Share |

মঞ্চস্থ হলো দর্শকনন্দিত ডিসটোপিয়া

নিলুফা ইয়াসমীন হাসান
বাংলা সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়ে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো পূর্ব লন্ডনে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী বাংলা নাট্যোসৎসব। এবারের উৎসবের প্রতিপাদ্য বিষয় রাখা হয়েছে সন্ত্রাসবাদ, অভিবাসন ও পরিবেশ সুরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। পহেলা নভেম্বর শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত। নাটকের পাশাপাশি আরো চলছে চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা ও ওয়ার্কশপ।
দীর্ঘ ১৭ বছর যাবৎ টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের উদ্যোগে একটানা উদযাপিত হয়ে আসছে ‘এ সিজন অব বাংলা ড্রামা‘। গত ২ নভেম্বর শনিবার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রযোজিত সাংবাদিক বুলবুল হাসানের রচনা ও সায়েদা সায়েমা আহমেদের নির্দেশনায় নাটক ডিসটোপিয়া মঞ্চস্থ হয়েছে। লন্ডনস্থ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের জন্য বুলবুল হাসানের লেখা এটা তৃতীয় নাটক। গত দু‘বছরের নাট্যউৎসবে এই নাট্যকারের লেখা ‘দ্য ক্যাফে‘ এবং ‘দ্য ফ্লোটিং হার্টস‘ নাটক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। তাই এবারও দর্শক ‘ডিসটোপিয়া‘ দেখার অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল। তাইতো ২ নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে হল ভর্তি দর্শক সমাগম হয়েছে, নন্দিত হয়েছে ডিসটোপিয়া।
মায়ানমার থেকে শরণার্থী হয়ে আসা নাফ নদীতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক কিশোরীর ঘুরে দাঁড়াবার গল্প নিয়ে রচিত হয়েছে ‘ডিসটোপিয়া‘। সংবাদপত্রে বা টিভিতে যারা রহিঙ্গা শরণার্থীদের উপর ঘটে যাওয়া নৃশংসতার খবর পড়েছেন, দেখে শিহরিত হয়েছেন, এই নাটকে দেখে মনে হচ্ছিল চোখের সামনেই ঘটনাগুলো ঘটছে। মায়ানমার সৈন্যদের হাতে বাড়ী ঘরে আগুন, পরিবারের প্রিয়জনদের সামনে ধর্ষণ, গণহত্যাসহ মায়ের কোল থেকে নিয়ে শিশু সন্তানকে হত্যার ঘটনাগুলো শরণার্থীরা বর্ণনা করছিলেন। নাটকে এইসব বর্বর নৃশংস ঘটনার বর্ণনা শুনে দর্শকদের অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অত্যাচারকে মনে করিয়ে দিয়েছে। এক কিশোরীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটকেই নাট্যকার মূলতঃ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। নাফ নদীতে গন্তব্যহীন নৌকা ভেসে চলছে। নারী পাচারকারী দালালের খপ্পর, খাবার নেই, ক্ষুধার জ্বালা, অসুস্থ বাবা- এত কিছুর পরও কিশোরী ফাহমিদা ভেঙ্গে পড়েনি। ভালভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে, সহযাত্রীদের মনোবল চাঙ্গা করার আকুতি অব্যাহত রেখেছে। সহায়-সম্বল সব কিছু হারাবার পরও বই সঙ্গে নিয়ে এসেছে ফাহমিদা। জ্ঞান চর্চায় তার প্রবল আগ্রহ। সে হেলেন কেলার, মালালা ইউসুফের মত শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চায় সবাইকে। নাটকের মাধ্যমে নাট্যকার দর্শকদের মাঝে প্রশ্ন রেখেছেন ফাহমিদার স্বপ্ন কি আসলে বাস্তবায়িত হবে? প্রতিদিন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যেসব শিশু জন্ম নিচ্ছে, তারা কি পাবে শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার? এই প্রশ্ন শুধু দর্শকদের জন্য নয়, পুরো বিশ্ববাসীর জন্য। শুধু ত্রাণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়, শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাইকে ভাবতে আরো একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন নাট্যকার বুলবুল হাসান।
সবাই চমৎকার অভিনয় করেছেন। অভিনয় শিল্পীরা হলেন অমল নওয়ার রীভু, হীমু এম হোসাইন, আরফুমান চৌধুরী, জহুরুল ইসলাম রাসেল, আদনীন তারান্নুম, অনিনদিতা তাহসিন, ইমরান খান, সাদেক আহমেদ চৌধুরী, বুলবুল হাসান, রামিরা হাসান, সারিনা জাইবা এবং রায়ান। নাটক শেষে ইশিতা আজাদের পরিচালনায় দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন নাট্যকার বুলবুল হাসান ও নির্দেশক সায়েমা আহমেদ।
