Share |

জর্ডানের আম্মান: প্রাচীন সভ্যতার তীর্থভূমি

দিলু নাসের
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে যেসব জনপদে সভ্যতার ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ, সেসবের মধ্যে গুরুত্বপূণ স্থান হলো জর্ডান। আরবি (আল-উরডুন) পশ্চিম এশিয়ার জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি আরব রাষ্ট্র। জর্ডানের পূর্ব ও দক্ষিণে সৌদি আরব, উত্তর-পূর্বে ইরাক, উত্তরে সিরিয়া, পশ্চিমে ফিলিস্তিন, ইজরায়েল ও মৃত সাগর এবং সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগর অবস্থিত। রাজধানী আম্মান জর্ডানের সবচেয়ে জনবহুল শহর এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এই জনপদে হাজার হাজার বছর আগে থেকে গ্রীক-রোমানসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এসে বসবাস করেছে। তাই সারা দেশ জুড়েই রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন। এদেশের সর্বশেষ দখলদার ব্রিটিশ। অবশেষে ১৯৪৬ সালের ২৫শে মে  স্বাধীনতা লাভ।
১৯৪৬ সালের ২২শে মার্চ লন্ডনে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ট্রান্সজর্ডানকে স্বীকৃতি দেয়। ঐ বছর ২৫শে মে আমীর আব্দুল্লাহ্ রাজা উপাধি ধারণ করেন। তারপর ১৭ই জুন লন্ডন চুক্তিটি অনুমোদিত হয়। ১৯৪৯ সালে এ অঞ্চলের নাম হাশেমি রাজতন্ত্র জর্ডান রাখা হয়।
রাজধানী আম্মান ছাড়াও বিখ্যাত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাবা-জেরাস-মাদাবা-আল কেরাকসহ আরও বেশ কয়েকটি।
আকাবাঃ লোহিত সাগরের পাড়ে জর্ডানের বন্দর নগরী এবং বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। এখানে মানব বসতি শুরু হয়েছিলো খৃষ্ট পূর্ব ৪০০০ বছর থেকে। আকাবা তিনটি আকর্ষণীয় ইসলামী স্থাপত্য রয়েছে। আইলায় ওসমান মসজিদ ওসমান ইবনে আফফান, মামলুক দুর্গের খিলাফতের সময় নির্মিত হয়েছিল এটি এবং সালাহউদ্দিনের ক্যাসেল (সালাদউদ্দিন) যা উপসাগরের মাঝখানে একটি দ্বীপে অবস্থিত।
জেরাসঃ রোমের বাইরে পরিপূর্ণ এক রোমান সভ্যতার নিদর্শন ‘জেরাশ। বলা ােয় গ্রেকো-রোমান সভ্যতা। গ্রিকরা প্রাথমিক নির্মাণ করলেও ৬৪ খ্রিস্টপূর্বে রোমানরা দখল করে। শহর নির্মাণে তাই পরিচিত রোমান শৈলি।
মাদাবাঃ আম্মান শহর থেকে পঁচিশ কিলোমিটার। এদেশের একমাত্র শহর যেখানকার ষাট শতাংশ মানুষই খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। এখানে সপ্তম শতকের একটি গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ আছে। মাদাবার মোজায়েক শিল্পের খ্যাতিও ভূবনজোড়া। এছাড়াও জর্ডানের পেট্রা জগৎ বিখ্যাত।
পেট্রাঃ জর্দানের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপত্যকা ওয়াদি মুসা-র হুর পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। ৪০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ছিল নাবাতাইন রাজ্যের রাজধানী। পেত্রা নগরী মূলত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ। এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর জন্য এই জায়গাটি বিখ্যাত। ১৮১২ সালে প্রাচীন শহরটিকে বিশ্বের কাছে উন্মোচন করেন সুইস পরিব্রাজক জোহান লুডিগ বুর্খার্দত।
২০০৭ সালে জর্ডানের পেট্রা নগরীকে বিশ্বের নতুন সপ্তমাশ্চর্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। আর ১৯৮৫ সাল থেকে এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের অংশ।
