Share |

গণপিটুনির ভয়াবহ বিস্তার : বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দায়ী

বাংলাদেশে হঠাৎ করে গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে। গত দু সপ্তাহে বিভিন্ন স্থানে সাতজন গণপিটুনিতে মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে ৩৬ জন গণপিটুনিতে মারা গেছেন। গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারী, মানসিক রোগী, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধাসহ নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন।  এর মধ্যে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে রাজধানীর বাড্ডায়। তসলিমা বেগম নামের এক মহিলাকে স্কুলের অফিস কক্ষ থেকে টেনে হিঁছড়ে বের  করে এনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।  তার ডাক নাম রেনু।  
দুই সন্তান মাহিন ও তুবাকে ঘিরেই যত স্বপ্ন ছিল তাসলিমা বেগম রেনুর(৩৫)। ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াবেন, সন্তানেরা বড় হবে-এমন অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু একটি গুজবেই শেষ হয়ে গেল তাসলিমার সব স্বপ্ন। ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণটাই দিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর এমন মৃত্যু মানুষকে নাড়া দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শত শত মানুষ। এই ঘটনার রেশ না কাটতেই ওই দিন রাতে সাভারের অজ্ঞাত আরেক নারী গণপিটুনিতে নিহত হন। আর গত ২১ জুলাই রোববার নওগাঁর মান্দায় পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ছেলেধরার গুজব রটিয়ে ছয়জনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়।
মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, নানা কারণে মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। আবার অপরাধীদের বিচারও ঠিকঠাক হচ্ছে না। মূলত এ কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আসকের হিসাবে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৬ জন এবং গত চার দিনে ৭ জন মিলিয়ে ৪৩ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। গত ১৮ জুলাই নেত্রকোনায় ব্যাগে করে এক শিশুর ছিন্ন মাথা নিয়ে দৌঁড়ে পালানোর সময় এক যুবককে (২৮) পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। এরপর শনিবার বিভিন্ন স্থানে পাঁচজনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার খবর পাওয়া যায়। ওই দিন রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাত একজন (বয়স আনুমানিক ৫৫) নিহত হয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত সিরাজ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। সিরাজ বোবা ও বধির ছিলেন।  
এদিকে, নানা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব ঘটনার পেছনের কথা। দেখা গেছে, বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীই বেশি গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দিন দিন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে তা-ই এ ধরনের ঘটনার নেপথ্যের অন্যতম কারণ বলে মনে করা অসঙ্গত হবে না। বিজ্ঞজনদের ভাষ্যমতে, কোনো ঘটনা থেকে সন্দেহ বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়া  মানুষ এসব ঘটনা ঘটায়, তখন তাদের মধ্যে বিচারবোধ কাজ করে না। মূলত সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে এসব ঘটনা ঘটতে থাকে সমাজে।  
তাই, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরীভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ জন্য যদি জাতিকে বড় কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়-সেই পথেই হাঁটতে হবে রাষ্ট্রকে।