Share |

ব্রেক্সিটের নতুন দিনক্ষণ ৩১ অক্টোবর : মে’কে সরিয়ে দেয়ার তোড়জোড়

পত্রিকা রিপোর্ট
লন্ডন, ১৫ এপ্রিল : ইউরোপিয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদের দিনক্ষণ আবারও পিছিয়েছে। নতুন দিনক্ষণ ৩১ অক্টোবর। এর ফলে ব্রেক্সিট নামে পরিচিত ঐতিহাসিক এই বিচ্ছেদ নিয়ে গৃহবিবাদ মিটাতে আরও ৬ মাস সময় পেল যুক্তরাজ্য। গত ১০ এপ্রিল বুধবার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউ’র জরুরি সম্মেলনে বিচ্ছেদের নতুন এই দিনক্ষণের সমঝোতা হয়। এটি দ্বিতীয়বার সময় পিছানোর ঘটনা। প্রথম দফায় ২৯ মার্চ থেকে পিছিয়ে ১২ এপ্রিল করা হয়েছিল।  
ব্রেক্সিটের দিনক্ষণ আবারও পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের গৃহবিবাদ আরও চড়াও হয়েছে। দলটির কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীরা এতে মরাত“কভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মেকে দ্রুত সরে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। আগামী মে মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে থেরেসা মেকে উতখাতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন তাঁরা।  
কনজারভেটিভ দলের সাবেক লিডার এবং সাবেক মন্ত্রী ব্রেক্সিটপন্থী ইয়ান ডানকান স্মিথ গত ১৪ এপ্রিল রোববার স্কাই নিউজে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মে নেতৃত্ব দেয়ার সকল বিশ্বাস হারিয়েছেন। ৬ মাসের জন্য ব্রেক্সিট পিছিয়ে যাওয়ার কারণে এখন যুক্তরাজ্যকে আগামী ২৩ মে থেকে অনুষ্ঠেয় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ তিন বছর আগে যে ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তাদের আবার ওই ইউনিয়নের ভোটে অংশগ্রহণের কথা বলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইয়ান ডানকান বলেন, কনজারভেটিভ দলের শতাধিক শাখা থেকে প্রধানমন্ত্রী মের কাছে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, তারা ইইউ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন- ইইউ নির্বাচনে কি বলে দলগুলো মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাবে?  তিনি বলেন, বিরোধী দল লেবার পার্টিও গত নির্বাচনে ব্রেক্সিট কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা ভোটারদের কাছে গিয়ে কি বলবে?  
ইয়ান ডানকান বলেন, যে ইউনিয়ন আমরা ছেড়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছি সেই ইউনিয়নের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থ খরচের কোনো মানে হয় না। এছাড়া ব্রেক্সিট ৬ মাস পিছিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতি মাসে আরও বিলিয়ন পাউন্ড করে ইইউকে দিতে হবে। তিনি বলেন, উচিত হবে আগামী ২৩ মে অনুষ্ঠেয় ইইউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। ফলে অর্থের সাশ্রয় হবে,  ভোট চাওয়ার বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাবে দলগুলো।   আগামী ২৩ থেকে ২৬ মে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে ব্রিটেন থেকে ৭০ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা। যুক্তরাজ্য এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ইইউ বিরোধী সাবেক ইউকিপ নেতা নাইজেল ফারাজ তাঁর নতুন দল ব্রেক্সিট পার্টি গঠন করেছেন। এই নির্বাচনে ব্রেক্সিটপন্থীরা তথাকথিত মূলধারার দলগুলোকে কঠিন জবাব দেবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, স্টাবলিস্টমেন্ট জনগণের দেয়া রায় মানছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফারাজের নতুন দলে যোগ দিয়েছেন কট্টর ব্রেক্সিটপন্থী কনজারভেটিভ দলের এমপি জেকব রীচ মগের বোন অ্যানানজীয়াতা রিজ মগ।  
অপিয়ামের এক জরিপে দেখা গেছে, আসন্ন ইইউ নির্বাচনে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ কনজারভেটিভ প্রার্থীদের ভোট দেবে। লেবার দলকে সমর্থন দেবে ২৪ শতাংশ। আর ১৪ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ফারাজের ব্রেক্সিট পার্টি।  
এবার সময় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইইউ কিছু শর্ত বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাজ্যকে। শর্ত অনুযায়ী আগামী ২৩ থেকে ২৬ মে অনুষ্ঠেয় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচনে অবশ্যই যুক্তরাজ্যকে অংশ নিতে হবে। নির্বাচনে অংশ না নিলে ১ জুন চুক্তি ছাড়াই যুক্তরাজ্যকে বের করে দেয়া হবে। যুক্তরাজ্য নির্বাচনে অংশ নিলে সদস্যপদ অব্যাহত থাকবে। সেক্ষেত্রে আগামী ২০ ও ২১ জুন নির্ধারিত ইইউ সম্মেলনে বিচ্ছেদ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদন সাপেক্ষে বিচ্ছেদের নির্ধারিত দিনক্ষণ এগিয়ে আনা যাবে।   
