Share |

স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড মুক্তাদির

সৈয়দ আবুল মনসুর লিলু
 ঘুমোতে যাওয়ার আগে অভ্যাস বশত টেলিভিশনে পরদিন সকালের নিউজ হেডলাইনগুলি দেখে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠলো। রিসিভার তুলতেই অপর প্রান্তে সাংবাদিক আনাস পাশার গলা শুনতে পেলাম। তাঁর কাছ থেকেই সেই দুঃসংবাদটি পেলাম, যার জন্য মোটেই আমি প্রস্তুত ছিলাম না। জানলাম, আমাদের নেতা লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটির অতি পরিচিত মুখ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ম আ মুক্তাদির আর নেই। সংবাদটি শুনে আমি নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরে জানলাম, দুইদিন আগে উনার হার্ট এ্যটাক হয়েছিল এবং তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মনে পড়লো, দুই একদিন আগে পূর্ব লন্ডনের বাঙালিদের প্রাণকেন্দ্র ব্রিকলেন এলাকাকে লন্ডন বারা অব টাওয়ার হ্যামলেটস ‘বাংলা টাউন’ হিসাবে সরকারীভাবে ঘোষণা করেছে। মুক্তাদির ভাই সেই বাংলা টাউন আন্দোলনের প্রথম সারির একজন নেতা হিসাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শুনেছিলাম, বাংলা টাউন উদ্বোধনের দিনই তিনি অতিরিক্ত পরিশ্রমে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হৃদয় বিদারক সংবাদটি শুনার সাথে সাথে বাংলাদেশে ভ্রমণরত আমার অনুজ দিলু নাসেরকে ফোন করে জানালাম। দিলুর সাথে লন্ডনে তাঁর সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। দু:সংবাদটি শুনে সে আর্তনাদ করে উঠলো এবং আমি অপর প্রান্ত থেকে তাঁর কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি তাকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। তখন সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাকে বললো, মুক্তাদির মামা আমাকে তাঁর গাড়ী দিয়ে এয়ারপোর্ট নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শরীর ভাল না থাকায় আমি তাকে বারণ করেছিলাম। (উল্লেখ্য, মুক্তাদির ভাই আমার অনুজ দিলু নাসেরের শ্বশুরবাড়ীর সম্পর্কে মামা ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার সপ্তাহখানেক আগে দিলু সপরিবারে দেশে বেড়াতে গিয়েছিল)।
মুক্তাদির ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ১৯৭৭ সাল থেকে। আমি তখন মেট্রিক পরীক্ষার্থী। আমার অগ্রজ সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু (সাংবাদিক ও লেখক মিলু কাশেম) তখন একটি রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে ছিলেন। জিয়া সরকার তখন ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। আমার অগ্রজসহ আরও কয়েকজন ছাত্রকে সেই ‘নিষিদ্ধ সময়ে’ সিলেট সরকারী কলেজের (বর্তমান এমসি কলেজ) একটি গোপন মিটিং থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে বিনা বিচারে কিছুদিন জেলে আটকে রেখেছিল। আমাদের পরিবারে এটাই ছিল প্রথম জেলে যাওয়ার মত ঘটনা। তাই বাস্তবিক কারনে আমার মা বড় ভাইয়ের হঠাৎ জেলে যাওয়ার ঘটনায় খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলেন। কারন ভাইটি পরিবারের দশ ভাইবোনদের মধ্যে ছিলেন সবার বড়। তখন আমার মাকে শান্তনা দেওয়ার জন্য তৎকালীন ছাত্রনেতা মুক্তাদির ভাই, লোকমান ভাই, আনসার ভাইসহ আরও অনেকে আমাদের বাসায় আসতেন। তখন থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে জড়িত হয়েছিলাম এবং মুক্তাদির ভাইসহ তখনকার সিলেটের ছাত্রনেতাদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল।
আশির দশকের শেষের দিকে সিলেট এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পড়াকালীন সময়ে মুক্তাদির ভাই, লোকমান ভাইসহ অন্যান্য জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে গিয়ে সমাজবদলের রাজনীতিতে দীক্ষা নেই। জীর্ণ সমাজকে ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে মুক্তাদির ভাইদের নেতৃত্বে আমরা রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় হই। আমাদের এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়কালীন সময়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় গোপনে মিটিং করতে হত। সেই সব মিটিং-মিছিলে কমরেড মুক্তাদির ভাইয়ের ঝাঁঝালো বক্তৃতা এবং বজ্রকণ্ঠের শ্লোগান সমাজ বদলের সংগ্রামে আমাদের আকৃষ্ট করতো। যার কারণে তৎকালীন সিলেটের সবকটি কলেজে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। মুক্তাদির ভাই ছাড়া আরও এই মুহূর্তে মনে পড়ছে মরহুম শাহ মোহাম্মদ আনসার আলী, লোকমান আহমদসহ আরও অনেকের নাম। উল্লেখ্য, আমাদের অপর নেতা শাহ মোহাম্মদ আনসার আলী ও প্রায় এক দশক আগে মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে মৃত্যুবরণ করেন।
আশির দশকের প্রথম দিকে যখন পুনরায় ছাত্র সংসদ গঠিত হয়, তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (মান্না-আখতার) সারা দেশের মত সিলেটেও সবকটি কলেজে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল। আমি বিশ্বাস করি, তখনকার সিলেটের মুক্তাদির ভাইদের মত ছাত্রনেতাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সাধারণ ছাত্রদের কাছে তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজের কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে জাসদের রাজনীতিতে বিভক্তির ফলশ্রুতিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা মান্না-আখতার যখন বাসদে যোগ দিয়েছিলেন, তখন সিলেট থেকে মুক্তাদির ভাইয়ের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একটি অংশ বাসদ ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছিলেন। তখন থেকে মুক্তাদির ভাইয়ের সাথে আমাদের রাজনৈতিক উঠাবসা কম ছিল বটে, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোন অবনতি