Share |

তাফিদার জীবনের পক্ষেই আদালত : জবাব কি দেবেন এনএইচএস-এর কর্তারা?

বাংলাদেশি-ব্রিটিশ পাঁচ বছরের শিশু তাফিদা রাকিবকে বাঁচিয়ে রাখার এবং পিতামাতার ইচ্ছে অনুসারে ইতালীতে নিয়ে গিয়ে তার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা অব্যাহত রাখার পক্ষেই রায়?দিয়েছে ব্রিটেনের হাইকোর্ট। গত ৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আদালত ঘোষিত এই গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মধ্যদিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে যে, এনএইচএসের কর্তারা এই শিশুটির পরিবারের সাথে গত প্রায় সাত মাস ধরে যে আচরণ করেছেন তা সঠিক ছিলো না। মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ কোন যুক্তিতে একটি জীবন স্তব্ধ করে দেওয়ার পক্ষে দাঁড়ায় তা সাধারণের বোধগম্য নয়। তবে আমরা মনে করি, যেকোন বিচারে লন্ডন বার্টসের এই?অবস্থান মানবিকতার এবং ব্রিটিশ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের পরিপন্থী।
মস্তিষ্কের জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। তাফিদার জেগে ওঠার সম্ভাবনা নেই- এমন যুক্তিতে পূর্ব লন্ডনের রয়েল লন্ডন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে জীবনের অবসান ঘটাতে চায়। কিন্তু তাফিদার মা-বাবা মেয়েকে ইতালির জেনোয়াতে অবস্থিত গ্যাসলিনি চিলড্রেন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান। কারণ, সেই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা তাফিদার সুস্থ হয়ে ওঠার ব্যাপারে রয়েল লন্ডন হাসপাতালের ডাক্তারদের সাথে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সম্মত। কিন্তু তাফিদার ইতালি যাওয়া রুখে দিতে রয়েল লন্ডন হাসপাতাল এদেশের আদালতের দ্বারস্থ হলে হাইকোর্টে শুরু হয় আইনি লড়াই। 
এই লড়াইয়ে ব্রিটিশ ডাক্তারদের প্রাণহরণের পক্ষে দেওয়া যুক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে মানবিকতা। তারা যুক্তি দেখিয়েছিলেন তাফিদার রোগ নিরাময়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাকে বাঁচিয়ে রাখার যত চেষ্টা করা হবে, তত তার শারীরিক ক্ষয় বেড়ে বিপর্যস্ত হবে সে। তাই তাকে অযথা বাঁচিয়ে রাখার যুক্তি নেই। এছাড়া সে বেশিদিন বাঁচবে না বলেও তাফিদার মা-বাবাকে বার বার বলা হয়েছে ব্রিটিশ ডাক্তারদের পক্ষ থেকে। অথচ আদালতের শুনানীতে গিয়ে শিশুটির মা-বাবা প্রথম জানলেন যে, ব্রিটিশ ডাক্তাররা তাফিদার ২০ বছরের আয়ু হতে পারে বলে স্বীকার করছেন। মা-বাবাকে দেওয়া তথ্য আর আইনী লড়াই শুরুর পর আদালতে দেওয়া তথ্যের মধ্যে এতো ফারাক হয় কী করে? কেনো গুরুতর অসুস্থ একটি শিশুর বিপর্যস্ত পিতামাতাকে অসত্য তথ্য দিয়ে?তাদের জীবনটাকে আরো দুর্বিষহ করে তোলা। কর্তৃপক্ষের এসব আচরণে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, এনএইচএস-এর অর্থ সাশ্রয়ের সংকীর্ণতা থেকে হাসপাতাল কর্তারা তাফিদার মা-বাবার সাথে এই চরম অমানবিক আচরণ করেছেন। 
এই ঘটনায় আরেকটি বিষয়?পরিষ্কার হলো- মা-বাবা শক্ত মনোবলের অধিকারী না হলে, অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে প্রত্যাশিত চিকিৎসা না পেয়েই হয়তো তাফিদার জীবনাবসান হতো। এমন অনেক প্রাণহরণকারী ঘটনা হয়তো আছে যা আমরা জানতে পারি না। হাসপাতালের এরকম সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সবাই দাঁড়ায় না বা লড়াই করে না। এ কারণেও এটি একটি দৃষ্টান্তসৃষ্টিকারি ঘটনা। আদালত মানবিক বোধের জয় ঘোষণা করে সবাইকে বিশেষকরে এনএইচএস কর্তাদের এই শিক্ষা দিয়েছে যে, প্রাণ রক্ষার মানবিক প্রচেষ্টার কাছে পৃথিবীর অর্থ-বিত্ত আর বৈষয়িক লাভক্ষতি সবই তুচ্ছ।
এ ঘটনায় আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব চাই-
এক. তাফিদার ২০ বছরের আয়ু হতে পারে- এটি কেনো তারা তার মা-বাবাকে আদালতে যাওয়ার আগে জানাননি? দুই. আইনী লড়াই শুরুর পর কর্তৃপক্ষের সাথে তাফিদার পরিবারের সাথে কেনো যোগাযোগ বিপর্যয় ঘটলো? তিন. আইনি লড়াইয়ের কারণে কালক্ষেপণে এই রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠা হুমকির মুখে পড়লে এর দায় বার্টস নেবে কি?
আমরা চাই এবং প্রার্থনা করি তাফিদা সুস্থ হয়ে উঠুক। তাঁর নিথর দেহে আবারও উঠুক প্রাণের স্পন্দন। মাতা-পিতার পরম মমতায় বেড়ে উঠুক সে বাকী জীবন।