Share |

ছোট্ট তাফিদার জীবন নিয়ে আইনী লড়াই

পত্রিকা প্রতিবেদন
লন্ডন, ১৬ সেপ্টেম্বর : হাসপাতালের বিছানায় ‘গভীর ঘুমে’ আচ্ছন্ন পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু তাফিদা রাকিব। তার বাঁচা-মরার প্রশ্ন নিয়ে আদালতে চলছে আইনি লড়াই। লন্ডনের হাইকোর্টে পাঁচ দিনের শুনানি শেষ হয়েছে গত শুক্রবার। চিকিৎসকেরা ছোট্ট মেয়েটির জীবনাবসান ঘটাবেন, নাকি তাকে আরও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবে- সেটি জানা যাবে ৩০ সেপ্টেম্বর কিংবা তার দু-একদিন পর। 
গত বৃহস্পতিবার তাফিদার মা সেলিনা রাকিব আদালতে শেষবারের মতো তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে বিচারক অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকডোনা? তাঁর কাছে জানতে চান, ‘আপনার মেয়ে যদি কথা বলতে পারত,  আদালতে আসতে পারত, তাহলে সে কী বলত?’ জবাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেলিনা বলেন, ‘আমার মেয়ে বলত, “আমি এমন কী অন্যায় করেছি যে আমার সঙ্গে এসব হচ্ছে? কেন আমাকে বাঁচার সুযোগ দেওয়া হবে না? আমার মা-বাবাই আমার সব। তারা আমার জন্য সবকিছু করবে। এটা আমার জীবনের বিষয়। অন্য কেউ এর মানে বুঝবে না। আমি কেবল বেঁচে থাকার সুযোগ চাইছি”।’
মস্তিষ্কের জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘গভীর ঘুমে’ আচ্ছন্ন তাফিদা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘কোমা’। তাফিদার আর জেগে ওঠার সম্ভাবনা নেই- এমন যুক্তিতে পূর্ব লন্ডনের রয়্যাল লন্ডন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে জীবনের অবসান ঘটাতে চায়। কিন্তু তাফিদার মাুবাবা নিজস্ব খরচে মেয়েকে ইতালির জেনোয়ার গ্যাসলিনি চিলড্রেন হসপিটালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান। এ নিয়েই এই আইনি লড়াই।
তাফিদার বাবা মোহাম্মদ রাকিব (৪৫) এবং মা সেলিনা রাকিব (৩৯)। দুজনেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। বাড়ি সিলেটের শিবগঞ্জে। যুক্তরাজ্যে এই পরিবারের বসবাস পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যাম এলাকায়।
বৃহস্পতিবার তাফিদাকে বাঁচানোর দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে আদালতে হাজির হন রাকিব-সেলিনা দম্পতি। একই দাবি জানিয়ে আদালতের বেষ্টনীতে ঝোলানো হয় তাফিদার ছবিসহ ব্যানার।
পেশায় আইনজীবী সেলিনা রাকিব আদালতকে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তাফিদা ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। আমি বুঝি, আমার কণ্ঠ শুনে সে সাড়া দেয়। তাফিদা এভাবে বেঁচে থাকলেও আমি, তার বাবা ও ভাই তাকে দেখতে পাব, আদর করতে পারব।’ শুক্রবার চূড়ান্ত শুনানীর দিনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ক্যাটি গোলোপ বলেন, তাফিদার মধ্যে হয়তো সুক্ষ চেতনা রয়েছে। কিন্তু সে পুরোপুরি নিচ্চেজ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সে কোনো ব্যাথা অনুভব করে না। আশপাশে কি ঘটছে তার কিছুই সে টের পায় না। কোনো চিকিৎসাতেই তার জেগে উঠার সম্ভাবনা নেই। লাইফ সাপোর্ট অব্যাহত রাখলে তার শরীরের মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকবে। তাই জীবনের অবসান ঘটানো তাফিদার জন্য মঙ্গলজনক। তাফিদার পরিবারের আইনজীবী ভিকরম সাছদেব পা?া যুক্তি দিয়ে বলেন যে, তাফিদাকে ইতালি নেয়ার অনুমোদন না দিলে সেটি হবে ইউরোপিয় ইউনিয়নের অবাধ চলাচল নীতির লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ‘যে কোনো ব্যক্তিকে তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে দেয়া উচিত। এ কথা ঠিক যে তাফিদার জেগে উঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু জীবন রক্ষার মত পবিত্রতম বিষয়টি এখানে মূখ্য।’ 
এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে মা সেলিনা রাকিব বলেন, ছোট্ট তাফিদার জীবন বাঁচানোর পক্ষেই আদালত রায় দেবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা বন্ধ করে আমার মেয়ের জীবনের অবসান ঘটানো হলে- সেটি আমি কখনো মেনে নিতে পারবো না।’  সেলিনা রাকিব জানান, তাফিদাকে বাঁচিয়ে রাখার এ লড়াইয়ে তাঁদের প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছে। কেবল আইনী লড়াইয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড। আর ইতালি নিয়ে চিকিৎসা করতে প্রয়োজন আরও প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড। পরিবারের পক্ষে এই পরিমান অর্থের সংস্থান করা সম্ভব নয়। তাই ইতিমধ্যে তাঁরা সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিদের কাছে তাফিদার চিকিতসার তহবিল যোগানের আবেদন জানিয়ে অনলাইনে একটি আপিল  করেছেন। ইতিমধ্যে এ আপিলের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড সংগৃহীত হয়েছে। তাফিদার নামে ফেসবুকে একটি পেইজও খোলা হয়েছে, যেখানে তাফিদার চিকিতসা ও আইনী লড়াই সম্পর্কে সময় সময় বিস্তারিত তুলে ধরা হচ্ছে। সেলিনা রাকিব তাফিদার পেইজবুক পেইজে লাইক দেয়ার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন,  অর্থ দিয়ে সহায়তা করতে না পারলেও পেইজবুক পেইজে লাইক করলে পেইজটি আরও বহু মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং সমাজের হৃদয়বান ও সামর্থ্যবান লোকেরা তাফিদাকে বাঁচাতে সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারবেন।   সেলিনা রাবিক বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আমার মেয়ে জেগে উঠবে। সে সুস্থ হবে। দুনিয়াতে অলৌকিক অনেক কিছুই ঘটে। আমি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখতে চাই।’  
আপিল পেইজটির ঠিকানা:

https://www.gofundme.com/f/save-tafida?rcid=r01-156189212745-25a6c9a83f6...