উল্লেখ্য, পহেলা নভেম্বর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের লীড এন্ড কালচারাল মেম্বার কাউন্সিলার সাবরিনা আকতার নাট্য উৎসবের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং জাতীয় সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর আয়োজকদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন যে, এখানকার উৎসবের আয়োজন দেখে আমি অভিভূত। বাংলাদেশে এই ধরনের মাসব্যাপী নাট্য উৎসব আয়োজন করা কষ্টসাধ্য, সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সাধারণত নাটকে মানুষের দূর্দশাগুলোই প্রস্ফুটিত হয়। আমি চাই সারা বিশ্বের মানুষের দুঃখ দূর হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আর্টস ডেভেলপমেন্ট অফিসার এবং নাট্য উৎসবের কোঅর্ডিনেটর কাজী রোকসানা বেগমের পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের মিনিস্টার প্রেস আশিকুন নবী চৌধুরী, কুইনমেরী ইউনিভার্সিটির ড্রামা বিভাগের আলী ক্যাম্পবেল, লাফবারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্র্যান্ট মেমেরী এ্যান্ড পোস্ট কলোনিয়াল ইমিগ্র্যান্টস প্রজেক্টের পরিচালক এমিলি।
এক ঝাঁক তরুণ তরুণীদের পরিবেশনায় পহেলা নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্ট সেন্টারে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ইয়ুথ আর্টস ডিভিশন- ‘এ টীম আর্টস‘ এর প্রযোজনায় ‘নেমেসিস - ২’ এর মঞ্চায়নের মাধ্যমে শুরু হয়েছে নাট্য উৎসব। সিরিয়া ও ইরাকে হামলা, ব্রিটেনে সন্ত্রাসী হামলা এবং পূর্ব লন্ডনের স্কুল ছাত্রী বহুল আলোচিত শামীমা বেগমের সিরিয়া গমনের প্রেক্ষাপট নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাই এবং পরবর্তীতে তাদের সঠিক উপলব্ধিতে ফিরে আসার কাহিনী নিয়ে ড. জেনান সালেহ ও তাসমিয়া তাহিয়ার লেখা নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন ড. জেনান সালেহ। এতে অভিনয় করেছেন রায়াদ আলী, মাহী আলী, সমির কামাল, লিলি মিয়া, আনিকা প্রতিভা, তাসনিয়া তাহসিন, তাসমিয়া তাহিয়া, এনথনি ব্রেন, তাকির হোসাইন ও জেবা শিকদার।
উদ্বোধনী দিনে ব্রাডি আর্টস সেন্টারে চিত্র প্রদর্শনীও শুরু হয়েছে। এই চিত্র প্রদর্শনী চলবে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত। মুক্ত আর্টস-এর আয়োজনে ‘ত্রিবেনী- দ্যা রীদিম অফ ওয়াটার’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে বেশ কিছু চমৎকার চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। চিত্রশিল্পী মনি মুক্তা চক্রবর্তীর একক চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। এই প্রদর্শনীতে মনি মুক্তার চল্লিশটি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।
ব্রাডি আর্টস সেন্টারে ২ নভেম্বর বিকাল চারটায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যশিল্পী সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর ও বিলেতের স্বনামধন্য অভিনেত্রী লিসা গাজীর আলাপচারিতা।
৩রা নভেম্বর প্রদর্শিত হয়েছে দুটি নাটক। পপলার ইউনিয়নে উদিচী শিল্পী গোষ্ঠীর নাটক ‘একটি অবাস্তব গল্প’। বিমল বন্দোপধ্যায়ের লেখা এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে রফিকুল হক জিন্নাহর পরিচালনায়। একই দিনে একই সময়ে ব্রাডি আর্টস সেন্টারে মঞ্চশৈলীর উদ্যোগে মঞ্চায়িত হয়েছে মনোজ মিত্রের লেখা ‘মেশো রাক্ষস’।
মহিলা অঙ্গনের উদ্যোগে ব্রাডি আর্টস সেন্টরে ৫ নভেম্বর সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ছিল ‘শাড়ী ডে’। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় কুইন মেরী বিশ্ববিদ্যালয়ে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে ‘জার্নালিজম- ইথিকস ও স্ট্যান্ডার্ড’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ডেইলী স্টারের আনন্দধারার এবং স্টার শোবিজ-এর রাফি হোসেন কিভাবে থিয়েটার এক্টিভিস্ট হলেন সেই ইতিহাস বর্ণনা করেছেন ৬ নভেম্বর সাড়ে সাতটায় কুইন মেরী বিশ্ববিদ্যালায়ের অডিটরিয়ামে।  