পেট্রা সম্পর্কে পরে একসময় বিস্তারিত লিখবো। আর রাজধানী আম্মান থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ডেড সী। মৃত সাগর। বিশ্বের সকল বিস্ময়কর বিষয়ের মাঝে ডেড সি বা মৃত সাগর একটি অন্যতম বিস্ময়। ডেড সির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই সাগরের পানিতে কেউ ডুবে না। এমন কি কেউ ডুবতে গেলেও ডুবতে পারে না। ডেড সি’তে কোনও মাছ নেই, কারণ এই সাগরের পানিতে কোনও মাছ বাস করতে পারে না। তেমনিভাবে এর পাশে জর্ডান নদীতেও কোনও মাছ নেই। এই সাগরের পানিতে কোন উদ্ভিদ বা মাছ বাচতে পারে না বলেই মূলত এই সাগরকে ডেড সি বা মৃত সাগর বলা হয়ে থাকে।  
মানব সভ্যতার ইতিহাসে ডেড সি’র রয়েছে বৈচিত্র্যময় ইতিহাস। বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থে এই স্থানটির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। ডেড সি বা মৃতসাগর যে স্বাভাবিক কারণে সৃষ্টি হয়নি সেটা এই ইতিহাসগুলো দ্বারা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এই সকল ইতিহাসগুলোর মধ্যে ডেড সি বা মৃত সাগরের কথা ইসলাম ধর্মে বেশী বলা হয়েছে। এই স্থানটি এরূপ হওয়ার কারণ হিসেবে আল কুরআনের তথ্যগুলো সবচেয়ে বেশী সত্য, সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য। ইসলাম ধর্মে এ অঞ্চলকে হযরত লূত (আঃ) এর অনুসারীদের আবাসস্থল হিসেবে চি?িত করা হয়েছে। লূত (আঃ)-এর উম্মতগণ এই এলাকায় বসবাস করতো। তখন এই স্থানটি ছিল স্বাভাবিক এবং মানুষ বসবাসের জন্য খুবই উপযোগী। তৎকালীন সময়ে লূত (আঃ)-এর অনুসারীরা চরম পাপে লিপ্ত হয়েছিল। লূত (আঃ) তার অনুসারীদের বারবার পাপ কাজ হতে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করে ব্যর্থ হলে এই জাতির পাপের পরিণামে আল্লাহ তার ফেরেশতাদের প্রেরণ করেন তাদের কঠিন শাস্তি প্রদান করার জন্য। আল্লাহর আদেশে ফেরেশতারা এসে এই জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এই স্থানের ভূমিকে উ?ে দেন। ফলে মাটি চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় এই সম্প্রদায়। মাটি উ?ে দেওয়ার কারণে এখানের ভূমি নিচে নিমে যায়। বর্তমান বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে প্রমাণ পেয়েছেন যে, বর্তমানে এই স্থানটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থান। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা রুম এ লূত (আঃ)-এর জাতির এই ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
খ্রিস্ট ধর্মে : ডেড সি বা মৃত সাগরের দুর্গম এ অঞ্চল বাইজেন্টাইন শাসকদের আমল থেকে গ্রিক অর্থোডক্স সন্ন্যাসীদের আকৃষ্ট করতে শুরু করেছিল। ওয়াদি কে?ে অবস্থিত সেইন্ট জর্জ গির্জা এবং জুদাই মরুভূমিতে মারসাবা মন্দির খ্রিস্টানদের তীর্থস্থান। এই সকল স্থানে খ্রিস্টানদের যাতায়াত ছিল বহু বছর ধরে।
ইহুদী ধর্মে : মৃত সাগরের উত্তর তীরবর্তী “জেরিকো” শহরের নামটি ইহুদী ধর্মগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। বুক অব জেনেসিসে উল্লিখিত নবী আব্রাহামের সময়কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত সোডম এবং গোমোরা শহর এবং তিনটি “সমতল ভূমির শহর” আদমাহ, জেবোইম এবং জোয়ার শহরের অবস্থান সম্ভবত মৃত সাগরের দক্ষিণপূর্ব উপকূলে বলে ধারণা করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে একটি বিশেষ জর্দান স্থান হিশেবে চি?