Share |

বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন : ১৯৭ কেন্দ্রে শতভাগ, হাজারো কেন্দ্রে ৯৫-৯৯% ভোট

ঢাকা, ৮ জুলাই : বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পর প্রকাশিত কেন্দ্র-ভিত্তিক ফলাফলে অস্বাভাবিক ভোট পড়ার চিত্র উঠে এসেছে।
ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কমপক্ষে ১৯৭টি কেন্দ্রে ১০০% ভোট পড়েছে।  আর অন্তত ১ হাজার ৮৮৯টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৫% থেকে ৯৯.৯৯ শতাংশ। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি সংস্থা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স’র (ফেমা) প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান বলেন, বিষয়টি উদ্বেগের। বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোথাও ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়লেই সেখানে কমিশনের আলাদা নজর দেয়া উচিৎ বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, “এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার। যেটা হয় না পৃথিবীতে কোথাও, সেটা চলতে পারে না। আমরা শুধু এটা দেখেছি মিলিটারি আমলে ডিক্টেটরদের সময়।”
“যখন তারা গণভোট নিয়েছে তখন আমরা দেখেছি হান্ড্রেড পার্সেন্ট, নাইনটি পার্সেন্ট অনেক সময় একশভাগেরও বেশ ভোট পড়ার নজির আছে। এটা হয় একটা অটোক্রেটিক রুলের সময়।”
“কিন্তু এখন তো আমাদের ডেমোক্রেসি। এখানে তো যে ভোট দিতে যাবে, ইচ্ছা হলে যাবে না। তাদের ওপরে তো কারো কোনো হাত নেই। সেখানে হান্ড্রেড পার্সেন্ট কিভাবে ভোট পড়লো এটা ইলেকশন কমিশনের নিজেদেরকেই বের করতে হবে,” বলেন তিনি। ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট বেশিরভাগ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। আর বিরোধী ২০ দলীয় জোটে নেতৃত্বে থাকা বিএনপি এবং তাদের নির্বাচনী জোট ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৭টি আসনে জয় নিয়ে এখন সংসদে। ভোটের ফলাফল ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক নৌকা মার্কা ও বিরোধী দল বিএনপির প্রতীক ধানের শীষের মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের তারতম্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
কারণ অনেক আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর তুলনায় বিএনপির প্রার্থী মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ ভোট পেয়েছে। কেন্দ্র-ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায় বহু কেন্দ্রে বিএনপি কোনো ভোটই পায়নি।
নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে শতভাগ প্রদত্ত ভোটকে অস্বাভাবিক বলে স্বীকার করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারও। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর এ নিয়ে কিছু করার নেই বলেও মনে করে কমিশন। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নির্বাচন কমিশনারদের কেউই মন্তব্য করতে রাজী হননি। তবে কমিশন সচিব মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয় কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে এটা যদি কোনো নির্বাচনকালীন অথবা গেজেট প্রকাশের আগে কেউ অভিযোগ করতো, সুনির্দিষ্টভাবে, তাহলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে দেখতে পারতো। যেহেতু এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি বা কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি, গেজেট নোটিফিকেশন করার পরে আর কিছু করার থাকে না। কিন্তু কেউ যদি এটা নিয়ে এখন কথা বলতে চান তাহলে উপযুক্ত আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।”
এদিকে জাতীয় নির্বাচনের এত ভোট পড়ার তথ্য থাকলেও অনেকে ভোট দিতে পারেননি এমন অভিযোগও ছিল। ভোটের দিন এমন কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বিবিসির সাংবাদিকদের চোখে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি ৫০টি আসন পর্যবেক্ষণ করে ৪৭টিতে বুথ দখল করে জাল ভোট, এমনকি ভোটের আগে ব্যালটে সিল মারার মতো অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বলে প্রতিবেদন দিয়েছে।
কিন্তু ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান বলছেন, জাতীয় নির্বাচনে ভোটের হার এত বেশি কেন সেটা নির্বাচন কমিশনকেই তদন্ত করে দেখার প্রয়োজন। “অনেকেই জানে। অনেকেই অনেক থিওরি দিতে পারে। কিন্তু সেই থিওরি-তো লিগ্যাল হবে না। একে বৈধতা দেয়ার জন্য ইলেকশন কমিশন যদি প্রতিটা আসনে একটা কমিটি করেন এবং তাদের যদি সদিচ্ছা থাকে তারা বের করতে পারবে যে এই ঘটনাটা কী করে হলো।” তিনি বলেন, “আমি মনে করি এটা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হতে হবে। ইলেকশন ঠিকমতো হওয়াটা কিন্তু গণতন্ত্রের একটা বড় স্তম্ভ। সেই স্তম্ভ যদি নড়বড়ে হয়ে যায় তাহলে গণতন্ত্রের বাকি স্তম্ভগুলোও কিন্তু নড়বড়ে হতে থাকবে।”
নির্বাচন কমিশন সচিব জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা বা এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত কমিশন এখন পর্যন্ত নেয়নি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে নির্বাচনকে বিতর্ক ও অনিয়মের ঊর্ধ্বে রাখতে সবক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনার করছে। যদিও নির্বাচনে ইভিএম নিয়েও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। 
