Share |

চলে গেলেন মমতাজ স্যার

উদয় শঙ্কর দাশ
বাংলাদেশ থেকে আমার মেজভাই জানালো মমতাজ উদ্দিন স্যার আর নেই। খবরটা পেয়েই ভেঙে পড়েছিলাম। বাংলাদেশের নাট্যজগতের একজন প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব মমতাজ উদ্দিন আহমদ আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। জানতাম স্যার অসুস্থ ছিলেন, তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তবু কাছের লোকের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। মনে পড়ছিল স্যারের সান্নিধ্যে অনেকগুলো ঘটনার কথা।  ১৯৬১ সাল। আইয়ুব খানের শাসনামলে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রচর্চা বলতে গেলে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রেমিরা মহা আড়ম্বরে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরাও বিশাল একটি কমিটি করে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তিনটি নাটক, তিনটি নৃত্যনাট্য ও আলোচনাসভা দিয়ে সাজানো হয়েছিল অনুষ্ঠানমালা। আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। প্রথম দিন মঞ্চস্থ হলো নাটক- ‘রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা’। আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নে (তার সমবয়সী) সত্যপ্রসাদের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। পরদিন সকালে মমতাজ স্যার আমার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘মুক্তধারা’ নাটকে আমাকে অভিনয় করতে দিতে অনুরোধ করলেন। বাবা বলেছিলেন- ‘আপনার নাটক তো দুদিন পরেই’। স্যার নাকি বলেছিলেন- ‘সে পারবে’। পর পর দু’দিন স্যারের সঙ্গে রিহার্সেল দিয়ে উৎসবের চতুর্থ দিনে ‘মুক্তধারা’ নাটকে অভিনয় করেছিলাম। স্যারের সাথে সেটাই ছিল আমার প্রথম পরিচয় এবং তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ। ঐ নাটকে স্যারের অসাধারণ অভিনয় এখনও আমার চোখে ভাসে।
স্যার চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে বদলি হয়ে চলে গেলেন চট্টগ্রাম কলেজে। আমিও এসএসসি পাশ করে ভর্তি হলাম ঐ কলেজেই। দু’বছর এইচএসসি পড়ার সময় চট্টগ্রাম কলেজে স্যারের সঙ্গে তিনটা নাটক করেছিলাম। সেই দিনগুলোর কথা এখনও মনে পড়ে।  নাটক সম্পর্কে বলার আগে কলেজের ক্লাশের একটা ঘটনার কথা বলি। স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছিলাম বলে আমরা এইচএসসিতে এডভান্সড ইংলিশ পড়তাম আর বাংলা পড়তাম অলটারনেটিভ ইজি বেঙ্গলি। বাংলা ক্লাশে আমরা ছিলাম মাত্র ১০/১২ জন। স্যার ক্লাশ নিতে এসে আমরা যারা নাটক করতাম তাদের কয়েকজনকে দেখে বলেছিলেন- তোমরা এখানে কেন? আমরা ব্যাপারটা তাঁকে বুঝিয়ে বললাম। জবাবে তিনি বললেন- ‘তাই বলে তোমরা ইজি বেঙ্গলী পড়বে?’ তোমাদের ঐ ক্লাশ আমি নিতে পারবো না’। স্যার আর আমাদের ক্লাশ নেননি। চট্টগ্রাম কলেজে ঐ দু’বছরে যে নাটকগুলো মঞ্চস্থ হয়েছিল, সেগুলো হলো- আ. ন. ম বজলুর রশীদ-এর ‘উত্তর ফালগুনী’, মমতাজ স্যারের লেখা ‘বিয়ে করলেই টাকা’ এবং ড. আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ঝড়ের রাতে নৌকায়’। ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন। মমতাজ স্যার নাটকে অভিনয় ছাড়া মঞ্চের পেছনের অনেক কাজের দায়িত্ব আমাকে দিতেন। একটি নাটকের কথা মনে পড়ছে। মহড়া প্রায় শেষ। তিনদিন পর নাটকটি মঞ্চস্থ হবে। আমি নিয়মিতভাবে রিহার্সেলে যাচ্ছি এবং মঞ্চের পেছনের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি। হঠাৎ স্যার আমাকে ডেকে বললেন, ‘উদয় তুমি তো এই নাটকে অভিনয় করছো না, তোমাকে তো কোনো চরিত্র দেয়া হয়নি।’ আমি বলেছিলাম,- ‘তাতে কি হয়েছে স্যার, অন্য অনেক কাজ তো আমাকে করতে হবে।’ স্যার ঐ রাতেই নাটকের আর একটি দৃশ্য লিখলেন এবং ঐ দৃশ্যে অভিনয় করার জন্য আমার জন্য একটি চরিত্রও তৈরী করলেন। 
প্রায় তিন মাস মহড়ার পর মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘উত্তর ফালগুনী’ নাটক। ঐ নাটক নিয়ে মজার এক ঘটনা বলি। মহড়া দিতে দিতে নায়কের মুখে নায়িকার ‘ফালগুনী’ নামটাই সব সময় চলে আসতো। নাটকে তাদের প্রথম সাক্ষাতের সময় নায়কের সংলাপ ছিল- ‘তোমার নাম কী?’ কিন্তু নাটকের দিন মঞ্চে প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যেও নায়ক বলে ফেললো- ‘তোমার নাম কী ফালগুনী?’ আমি ছিলাম মঞ্চের আড়ালে স্যারের পাশে। আমার পিঠে ভীষণ জোরে একটা থাপ্পড় মেরে স্যার বললেন, ‘শুয়োরটার কাণ্ড দেখ উদয়।’
দু’বছর পর চলে গেলাম চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। কমার্স কলেজ থেকে বিকম পাশ করলাম। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কিন্তু পরে আর নাটক করা হয়নি। তবে ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের কথা না বললেই নয়। চলছে অসহযোগ আন্দোলন, চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে পাকিস্তানি নৌবাহিনির জাহাজ, নামানো হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। বন্দরে চলছে প্রতিবাদ বিক্ষোভও। সেনাবাহিনির ট্রাকে করে অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আর সেই রাস্তার পাশেই চট্টগ্রাম কলেজের মাঠে মমতাজ স্যার-এর লেখা এবং পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল পেট্রমাক্সের আলোতে।
চট্টগ্রামে মমতাজ স্যারের শিক্ষক জীবন শুরু হয়েছিল কমার্স কলেজে। ১৯৬০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর দুর্গত লোকদের সাহায্যার্থে তহবিল সংগ্রহের জন্য চট্টগ্রামের ওয়ালিউল্লাহ ইন্সটিটিউটে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘মমতাজ স্যারের পরিচালনায় নাটক ‘তবুও আমরা বাঁচবো’। সেটি ছিল স্যারের লেখা প্রথম মঞ্চনাটক। স্যারের বেশিরভাগই নাটকই ছিল তিন শব্দের। ‘তবুও আমরা বাঁচবো’, ‘বিয়ে করলেই টাকা’, ‘স্পাটাকার্স বিষয়ক জটিলতা’, ‘হৃদয়ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার’, ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’, ‘হাস্য লাস্য ভাষ্য,’- এই নাটকগুলোর কথা মনে পড়ছে।  মমতাজ স্যারের মৃত্যুর পর তার অনেকগুলো নাটক এবং অন্যান্য লেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। কিন্তু যে নাটকটির তেমন উল্লেখ চোখে পড়েনি সেটি হচ্ছে- ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’। এরকম নাটক লেখা এবং মঞ্চস্থ করার মত সাহস খুব কম নাট্যকারই দেখাতে পেরেছিলেন। নাটকটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তার অন্তর্নিহিত বক্তব্যের জন্য। স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গিয়েছিল।  