Share |

ব্রেক্সিটে ঝুলছে বরিসের নেতৃত্ব

পত্রিকা প্রতিবেদন 
লন্ডন, ০৭ অক্টোবর : চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বিচ্ছেদের নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। গত ২ অক্টোবর বুধবার প্রধানমন্ত্রী বরিস ওই প্রস্তাবের পাশাপাশি ইইউ প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ ইয়ঙ্কারের কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছাড় দিয়েছে যুক্তরাজ্য। এবার ইইউর উচিত ছাড়ের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা। ইইউ নতুন প্রস্তাবে রাজি না হলে চুক্তি ছাড়াই বিচ্ছেদ কার্যকরের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন বরিস জনসন।
গত রোববার দুটি জাতীয় দৈনিকে দুটি নিবন্ধ লিখে ব্রেক্সিট কার্যকর করার বিষয়ে তাঁর সরকারের কঠোর প্রতিজ্ঞার কথা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি ইইউকে হুমকির সুরে বলেন, আমরা আপনাদের ছেড়ে আসার জন্য গাট্টি-পেটরা নিয়ে তৈরি। আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন আমাদের আন্তরিকতার সঙ্গে বিদায় দিবেন কি-না। 
প্রধানমন্ত্রীর কথায় ব্রেক্সিট নিয়ে এমন কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হলেও ইইউর সূর নরম হয়নি। ইইউ বরিসের প্রস্তাবকে ত্রুটিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করেছে।  
এদিকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করতে না পারলে বিচ্ছেদ পেছানোর আবেদন জানাতে আইন প্রণয়ন করেছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের বিরোধী আইনপ্রণেতাদের আশঙ্কা, সরকার কোনো কৌশলে এই আইন অমান্য করবে এবং চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের পথে হাঁটবে। যে কারণে বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার তোড়জোড় শুরু করেছে। কিন্তু বরিসের পতন ঘটলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে বিভক্ত বিরোধীরা। যে কারণে থমকে আছে অনাস্থা প্রস্তাবের উদ্যোগ। প্রধান বিরোধী দল লেবারের ছায়া অর্থমন্ত্রী জন ম্যাকডোনা? বলেন, লেবার নেতা জেরেমি করবিনের নেতৃত্বেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হবে। কেননা, গণতন্ত্রে এটাই নিয়ম। কিন্তু লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি করবিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানতে নারাজ। তারা সবার সমর্থন পাবে এমন পেছনের সারির কোনো আইনপ্রণেতাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী করতে চায়।  লেবার পার্টি বলছে, ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ইইউ সম্মেলনের আগে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা নেই তাদের।
১৯ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করতে না পারলে প্রধানমন্ত্রী বরিস যাতে ইইউর কাছে বিচ্ছেদ পেছাতে বাধ্য হন সে বিষয়ে নির্দেশনা আদায় করতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ব্রেক্সিট বিরোধী কিছু আইনপ্রণেতা। কিন্তু স্কটল্যাণ্ডের কোর্ট অব সেশন আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছে। আদালত বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আইন মান্য করবেন কি, করবেন না-এ বিষয়ে ধারণার ওপর ভিত্তি করে আদালত কোনো রুল দিতে পারে না।  
ম্যানচেস্টারে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির পাঁচ দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন ছিল গত বুধবার। এদিন দলের নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো সম্মেলনে বক্তব্য দেন বরিস জনসন। বিতর্কিত ‘বেক স্টপ’-ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নতুন প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান বরিস। বিতর্কিত ‘বেক স্টপ’ শর্তের কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সম্পাদিত ব্রেক্সিট চুক্তি তিন দফা প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন, ইইউভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অনেক আলোচনা-পরামর্শের পর নতুন প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইইউর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। আবারও জোর দিয়ে বরিস বলেন, ইইউ চুক্তিতে রাজি না হলেও যুক্তরাজ্য আর ব্রেক্সিট পেছানোর আবেদন করবে না।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন করতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যাঁরা ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, সবাই দ্রুত এই বিতর্কের অবসান চান। 
তিনি বলেন, কেবল ব্রেক্সিটের রায় কার্যকর করার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সৃষ্ট বিভক্তি দূর করে জাতিকে আবার ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। বুধবারই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউর কাছে উত্থাপন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইইউ নতুন প্রস্তাবে রাজি না হলে ৩১ অক্টোবর চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট কার্যকর করবে যুক্তরাজ্য। কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান জেমস ক্লেভারলি বলেন, যুক্তরাজ্য বাস্তবতা মেনে ছাড় দিয়েছে। এবার ইইউর পালা। 
চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে বলেছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কোনো চুক্তি হওয়া সম্ভব কিনা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূলনীতি মেনে সমঝোতায় পৌছাতে সামনের দিনগুলোতে উভয় পক্ষেরই ব্রেক্সিট আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। দিনকয়েক আগে ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন প্রস্তাব হাজির করা জনসন বলেছেন, ৩১ অক্টোবরের পরও ব্রেক্সিট হতে পারে এমন ‘টোপ’ নিয়ে ভাবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত হবে না।  যদিও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ১৯ অক্টোবরের মধ্যে ব্রেক্সিট বিষয়ক কোনো চুক্তিতে একমত হতে না পারলে জনসনকেই ব্রেক্সিট কার্যকরের মেয়াদ বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বারস্থ হতে হবে, জানিয়েছে বিবিসি।
চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ব্রেক্সিট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের মধ্যে টেলিফোনে এ কথোপকথন হয় বলে ফরাসী প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিসি প্রাসাদের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ম্যাক্রোঁকে জনসন বলেন, সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ব্রেক্সিট নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব বলেই মনে করেন তিনি; কিন্তু এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অবশ্যই যুক্তরাজ্যের মতই ছাড় দিতে হবে।
“প্রেসিডেন্ট (জনসনকে) বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে মিচেল বার্নিয়েরের দলের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলের আলোচনা অব্যাহত রাখা উচিত; ওই আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূলনীতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কোনো চুক্তি হওয়া সম্ভব কিনা আগামী সপ্তাহের মধ্যে তাও বেরিয়ে আসতে পারে,” জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। ফ্রান্সের রাজনীতিবিদ বার্নিয়ের ২০১৬ সাল থেকেই ব্রেক্সিট বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করছেন।
বিবিসি বলছে, চলতি মাসের ১৭ ও ১৮ তারিখে ইউরোপীয় নেতাদের শীর্ষ বৈঠকের মধ্যেই ব্রেক্সিট নিয়ে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয়পক্ষের মধ্যস্থতাকারীদের অনেকগুলো বিষয়ে একমত হতে হবে। সোমবার জনসনের ইউরোপ বিষয়ক উপদেষ্টা ডেভিড ফ্রস্ট ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসবেন, একইদিন ব্রাসেলসে যাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন বার্কলেও। এসব আলোচনায় ব্রেক্সিট পরবর্তী উত্তর আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাই প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।