সোহায়া ভিশনের প্রযোজনায় রমিন্দর খায়েরের লেখা ও মুকুল আহমেদের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হবে ‘টেরর’ ৭ ও ৮ নভেম্বর কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির পিন্টার স্টুডিওতে সন্ধ্যা সাতটায়।
ব্রাডি আর্টস সেন্টারে ৮ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় আমরা থিয়েটার গ্রুপের পরিবেশনা এবং সাঈদা তাসমিয়া তাহিয়ার লেখা ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হবে ‘হোস্টাইল এনভারমেন্ট’।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যকার প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুনের লেখা ও রুবায়েত শারমীন ঝরার নির্দেশনায় চারনের পরিবেশনায় ব্রাডি আর্ট সেন্টারে ৯ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় মঞ্চস্থ হবে ‘কোকিলারা’। কবি নজরুল সেন্টারে ৯ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় সুর তাল পরিবেশন করবে ‘মিউজিক - মন কা সঙ্গীত’। দেবাশিষ ব্যানার্জির লেখা ও নির্দেশনায় ইস্টার্ন থেসপিয়ানস ৯ ও ১০ নভেম্বর কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির পিন্টার স্টুডিওতে পরিবেশন করবে ‘এ ওয়েক’।
মেসেজ কালচারাল গ্রুপ পরিবেশন করবে মুহিব চৌধুরীর লেখা ও নির্দেশনায় এবং গুলজার আহমেদের পরিচালনায় নাটক ‘আওয়ার ওয়ার্?’। মঞ্চায়িত হবে ১০ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় ব্রাডি আর্টস সেন্টারে।
স্বাধীনতা ট্রাস্ট এর উদ্যোগে ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ইস্ট লন্ডনের বাঙালী কমিউনিটির আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা ‘বেঙ্গলী হিস্ট্রী ওয়াক’।
কৌশিক চক্রবর্তী এবং রঞ্জন ব্যানার্জির লেখা ‘প্রেরণা’ পরিবেশন করবে বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। মঞ্চস্থ হবে ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় ব্রাডি আর্টস সেন্টারে।
এসেক্স ইন্ডিয়ানস-এর পরিবেশনায় ড. অর্পিতা রায়ের লেখা ও নির্দেশনায় ব্রাডি আর্টস সেন্টারে বিকাল সাড়ে চারটায় ১৬ নভেম্বর মঞ্চায়িত হবে ‘হিল দ্য ওয়ার্?।’ একই দিনে কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গ্রেট হলে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় আইএমডি এন্ড বলি ফ্লেক্স পরিবেশন করবে ‘ইস্ট সাইড স্টোরী’।
ছান্দসিকের পরিবেশনায় কবি নজরুল সেন্টারে ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় ‘জেনোসাইড ইন টি এস্টেইটস ইন ১৯৭১’ নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
মুজিবুল হক মণির লেখা ও নির্দেশনায় ১৭ নভেম্বর রোববার ব্রাডি আর্টস সেন্টারে সন্ধ্যা সাতটায় মঞ্চস্থ হবে ‘লন্ডনী কানাই’। একই দিনে দুপুর সাড়ে বারোটায় সুদীপ চক্রবর্তীর পরিচালনায় থিয়েটার নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে ওয়ার্কশপ এবং বিকাল সাড়ে চারটায় মুক্ত আর্টস পরিবেশন করবে মিউজিক এন্ড আর্ট।
স্পেস থিয়েটারে ২১ ও ২২ নভেম্বর দু‘দিন সন্ধ্যা সাতটায় মঞ্চায়িত হবে জুম ফারুকের লেখা, শাবজ রাজভান্ড ও জুম ফারুকের নির্দেশনায় ‘লাইক এ রেম্বলিংগ স্টোন’ এবং ২৩ নভেম্বর সোয়াস ইন্ডিয়ান ড্যান্স সোসাইটি পরিবেশন করবে ‘অধৈর্য্য’।
রিচমিক্সে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর রাধা রমনের পরিবেশনায় টি এম আহমেদ কায়সরের লেখা ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হবে ‘মহুয়ার পালা।’ ব্রাডি আর্টস সেন্টারে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর শনি ও রবিবার তারুন জাসানির লেখা ও মুকুল আহমেদের নির্দেশনায় ‘গহর জান’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে মাসব্যাপী বাংলা নাট্য উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
লন্ডন, ৬ নভেম্বর, ২০১৯
লেখক : সাংবাদিক