Share |

ছান্দসিকের আন্তর্জাতিক বাংলা আবৃত্তি উৎসব ২০১৯: কিছু স্মৃতি কিছু কথা

সুজাতা চৌধুরী  
পয়েলা সেপ্টেম্বর ছান্দসিকের আয়োজনে লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম আন্তর্জাতিক বাংলা আবৃত্তি উৎসব। বিলেতের বুকে বাংলা আবৃত্তি উৎসব করার কথা ভাবা এবং সেই ভাবনাকে সফলভাবে রূপায়ন করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। আবৃত্তির মতো অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় শিল্প মাধ্যমকে নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক উৎসবের আয়োজন করতে গেলে অদম্য সাহস ও মনোবল লাগে। লাগে ধর্য্য ও প্রত্যয়। ছান্দসিকের কর্ণধার মুনিরা পারভীন সেটা করে দেখিয়েছেন। আমরা পশ্চিমবঙ্গে থেকে কিংবা বাংলাদেশে থেকে যেটা ভাবতে পারিনি, প্রবাসে যেখানে বাঙালির সংখ্যা হাতেগোনা, সেই গুটিকয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাংলা ভাষাকে নিয়ে এতবড় একটা উৎসবের আয়োজন করে মুনিরা প্রমাণ করে দিলেন, বাংলাভাষার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতো গভীরে, কতোটা নিখাদ। মুনিরাকে এ জন্য আন্তরিক অভিবাদন জানাই। কুর্নিশ জানাই তাঁর নিষ্ঠাকে। বিলেতে বাংলাভাষার চর্চা, প্রচার ও প্রসার, উত্তর প্রজন্মকে বাংলাভাষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা; এসব গুরু দায়িত্ব মুনিরা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন স্বেচ্ছায়। তাঁর মতো সাহসী ভাষা প্রেমিকের হাত ধরে বাংলা ভাষার জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে এই প্রত্যয় আমাদের বুকে। আন্তর্জাতিক আবৃত্তি উৎসবের নিমন্ত্রণ চিঠি হাতে আসার পর শুরু হলো ভিসার জন্য ছুটোছুটি। মুনিরা পারভীনের আন্তরিক ডাকে এবং আমার ভাই বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক অপূর্ব শর্মার তুমুল উৎসাহে এবারই প্রথম যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেওয়া। কালকাতা থেকে প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী মুনমুন মুখার্জি আর আমি আমন্ত্রণ পেয়ছিলাম। দুজনে একই সাথে প্লেনে চেপে বসলাম। লন্ডনে যখন পৌছলাম তখন বিকেল ছটা। বাইরে দিনের আলো ঝলমলে রোদ। মুনিরা ও তাঁর স্বামী আরিফ একরাশ হলুদ ফুলের শুভেচ্ছাসহ আমাদের স্বাগত জানালেন। তারপর আমাদেরকে নিয়ে গেলেন রাতের লন্ডন দেখাতে। মুনিরার স্বামী আরিফ খন্দকার মাত্র দশ মিনেটেই আপন হয়ে উঠলেন। তার মুখে দিদি ডাক শুনে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। রাতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো লন্ডনের বিশিষ্ট কবি ময়নূর রহমান বাবুলের বাসায়। বাবুল ভাই ও শিরীন ভাবীর উদার আথিতেয়তা ও আন্তরিকতার কথা মনে থাকবে চিরদিন।
