যপটগুলো কৃত্রিমতায় ভরপুর। বলা যায় শিল্পের অকৃত্রিম আয়োজন কেবল মঞ্চেই টিকে আছে। আর বিশ্ব নাট্যশালার (থিয়েটার) রাজধানী হিসেবে বিবেচিত লন্ডন শহর। এখানে ২৪১টি থিয়েটার হল রয়েছে। এসব হলে সামষ্টিক আসন ক্ষমতা এক লাখের বেশি। এই মঞ্চ জগতের কলা-কুশলীদের স্বীকৃতি প্রদানে আয়োজিত লরেন্স অলিভিয়ার অ্যাওয়ার্ডস কেবল যুক্তরাজ্যেই নয়; বিশ্বময় শিল্পবোদ্ধাদের কাছে একটি সেরা স্বীকৃতি হিসেবে সমাদৃত। নিজের পরিবেশনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আকরাম খান শনিবারের অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি। তাঁর পক্ষে সম্মাননাটি গ্রহণ করেন আকরাম খান  ডেন্স কোম্পানির ম্যাবিন খো। নৃত্যে অসাধারণ অবদানের পুরষ্কারের জন্য এবার আকরামের সঙ্গে আরও দুই প্রতিযোগী (নোমিনি) ছিলেন। এরা হলেন রয়্যাল ব্যালেটসের প্রযোজনা সোয়ান লেইকের ডিজাইনের জন্য জন ম্যাকফারল্যান এবং গ্রেট ট্যামের ফর ডেন্স আমব্রেলার কোরিয়াগ্রাফির জন্য ডিমিট্রিস পাপইওয়ানু। কিন্তু জেনোস নৃত্যনাট্যে আকরামের একক পরিবেশনা সেরা হিসেবে বিজয়ী হয়। আকরাম খান এর আগেও লরেন্স অলিভিয়ার পুরষ্কার জিতেছেন। সেটি ২০১২ সালে তাঁর নির্মিত আরেক নৃত্যনাট্য ‘দেশ’ এর জন্য। তা ছিল সেরা নতুন নৃত্য প্রযোজনা বিভাগে। সাড়া জাগানো ‘দেশ’ নৃত্যনাট্যে বাঙালি এই সন্তান বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বের গল্প তুলে ধরেন।
প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে পাঠানো ই-মেইলের জবাবে আকরাম খান গত মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) এই প্রতিবেদককে বলেন, নির্দেশনার কাজ অব্যহত রাখলেও মঞ্চাভিনয় থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ‘জেনোস’ তাঁর সর্বশেষ একক পূর্ণ দৈর্ঘ্য পরিবেশনা। তাঁর ভাষায়, ‘শেষ কাজটি সেরা পুরষ্কার জিতে নেয়ায় সত্যিই অভিভূত’। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে নানা কাজের জন্য লয়েন্স অ্যাওয়ার্ডস সহ দেশে-বিদেশে মোট ৩৫টি অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন। নৃত্যকলায় অবদানের জন্য পেয়েছেন রাজকীয় সম্মাননা-এমবিই। তবে সব পুরষ্কারের মধ্যে নৃত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য পাওয়া পুরষ্কারটিই তাঁর কাছে সেরা।
আকরাম খানের জন্ম ও বেড়ে উঠা যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে। বাবা মোশারফ হুসেন খান ১৯৬৯ সালে লন্ডনে পাড়ি জমান। মা আনোয়ারা খান স্বামীর সঙ্গে যোগ দেন ১৯৭৩ সালে। ছোট বেলায় মায়ের কাছ থেকেই শাস্ত্রীয় নৃত্যের পাঠ শুরু হয় আকরামের। আকরাম খান বলেন, ‘লন্ডনের বিদ্যালয়ে আমার বাংলাদেশি বন্ধরা সবাই চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা আইনজীবী হতে চাইতো।তাদের সেসব চাওয়ার সঙ্গে আমি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। কিন্তু বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে যখন নাচে ভাল করতাম, তখন সবাই বাহবা দিত।’
   আকরামের নৃত্য ভারতীয় শাস্ত্রীয় কথক নৃত্যের সঙ্গে সমসাময়িক নাচের মিশেলে নিজস্ব রীতি প্রতিষ্ঠিত করে নিজেকে আধুনিক নৃত্যকলার খ্যাতিমান পুরুষের মর্যাদায় নিয়ে গেছেন আকরাম। শরীরের মোচড়ে মোচড়ে জীবনের গল্প বলেন তিনি। বিবিসি’র মতে, বাঙালি পরিবারের এই সন্তান গত দুই দশকে যুক্তরাজ্যের নৃত্যকলা জগতে সেরা কিছু কাল্পনিক পরিবেশনার উপহার দিয়েছেন। দেশটির বৃহত্তম সঙ্গীত উৎসব গ্লাসটোনবেরি ফেস্টিভ্যালে মঞ্চ মাতিয়েছেন। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আকরাম খান ও তাঁর দলের পারফরম্যান্স বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছুটে যাচ্ছেন নিজের কাজ নিয়ে। ২০১৪ সালে এসেছিলেন বাংলাদেশেও। তখন তিনি তাঁর বাংলাদেশ নিয়ে সৃষ্টি ‘দেশ’ পরিবেশন করেন।
