Share |

ইইউকে বরিস জনসন : ব্রেক্সিট পেছাবে না ব্রিটেন

পত্রিকা প্রতিবেদন
লন্ডন, ১৬ সেপ্টেম্বর : প্রধানমন্ত্রী বরিস জন ইউরোপিয় ইউনিয়নকে জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ব্রেক্সিটের দিনক্ষণ আর পেছাতে রাজি নয়। ৩১ অক্টোবর বিচ্ছেদ ঘটাতে প্রস্তুত সরকার। ১৬ সেপ্টেম্বর সোমবার ইউরোপিয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ জাঙ্কারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতে এমনটি জানান প্রধানমন্ত্রী বরিস। 
একই সঙ্গে একটি কািিখত চুক্তি সম্পাদনের বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন ৩১ অক্টোবর চুক্তির মাধ্যমেই ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ কার্যকর হবে। আয়ারল্যাণ্ড সীমান্তের বেকস্টপ নিয়ে সৃষ্ট সংকট দূর করতে ইইউ সহযোগিতা করবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।  তবে বৈঠক শেষে ইইউ প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ জাঙ্কার বলেন, বেকস্টপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের আপত্তি আছে। কিন্তু এর বিকল্প কিছু তারা এখনও উপস্থাপন করতে পারেনি। সে কারণে সমঝোতার আলোচনা আগায়নি। 
তিনি বলেন, দেশপ্রেমিক কোনো ব্রিটিশ রাজনীতিক চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদ ঘটাতে চাইবেন না বলে তিনি মনে করেন।  এদিকে, ব্রেক্সিটপন্থী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচ সপ্তাহের জন্য স্থগিত হয়ে গেছে যুক্তরাজ্যের সংসদ অধিবেশন। গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর সোমবার অধিবেশন স্থগিত হওয়ার আগে স্থানীয় সময় মধ্যরাত পর্যন্ত চলে সরকার ও বিরোধীদের উত্তপ্ত বিতর্ক। বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতাদের তুমুল প্রতিবাদ ও অভিনব বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় পার্লামেন্ট স্থগিতের ঐতিহাসিক চর্চা। উত্তেজনা আর তুমুল নাটকীয় এমন রাত আগে কখনো দেখেনি যুক্তরাজ্যের সংসদ।
চলতি অধিবেশনের শেষ কার্যদিবসেও সংসদের কাছে শোচনীয়ভাবে ধরাশায়ী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস। সরকারের ব্রেক্সিটনীতির বিরোধীরা দিনটিকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। সরকার কিসের ভিত্তিতে পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সব যোগাযোগের নথি প্রকাশ করতে প্রস্তাব আনা হয়। আরেক প্রস্তাবে চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের পরিণতি নিয়ে সরকারি গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে বলা হয়। বিরোধীদের আনা দুটি প্রস্তাবই পাশ হয়েছে সংসদে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আগামী ১৫ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন আয়োজনে এ দিন শেষ চেষ্টা চালান। কিন্তু পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বিরোধী দলগুলো তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। আগাম নির্বাচন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন ২৯৮ জন। আর বিপক্ষে ছিলেন ৪৬ জন। বিরোধী দল লেবার ও লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের আইনপ্রণেতাসহ ৩০৩ জন সদস্য ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। এ নিয়ে আগাম নির্বাচনের চেষ্টায় দ্বিতীয় দফা পরাস্ত হলেন বরিস। ভোটাভুটির আগে বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে বরিস জনসন বলেন, ‘আপনারা বারবার বলছেন চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদ কার্যকরে জনগণের সমর্থন নেই। তাহলে সাধারণ নির্বাচনে সমর্থন দিন। জনগণ আপনাদের ভোট দিলে আপনারা বিচ্ছেদ পিছিয়ে দিতে পারবেন।’ বরিস এ সময় বারবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি কোনো অবস্থাতেই বিচ্ছেদের দিনক্ষণ পেছানোর আবেদন করবেন না। প্রসঙ্গত, ১৯ অক্টোবরের মধ্যে কোনো প্রকার চুক্তি সম্পাদনে ব্যর্থ হলে বিচ্ছেদের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারকে বাধ্য করতে ইতিমধ্যে বিল পাশ করেছে সংসদ। গতকাল রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অনুমোদন লাভের মধ্য দিয়ে সেটি আইনে পরিণত হয়। এমন আইন সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর বিচ্ছেদ না পেছানোর ঘোষণা ছিল অবাক করার মতো।
বিরোধী দল লেবারের নেতা জেরেমি করবিন বলেন, অবশ্যই তিনি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তবে সেটি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছামাফিক তারিখে নয়। বিচ্ছেদ না পেছানোর ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আইনভঙ্গের মতো ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন করবিন। এসএনপি নেতা ইয়ান ব্ল্যাকফোর্ড প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আপনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের প্রধান। আপনি যদি আইন ভঙ্গ করেন তার মানে দাঁড়াবে দেশে আইন কোনো ব্যাপার না।’
গভীর রাতে বিতর্ক শেষে যখন সংসদ স্থগিতের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়, তখন ঘটে নজিরবিহীন কাণ্ড। রীতি অনুযায়ী রানির প্রতিনিধি (ব্ল্যাক রড) নিম্ন কক্ষ বা হাউস অব কমন্সের সদস্যদের উচ্চকক্ষ বা হাউস অব লর্ডসে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তারপর কমন্সের স্পিকারের নেতৃত্বে আইনপ্রণেতারা সেখানে যান।