িত। কারণ এটিই প্রথম অঞ্চল যেখানে আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। এখানে সংঘটিত হয়েছিলো ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধ মুতার যুদ্ধ নামে পরিচিত। মুতা জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মুসলমানরা যেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এ যুদ্ধ ছিলো সেসবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। এই যুদ্ধই ইসলামের জন্য খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশসমূহ জয়ের পথ খুলে দেয়। অষ্টম হিজরীর জমাদিউল আউয়াল অর্থাৎ ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে এই যুদ্ধে সংঘটিত হয়। রোমাধিপতি হিরাক্লিয়াসের এক লক্ষ সুসজ্জিত সৈন্যের বিরুদ্ধে মুসলমান ছিলেন মাত্র ৩০০০ জন। এই যুদ্ধে হযরত যায়েদ ইবনে হারিছা, জাফর ইবনে আবু তালিব ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) এই তিন সেনাপতিসহ বহু সাহাবী শহীদ হন। পরে সেনাপতি খালিদ ইবনে অলীদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা বিজয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন। সেই রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে মুতা প্রান্তর এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে। আম্মান থেকে মুতার দুরত্ব প্রায় ৮০ মাইল। শহীদ সাহাবীদের রক্তের সুঘ্রাণ নিতে সেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মুসলিম পর্যটক সেখানে ােতায়াত করেন। জর্ডনের উত্তর দিকের মরুভূমি সাঈফে রয়েছে একটি অলৌকিক বৃক্ষ যার নাম ‘সাহাবী বৃক্ষ’। ইংরেজিতে বলা হয় ‘দ্য ব্লেসড ট্রি’। অনেকের মতে, সম্ভবত পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীনতম গাছ এটি। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বে এত বয়স্ক গাছ কোনও দেশে নেই। মহানবী সা.-এর স্মৃতিবিজড়িত এই গাছটি এখনও জীবিত রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, ধূ-ধূ মরুভূমি অঞ্চলে ১৫০০ বছর ধরে দণ্ডায়মান এই এর আশপাশের শতাধিক বর্গ কিমি এলাকায় আর কোনও গাছ নেই। কথিত আছে, বাল্যকালে চাচা আবু তালিবের হাত ধরে জর্ডনের এই উত্তপ্ত বালুময় মরুপথ ধরেই মক্কা থেকে পদব্রজে সিরিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে একটানা হাঁটা সম্ভব ছিল না। তাই চাচা-ভাইপো এই শুকনো গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। তখনই মহান আল্লাহর নির্দেশে শুকনো পাতাঝরা মৃতপ্রায় গাছটি পাতায় পাতায় সবুজ হয়ে ওঠে। এবং ধুসর মরুভূমিতে গাছটি এখনো জীবিত। সেখানেও প্রতিদিন পর্যটকদের ভীড় থাকে।
বাইজান্টিয়ামের সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে নবী মুহাম্মদের (স) কাছ থেকে প্রেরিত মূল চিঠির (জর্ডানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা) একটি অনুলিপি কেরাক শহরের আবদালি মাজার ইসলামিক যাদুঘরের কিং আবদুল্লাহ মসজিদ যাদুঘরে এখনও সংরক্ষিত আছে। জর্ডানের ভূমি কোরানে বর্ণিত অসংখ্য নবী রাসুলের পদভারে ধন্য হয়েছে। হজরত দাউদ, হজরত মুসা, হযরত ইয়াহইয়া, হজরত লুত, হজরত নুহ, হযরত আইয়ূব, হজরত হারুন (আঃ)সহ অনেকের স্মৃতি চি? বিভিন্ন শহরে এখনো বিদ্যমান। হারুন আঃ এর মাজার রয়েছে পেট্রার পাশে। কেরাক শহরে হজরত নুহ আঃ শায়িত। নবী লূত ‘লোট’ মন্দির ও জাদুঘর মৃত সাগরের দক্ষিণে। জেরাস শহরের পাশে রয়েছে হুদ আঃ এর কবর। কেরাকের পাশে রয়েছে নবী, সুলাইমানের মাজার এবং নবী শোয়াইব আলাইসাল্লামের। প্রাচীন ইতিহাসের তীর্থস্থান জর্ডান ভ্রমণ করেন  প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়নের বেশি লোক।
