Share |

লর্ডসে জয়ী হয়েছে ক্রিকেট

উদয় শঙ্কর দাশ
লন্ডন, ১৫ জুলাই : চুয়াল্লিশ বছরের অপেক্ষা আর তিনবার ফাইনালে পরাজিত হওয়ার পর ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র লর্ডসে এক অবিস্মরণীয় ফাইনালে শুধুমাত্র বেশি সংখ্যক চার/ছয় এর মারের ভিত্তিতে নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করে ইংল্যান্ড রচনা করলো এক নতুন ইতিহাস। 
১৯৭৯ সালে মাইক ব্রিয়ারলি, ১৯৮৭তে মাইক গ্যাটিং আর ১৯৯২ এ গ্রাহামগুচের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড দল ফাইনালে যা করতে পারেনি,ডাবলিনে জন্মগ্রহণকারি ইয়ন মরগান ও তাঁর দল ২০১৯ সালে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ খেলায়, যেমনটা ক্রিকেটের ইতিহাসে কখনও দেখা যায়নি বললে অত্যুক্তি হবে না- নূন্যতম ব্যবধানে জয়লাভ করে ক্রিকেটের সেরা শিরোপাটা তুলে নিল প্রথমবারের মত। বলতে গেলে ইংল্যান্ড দলের এই পরিবর্তন ঘটে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর। বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হয়ে গ্রুপ পর্যায়ে বিদায় নেয়ার পর দল পুর্নগঠনে মনযোগ দেয়া হয় এবং চার বছরের প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ইংল্যান্ড পরিণত হল বিশ্বসেরা একটি দলে। মাত্র চার বছরে দেখা গেল অসারধারণ সাফল্য। এ বছরের বিশ্বকাপে খেলতে নামে বিশ্বের শীর্ষ র‌্যাংকের দল হিসেবে। সেটা দেখা  গেল ফাইনাল খেলতেও। 
নির্ধারিত ৫০ ওভারে নিউজিল্যান্ড করলো ২৪১-৮, ইংল্যান্ড ২৪১ অল আউট। এরপর সুপার ওভারে স্টোকস ও বাটলার করলেন ১৫ রান। নিউজিল্যান্ড ব্যাট করতে নামলে  প্রথম পাঁচ বলে আসল ১৪ রান-শেষ বলে ২ রান নিতে গিয়ে রান আউট  হলেন গুপটিল অর্থাৎ তাদের রানও ১৫। মূল খেলা ও সুপার ওভার টাই। কিন্তু দিনের খেলায় ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা সীমানার বাইরে বল পাঠিয়েছেন  নিউজিল্যান্ডের চাইতে বেশি(২৬-১৭)।  সেই সুবাদে জিতে নিল বিশ্বকাপ। 
২৪২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের জেসন রয়, জো রুট, জন বেয়ারস্টো ও ইয়ন মরগান আউট হয়ে যান দলের রান সংখ্যা ১০০ পৌঁছানোর আগেই। তখন হাল ধরেন বেনস্টোকস (৮৪ অপরাজিত) এবং জশ বাটলার (৫৯)। তবুও শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১৫। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল ইংল্যান্ডের প্রতি। স্টোকসের একটি মারে দ্বিতীয় রান নেয়ার সময় ফিল্ডারের ছোঁড়া বল তাঁর ব্যাটে লেগে চলে যায় সীমানার বাইরে। ২ রান হয়ে গেল ৬। তবুও শেষ বলে করতে হবে ২ রান। কিন্তু ইংল্যান্ডের শেষ ব্যাটসম্যান মার্ক উড  দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে রান আউট হলেন, স্কোর দাঁড়াল ২৪১ অল আউট। অর্থ্যাৎ নিউজিল্যান্ডের রানের সমান। ম্যাচ টাই।
