Share |

ইস্রায়েল নির্বাচন : নেতানিয়াহু যুগের অবসান?

উদয় শঙ্কর দাশ
লন্ডন, ২৪ সেপ্টেম্বর : গত পাঁচ মাসে দ্বিতীয়বারের মত অনুষ্ঠিত ইস্রায়েলী সংসদ নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য শুধু রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াই ছিলনা, ছিল তাঁর বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষরক্ষা এখনো হয়েছে বলে মনে হয়না। তাঁর ডানপন্থী লিকুদ পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো দূরের কথা, এককভাবে বৃহত্তম দল হিশেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। সেই কৃতিত্ব অর্জন করেছে সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজ-এর ব্লু অ্যান্ড ওয়াইট পার্টি। তবে বড় দু’টি দলের মধ্যে কোনো দলই ১২০ আসনের সংসদে ৬১ আসন পেতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তাদের জোট গঠন করতে হবে ছোট দল্গুলিকে নিয়ে।
বড় দু’টি দল এখন জোট গঠন নিয়ে জোর আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ পার্টির সঙ্গে থাকবে ছোট ধর্মীয় দলগুলি। জোট গঠন করতে না পারলে নেতানিয়াহু মামলা থেকে রক্ষা পাবেন কিনা এই সংশয় থেকেই যায়। দুর্নীতির অভিযোগে তিনটি মামলার প্রাক-বিচার শুনানী হবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর। সরকার গঠন করতে পারার মত জোট করতে না পারলে, বিচার থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আইন তিনি করতে পারবেননা। অন্যদিকে, মধ্যপন্থী গান্টজ-এর সঙ্গে একটি মধ্য-বামপন্থী জোট গঠনে এগিয়ে আসবে লেবার পার্টি, বামপন্থী ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন এবং আরব সংখ্যালঘুদের দল জয়েন্ট লিস্ট, যারা তেরোটি আসন নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিশেবে আত্মপ্রকাশ করেছে । সমস্যা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন এই দু’টো জোটের কাছে নেই। তাই, এই নির্বাচনে সত্যিকারের জয়ী বলা হচ্ছে নেতানিয়াহুর একসময়ের মিত্র এবং সাবেক মন্ত্রী আভিদোর লিবারমেনকে। তাঁর দল পেয়েছে আটটি আসন, যা দুই প্রধান জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আদায়ের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু লিবারমেন কোনো জোটকেই সমর্থন জানাতে এখনও নারাজ। তিনি চান একটি ঐক্য সরকার যাতে তাঁর দলের সঙ্গে লিকুদ পার্টি আর ব্লু অ্যান্ড ওয়াইট পার্টিও থাকবে।     
বেনি গান্টজ এই ঐক্য সরকারে রাজী হলেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে লিকুদ পার্টির সংগে বসতে রাজী নন। তাছাড়া, তাঁর দল সবচাইতে বেশী আসন পেয়েছে বলে তিনিই এই ঐক্য সরকারে প্রধানমন্ত্রী হতে চান। এই প্রস্তাবে লিকুদ কি রাজী হবে? আর তারা তাদের নেতা নেতানিয়াহুকে দলীয় প্রধানের পদ থেকে কি সরাবে? লিকুদ পার্টিতে তেমন নজীর নেই। সুতরাং, অচলাবস্থা থেকেই যাচ্ছে।
নেতানিয়াহু নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলের পরও সরকার গঠন করার কথা বলছিলেন । তাঁর মতে দু’টা পথ খোলা-এক, তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠন; দুই, ইহুদী-বিরোধী আরব দল্গুলির উপর নির্ভরশীল একটি ‘বিপজ্জনক সরকার’। তিনি ইস্রায়েলের আরব জয়েন্ট লিস্টের কথাই বলছিলেন। নির্বাচনের আগে তিনি এবং তাঁর  ডানপন্থী সমর্থকরা এই দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রচারণা চালান। নির্বাচনের পর আরব জয়েন্ট লিস্টের একজন নেতা বলেন, ‘নেতানিয়াহু যুগের অবসান ঘটেছে’। কিন্তু লেবার পার্টির নেতা আমির-পেরেজ যে কোনো জোট সরকার গঠনের আলোচনায় আরব জয়েন্ট লিস্টের অন্তর্ভুক্তিকে সমর্থন করেছেন। আর নেতানিয়াহুও এখন সুর নরম করে ঐক্য সরকার গঠনের কথা বলছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডন্যা? ট্রাম্প এরমধ্যে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন যে খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে তা জানা ছিল। তারপর তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক ইস্রায়েলের সঙ্গে’। এই মন্তব্যের অর্থ পাঠক বুঝে নিতে পারেন। তবে ইস্রায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী যিনিই হোন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইস্রায়েল সম্পর্কে তেমন পরিবর্তন দেখা যাবে না।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইস্রায়েলী নীতির কোনো হেরফের হবে বলে মনে হয়না। গান্টজ আর নেতানিয়াহুর এই ব্যাপারে রয়েছে অভিন্ন নীতি। গান্টজ হয়তো নেতানিয়াহুর মত কঠোর ভাষায় কথা বলবেন না- সেটাই হবে পার্থক্য। আর এই কথাও  মনে রাখতে হবে যে ইস্রায়েল থেকে আরব নাগরিকদের স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেছিলেন লিবারমেন। পশ্চিম তীরের বেশীরভাগ এলাকা ইস্রায়েলের দখলের নীতির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
ইস্রায়েলের প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভ্লিন কাদের পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব তা যাচাই করার  জন্য বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। লিকুদ পার্টি এবং ব্লু অ্যান্ড ওয়াইট পার্টি প্রধানমন্ত্রী হিশেবে  তাদের নেতা নেতানিয়াহু আর গান্টজ-এর নাম প্রস্তাব করেছেন। তবে আরব জয়েন্ট লিস্ট গান্টজ-এর প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। বিভিন্ন দলের মধ্যে জোর আলোচনা চলবে জোট গঠনের উদ্দেশ্যে। তবে নেতানিয়াহু যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি সেটাই তাৎপর্যপূর্ণ। এক দশক ধরে তিনি রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পদে। সুতরাং, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সবধরনের চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাবেন।
কি ধরনের জোট শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসবে তা এখনো পরিষ্কার নয় যেমন পরিষ্কার নয় প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভ্লিন সরকার গঠনের জন্য কাকে আমন্ত্রণ জানাবেন আর এর ফলে কি ধরনের সরকার গঠিত হবে। তখনই এই নির্বাচনের পর ইস্রায়েলের নীতি নির্ধারণে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না তা বোঝা যাবে। কিন্তু অনেকের কাছে এটা হয়তো পরিষ্কার যে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ইস্রায়েলের ইতিহাসে সবচাইতে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকার কৃতিত্ব অর্জন করেন, তিনি হয়তো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচাইতে বড় পরাজয় বরণ করলেন এবং সেই সঙ্গে থাকবেন কারাভোগের ঝুঁকিতে।
লন্ডন, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