এই ঐতিহাসিক দেশ ঘুরে দেখা ইচ্ছে আমার অনেক দিনের। হঠাৎ করে  অক্টোবরের শেষের দিকে আমি আর বন্ধুবর রুবেল (ব্লু স্টোন ট্রাভেলসের মালিক) জর্ডান এবং পবিত্র ভূমি জেরুজালেম ঘুরে আসার ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। টিকিট ও বুকিং হয়ে গেলো সঙ্গে আরও কয়েকজন।
৩০ নভেম্বর ২০১৯ সকাল ১১টায় আম্মানের রানী আলেয়া বিমানবন্দরে আমাদের প্লেন খেন অবতরণ করলো তখন রোদ ঝলমলে সুনীল আকাশ। প্লেন থেকে নেমে ইমিগ্রেশনে পৌঁছার আগেই দেখি একজন সুদর্শন লোক আমাদের নাম হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চোখাচোখি হতেই তিনি গুড মর্নিং বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন আমি মুহাম্মদ, আপনাদেরকে রিসিভ করতে এসেছি। জর্ডানে সু-স্বাগতম। এই রাজকীয় অভ্যর্থনায় আমি একটু অবাকই হলাম। জানতাম আমাদের জন্য লোক আসবে কিন্তু একেবারেই যে প্লেনের দ্বারে উপস্থিত হবে এমনটা ভাবিনি। ইমিগ্রেশনে আসার আগেই মুহাম্মদ আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে গেলেন। আমাদের কে ইমিগ্রেশনের সামনে দাঁড়াতে বলে তিনি নিজেই এগিয়ে গেলেন। অফিসারের কাছ থেকে সিল মারিয়ে আমাদেরকে আসতে বললেন। ইমিগ্রেশন অফিসারও আমাদেরকে হাসি মুখে গুড মর্নিং বলে স্বাগত জানিয়ে বিদায় করলেন। এমন ভিআইপি সার্ভিসে আমরা মুগ্ধ এবং পুলকিত। রুবেল বল্লেন, এই খাতির ব্লু স্টোনের সৌজন্যে। আমরা মেনে নিলাম।
পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে আমার। কিন্তু বিমানবন্দরে এমন অভ্যর্থনা কখনও পাইনি। এরকম সুন্দর প্রশস্ত এবং গোছানো বিমানবন্দরও চোখে পড়েনি আর। ইমিগ্রেশন শেষ করে এক্সেলেটার দিয়ে নেমে খুব সহজেই বেড়িয়ে এলাম বাইরে। কুইন আলেয়া বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালগুলো হয়েছে ২০১৩ সালে তাই এখানকার সবকিছুই ঝকঝকে তকতকে। এরাইভেল লাউঞ্জে আসতে মুহাম্মদ পরিচয় করিয়ে দিলেন আরেক সুদর্শন তরুণের সাথে। বললেন, ওনি হচ্ছেন আবদুল্লাহ আপনাদের ড্রাইভার। যে কদিন আছেন তিনি আপনাদেরকে সঙ্গ দেবেন। আবদুল্লাহ ও সালাম করে হাসি মুখে হাত বাড়ালেন। মুহাম্মদ বিদায় নেবার আগে আমাদের হাতে দিয়ে গেলেন গিফটের প্যাকেট।
মোবাইল ফোন অন করতেই ম্যাসেজ এলো ব্যবহার করলেই চার্জ করবে। সাথে সাথে আমরা সিম খুলে জর্ডানের সিম কিনতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। পাশেই ফোন নেটওয়ার্কের দোকান থেকে থেকে পাঁচ জিবি ইন্টারনেটসহ সিম কিনলাম পনেরো দিনার করে। মানি এক্সচেইঞ্জে পাউন্ড ভাঙ্গাতে গিয়ে এই প্রথম ব্রিটিশ পাউন্ড দিয়ে কম মুদ্রা পেলাম। একশত পাউন্ডে মাত্র ৮০ দিনার মাত্র।
বাইরে তখন রোদ ঝলমল আকাশ ঝিরঝির হাওয়ায় ভালোলাগার পরশ। আমরা কয়েকটি খেজুর বৃক্ষের নিচে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে আবদুল্লাহর চকচকে গাড়িতে উঠলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই হাইওয়ে। একটু সামনে যেতেই চোখে পড়লো সিরিয়া- ইরাক-সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের সাইন। এখান থেকে রাজধানী আম্মানের দুরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। মসৃণ পথ। ততোধিক আরামদায়ক যান।
প্লেন থেকে পাখির চোখে প্রথম দর্শনেই আম্মান প্রেম। যদিও খটকা লেগেছিল। চুনাপাথরে নির্মিত আদি আম্মান শহর শ্বেতনগরী নামে পরিচিত। কিন্তু ঘরবাড়িতে সাদা রঙ থেকেও ধুসরের উপস্থিতি বেশি মনে হল।
হ্যাশেমাইট কিংডম অফ জর্ডন। আরবিতে আল-উর্দুন। শাসক রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। এখানে পা দিয়ে তা বিস্মৃত হতে হল। রুক্ষ মরুভূমি সদৃশ মধ্যপ্রাচ্যে এ যেন এক শান্তির মরুদ্যান।
