Share |

সিলেটের প্রথম শত্রুমুক্ত এলাকা বালাগঞ্জ : ৭ ডিসেম্বরের বিজয়ের নায়ক মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামাল

# হামিদ মোহাম্মদ #
একাত্তরের ঐতিহাসিক বছরটির প্রতিটি দিন ছিল বাঙালির জীবনে সোনাঝরা দিন। ডিসেম্বর মাস ছিল সেই সোনাঝরা দিনের শ্রেষ্ঠ মাস। বাঙালি পাক হানাদার বাহিনিকে যুদ্ধে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে- বিজয় অর্জন করে নয় মাসের সশস্ত্র লড়াই ও বহু  রক্তের বিনিময়ে। এই ডিসেম্বর এলেই বাঙালিরা আবেগে, উচ্ছ্বাসে আত্মহারা হওয়া শুধু নয় আত্মপরিচয়ের শিখরেও দাঁড়ায়। এত উঁচু মাথা বাঙালির- কে ঠেকায় তাকে! একাত্তরের সেই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কত বীরত্বগাথা বাঙালি জীবনে জড়িয়ে গেছে ইতিহাস হয়ে। অমর এসব ইতিহাস শুধুই আমাদের- বাঙালিদের, পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষের পাশে বাঙালি বীর সন্তানরা অদ্বিতীয় ইতিহাস। সেই ইতিহাসের একটি গল্প বলতেই আজকের এ লেখা শুরু। সিলেটের প্রথম শত্রুমুক্ত এলাকা বালাগঞ্জের শত্রুমুক্ত হওয়ার কাহিনি।
এ বিজয়-কাব্য রচনার মূল নায়ক সত্তরোর্ধ আজিজুল কামাল বিজয়ের আটচল্লিশ বছর পর কী ভাবছেন, কী অনুভূতি তাঁর? এ নিয়ে পত্রিকার সাথে আলাপচারিতায় আজিজুল কামাল-
৭ ডিসেম্বর সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানা শত্রুমুক্ত করতে একদল মুক্তিযোদ্ধার সাহসী অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি। বালাগঞ্জ থানায় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্ণেল ওসমানীর বাড়ি। এই এলাকায় বড় ধরনের তিন/চারটি গণহত্যা ঘটায় পাক বাহিনি আলবদর বাজাকারদের সহযোগিতায়। এর প্রতিশোধ স্পৃহা তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে। অন্যদিকে দেশকে শত্রুমুক্ত করার মরণপণ অঙ্গীকার। একাত্তরের ডিসেম্বর মাসের ১ তারিখ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সমগ্র বাংলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রচন্ড আঘাত হানা শুরু করে। ২ ডিসেম্বর ৪০ জনের এক দল তেজোদীপ্ত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সিলেটের পূর্ব সীমান্তের রাতাছড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প থেকে ভোর ৬টায় বালাগঞ্জ অভিমুখে অধিনায়ক আজিজুল কামাল রওয়ানা দেন। এ দলে ছিলেন সহ অধিনায়ক মছব্বির বেগ, শফিকুর রহমান, মজির উদ্দিন, ধীরেন্দ্র কুমার দে, আবদুল বারি, সমুজ আলী, আবদুল খালিক, জবেদ আলী, সিকন্দর আলী, নেহাবেন্দ্র ধর, আমান উদ্দিন, লালা মিয়া, আবুল হোসেন সহ ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ওদের ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পথিমধ্যে রাজনগর থানার একটি জায়গায় রেখে অবশিষ্ট ১৪ জন নির্ভিক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজ গাঁওয়ে গণি মাস্টার ও বদরুল হক নিলুর বাড়িতে যাত্রা বিরতি করেন। সেখান থেকে রাত বারোটার দিকে অভিযান শুরু করেন। ঘনকুয়াশা আর কনকনে শীতের ভোররাত ৪টায় ইলাশপুর সেতুর কাছে বাংকারে অবস্থান নেন শত্রুকে এমবুস করার অপেক্ষায়। দিনটি ছিল ৬ ডিসেম্বর। সিলেট থেকে একদল পাকবাহিনি ফেঞ্চুগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে ইলাশপুর সেতুর কাছে আসতেই মুক্তিযোদ্ধারা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। যুদ্ধ শুরু হয়। পাকবাহিনিও পা?া আক্রমণ করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ে। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনির আক্রমণের মুখে পাক বাহিনি ঠিকতে না পেরে ফের সিলেটের দিকে চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি তবে পাকবাহিনি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গোলাবারুদ ফেলে পলায়ন করে। ইলাশপুর এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। কদিন আগে ফেঞ্চুগঞ্জ প্রচন্ড যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা করায়ত্ব করে। এর কদিন আগে ছোটলেখা চাবাগান আজিজুল কামালের নেতৃত্বে প্রচন্ড যুদ্ধের পর দখলমুক্ত করেন  মুক্তিযোদ্ধারা। তুমুল যুদ্ধে ২ জন পাক সেনা নিহত ও কয়েকজন মারাত“ক আহত হয়। বাকীরা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে বাগান ছেড়ে পালায়। এ বিজয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল আরও বেড়ে যায়। এই অভিযানের সাফল্য ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য তাদের ওপর দায়িত্ব পড়ে বালাগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করার। ৬ ডিসেম্বর ইলাশপুর যুদ্ধে জয়লাভের পর ১২ কিলোমিটার দূরে বালাগঞ্জের থানা সদরে অভিযানের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।এ উদ্দেশ্যে আজিজুল কামালের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা রওয়ানা দেন বালাগঞ্জ অভিযানে। এদিকে রাজনগরে অবস্থানকারি দলটি ৬ তারিখ বালাগঞ্জে এসে আজিজুল কামালের মূল গ্রুপের সাথে মিলিত হন। রেকি পার্টির মাধ্যমে নিশ্চিত খবর পান পাকবাহিনি বালাগঞ্জ সদরে নেই। থানা নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ ও পাকদোসর রাজাকার বাহিনি। রাতেই মুক্তিযোদ্ধারা থানা সদর ঘেরাও করে পুলিশ সদস্যদের আত্মসমর্পণের আহবান জানান। এ সময় বালাগঞ্জে কর্মরত ডা. জাকারিয়া, কানুনগো বদিউজ্জামান ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুস সোবহান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বার্তা আদান প্রদান করতে বিশেষ সহায়তা করেন। ৭ তারিখ ভোরে অধিনায়ক আজিজুল কামাল তার তিনজন প্রতিনিধিকে দিয়ে পুলিশসহ থানার ভেতরে অবস্থানরত পাক সরকারের সকল সহযোগিতাকারিকে আত্মসমর্পণের চুড়ান্ত আহবান জানান। পুলিশ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দুই ঘন্টা সময় প্রার্থনা করে। কিন্তু তাদেরকে ১৫ মিনিট সময় বেঁেধ দিয়ে এরই মধ্যে আত্মসমর্পণ নতুবা থানা ভবন উড়িয়ে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন মুক্তিযোদ্ধারা। অবস্থা বেগতিক দেখে সকাল ৯টায় ভীতসন্ত্রস্ত পুলিশ দলটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণের কথা জানায়। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। থানা সদরে অবস্থান করা রাজাকার দলটি অন্ধকার থাকতেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে আত্মগোপন করে। পালাতে গিয়ে কয়েকজন ধরা পড়ে। দায়িত্বরত ওসি আবদুল জব্বার ও সেকেন্ড অফিসার ফয়জুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ দলটি ভবন থেকে বেরিয়ে থানা চত্ব¡রে তাদের অস্ত্র জমা দিতে থাকে। ইতোমধ্যে ডাকবাংলো ভবনে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা দলের অধিনায়ক আজিজুল কামাল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে থানা চত্বরে হাজির হন। আনুষ্ঠানিকভাবে ওসি আবদুল জব্বার অধিনায়ক আজিজুল কামালের হাতে থানা ভবনের চাবি হস্তান্তর করে। থানা সদর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসার খবর এবং পুলিশ ও রাজাকারদের আত্মসমর্পণের এ সংবাদটি আগেই মুক্তিকামী মানুষের কাছ পৌঁছে গিয়েছিল। তাই থানা সদর সকাল ১০টার মধ্যেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সকাল ৯টায় মুক্তিযোদ্ধাদের দলপতি আজিজুল  কামাল থানার দায়িত্ব বুঝে নেন। আজিজুল কামাল সমবেত মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। তিনি ঘোষণা দেন- আজ থেকে বালাগঞ্জ থানা মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। যে কোন আক্রমণ ও অপকর্ম মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিহত করতে সক্ষম। তিনি বালাগঞ্জবাসীকে শান্তি-শৃৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যে কোন সমস্যার বিষয়ে থানা ভবনে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের অবহিত করতে উপস্থিত জনতার প্রতি আহবান জানান। আবেগঘন এ বক্তব্য প্রদানের পর জনতার জয়বাংলা ধ্বনি ও জাতীয় সঙ্গীত গীত হওয়ার মাধ্যমে আজিজুল কামাল আমাদের প্রিয় লাল সবুজ পতাকাটি থানা সদরে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে প্রথম উত্তোলন করেন। জনতার পক্ষ থেকে ছাত্রনেতা মখলিসুর রহমান অধিনায়ক আজিজুল কামালকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করেন। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সহঅধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধা মছব্বির বেগ, মইজ উদ্দিন দোলা, আনোয়ার উদ্দিন ও ছাত্রনেতা জামি আহমদ প্রমুখ। আটককৃত রাজাকার ও পুলিশ সদস্যদের থানা কাস্টোডিতে রাখা হয়।
৯ ডিসেম্বর বালাগঞ্জের ত্রাস সাইদুর রহমান ওরফে কালা মৌলবীকে আটক করেন মুক্তিযোদ্ধারা। দুদিন পর সকল বন্দীদের জালালপুর ক্যাম্পে স্থানান্তর করেন। পাক দালাল মৌলভী ফজলুর রহমান, শান্তি কমিটির ইউনিয়ন কনভেনার আবদুল আহাদ চৌধুরী সাদ মাস্টার, বদরুল জায়গীরদার, আজিজুল হক জানু ও রাজাকার হারুন এবং থানা রাজাকার কমান্ডার আফতাবুজ্জামানকে আটক করা সম্ভব হয়নি। জনরোষ থেকে বাঁচতে তারা আত্মগোপন করেন। বদরুল জায়গীরদার ছিল বোয়ালজুড় ইউনিয়নের শান্তিকমিটির কনভেনার। বোয়ালজুড় বাজারে শান্তিকমিটির অফিস স্থাপন করে এলাকায় সে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। সাদ মাস্টার বুরুঙ্গা ও আদিত্যপুর গণহত্যার মূল নায়ক ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামাল এ উত্তেজনাকর অভিযানের  গল্প সংঘটিত ঘটনার বিষদ  বর্ণনা দিতে গিয়ে আমার হাতে তুলে দেন যতœ করে রাখা ভাঁজ করা পত্রিকার পুরনো একটি অংশ। তরুণ সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের লেখা সিলেটে প্রথম শত্রুমুক্ত জনপদ বালাগঞ্জ। কাগজটি হাতে ধরিয়ে দেয়ার সময় দেখলাম তাঁর চোখ আনন্দে চিক চিক করছে।  
আজিজুল কামাল ১৯৭৪ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার পর স্বপ্নে ভরা বুক নিয়ে  জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যুক্তরাজ্যে বাস করলেও দেশে থাকেন বেশী। এক পুত্র ও এক কন্যার জনক আজিজুল কামালের বালাগঞ্জের বোয়ালজুরে পৈতৃক নিবাস। সিলেট শহরের শাহাজালাল হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা  তিনি। তার গ্রাম বোয়ালজুরে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া দুইযুগ আগে শিক্ষায় পশ্চাদপদ বালাগঞ্জে কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে তিনি জড়িয়ে পড়েন। এখন কলেজটি একটি লব্ধ প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। যুক্তরাজ্যেও বালাগঞ্জের শিক্ষা ও সমাজ সেবামূলক কমিউনিটি সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছেন। মূলত দেশের কল্যাণ কামনায় নিবেদিত আজিজুল কামাল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু তার মাঝে কোন অহঙ্কার বাসা বাঁধেনি। দেশপ্রেম আর সততা আজিজুল কামালের ভূষণ। ব্যক্তিগতভাবে সদালাপী ও বন্ধু বৎসল তিনি।

ছোটলেখা চা-বাগানের যুদ্ধের বীরত্বগাঁথা
বেশ কবছর আগে লন্ডনে বালাগঞ্জ এলাকার একটি কমিউনিটি সংগঠনের সভায় বালাগঞ্জের একজন চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্য প্রদানের এক পর্যায়ে বললেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামাল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। সভায় উপস্থিত আজিজুল কামাল এ কথা শুনে শিহরিত হয়ে ওঠেন। আমাকে জানালেন, এরকম মূল্যায়নের কথা এই প্রথম তিনি শুনলেন। নিজেও নিয়ে এমন ভাবনা তার মনে আসেনি আগে কখনো। লক্ষ্য করলাম, তাঁর চোখে তখন ঢেউ খেলছে আনন্দ, মুখে বিজয়ের হাসি। তারপর একটু থেমে তিনি আমাকে বললেন, যারা মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তারা অনেকেই আলোচনার বাইরে রয়ে গেছেন। আমার চেয়ে আরও সাহসী বীরযোদ্ধার কাহিনি শুনুন। তিনি বলতে লাগলেন ছোটলেখা চাবাগানের যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ কাহিনি। ছোট লেখা চাবাগানে দু’দফা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল মাত্র একদিনের ব্যবধানে। তারিখ মনে করতে পারলেন না। একাত্তর সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ঘটেছিল এ অভিযানের বীরত্বপূর্ণ ঘটনা। তুমুল যুদ্ধের পর চা-বাগান দখল করলেন মুক্তিযোদ্ধারা। আজিজুল কামাল এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন মাত্র ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে। এ যুদ্ধে দুজন পাক সেনা নিহত এবং বহু পাকসেনা আহত হয়। বাকীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় অস্ত্রশস্ত্র ফেলে যায়। যুদ্ধে মেশিনগানসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়েছিল। এর পর একদিন একরাত পরেই পাকসেনারা দ্বিগুণ শক্তি বৃদ্ধি করে পা?া আক্রমণ চালায়। তিনি বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যুদ্ধের কৌশল ছিল ‘হিট এ- রান’ কিন্তু অক্টোবর থেকে পলিসি ঠিক করা হয় ‘হিট এন্ড এডভান্স’। সুতরাং চা-বাগান দখলের পর মুক্তিবাহিনি দখলকৃত এলাকায় অবস্থান করছিল। এ অর্থে দখল টিকিয়ে রাখতে মুক্তিবাহিনিও শক্তি বৃদ্ধি করে। কমান্ডার সালামের নেতৃত্বে ২২ জনের অপর দলটি তাদের সাথে যোগ দেয়। তবে সালাম তাঁর দলকে নিয়ে মূল দলের বাম পাশে অবস্থান নেন। ভোর ৫টা হবে তখন। পাকবাহিনি ভারি অস্ত্র আর মর্টার আক্রমণ চালায়। তারাও দু দিক থেকে আক্রমণ রচনা করেন। এক পর্যায়ে সকাল প্রায় ৭টার দিকে দেখা গেল পেছন থেকে গুলি আসছে। আজিজুল কামাল ও তার  দল মনে করলেন বোধ হয় তাদের অপর দল অর্থাৎ সালামের দল হয়তো ভুলক্রমে তাদের পেছনে এসে পড়েছে। ওয়ারলেসে যোগাযোগ করে জানা গেল- না তারা ওদের পেছনে আসেনি। ওরাও পা?া জানালো যে তাদেরও পেছন থেকে গুলি আসছে। এতে আর সন্দেহ রইল না যে, তারা উভয় গ্রুপই পাক সেনা দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। এদিকে পেছনে পাক সেনা চলে আসায় নিজেদের অস্ত্রযোগানও বন্ধ হয়ে পড়ে। দুটি গ্রুপের একই অবস্থা। হাতের মজুদ গোলা-বারুদ শেষ হলেই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে তাদের পড়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা রইল না। এসময় আজিজুল কামালের দলের মজির উদ্দিন উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন, তিনি ও তার সহযোগী আমান উদ্দিন ক্রলিং করে পাক সেনার পেছনে গিয়ে তাদের আক্রমণ করবেন। এটা বুদ্ধির কথা শুধু নয়-নিশ্চিত মৃত্যু ঝুঁকি।
অনুমতি নিয়ে মজির উদ্দিন ও আমান উদ্দিন তাদের এ সাহসী পদক্ষেপ নিলেন। মজির উদ্দিনের বর্ণনানুযায়ী আজিজুল কামাল বললেন, ক্রলিং করে তারা দুজন পাক সেনাদের পেছনে বাংকারের চার পাঁচ হাত দূরে পৌঁছে যান। তখন দুজনে চুড়ান্ত অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। মজির উদ্দিন তাদের প্রস্তুতি অনুযায়ী ইশারা দিলেন পাকসেনার মটারের সেল সাপ্লাইয়ার অপর সহযোগী সেনাকে গুলি করার। আমানউদ্দিন পলকেই পাকসেনার মাথায় গুলি করে তাকে  হত্যা করেন। সঙ্গে সঙ্গেই মজির উদ্দিন লাফ দিয়ে ঝাপটে ধরেন মর্টারের গুলি ছোড়ারত অপর পাক সেনাকে। বিশালদেহী পাক সেনাকে কাবু করতে মজির উদ্দিনের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। ধস্তাধস্তির ফাঁকেই আমান উদ্দিন এই পাক সেনার মাথায় পিস্তল ধরে সারেন্ডার করার আহবান জানান। পাক সেনা আর উপায়ান্তর না দেখে দুহাত তুলে সারেন্ডার করে। এই পাক সেনার নাম লেফটেন্যান্ট এম এইচ আনসারি। সারেন্ডারের পরে দখলকৃত পাক সেনারই ব্যবহৃত মর্টার দিয়ে পেছনে থাকা মূল পাক বাহিনির দিকেই পা?া আক্রমণ চালায় মজির উদ্দিন। মর্টার আক্রমণের ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাকবাহিনি ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকে। পাক সেনাদের মূল মর্টার ইউনিট হাতছাড়া হওয়ায় টিকতে না পেরে অস্ত্রশস্ত্রসহ কনভয় ফেলে অবশিষ্ট পাক সেনারা দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। মজির উদ্দিন ও আমান উদ্দিন জয়বাংলা ধ্বনি দিয়ে উল্লাস করতে থাকলে আজিজুল কামাল নিজের দল নিয়ে এবং সালাম কমান্ডার তার দলকে নিয়ে অগ্রসর হয়ে পাক সেনাদের ধাওয়া করেন। অতি অল্প সময়ের মধেই ছোটলেখা চাবাগান পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের। পাক সেনাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র তাদেরই ফেলে যাওয়া বড় লরি বোঝাই করে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পাক সেনা সদস্য আনসারিকে বন্দী করে ক্যাম্পে সোপর্দ করেন অধিনায়ক আজিজুল কামাল। অধিনায়ক আজিজুল কামালের নেতৃত্বে এ বিজয়ে উল্লসিত হয়ে ক্যাম্পের সকল মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দে মেতে ওঠেন এবং আনন্দ উচ্ছ্বাসে আপ্লুত অনেকেই মজির উদ্দিন ও আমান উদ্দিনকে তাদের বীরত্বে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মজির উদ্দিন ও আমান যে সাহসী কাজটি করেছেন তা শুধু বীরত্বপূর্ণ নয়- আজিজুল কামালসহ তাদের দলের ১১ জন এবং সালাম কমান্ডারের দলের ২২ জন মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ রক্ষা করতে পেরেছেন জান বাজি রেখে। আর তা সম্ভব হয়েছে সাহসিকতার দেদীপ্যমান তীব্রতার কারণে। দুটি বিষয়ই বীরত্ব ও কৃতিত্বপূর্ণ। আজিজুল কামাল কথা বলতে বলতে আক্ষেপ করে বললেন, মুক্তিযুদ্ধের পর এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা মজির ও আমান কোন খেতাব পাননি বা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হননি। এরকম শত শত মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘ আটচল্লিশ বছর ধরে অবহেলার শিকার হয়ে হতদরিদ্র্র অবস্থায় পরিবার পরিজনকে নিয়ে কষ্টে স্বাধীন দেশেই দিনযাপন করছেন। তাদের সন্তানরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, অবহেলিত। এই বীরদের চোখে যে স্বপ্ন ও বুকে যে সাহস ছিল তা আর নেই। তাদের সেই অসীম সাহসী নদী যেন শুকিয়ে গেছে।
বিজয়ের মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামাল এই কথাগুলো বলতে বলতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশকে গড়ে তুলবেই, আমি আশাবাদী এরা মেধাবী ও সাহসী এবং রক্তের ঋণ তারা শোধ করবেই।
(পুনর্মুদ্রিত)