 ম্যাচ গড়াল সুপার ওভারে। ইংল্যান্ডের হয়ে  স্টোকস আর বাটলার করলেন ১৫ রান। নিউজিল্যান্ডকে করতে হবে ১৬। সুপার ওভারেও শেষ বলে নিউজিল্যান্ডের প্রয়োজন ২ রান। এবারও দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে গুপ্টিল রান আউট হলেন। সুপার ওভারও টাই। অবিশ্বাস্য! এবারের ফাইনালের দু’একটা বিশেষ দিকে নজর দেবো। প্রথমত বেনস্টোকের ব্যাটিং। মারকুটে খেলোয়াড় হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। কিন্তু দল যখন বিপর্যয়ে, প্রথম চার ব্যাটসম্যান যখন ১০০ রান পার না করেই প্যাভালিয়নে ফিরে গেলেন-তখন একটি দায়িত্বশীল ইনিংস খেললেন তিনি। অনেক সময় ১ রানকে পরিণত করলেন ২ রানে। তার এই মানসিকতা ও ধৈর্য দলকে ২৪২ রানের লক্ষ্যে প্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। তারপর তিনি ব্যাট করতে নামলেন সুপার ওভারে। চুড়ান্ত বিজয়ের পর তিনি হয়ে উঠলেন আবেগাপ্লুত, যথার্থভাবেই হলেন প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যাচ। তার খেলায় লক্ষ্য করেছি পরিপক্কতা।
আমার কাছে এবারের বিশ্বকাপের বিস্ময়-খেলোয়াড় ইংল্যান্ডর জফরা আর্চার। ২৪ বছরের এই তরুণ মাত্র মাস কয়েক আগে ইংল্যান্ডের পক্ষে  খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন এবং তাকে বিশ্বকাপের দলে  অর্ন্তভুক্ত করা হলো। নিউজিল্যান্ডের রান সংখ্যা ২৪১ এর মধ্যে বেধে রাখার পেছনে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডেথ ওভারে বল করতে এসে শেষ পাঁচ ওভারে তিনি দিয়েছেন মাত্র ২২ রান। তার উপর অধিনায়ক ইয়ন মরগানের ছিল গভীর আস্থা। তাই তো সুপার ওভারে অভিজ্ঞ  বোলার ক্রিস ওকসের পরিবর্তে আর্চারের হাতেই বল তুলে দেন মরগান। সেই আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন আর্চার।
এবারের বিশ্বকাপে ‘প্লেয়ার অফ দ্যা টুর্ণামেন্ট’ কে হবে তা নিয়ে বেশ জল্পনা-কল্পনা ছিল। এর দাবীদারও ছিলেন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়। ভারতের রোহিত শর্মা একই বিশ্বকাপে পাঁচটি শতক করে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। বাংলাদেশের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান দুটো সেঞ্চুরি আর পাঁচটি পঞ্চাশোর্ধ রানের ইনিংস খেলা ছাড়াও গড়ে ৫.৩৯ রান দিয়ে নিয়েছেন ১১টি উইকেট। অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মত কোনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারলেও তাদের ফাস্ট বোলার মিচেল স্টর্ক এবার রেকর্ড সংখ্যক ২৭টি উইকেট নিয়েছেন, গড় ৫.৪৬ রান। তবে ‘প্লেয়ার অব দ্যা টুর্ণামেন্ট’ নির্বাচিত হয়েছেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেইন উলিয়ামসন। তাঁর ৫৭৮ রান এবং অনবদ্য নেতৃত্বের কথা বিবেচনা করে তাকে বেছে নেয়া হয়। এবং শচীন টেন্ডুলকারের কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। 
আমরা জানি, ক্রিকেট এক গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। দ্বাদশ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা যে উত্তেজনার মধ্যে শেষ হয়েছে তা ক্রিকেট আমোদীরা মনে রাখবেন অনেক বছর। ইংল্যান্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছে ঠিকই, কিন্তু নিউজিল্যা-ও সমান প্রশংসার দাবীদার। এই ফাইনালে কোনো দলেরই হারা উচিত ছিল না। আইসিসি কি এ রকম পরিস্থিতিতে যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করতে পারে না?  সব কথার শেষ কথা- ১৪ জুলাই, ২০১৯ লর্ডসে জয়ী হয়েছে ক্রিকেট।