দশ মিলিয়ন মানুষের এই দেশটির প্রধান ভাষা আরবি হলেও বেশিরভাগ মানুষ ইংরেজি জানেন। রাজা নিজেই আমেরিকায় শিক্ষিত। আবদুল্লাহ আমাদের সাথে চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। তবে কিছু কিছু বিষয় আমি তাকে বুঝাতে পারছিলাম না। জানলাম, প্রায় ২১,৭৫,৪৯১ ফিলিস্তিনি শরণার্থী এখানে আছেন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর ১০ লক্ষ ইরাকি জর্দানে আশ্রয় নেন। এখন অসংখ্য সিরিয়ান। আম্মান সাতটি পাহাড়ের উপর নির্মিত শহর, তাই যেকোনো রাস্তা দিয়ে গেলে পুরো শহর চোখে পড়ে। আম্মান আধুনিক শহর। এখানে নগরায়ন শুরু হয়েছে ১৯০৯ সাল থেকে। তাই সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া।
যেতে যেতে শহরের উপকণ্ঠে এসে একটা চমৎকার ব্রীজ চোখে পড়লো আবদুল্লাহ বললেন এটা আম্মান শহরের একমাত্র ব্রীজ। চোখে পড়লো অনেকগুলো সুদৃশ্য মসজিদ এবং কয়েকটি চার্চ।
আবদুল্লাহকে জিগ্যেস করলাম, এগুলো অ্যাকটিভ? তিনি বললেন, অবশ্যই। জর্ডানে ৯৭% সুন্নি মুসলিম, ৩% ক্রিশ্চান। দেয়ার ইজ নো শিয়া ইন জর্ডন। সেইজন্য জর্ডন এত পিসফুল। ক্রিশ্চানদের সাথে আমাদের কোন ঝামেলা নেই।
কিছু দূর এগুতেই আবদুল্লাহ সামনের পাহাড়ের উপরে একটা সুউচ্চ ভবন দেখিয়ে বললেন- এটাই আপনাদের হোটেল। পাঁচ মিনিটেই পৌঁছাবো।
আম্মান শহরে আটটা রাউন্ড এবাউট (গোল চত্তর) তারা এগুলোকে সার্কেল বলে। আমাদের হোটেল সেকেন্ড সার্কেলে। ডাউনটাউনের অনেকটা পাশেই। তবে এখানে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস রয়েছে পাশে দোকানপাট ও রয়েছে কিছু। সুন্দর ছিমছাম চারতারকা হোটেল। রিসেপশনে দুজন মহিলা ছিলেন হিজাব পরিহিতা। মৃদু হেসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। ঘড়িতে তখন প্রায় দুপুর বারোটা। বেলা দুটোতে চেকইন টাইম, তাই রুম রেডি হতে একটু সময় লাগবে বলে জানালেন তারা। রুবেল প্রস্তাব করলেন, তাহলে আমরা একটু ঘুরে আসি। কথা ছিলো হোটেলে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার আগে আম্মান শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো আজই দেখবো, না হলে আর দেখা হবেনা। কারণ এই সংক্ষিপ্ত সফরের বাকি দিনগুলোতে পেট্রা এবং জেরুজালেম দেখতেই চলে যাবে।
আবদুল্লাহ বললেন, চলে আসেন ঘুরে আসি। আম্মান সিটাডেল আর রোমান থিয়েটার পাশেই। আমরা উঠলাম গাড়িতে। উঁচুনিচু পাহাড়ী পথ দিয়ে গাড়ি ছুটছে। যেদিকেই তাকাচ্ছি পুরো শহর দেখা ােচ্ছে।
রোমের মতো আদি আম্মানও তৈরি হয়েছিলো সাতটি পাহাড় জুড়ে। প্রশাসনিক কারণে পাহাড় চিরে রাস্তা হওয়ায় সংখ্যা বেড়ে এখন চব্বিশ। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে প্রথম গন্তব্য আম্মান সিটাডেল। অন্যান্য সব প্রাচীন সভ্যতার মতই আম্মান সিটাডেলও পাহাড়ের মাথায়। পাহাড়ের নাম জাবাল আল কালা। সেখান থেকে আম্মান শহরকে ভারী সুন্দর লাগছে। বাড়ীগুলো সবই হলুদাভ রঙের। তার ওপর বৃক্ষের ছায়া পড়েছে। দুপুরের রোদে বাড়ীগুলো ঝকঝক করছে তখন। গাড়ি থেকে নেমেই আমরা ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আবদুল্লাহ ভেতরে ঢোকার টিকিট নিয়ে এলেন। রোদ ঝলমল দুপুরে আধুনিক পোশাকে সিটাডেলের ভিতরে ঢুকতেই আধুনিকতা গায়েব। চারিদিকে শুধু প্রস্তর যুগের নিদর্শন। যেন সময়যানে আট হাজার বছর পাড়ি দিয়ে নব্যপ্রস্তর যুগের যুগে প্রবেশ। এখন ট্যুরিস্ট সিজন নয়, তবুও এই দুপুরের মিষ্টি রোদে আরও কিছু লোকজনের দেখা মিললো। স্টোন, ব্রোঞ্জ, আয়রন তিনটি যুগে পর্যায়ক্রমে কীভাবে ছাপ ফেলেছে এখানে তা প্রথম দৃষ্টিতেই বোঝা গেলো।