এক সময় আমি পড়াশোনার জন্য চলে আসি লন্ডনে। বেশ কয়েক বছর স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। তবে দেশে গেলেই স্যারকে ফোন করতাম, দেখা করতাম। একবার দেশে গিয়ে স্যারকে ফোন করেছিলাম। স্যার বলেছিলেন, ‘আজ মহিলা সমিতি মঞ্চে আমার দলের একটি নাটক হবে। তুমি চলে এসো। আমি গেইটে তোমার কথা বলে রাখবো’। সেদিন মঞ্চস্থ হয়েছিল শেক্সপীয়রের ‘অলস ওয়েল দ্যাটস এন্ডস ওয়েল’ অবলম্বনে স্যারের লেখা নাটক ‘হাস্য লাস্য ভাষ্য’। নাটকটি বেশ উপভোগ করেছিলাম। এবং মনে মনে ভাবছিলাম- ‘এই নাটকটি লন্ডনে করতে পারলে কেমন হয়? স্যারকে প্রস্তাবটা দিতেই তিনি রাজী হলেন। ঠিক হলো, স্যার তাঁর সঙ্গে ঐ নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয়কারি দুজনকে নিয়ে লন্ডনে আসবেন। লন্ডনে নাট্যপ্রেমী এবং কয়েকজন সংগঠকের সঙ্গে কথা বললাম। সবাই রাজী হলেন। নিউকম আর্টসের ব্যানারে লন্ডনের বিখ্যাত লোগান হলে নাটকটি মঞ্চস্থ হলো। সুখের কথা- হলভর্তি দর্শক নাটকটি উপভোগ করেছিলেন। স্যার এবং তার সঙ্গে অভিনেতা শামস সুমন এবং স্যারের দলের একজন অভিনেত্রী নাসরীন এসেছিলেন ঢাকা থেকে। লন্ডন থেকে তসলিম আহমদ, উর্মি মাযহার, গৌরী কর, সুজিত কর, গোলাম কবির, গুলনাহার খানসহ অনেকেই অভিনয় করেছিলেন। আমিও সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম।
ঐ নাটক মঞ্চস্থ করা হলো লুটনে, সেখানকার বাংলাদেশীদের উদ্যোগে। পরে টয়েনবী হলের আয়োজনে নাট্য উৎসবের শেষ দিনে পূর্ব লন্ডনের কার্টেন থিয়েটারে। সেই দিনগুলোর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। ডা. ফজল মাহমুদ, রহমান জিলানী, নজরুল ইসলাম বাসন, আবু হেলাল, নুরুল ইসলাম পুতুলসহ অনেকেই সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা পত্রিকাগুলোও নাটকের প্রচারে সাহায্য করেছিল। এর মধ্যদিয়ে স্যারকে নিয়ে লন্ডনে একটা নাটক মঞ্চস্থ করার আমার স্বপ্ন পূরণ হল।
একবার কানাডার টরেন্টোর বাংলাদেশী কমিউনিটি আয়োজিত নাট্যউৎসবে স্যারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ঢাকা থেকে অভিনেত্রী তরু মোস্তফাও যাবেন। স্যার আমাকে খবর দিলেন- আমি যেন যাই, আর সঙ্গে উর্মি মাযহার। সাথে শব্দ সংযোজন ও আলোকসম্পাতের জন্য আবু হেলালকেও যেনো নিয়ে যাই। সেই নাট্যউৎসবে যোগ দিতে আমরা গিয়েছিলাম টরেন্টোয়। সেখানে খুব আনন্দে কেটেছিল কয়েকটা দিন।  মমতাজ স্যারকে নিয়ে অনেক স্মৃতি। কেন জানি না, আমাকে খুব স্নেহ করতেন এবং ভালোবাসতেন। লন্ডনে এসে আমার সঙ্গে ছিলেন। আমার স্ত্রী এবং মেয়েদেরকেও ভীষণ ভালোবাসতেন। 
মমতাজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের নাট্যজগতের একটি অবিস্মরণীয় নাম হয়ে থাকবেন। কোনোদিন নীতি বিবর্জিত হননি। প্রচণ্ড সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। ঝুঁকি নিতে ভয় পেতেন না। সেই কারণে, সবার সম্মান ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছিলেন। 
স্যার- যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন, আপনার স্নেহ ও ভালোবাসা কোনো দিন ভুলবো না। লন্ডন, ১০ জুন ২০১৯
লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও ক্রীড়া ভাষ্যকার।