Share |

ক্যাসিনোর ফাঁদে বাংলাদেশ

মোঃ হাফিজুর রাহমান
বাংলাদেশে ক্যাসিনো-কেলেঙ্কারি নিয়ে বেশ হইচই চলছে। ক্যাসিনো নামক বালাখানাতে জুয়াড়ীদের জড়ো করে ভিন্ন কায়দায় ব্যবসা করে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের অসাধুরা। বিগত কয়েকদিনে আইনশৃৃখলা বাহিনীর অভিযানে ক্যাসিনোর আসর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা ও বিদেশি মদ যা দেশবাসীকে শুধু অবাকই করেনি বরং বাকরুদ্ধ করেছে। অপরাধীচক্র প্রশাসনের চোখের সামনে জুয়ার আসর বসিয়ে কতজনকে যে পথে বসিয়েছে কে জানে। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, জুয়াড়ীরা যে জায়গাগুলো বেছে নিয়েছে তাতে কারো পক্ষে বোঝার উপায় নেই ভিতরে কি হচ্ছে। ঢাকার সব ঐতিহ্যবাহী নামীদামী ফুটবল ক্লাবের এই অনৈতিক পথে নামা নিয়ে সারা দেশে নিন্দার ঝড় বইছে। প্রশ্ন হলো-ক্যাসিনোর ভূত কেনো বাংলাদেশে চেপে বসেছে? জুয়ার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভূমিধস হওয়া রাষ্ট্রের দিশেহারা তরুণ-যুবকদের দায় কে নিবে? বাংলাদেশে ক্যাসিনোর আবির্ভাব নিয়ে তর্কবিতর্কের শেষ নেই। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে- এই অবৈধ জুয়ার আসরগুলো গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছে কীভাবে? নিশ্চয়ই করো না করোর আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল। তা না হলে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে প্রায় ৬০টির মত ক্যাসিনো কিভাবে পরিচালিত হতো? রাষ্ট্রের নাগরিকরা তো আর বোকার রাজ্যে বাস করে না। সবই বুঝে। কাজেই ক্যাসিনো-কাণ্ড কিভাবে বাংলাদেশে আমদানী হয়ে এসেছে সেটা নিয়ে তর্ক করে অযথা সময় নষ্ট না করে, কিভাবে তা নির্মূল করা যায় সেই পদক্ষেপ কাম্য। বাংলাদেশের অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা তো দূরের কথা আমাদের রাজনীতিবিদরা বরং আরও দূষিত শব্দ দ্বারা কলঙ্কিত করেছেন রাজনীতিকে। ফলাফল যেই সেই। যেখান থেকে দেশ যাত্রা শুরু করেছিল, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরে এসেও উন্নতি তেমন নেই। এখন এটি খুবই পরিষ্কার যে, আমরা পেয়েছি কিছু অযোগ্য রাজনীতিবিদ যারা সদাসর্বদা দুর্নীতিকে লালন করেন।
চাদাবাঁজী ও দুর্নীতির অভিযোগে ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানী দিয়ে যে শুদ্ধি শুরু হয়েছিল তার আছর এখন যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের উপর পড়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি কেউ বাদ নেই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। যাইহোক, এখন শুদ্ধির জালে নিজের ঘরের লোকজন কাবু। যদিও সব তালগোল পাঁকিয়ে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পথে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে শুদ্ধি অভিযান কতটা শুদ্ধ হবে তা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতির কেলেঙ্কারী শিক্ষাঙ্গনকে কলঙ্কিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরকুট দুর্নীতি আমাদের লজ্জায় নিমজ্জিত করেছে। ক্ষমতাসীনদের ঘরে এখন অশান্তি বিরাজ করছে। তার ওপর ক্যাসিনো-থেরাপীর আতঙ্কে তাদের আশপাশে থাকা দুর্নীতিবাজরা।  
ঢাকাসহ সারা দেশে জুয়ার আসর বসিয়ে এক সময়ের টোকাই, ছ্যাচড়া চোর আর সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ এখন সমাজপতি। তারা কোটি টাকা ঘরে নিয়ে ঘুমান। তাদের কাছে টাকার পরিমাণ এতোই যে, তারা টাকা রাখার জায়গা পাচ্ছে না। তাই টাকাকে স্বর্ণে রূপান্তর করছেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ঘরে টাকার লকার। এ যেন আরেক ব্যাংক। আজব এক নৃত্যে মেতেছে ক্ষমতাসীনরা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশটাকে তারা নিজেদের মত করে লুটেপুটে ফোকলা করবে কিন্তু কেউ টু শব্দ করতে পারবে না। করলেই যে বিপদে পড়তে হবে তার উদাহরণ আমরা দেখেছি দিদারুল আলমের ক্ষেত্রে। চট্টগ্রামে হুইপ শামসুল হকের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোর টাকা খাওয়ার অভিযোগ করেছেন দিদারুল আলম। হুইপ শামসুল হক আওয়ামী লীগের একজন বড় আঞ্চলিক নেতা। আর সেই অভিযোগকেই কেন্দ্র করে হুইপপুত্র নাজমুল করিম শারুন টেলিফোনে তার পিতৃতুল্য আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলমকে টেলিফোনে যে ভাষায় গালাগালি করে হুমকি দিয়েছেন। এটি কিসের সংকেত? শুধু কি তাই? পুলিশ ইন্সপেক্টর সাইফ আমিন অভিযোগ করেন এই বলে যে, হুইপ শামসুল হক বিগত ৫ বছরে ১৮০ কোটি টাকা ক্যাসিনোর জুয়া থেকে নিয়েছেন। এই অভিযোগের অপরাধে পুলিশ ইন্সপেক্টর সাইফ আমিনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। শামসুল হকের এত ক্ষমতা! কি আজব ব্যাপার। এই ব্যক্তি এক সময় টাইপরাইটার চুরির অপরাধে জেল খেটেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের আইনে জুয়ার কোন বৈধতা নেই। ক্যাসিনো বাংলাদেশের সংবিধানবিরোধী। তারপরও অনেকে জুয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বাংলাদেশ সংবিধানে জুয়ার কোন অনুমোদন নেই বরং এ খেলা আইনবিরোধী। সংবিধানের ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অধ্যায়ে ‘জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা’ অনুচ্ছেদ ১৮ (২) মতে, “গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন”। মানে কি দাঁড়াল, এখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে জুয়া খেলা বন্ধে রাষ্ট্র প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে পারে। তাছাড়া ১৮৬৭ সালের বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন অনুযায়ী যেকোনো ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত হলে তাঁর মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা সাহায্যকারীকে আইনের আওতায় এনে কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দন্ডিত করা করা যেতে পারে, যে আইনটি এখনও প্রযোজ্য। কাজেই বিদেশিদের জন্য ক্যাসিনো করবেন বলে যারা গলাবাজি করছেন যে তারা কী সংবিধান পরিবর্তন করবেন? যদি এমন হয় তাহলে সামনের দিনগুলো হবে আর ভয়াবহ।
ব্রাডফোর্ড, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট
বঢদটতধড়১৯৮৭আথবটধফ.ডমব