ব্রোঞ্জ এবং আয়রন যুগের পাশাপাশি রোমান, বাইজেন্টাইন এবং উমাইয়াদ সময়কালে বহু কিছু পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল এখানে। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আরবে রোমান সভ্যতার বিবর্ণ স্মৃতিচি? এবং টেম্পল অফ হারকিউলিস, আর অদূরে রোমান থিয়েটার। সিটাডেলে গ্রীক পুরাণের দেবতা হারকিউলিসের মূর্তি বানায় রোমানরা। তেরো মিটার লম্বা। এতো বড় রোমান মূর্তির আর কোনও নজীর কিন্তু নেই বিশ্বে। মূর্তির ভাঙা হাত-পা এখনো পড়ে আছে সেখানে। হারকিউলিস মন্দিরের পাথর দিয়ে তৈরী হয়েছিলো বাইজান্টাইন চার্চ। সম্রাট কনস্টানটাইনের মা হেলেনা এই চার্চের প্রতিষ্ঠাতা। তারপর সেই চার্চের পাথর দিয়ে তৈরী হয়েছে উম্মাইদ প্যালেস। সিটাডেলের সবচেয়ে নতুন স্থাপত্য, উম্মাইদ বংশের খলিফাদের বাসভবন।
সিটাডেল থেকে চোখে পড়ে নিচের রোমান থিয়েটার। দ্বিতীয় শতাব্দীতে মার্কাস অরেলিয়াসের রাজত্বকালে এই থিয়েটার নির্মিত হয়েছিল। বিশাল এই থিয়েটারে প্রায় ৬০০০ মানুষ একসাথে বসতে পারতো। এটি পাহাড় কেটে তৈরী করা হয় এবং দর্শক এর দিকে সরাসরি সূর্যালোক ঠেকানোর জন্য আসন উত্তর দিকে নির্মাণ করা হয়। থিয়েটার তিনটি স্তরের উপর নির্মিত হয়েছিল, শাসকেরা একদম সম্মুখভাগে বা নিচের দিকে, সামরিক বাহিনী মধ্যভাগে এবং সাধারণেরা পেছনভাগে বা উপরের দিকে। বিশেষ কাঠামোর কারণে মূল মঞ্চ হতে দূরে হওয়া সত্ত্বেও পেছন ভাগের দর্শকরা অভিনেতাদের স্পষ্ট শুনতে পেতেন।
প্রায় ছয় হাজার খ্রিস্ট পূর্বাব্দে খাবারের খোঁজে একদল মানুষ এসে আস্তানা গাড়েন এখানে। সেই থেকে আজ অবধি মনুষ্য বসবাস চলছে। আম্মানের প্রাচীনতম বসতি ছিলো যেখানে সেখানে মানুষের বাস এখনও। তবে তখন এই শহরের নাম ছিল অ্যাঙ্গাজোল। এরপর আম্মোনরা (অ্যামোনাইটস) দখল নিয়ে নাম পরিবর্তন করেন। নাম হয় জেরাথ আম্মান।
কখনও আম্মোন, কখনও নাবাত, কখনও বা গ্রিক কিম্বা রোমানরা দখল নিয়েছেন এ শহরের। নিজেদের পছন্দ মতন নাম পরিবর্তন করেছেন শাসকরা। আলেকজান্দারের সেনাপতি বেথলিমাস ফিলাডেলফিয়াস শহরের নাম রাখেন ফিলাডেলফিয়া, যার নাম অনেক পরে আবার আম্মানে পরিবর্তিত হয়।
প্রাচীন সভ্যতার উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খেয়াল হলো আমার সামনে পড়ে আছে হারকিউলিসের পাহাড়প্রমাণ মূর্তির তিনখানি আঙুল। আশেপাশে সাথীদের দেখা যাচ্ছে না। একজন পর্যটককে দিয়ে নিজের ছবি উঠালাম। ফিরে দেখি বন্ধু রুবেল সেলফি স্টিক নিয়ে ব্যস্ত। ভিডিও করছেন ব্লু স্টোনের জন্য। বেলা প্রায় দুটো বাজে তখন। গায়ে সুয়েটার ছিলো তখনও তাই কিছুটা গরম এবং তৃষ্ণার্ত অনুভব করলাম। ভাঙা পাথুরে পথে হেঁটে হেঁটে গেইটের পাশের দোকানে আসলাম পানীয় কিনতে। তিনটা কোকাকোলার ছোট ক্যান কিনতে গিয়ে আট দিনার চলে গেলো। হিসাব করে দেখলাম দশ পাউন্ডের উপরে। আবদুল্লাহ বললেন ট্যুরিস্ট এলাকা তাই দাম বেশী।
টেম্পল অফ হারকিউলিসের কড়া রোদ্দুর গায়ে মেখে গাড়িতে উঠলাম। ইতিহাস থেকে চকচকে আধুনিক শহরে চলছে গাড়ি। ডাউনটাউন হয়ে কয়েক মিনিটেই পৌছে গেলাম হোটেলে। পরদিন সকাল সাতটায় তৈরি থাকতে বলে বিদায় নিলেন আবদুল্লাহ। গোলাপী পাথরের শহর পেট্রা গাড়িতে চার ঘন্টার পথ।