হয়নি। মুক্তাদির ভাইয়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে আজ ছোট ছোট কত স্মৃতি মনে পড়ছে। আশি সালের প্রথম দিকে আমি এম সি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই কম পাশ করে সিলেট মদন মোহন কলেজ বি কম পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছিলাম। মদন মোহন কলেজে তখন মুক্তাদির ভাইয়ের নেতৃত্বে বাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তৎকালীন ছাত্রনেতা শাহাবুদ্দিন (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) ছিলেন মদন মোহন কলেজের দায়িত্বে এবং বাসদ ছাত্রলীগ ছিল খুবই শক্ত অবস্থানে। তখন আমিসহ আরও কয়েকজনকে কেন্দ্রীয় এবং জেলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নতুন করে জাসদ ছাত্রলীগকে সংগঠিত করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের। মুক্তাদির ভাই যদিও তখন আমাদের ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন না। কিন্তু দেখা হলেই আমাদেরকে রাজনৈতিকভাবে উৎসাহিত করতেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক। তিনি ছিলেন সবসময় রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উর্ধে। কথা প্রসঙ্গে মুক্তাদির ভাই একদিন আমাকে বলেছিলেন, “লিলু, আমাদের পথ ভিন্ন হতে পারে কিন্তু গন্তব্য একই। তাই আমরা যারা প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংর্কীণতা থাকা উচিত নয়।” আজ প্রিয় নেতার সেই কথাগুলি বার বার মনে পড়ছে।
 ‘৮৪ সালের দিকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সিলেট শহর থেকে কিছুদিন সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকতে হয়েছিল। তখন পারিবারিক কারণে রাজনীতি থেকে কিছুটা দুরে ছিলাম। ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে দুই একজন বন্ধুবান্ধব ছাড়া অনেকের সাথে দেখা করার সুযোগ হতোনা। বন্ধুদের সাথে যোগাযোগও কম ছিল। তখন শুধু মুক্তাদির ভাইয়ের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হতো। সিলেটের হাওয়া পাড়া এবং জিন্দাবাজরে দেখলেই সহাস্যে তাঁর সাদা টয়োটা পাবলিকা গাড়ীর ভিতর থেকে হাত নাড়তেন। তখন ভেবেছিলাম, তিনিও হয়ত রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসাতে নেমেছেন। পরে একদিন খবর পেলাম, মুক্তাদির ভাই লন্ডন পাড়ি জমিয়েছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি করতে না পেরে আমাকেও মুক্তাদির ভাইয়ের মত ‘৮৮ সালের শেষের দিকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে পাড়ি দিতে হয়েছিল সাত সমুদ্দর তের নদী। আমার স্থায়ী নিবাস হয়েছিল যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। লন্ডনে আসার পর আমার অনুজ দিলু নাসেরের সহযোগিতায় যোগাযোগ হয়েছিল কমরেড মুক্তাদির ভাইসহ সিলেটের আরও পরিচিত জনদের সাথে। দিলু আমার কয়েক বছর আগে লন্ডনে এসেছিল। পরে প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে মুক্তাদির ভাইয়ের এখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটির নানা তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ার কথা জানতে পারি। বিশেষকরে পূর্ব লন্ডনের তখনকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে ম আ মুক্তাদির এবং কাউন্সিলার রাজন উদ্দিন জালালসহ আরও অনেকের সাহসী ভূমিকা ছিলো। তাদের মতো আরো অনেক বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের ফলেই পূর্ব লন্ডন থেকে একসময় বর্ণবাদীরা বিতাড়িত হয়েছে।
পূর্ব লন্ডনের এক সভায় একদিন আমি তাকে সহাস্যে প্রশ্ন করেছিলাম, মুক্তাদির ভাই এখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছেন নাকি? তিনি জবাবে আমাকে বলেছিলেন, আর কোন জায়গায় হউক বা না হউক দেখবে এই ব্রিকলেনে বাঙালিরা একদিন বিপ্লব ঘটাবে। তাঁর কথা সত্যি হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই ব্রিকলেনকে ‘বাংলা টাউন’ সরকারীভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
মানবতা এবং অধিকারের প্রশ্নে কমরেড মুক্তাদির ছিলেন সদা জাগ্রত। সেটা নিজ দেশেই হউক অথবা বিদেশেই হউক। মেহনতি মানুষের সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন সীমানাবিহীন একজন লড়াকু সৈনিক। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে ঢাকা এয়ার পোর্টে লন্ডন প্রবাসী ছুরত মিয়াকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। কমিউনিটির অনৈক্যের কারণে যখন লন্ডনে সেই আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিল, তখন মুক্তাদির ভাই এবং আরও কয়েকজন কমিউনিটি নেতার উৎসাহ ও সহযোগিতায় আমরা যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টার এমিলী থর্নবেরীর (বর্তমানে শ্যাডো ফরেন সেক্রেটারি) নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলাম এই হত্যার সঠিক তদন্ত করার জন্য।

একাত্তরের সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী এবং লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটির বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আমাদের প্রিয় নেতা মুক্তাদির ভাই আমাদের ছেড়ে বহু আগেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু মুক্তাদির ভাই, তুমি বেঁচে থাকবে পৃথিবীর খেটে খাওয়া অধিকারবঞ্চিত কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের গহীনে। কমরেড তোমার মৃত্যু নেই। আমি মুক্তাদির ভাইয়ের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক : রাজনীতিক ও ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক
 (লেখাটি আজ থেকে ২১ বছর আগে ম আ মুক্তাদির ভাইয়ের মৃত্যুর পর লেখা। লন্ডন থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সিলেটের ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত)।