প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ৩০ জুন পর্য্যন্ত সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু এবার সময় বৃদ্ধি নিয়ে ইইউকে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। বাকী ২৭টি সদস্য দেশ (যুক্তরাজ্য ছাড়া) ব্রেক্সিট নিয়ে বিরক্ত। বার বার সময় বৃদ্ধির ঝামেলা এড়াতে বিচ্ছেদ এক বছর পিছিয়ে দেয়ার মত আসে। আবার কেউ কেউ ৩০ জুনের বেশি সময় দিতে নারাজ। বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়াল ম্যাখোঁ দ্রুত ব্রেক্সিট ঝামেলা শেষ করার পক্ষে অবস্থান নেন। ব্রেক্সিটের কারণে ইইউ’র বাকী নিয়মিত কাজগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ। আবার বিচ্ছেদ চাওয়া যুক্তরাজ্যকে দীর্ঘদিন সাথে রাখলে ইইউ’র জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে যে আশঙ্কা, সে বিষয়টিও ইইউ নেতারা বিবেচনা করেন। যে কারণে বর্ধিত সময়ে যুক্তরাজ্য দ্বায়িত্বশীল আচরণ করবে বলে প্রধানমন্ত্রী মে’র কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে।   
প্রসঙ্গত, যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীরা বিচ্ছেদের সময় না পিছাতে হুমকি-ধামকি দিয়েছেন। দলটির কট্টর ব্রেক্সিটপন্থী আইনপ্রণেতা মার্ক ফ্র্যানকোইচ বলেন, ইচ্ছার বিপরীতে যুক্তরাজ্যকে আটকে রাখতে চাইলে ইইউ’র জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবেন তাঁরা। তিনি বলেন, থেরেসা মে থাকবেন না। ব্রেক্সিটপন্থী বরিস জনসন কিংবা ডোমিনিক রাব প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁরা ইইউ’র বাজেট আটকে দেবেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন এবং ইউরোপিয়ান রিচার্স গ্রুপের নেতা জেকব রিচ মগও একই রকমের হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।   কট্টরপন্থী আরেক নেতা নাইজেল ফারাজ বলেন, আসন্ন ইইউ নির্বাচনে যুক্তরাজ্যকে অংশ নিতে বাধ্য করা হলে তিনি সেই নির্বাচন ভালভাবেই লড়বেন। ইউরোপিয়ান  পার্লামেন্ট মেম্বার (এমইপি) পদে ব্রেক্সিটপন্থীরা বিজয়ী হয়ে ইইউ’র জীবন অস্থির করে তুলবে বলে তাঁর মন্তব্য।   এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ভালই বিপাকে পড়েছে ইইউ। বিচ্ছেদের সময় বৃদ্ধি না করলে চুক্তিহীন বিচ্ছেদের দায় নিতে হবে তাদের। আবার সময় বৃদ্ধি করা হলে যুক্তরাজ্য ইইউ’র ঝামেলার কারণ হতে পারে।
এদিকে থেরেসা মে সরকারের শরিক দল নর্দান আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতা অ্যারলেন ফোস্টার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মে ইইউ’র কাছে সময় ভিক্ষা চাওয়াটা অবমানাকর। তাঁর উচিত শক্ত অবস্থান নিয়ে নেতৃত্ব দেয়া’।
দীর্ঘ ৬ ঘন্টা আলোচনার পর স্থানীয় সময় মধ্যরাতে ৩১ অক্টবর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির ঘোষণা আসে। দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এদিন ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে জ্যঁ ক্লদ ইয়ঙ্কার বিদায় নেবন।
মধ্যরাতের সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদ না চাইলে অবশ্যই সম্পাদিত চুক্তিতে সমর্থন দিতে হবে যুক্তরাজ্যকে। অথবা ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য চাইলে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক ঘোষণার পরিবর্তন করা যাবে। কিন্তু বিচ্ছেদ চুক্তি (উইথড্রোয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট) নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। তাঁর আহবান, ‘ব্রিটিশ বন্ধুরা আর সময় নষ্ট করবেন না’।
প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেন, সময় বৃদ্ধির বিষয়টি তাঁর জন্য অত্যন্ত বেদনার। পার্লামেন্ট শিঘ্রই ব্রেক্সিট চুক্তিতে সমর্থন দেবে এবং যুক্তরাজ্য দ্রুত ইইউ থেকে বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। মে বলেন, ২৩ মে’র আগে পার্লামেন্ট ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদন করলে ইইউ পার্লামেন্ট নির্বাচনে যুক্তরাজ্যকে অংশ নিতে হবে না এবং সেক্ষেত্রে ১ জুন বিচ্ছেদ কার্যকর হবে।
২০১৬ সালের এক গণভোটে যুক্তরাজ্যের মানুষ ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেয়। সমঝোতার ভিত্তিতে এই বিচ্ছেদ কার্যকর করতে ইইউর সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন প্রধানমন্ত্রী মে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সেই চুক্তি অনুমোদন করছে না। তিন দফা চুক্তিটি প্রত্যাখান করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদ হোক-তাও চায় না। অন্যদিকে ইইউ বলছে, ওই চুক্তি সংশোধনের সুযোগ নেই।
৬ মাসের জন্য ব্রেক্সিট পিছিয়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী পদে পরিবর্তনের সুযোগ দেখছেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীরা। সাবেক মন্ত্রী ইয়ান ডানকান স্মীথ বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে বার্ষিক দলীয় সম্মেলনের আগেই নতুন নেতার দায়িত্ব নেয়া উচিত। তবে ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদন হওয়ার আগ পর্যন্ত পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে অটল আছেন মে। তিনি চুক্তি পাশে বিরোধী দল লেবারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইস্টার ছুটি উপলক্ষ্যে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত পার্লামেন্টের অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। তাই বলা যায়, চলতি মাসে ব্রেক্সিট পরিস্থিতির কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই।