Share |

এক্সেলসিয়র সিলেট : মিথ্যা মামলায় নাজেহাল প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা

লন্ডন, ১৬ সেপ্টেম্বর : এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেড কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে প্রতারিত হওয়ার পর এখন মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা। ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণকারী সাইদ চৌধুরী (সাবেক এমডি) এবং শাহ জামাল নুরুল হুদা (সাবেক চেয়ারম্যান)-সহ তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এবং পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা। এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেড সিলেটের স্বনামধন্য জাকারিয়া সিটির মালিক।
সাইদ চৌধুরী ও শাহ জামাল বিনিয়োগকারী অর্থ ফেরত দেয়ার চাপ এড়ানোর কৌশল হিসেবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও প্রকৃতপক্ষে তারাই কোম্পানি পরিচালনা করছেন।  
লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা এসব অভিযোগ এনে বলেন, ২০১৪ সাল থেকে নানা চেষ্টা ও সমঝোতার মাধ্যমে তারা নিজেদের অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কমিউনিটির গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্ততায় কয়েকদফা লিখিত অঙ্গীকার করার পরও সাইদ চৌধুরী তাদের অর্থ ফেরত দেননি। বাধ্য হয়ে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল লন্ডনের হাইকোর্টে সাইদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা করেন বিনিয়োগকারী আব্দুল বারী।  
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, এই মামলার পরপরই সাইদ চৌধুরীর সহযোগী শাহ জামাল নুরুল হুদা বিনিয়োগকারী সিরাজ হক, আব্দুল বারী, কয়সর খান, আনিস রহমান ও মাসুক রহমানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। ২০১৮ সালের ২১ জুন সিলেট জালালাবাদ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ৯০১) করে এসব প্রবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে বলা হয় যে, তাঁরা লোক পাঠিয়ে শাহ জামালের বাড়িতে হামলা করিয়েছেন এবং ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। এর চারদিন পর ২৫ জুন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুানালে ৫৭(২) ধারায় ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে আরও একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন শাহ জামাল। এ মামলায়ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হয় যে, এসব প্রবাসী অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাহ জামালের নামে মিথ্যা ও কুরুচিপূর্ণ অপপ্রচার চালিয়েছেন। দুটি মামলাতেই সাক্ষী হিসেবে আছেন সাইদ চৌধুরী ও এক্সেলসিয়র সিলেটের বর্তমান এমডি আহমদ আলী।  
অন্যায় ও অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হয়রানির উদ্দেশে এসব মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা। তাই স্বাভাবিক কারণে এসব মামলার ন্যায়বিচার নিয়েও তাঁরা সন্দিহান।   
মামলার হয়রানির ভয়ে বিনিয়োগকারীরা যাতে অর্থের দাবি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং অন্যান্য সাধারণ বিনিয়োগকারীও যাতে অর্থের হিসাব চাইতে সাহস না পায় সেজন্য এসব মামলা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তাঁরা। ভুক্তভোগীরা বলেন, অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। প্রতারিত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মিথ্যা কিছু কখনো প্রচার করেননি।  
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জন্মভূমি বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে, নিজেদের এলাকা সিলেটের উন্নয়ন হবে, প্রজেক্টটি সফল হবে- এমন প্রত্যাশা নিয়েই তাঁরা সাইদ চৌধুরী ও শাহ জামালের কথায় বিশ্বাস করে বিনিয়োগ করেছিলেন। তাদের পাঁচজনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।  
এসব বিনিয়োগকারী বলেন, তাঁরা প্রত্যেকে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং কমিউনিটিতে ভালভাবেই পরিচিত। বাংলাদেশে অন্যান্য ব্যবসায়ও তাদের বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা রয়েছে বলে জানান। তাঁরা বলেন, সাইদ চৌধুরী ও এক্সেলসিয়র সিলেট লিমিটেডের এ প্রতারণামূলক কাণ্ড বাংলাদেশের বিনিয়োগের পরিস্থিতি নিয়ে প্রবাসীদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করবে। বাংলাদেশে প্রবাসী বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে এই প্রতারণা কাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।
  কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সাইদ চৌধুরী এবং শাহ জামাল আবারও যুক্তরাজ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারা যেন আর কারো কাছ থেকে বিনিয়োগের নামে অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারেন সে বিষয়ে সকলকে সজাগ থাকার আহবান জানানো হয়।   সাইদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টে দায়ের করা মামলার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এই মামলা চলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সাইদ চৌধুরী একটি আবেদন করেছিলেন। আদালত তার সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। একইসঙ্গে ওই আবেদন মোকাবেলায় আব্দুল বারীর খরচ হওয়া সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে সাইদ চৌধুরীর প্রতি আদেশ জারি করে আদালত। কিন্তু সাইদ চৌধুরী নিজেকে বেশ অসহায় ও দরিদ্র দাবি করেন এবং ওই খরচ পরিশোধে অপারগতা জানান।  মাসে মাত্র ১৪০ পাউন্ড দেয়ার অনুমতি চেয়ে আবারও আদালতে আবেদন করেন। ওই মামলায় সাইদ চৌধুরী দাবি করেন, স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ মালিকানায় তার যে ঘর রয়েছে, সেটি তাঁর স্ত্রীর। ঘরে তাঁর মালিকানার ভাগ মাত্র ১ শতাংশ। আদালত তার ১৪০ পাউন্ড করে ফেরত দেয়ার আবেদনও গ্রহণ করেনি। দুটি আবেদনে হেরে আব্দুল বারীর মামলার খরচ বাবদ সাইদ চৌধুরীর মোট দেনা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার পাউন্ড। ফলে আইনীভাবে সাইদ চৌধুরীর ওই ঘরের ওপর চার্জ এনেছেন আব্দুল বারী। মূল মামলাটি এখনও শুনানীর অপেক্ষায়।  
সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানির ডাইরেক্টর আনিস রহমান ও মাসুক রহমান জানান, ২০১৪ সালে কোম্পানির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব পাননি। গত ৬ বছরে অন্তত ১৯ কোটি টাকা টার্নওভার হয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা। কিন্তু কোনো লাভের মুখ দেখেননি তাঁরা।  
সংবাদ সম্মেলনে মামলার নথি উপস্থাপন করে বলা হয় যে, আরও অন্তত পাঁচজন বিনিযোগকারী চেক ডিসঅনারের অভিযোগে সাইদ চৌধুরীকে বাংলাদেশের আদালতে তুলেছেন। এর মধ্যে একটি মামলায় সাজা এড়াতে সাইদ চৌধুরী ব্যরিস্টার মোস্তাকিম চৌধুরীকে ৪০ লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।  
প্রসঙ্গত, এই সংবাদ সম্মেলনের অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই এক্সেলসিয়র সিলেটের পক্ষে সাইদ চৌধুরী একটি বিভিন্ন জনের কাছে প্রতিবাদ পাঠান। এতে তিনি সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য জানাজানি হওয়ার আগেই অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও মানহানিকর উল্লেখ করে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।