পহেলা সেপ্টেম্বর বেলা ৩টায় আন্তর্জাতিক বাংলা আবৃত্তি উৎসবের উদ্বোধন হলো বর্ণময় সমারোহে। বিলেতের বিশিষ্টজনেরা, লন্ডনের প্রায় সকল আবৃত্তিশিল্পী ও অন্যান্য শ্রোতা-দর্শকদের তুমুল উপস্থিতিতে আয়োজিত হলো এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। শুধু কবিতাকে ভালোবেসে এত গুণী মানুষের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমন্ত্রিত বাচিক শিল্পীদের পাশাপাশি বিলেতের আবৃত্তি শিল্পীদের উপস্থাপনা হৃদয় ছুঁয়েছে। প্রত্যেকের উপস্থাপনাই ছড়িয়েছি নান্দনিকতার বিভা। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকেও বিলেতে বসবাস করা বাঙালিদের আবৃত্তি প্রেম আমাকে বিমোহিত করেছে। এই শিল্পের প্রতি তাদের নিবেদন এবং দায়বদ্ধতাই যেনও প্রতিভাত হয়েছে অনুষ্ঠানে। এছাড়া উৎসব উপলক্ষে চতুর্থ প্রজন্মের জন্য আবৃত্তি প্রতিযোগিতা এবং তাদের দিয়ে অনুষ্ঠানে আবৃত্তি উপস্থাপন করিয়ে মুনিরা বাঙালিয়ানার প্রতি যে দায়বদ্ধতা দেখালেন তা সত্যিই অনুকরণীয়। পাশাপাশি আবৃত্তি শিল্পে অবদান রাখায় ছান্দসিকের পক্ষ থেকে আমিসহ পাঁচজন বাচিক শিল্পীকে ছান্দসিক সম্মাননা ২০১৯ প্রদান করা হয়। আবৃত্তি শিল্পের জন্য লন্ডনে এমন সম্মাননা পাওয়ায় অন্যরকম এক ভালোলাগায় আন্দোলিত হয়েছে হৃদয়, যা মনে থাকবে আজীবন।
ছন্দপ্রভা ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বপ্রাণে এই আহ্বানে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই উৎসব প্রাঙ্গনে দর্শকদের উপস্থিতি ছিলো উপচে পড়া। এবং সেটা অব্যাহত ছিলো শেষ অবদি। হলের মধ্যে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককেই বাইরে থাকতে হয়েছে। কিন্তু কেউই চলে যাননি। উপভোগ করেছেন পুরো অনুষ্ঠান। এমনটি সচরাচর দেখা যায় না। আর এটা সম্ভব হয়েছে মুনিরার সাংগঠনিক দক্ষতায়। বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর দল ছান্দসিকের পরিবেশনা, ‘জাগরণের পঙক্তিমালা’ মনোভূমিকে করেছে আন্দোলিত। বাংলা ভাষাযে বুকের রক্ত দিয়ে অর্জিত তা বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ছান্দসিকের এই উপস্থাপনা।
উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকটির প্রশংসা না করলেই নয়। আমি মনে করি, আবৃত্তির ইতিহাসে আকর গ্রন্থ হিসেবেই বিবেচিত হবে এটি। পৃথিবীর যে সব স্থানে বাংলা আবৃত্তিচর্চা হচ্ছে সেসব স্থানের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে ‘ছান্দসিক’ নামের স্মারকটি। সম্পাদনায়ও পরিলক্ষিত হয়েছে মুন্সিয়ানার ছাপ। যা অনেককেই এই পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করবে।
ছান্দসিক আয়োজিত বাংলা আবৃত্তি উৎসব ছিল যেমন বর্ণময়, তেমনি ভাবগম্ভীর। সমস্ত আয়োজনেই ছিলো পরিশীলিত চিন্তা ও যতœ-নিষ্ঠার ছাপ। বিমোহিত হয়েছি ছান্দসিক পরিবারের ঐক্য দেখে। এই ঐক্যই সংগঠনটিকে নিয়ে এসেছে আজকের পর্যায়ে। মুনিরা পরম মমতা ও পরিচর্যায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন সংগঠনটিকে। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা ছান্দসিকই আজ সৃষ্টি করছে ইতিহাস, নান্দনিকতার শিখরে পৌছে দিয়েছে উৎসবকে। এমন সফল আয়োজনের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাই মুনিরাসহ ছান্দসিক পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে। ছান্দসিক অব্যাহত রাখুক তাদের জয়যাত্রা, জয় হউক আবৃত্তির। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায় কণ্ঠ মিলিয়ে আজ বলতে ইচ্ছে করছে-
‘তুমিতৃপ্ত হও, পূর্ণ হও,
জ্বালো ভূলোক, জ্বালো দ্যুলোক,
কবিতা।’