কিন্তু এদিন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ স্পিকারকে তাঁর চেয়ারের চারপাশে ঘিরে ধরেন। কেউ কেউ ‘সাইলেন্স’ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। আর সরকারি দলের আইনপ্রণেতারা যখন বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখন বিরোধী আইনপ্রণেতারা সমস্বরে ‘শেইম অন ইউ’ সৌাগান দিতে থাকে। এর আগে বিকেলে অধিবেশনের এক ফাঁকে অনেকটা আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্পিকার জন বারকো। আবেগঘন বক্তব্যে তিনি জানান, আগামী ৩১ অক্টোবর হবে তাঁর শেষ কর্মদিবস। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করা ক্ষমতাসীন দলীয় রাজনীতিক বারকো নানা কারণে আলোচিত ও সমালোচিত। সম্প্রতি পার্লামেন্টের অধিকার অক্ষুণœ রাখতে গিয়ে তিনি সরকারের বিরাগভাজন হন। যে কারণে পদত্যাগের ঘোষণার পর বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিবাদন জানালেও আশ্চর্যরকম নীরব থাকেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভের সদস্যরা।
বরিসের সামনে বিকল্প কী
বিচ্ছেদ পেছানো ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সামনে ছয়টি বিকল্প দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তবে এগুলোর কোনোটিই স্বাভাবিক পথ নয়।
ইইউর কাছে দুটি চিঠি লিখবেন বরিস
আইন মেনে প্রধানমন্ত্রী বরিস বিচ্ছেদের দিনক্ষণ পেছানোর আবেদন জানিয়ে ইইউকে একটি চিঠি লিখবেন। সেই সঙ্গে আরেকটি চিঠিতে জানিয়ে দেবেন যে প্রকৃতপক্ষে তাঁর সরকার বিচ্ছেদ পেছাতে চায় না। তাই ৩১ অক্টোবর বিচ্ছেদের যে দিনক্ষণ নির্ধারিত রয়েছে, ইইউ যেন সেটি পরিবর্তন না করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এই বিকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। তবে এমন চতুর কৌশলের সম্ভাবনা ইতিমধ্যে বিতর্ক ছড়িয়েছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক লর্ড সাম্পশন বলেন, আইন অনুযায়ী সরকার কেবল চিঠি লিখলে চলবে না। বিচ্ছেদের দিনক্ষণ পেছানোর অনুরোধ করতে হবে। এই অনুরোধ বাতিল করে এমন কোনো চিঠি সঙ্গে জুড়ে দিলে সেটি হবে আইনের লঙ্ঘন।
আইন বাতিলে জরুরি ক্ষমতার প্রয়োগ
দেশটির সিভিল কনটিনজেন্সি অ্যাক্ট ২০০৪ুএর ক্ষমতাবলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সরকার বিচ্ছেদ পেছানোর আইন বাতিল করতে পারে। কিন্তু দেশটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের মতে, এমন কিছু করা হলে সেটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে এবং সরকারের পক্ষে এর বৈধতা প্রমাণ করা কঠিন।
পদত্যাগ
বিচ্ছেদের দিনক্ষণ পেছানোর বদলে বরিস জনসন পদত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যের অলিখিত সংবিধান অনুযায়ী রানির সার্বক্ষণিক একজন প্রধানমন্ত্রী থাকতে হবে। অন্যথায় বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ৯৩ বছর বয়সী রানিকেই ইইউর কাছে বিচ্ছেদ পেছানোর আবেদন নিয়ে যেতে হবে। বরিস রানির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। কিন্তু রানি জানতে চাইবেন প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন? বরিস হয়তো বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিনের নাম বলবেন। কিন্তু জেরেমি করবিন পার্লামেন্টের সমর্থন আদায় করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত বরিসকেই দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে।
আইনটি অমান্য করা
বিচ্ছেদ পেছানোর আইনটি অগ্রাহ্য করে ক্ষমতায় বহাল থাকার চেষ্টা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীদের অনেকেই এমনটি চান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁর মন্ত্রিসভা ও দলের আইনপ্রণেতাদের অনেকেই পদত্যাগ করার পাশাপাশি দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল। এ ছাড়া আইন ভঙ্গের দায়ে প্রধানমন্ত্রীকে জেলে যেতে হতে পারে।
নিজেই নিজের প্রতি অনাস্থা
প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ১৪ দিনের মধ্যে বিকল্প সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারে বিরোধীরা। বিকল্প সরকার গঠিত না হলে তবেই সাধারণ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্ট স্থগিত করার কারণে আগামী ১৪ অক্টোবরের আগে অধিবেশনে ফিরছেন না আইনপ্রণেতারা। ফলে পার্লামেন্ট চালু হওয়ার পর এমন কিছু ঘটলেও ৩১ অক্টোবরের আগে নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই।
ইইউ সদস্য দেশকে অনুরোধ
যুক্তরাজ্য বিচ্ছেদের দিনক্ষণ পেছানোর অনুরোধ অনুমোদনের জন্য ইইউর বাকি ২৭ সদস্য দেশের সম্মতি লাগবে। কোনো একটি দেশ আপত্তি করলেই আটকে যাবে বিচ্ছেদ পেছানোর অনুমোদন। প্রধানমন্ত্রী বরিস ইইউর কোনো একটি সদস্য দেশকে দিয়ে এমন আপত্তি তোলানোর চেষ্টা করতে পারেন। তবে গত মার্চ মাসে পোল্যান্ডকে দিয়ে এমনটি করাতে চেয়ে ব্যর্থ হন বরিস। অবশ্য তিনি তখন সরকারে ছিলেন না। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে যুক্তরাজ্যের মানুষ ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেন। দীর্ঘ তিন বছরেও এই বিচ্ছেদ নিয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাজ্য। ফলে চলতি বছরের ২৯ মার্চ বিচ্ছেদ ঘটার কথা থাকলেও সেটি দুই দফা পিছিয়ে যায়। ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস যেকোনো মূল্যে আগামী ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিট কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতা নেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী বরিস তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেন কি না, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।