চার তারকা হোটেলের ধবধবে বেড দেখে রাতের ক্লান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। গোসল সেরে আমরা না ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ এখন ঘুমোলে রাতে আর ঘুম আসবে না। তাছাড়া খাওয়া ও হয়নি কিছু। ঘন্টাদেড়েক বিশ্রাম নিয়ে মোবাইল চার্জ দিয়ে আবারও বেড়িয়ে পড়লাম। হোটেলের সামনেই রেস্টুরেন্ট, সাইন বোর্ডে লেখা “দ্যা গুড টেইস্ট অফ ইন্ডিয়ান ফুড”। ক্ষুধার্ত, তবু খেতে ইচ্ছে হলো না। সামনের দিকে হাঁটতে থাকলাম। আম্মানের বিখ্যাত রেইনবো স্ট্রিট পাঁচসাত মিনিটের পথ। ইচ্ছে সেখানে গিয়েই খাবো। বিকেলের ফুরফুরে হাওয়ায় হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিলো। রেইনবো স্ট্রিটের পরিবেশ দেখে বেশ ভালো লাগলো। সাধারণত আরব দেশে এরকম দেখা যায়না। নারীপুরুষ একসাথে বসে ক্যাফে-রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিচ্ছেন। কেনাকাটা করছেন। সবগুলো রেস্টুরেন্টেই তরুণীরা কাজ করছেন। চকচকে শহর আম্মান যতটা না চমক দিল তার চেয়ে বেশি চমক মানুষজন দেখে। এখানে এলে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে যে ছবিটা অনেকের মনে আছে তা ভেঙে যাবে। বোরখায় মুখ ঢাকা নয়, জর্ডনীয় নাগরিক নারী আধুনিকতায় প্রথম সারির। তবে স্বল্পবসনা ভাবলে ভুল হবে। এখানকার রাস্তাঘাটের মসৃণতা অনায়াসেই জর্ডন সুন্দরীদের পেলবতার সাথে তুলনীয়।
একজন আমাদেরকে একটা রেস্টুরেন্টের ভেতর ডেকে নিলেন। বসার জায়গা চমৎকার। সারা আম্মান দেখা যায় সেখান থেকে। কিন্তু খাবার আমাদের পছন্দ হলো না। হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের খাবার পছন্দ হলো। অর্ডার দেওয়ার সাথে সাথেই পাশের মসজিদ থেকে ভেসে এলো মাগরিবের আজান। রেস্টুরেন্ট থেকে দুমিনিটের পথ মসজিদ, তাই আমরা সেদিকে ছুটলাম। বললাম, নামাজ শেষে খাবো এসে। শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে চমৎকার মসজিদ। ভেতর বেশ বড়। কিন্তু মুসল্লির সংখ্যা একেবারেই নগন্য। এমন অভিজ্ঞতা মরক্কোর মারাকেশেও হয়েছিল।
নামাজ শেষ করে এসে নানরুটি আর কারী খেয়ে আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম। গন্তব্য ডাউনটাউন। আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে ১০ মিনিটে যেখানে এসে থামলাম, সেটা আম্মানের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা কিং ফয়সাল স্কোয়ার। দেখতে একেবারেই ঢাকার বায়তুল মোকারমের মতো। রাস্তায় বিভিন্ন জন বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছেন। পুরুষ মহিলা সমান তালে হাঁটছেন। পাশে বড় মসজিদও একটা। আমরা ও দুএকটি দোকানে ঢু মারলাম। পথের পাশে একজন তাজা ফলের রস বিক্রি করছেন। দুই গ্রাস কিনলাম এক দিনার দিয়ে। রাস্তায় অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশু ভিক্ষা বৃত্তিতে করছেন। পরে জেনেছি এরা সবাই সিরিয়ান রিফিউজি। শুনেছি আম্মানে অনেক বাঙালী আছেন, কিন্তু দেখা পেলাম না কারো। ঘন্টাখানেক ঘুরাঘুরি করে হোটেলে ফিরলাম টেক্সিতে করে। ভাড়া দিলাম এক দিনার মাত্র।
রুমে ঢুকেই দেখি বিশাল জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আলো ঝলমলে আম্মান শহর। ঘড়ি তখন সাড়ে সাতটা বাজে। বেশিক্ষণ এই দৃশ্য উপভোগ করতে পারিনি, ক্লান্তির ভরে ঘুমের আলিঙ্গনে আত্মসমর্পণ করতে হলো। হঠাৎ মধ্যরাতে প্রচন্ড মাথা ব্যাথায় ঘুম ভেঙে যায়। অন্ধকারে প্যারাসিটামল খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো না ব্যাগে। কোনভাবে রুবেলের বেডের পাশে গিয়ে পাওয়া গেলো কো-কোঢালমল। একটা খেয়ে ঘুমাবার চেষ্টা করলাম।