স্থানীয় সরকার নির্বাচন
ভোটে থাকবে বিএনপি, প্রতীক নেবে না
দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ৫ জুলাই শুক্রবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’। অর্থাৎ প্রতীক না নিয়ে দলটির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন।
বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন যে হচ্ছে, ইউনিয়ন পরিষদের উপনির্বাচন হচ্ছে, এখনো পুরো ইউপি নির্বাচনের সিডিউল আসেনি। এর মধ্যে আমাদের কাছে বিভিন্নভাবে আমাদের নেতা-কর্মীরা জানতে চাচ্ছেন যে, এখানে আমাদের অবস্থান কী হবে? আপনারা জানেন যে, ইতিপূর্বে যখন পার্টির প্রতীক দিয়ে নির্বাচন করার প্রশ্ন এসেছিল, তখনই আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, পার্টির মার্কা দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করাটা বাংলাদেশের জন্য উপযোগী হবে না এবং এটা বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করবে রাজনীতির ক্ষেত্রে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা এখনো মনে করি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে মার্কা ব্যবস্থা তুলে নেয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয়দেরকে মার্কা ছাড়াই নির্বাচনের সুযোগ দেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, বিএনপির যে সমচ্চ নেতাুকর্মী বা যাঁরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন, তাঁরা যদি কেউ অংশ নিতে চান, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু মার্কা সে ক্ষেত্রে আমরা বরাদ্দ করব না।’ নয়ন বন্ডকে হত্যা আসল মদদদাতাদের আড়াল করতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রিফাত হত্যার পর যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটা বাংলাদেশের আইন-আদালত ও রাষ্ট্রের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশ করা হয়েছে। দেখুন, নয়ন বন্ড, প্রধান আসামিকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, নয়ন বন্ডকে হত্যা করা, এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আসল মদদদাতা যারা, তাদের আড়াল করা। তারা যেন আলোচনায় না আসতে পারে, সেজন্য এটা করা হয়েছে। আমরা মনে করি এটা বাংলাদেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি এটা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।’ একাদশ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের যে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রকাশ করেছে, এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ হয়ে এই নির্বাচন (একাদশ নির্বাচন) কতটা প্রহসন ছিল। আপনারা দেখেছেন প্রায় ২১৩ কেন্দ্রে শতকরা ১০০ ভাগ ভোট পড়েছে, ১৫০০-এর ওপরে ভোটকেন্দ্রে শতকরা ৯৫-৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে, যেটা অসম্ভব ব্যাপার, যেটা বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সেটা কখনোই সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে এই নির্বাচন কমিশনকে সরকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এই নির্বাচনটাকে প্রহসনে পরিণত করেছে। আমরা এ বিষয়ে তথ্য আরও ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। অল্প দিনে মধ্যে আমরা আপনাদের সামনে আসব।’ পাবনার আদালতে রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘২৪ বছর পরে নিম্ন আদালতে যে রায় দেওয়া হয়েছে, এতে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ও কমিটি বিক্ষুব্ধ হয়েছে। সভা মনে করে, শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং পুরোপুরি প্রতিহিংসামূলক রায় হয়েছে এটা। যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল, সেই ঘটনায় গুলির আওয়াজ শোনা গিয়েছিল কিন্তু কেউ হতাহত হয়নি। সেই গুলির আওয়াজ সম্পর্কেও একজন খুব পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন যিনি এর আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সাথে কাজ করেছিলেন। রেন্টু তার “আমরা ফাঁসি চাই” বইতে বলেছিলেন, এটা একটা সাজানো ব্যাপার ছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা ছিল।’
বিএনপির নেতা বলেন, ‘এ ধরনের রায় নজিরবিহীন। আমরা মনে করি এই ধরনের রায় শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, প্রতিহিংসাপরায়ণও। এতটুকু ন্যায়বিচারও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল তারা পায়নি। যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা সবাই বিএনপির স্থানীয় বা অঙ্গসংগঠনের লোকজন। আমরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছি। আমরা এ কথা বলতে চাই পরিষ্কার করে, এ রায়ে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, দলের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা হবে।’
গত বুধবার পাবনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত ১৯৯৪ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনার ট্রেনে হামলা মামলায়ে ৯ জনের ফাঁসি, ২৫ জনের যাবজ্জীবন ও ১৩ জনের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
বিকাল ৪টা থেকে ২ ঘণ্টা গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্ত ছিলেন।