নৃত্যে চমক দেখিয়ে ১৯৯০ এর দশকেই সাড়া জাগান আকরাম। ২০০০ সালে গড়ে তোলেন ‘আকরাম খান কোম্পানি’। এই প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রযোজনার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ পর্য্যন্ত মোট ২৩টি নৃত্যনাট্য প্রযোজনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আকরাম খান বলেন, ‘যখন আমি নাচি, তখন এক ধরণের আশার আলো দেখি। কর্ম ছাড়া কোনো আশা প্রত্যাশা করা যায় না। তাই আমাদের নড়াচড়া করতে হবে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের সামষ্টিক মানবিকতার জন্য।’
 
যে বার্তা নিয়ে জেনোস
 গ্রিক শব্দ ‘জেনোস’-এর অর্থ হলো অচেনা ব্যক্তি বা বিদেশি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষের যেসব সৈন্য ব্রিটিশ বাহিনীর পক্ষে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আকরামের সর্বশেষ একক পরিবেশনা ‘জেনোস’। আকরাম খান বলেন, ‘একজন তৎকালীন ভারতীয় নৃত্যশিল্পীর হঠ্যাৎ যুদ্ধের ময়দানে নিজেকে আবিষ্কারের গল্প নিয়েই জেনোস। ওই যুদ্ধ তাঁর কাছে অচেনা, এই বিশ্ব তাঁর কাছে অচেনা। মানুষগুলোও তাঁর কাছে অচেনা। নিজেকে সে ভিনদেশী ভাবছে।’ কখনো বাদ্যের সূর, কখনো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, আবার কখনো গভীর নিরবতা-এমন নানা মুহূর্তে বিচিত্র শারীরিক কসরতে  আকরাম তুলে ধরেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষের সৈনিকদের অবদান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনকে সামনে রেখে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনোস মঞ্চে গড়ায়।
আকরাম খান বলেন, জেনোসকে একটি রাজনৈতিক কর্মও বলা যেতে পারে। যার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্যের সমসাময়িক পরিস্থিতির প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশিদের নিয়ে যে ভীতি এবং বিদ্বেষ সেটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেও ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল এবং বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে আমি নিজেকে কখনো বিদেশি মনে করিনি। তবে ১৯৮০/৯০ সালের দিকে যখন বাবার রেস্টুরেন্টে কাজ করতাম, তখন বর্ণবাদের শিকার হয়েছিলাম। এখন আমার নিজেকে বেশ বাদামি রঙের মনে হয়। আমি আগে কখনো নিজের রঙ নিয়ে চিন্তা করিনি। ব্রেক্সিট নিয়ে দেশ যেদিকে যাচ্ছে এসব নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জেনোস এর আবির্ভাব ঘটেছে।’
শরীর আমার কণ্ঠ মঞ্চ পারফরমেন্স থেকে অবসর নেয়া প্রসঙ্গে আকরাম বলেন, ‘বয়সের কারণে শরীর আর চাপ নিতে পারছে না। তাই জেনোস-ই হবে মঞ্চে তাঁর শেষ কাজ। তিনি বলেন, ‘এটা আমার জন্য আবেগঘন সময়। কারণ আমার শরীর ছিল আমার কণ্ঠ। আমার শক্তি। শরীর দিয়েই আমি যোগাযোগ করি।’ তবে কোরিওগ্রাফি অব্যাহত রাখবেন বলে জানান তিনি।
আকরাম জানান, বাংলাদেশে যাওয়ার তাঁর ব্যক্তিগত কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তাঁর দল নিয়ে পারফরম্যান্স করার জন্য যেতে আগ্রহী।