সকাল সাড়ে ছটায় ঘুম ভাঙলো রুবেলের ডাকে। সাতটায় আবদুল্লাহ চলে আসবেন। পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ মরুপথ। ঠিক সাতটায় আবদুল্লাহর ফোন এলো, তিনি হোটেলের লবিতে আছেন। তাড়াহুড়া করে নিচে এসে দেখি আবদুল্লাহর সাথে আজ আরেকজন। আবদুল্লাহ পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি হচ্ছেন মুহাম্মদ সালাহ, আজ আপনাদের গাইড। সালাহ সাহেব ষাটোর্ধ্ব চমৎকার মানুষ। এই পেশায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। তাঁর কথার মাধুর্যে মুহূর্তেই বশ করে নিলেন।
আমরা গাড়িতে উঠলাম। প্রথম গন্তব্য ঐতিহাসিক আসহাবে কাহাফ। পবিত্র কোরানের কাহাফ সুরায় বর্ণীত কাহিনীর সেই ঐতাহাসিক গুহা।
সকালের আম্মান। গাড়ির চলাচল বেশ কম। রাস্তায় ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে দেশের কথা মনে পড়লো। মেয়েদের সবুজ রঙের স্কুলপোষাক দেখে রুবেল বলে উঠলেন, কিশোরী মোহন। (সিলেটের একটি বালিকা বিদ্যালয়ের নাম) বেশিরভাগই হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ সালাহ একটা গাড়ি দেখিয়ে বললেন, এই যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ােচ্ছেন। মুহূর্তে গাড়িটি পাশ দিয়ে চলে গেলো চেহারা দেখা হলো না। সালাহ আশেপাশের কয়েকটি অট্টালিকা দেখিয়ে বললেন, এগুলো রাজপরিবারের সদস্যদের। বলেই রাজার প্রশংসা শুরু করলেন। বললেন রাজা হাশেমাইত ফ্যামিলি, নবী মুহাম্মদের(স) নিজের বংশধারা। এর চেয়ে বড় যোগ্যতা আর কি হতে পারে!
সালাহ তার নিজের কথা বলেন, তাদের আদি নিবাস প্যালেস্টাইনে। অনেক বছর ধরে এখানে তারা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্লেন, তেলআবিব বিমান বন্দর গড়ে উঠেছে তার পিতামহের জমিতে।
পনেরো বিশ মিনিটে আমরা পৌছে গেলাম আসহাবে কাহাফে। পাহাড়ের পাদদেশে চমৎকার একটি মসজিদ। আমরা গাড়ি থেকে নেমে মসজিদের সামনা দিয়ে গুহাটির পাশে আসলাম। সবুজাভ গ্রাম। কোরান ছাড়াও আরও বিভিন্নভাবে এই গুহার কথা শুনেছি। একবার একটা ছবিও দেখেছিলাম এই বিষয়ে।
আল কাহ্ফ, (‘ডমবযটভধমভ্র মতর্ দণ ডটশণ’) সাত যুবকের একটি দলের গল্প, যারা ধর্মীয় নিপীড়ন হতে রক্ষা পেতে ২৫০ খ্রিস্টাব্দে ঋযদণ্রল্র নগরী হতে পালিয়ে গিয়ে ৩০০ বছর গুহায় কাটিয়ে দেয়। কুরআনে (সূরা ১৮ আয়াত ৯৯-২৬) কাহিনীটি বর্ণনা আছে যতটুকু ইসলামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই বর্ণনায়?একটি কুকুরের কথাও উল্লেখ রয়েছে যা যুবকদের সাথে গুহায় প্রবেশ করে এবং নজর রাখে। ইসলামে এই যুবকদেরকে ‘গুহাবাসী’ বলা হয় ।
আমরা যখন পাহাড়ের পাদদেশে এই গুহার সামনে পৌঁছলাম তখন এর দরজা বন্ধ ছিলো। এটি এখন আর গুহার মতো নয়। গুহার কাঠামো ঠিক রেখে দরজা লাগিয়ে মিউজিয়ামের মতো করা হয়েছে। কয়েকজন লোক সেখানে আঙিনা পরিষ্কারের কাজ করছিলেন। আমরা ছবি তোলায় ব্যস্ত হলাম। গাইড সালাহ আমাদেরকে গুহার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বললেন। একটু পর মসজিদের তরুণ ইমাম আসলেন চাবি নিয়ে। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ইমাম সাহেব সুরা কাহাফ পড়লেন, তারপর ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আবারও বিস্তারিত ইতিহাস শোনালেন আর গুহার ভেতরে রাখা বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখালেন। এসবের মধ্যে গুহাবাসী লোকজনের কিছু হাড়ের অংশবিশেষও রয়েছে।
আমরা গুহা থেকে বেড়িয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে চারপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। সকাল তখন প্রায় সাড়ে আটটা। রোদ ঝলমলে নীলাকাশ, অথচ মনে হচ্ছিল যেন দুপুর। আবদুল্লাহ গাড়ি নিয়ে বাইরে অপেক্ষমান। গাড়িতে উঠলাম আমরা। যাত্রা শুরু হলো বিস্ময়-নগরী পেট্রা অভিমুখে।