Share |

পর্যালোচনা : মিস্বাহুল ইসলাম সুরত নির্মিত টেলিফিল্ম ‘প্রতিফল’

খসরু নোমান
গত ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ পূর্ব লন্ডনের ব্র্যাডি আর্ট সেন্টারে প্রদর্শিত হলো সৌখিন নির্মাতা গোষ্ঠী ‘রিয়্যালফ্রেম’-এর তত্ত্বাবধানে এবং মিসবাহুল ইসলাম সুরুত ফিল্মস ও স্মৃতি প্রোডাকশন্সের যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত সাব্টাইটেল যুক্ত বাংলা টেলিফিল্ম ‘প্রতিফল’। অনুজপ্রতীম চিত্রনির্মাতা মিসবাহুল ইসলাম সুরতের অনুরোধে ছবিটি দেখতে গেলে তিনি ছবিটির ওপর কিছু লিখতে অনুরোধ করেন।
মিজবাহুল ইসলাম সুরত একাধারে টেলিফিল্মটির কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক, অভিনেতা ও পরিচালক। পরিচালক হিসেবে ‘প্রতিফল’ তাঁর প্রথম ছবি। বিলেতের বাঙালি কমিউনিটিতে হাতেগোনা যে ক’জন বাংলা টেলিফিল্ম নির্মাতা রয়েছেন তাদের সারিতে নতুন নির্মাতা হিসেবে তাঁর নাম যুক্ত হলো।
মিসবাহুল ইসলাম সুরত এর আগে বেশ কয়টি টেলিফিল্মে অভিনয়, চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনার কাজ করে বিলেতের বাঙালি কমিউনিটিতে এখন সুপরিচিত। প্রথমে সখের বশবর্তী হয়ে অভিনয় করতে এসেছিলেন। পরবর্তীতে সিনেমা তৈরির নেশায় পড়ে; ক্যামেরা ইক্যুইপমেন্ট, সাউন্ড সিস্টেম ও লাইটের সরঞ্জাম ক্রয় করে সেট্আপ করেন এডিটিং প্যানেল ও গড়ে তোলেন স্যুটিং ইউনিট। তারপর সিনেমা তৈরির কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন শর্টকোর্সের মাধ্যমে এবং কয়েকটি টেলিফিল্ম ও সর্টফিল্মে ক্যামেরাম্যান ও এডিটরের কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ছবি তৈরীর নেশা হয়ে যায় পেশা। অতঃপর এককভাবে পরিচালক হিসেবে নির্মাণ করলেন ‘প্রতিফল’।
‘প্রতিফল’ সম্পূর্ণভাবে সিলেটি বাংলায় তৈরী হলেও মেইনস্ট্রিমে প্রদর্শনের জন্যে তিনি সাব্টাইটেল্ ব্যবহার করেছেন। এবার আসা যাক মূল বিষয়ে। প্রথমেই ছবির পোস্টারের কথা বলতে হয়; গতানুগতিক পোস্টার নয়। বিদেশী পোস্টারের অনুকরনে একটি ভিন্ন ধরনের পোস্টার তৈরী করেছেন। সুন্দর ও আকর্ষনীয় হয়েছে পোস্টারটি। তবে স্যোশাল ফর্মে তৈরী ছবির পোস্টারে থ্রিলার ছবির ইন্ফ্লুয়েন্স প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। সামাজিক ধারার নিয়মের মধ্যে অযাচিতভাবে ক্রাইম ও সাসপেন্সের অনুপ্রবেশ দেখা গেছে। কাহিনীর গতিতে ড্রাগ ডিলিংয়ের অপরাধ ও তার প্রতিরোধের বিষয়টি চমৎকারভাবে উঠে এসেছে; কিন্তু সিকোয়েন্সের লিংক লাইন-আপে গভীরতা কনটিনিউ করেনি।
পরিচালক যতই বলতে চেয়েছেন ‘প্রতিফল’ একটি ক্রাইম ছবি; কিন্তু সমাজ জীবনের প্রেম ভালোবাসা, হাসি কান্না ও দুঃখ বেদনার আবেদন দেখে মনে হয়েছে এটি নিছক একটি সামাজিক ছবি।
সোশ্যাল ও ক্রাইম এলিমেন্টের সংমিশ্রনে চিত্রনাট্য গাঁথা হয়েছে ঠিকই; তবে দর্শকের দৃষ্টিকে ক্রাইমের দিকেই জোর করে টেনে নেওয়া হয়েছে বেশি। এটি করে না হয়েছে সামাজিক ফর্মের ছবি; না হয়েছে ক্রাইম ফর্মের ছবি। মনে হয়েছে পরিচালক ইচ্ছে করেই ইন্ডিভিজ্যুয়াল সিকোয়েন্সগুলিকে বিভিন্ন দিকে টার্ণওয়েভ করে, দর্শককে কন্ফিউজ্ড করার চেষ্টা করেছেন। আমার ব্যক্তিগত মুল্যায়ন হচ্ছে, ‘প্রতিফল’ একটি স্যোশাল ক্রাইম ছবি।
মিসবাহুল সুরত কয়েকটি সত্য ও বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি এক্সপেরিমেন্টাল ছবি তৈরী করতে চেয়েছেন যার রেজালট স্পষ্টতই ‘প্রতিফল’ ছবিতে দেখা গেছে। নতুন পরিচালক হিসেবে মিসবাহুল সুরতের কিছু ঘাটতি তো অবশ্যই থাকবে সেটি মেনে নেয়া উচিৎ। তবে সম্পূর্ণ ছবিতে ক্যামেরা ও এডিটিং-এর কাজ করে তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ জন্যে অবশ্যই তিনি প্রসংশা লাভের দাবীদার। মোট কথা যেকোনো পেশাদার চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদকের সাথে তার তুলনা করা চলে।  
‘প্রতিফল’ টেলিফিল্মের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বয়ং পরিচালক মিসবাহুল সুরত। অন্যান্য অভিনেতা অভিনেত্রীরা হলেন, নুরুল আমিন, রঞ্জনা চৌধুরী, শার্লী রানি, শাহ্ সুহেল আমিন, আব্দুল কালাম, আফসার হোসেন, বদিউল আলম, সুলেমান মিয়া, ইলিয়াস হোসেন, আলী হায়দার, হারুন মিয়া, মিমি আহমেদ, সনিয়া ইসলাম, আলী হাসান, শাহেদ আহমেদ, কাইসার মিয়া, আন্হার আলী, রায়হান জামান, বায়েজীদ হাসান মিয়া, আশরাফ হোসেন, রনি, শাকিল, মারজান্ হায়দার, আজিজুর রহমান, লাইলা মিয়া, গৌরী পাল, বিধান দে’ এবং শঙ্করী দে’। আবহ্সঙ্গীত সংমিশ্রণ করেছেন ইব্রার টিপু। চিত্রগ্রহণে সহযোগিতা করেছেন হারুন মিয়া ও রম্য রহিম।
সকল অভিনেতা অভিনেত্রী ও কলাকূশলীর ভুলভ্রান্তির চুলচেরা সমালোচনা না করে সংক্ষেপে বলতে হয়; প্রধান নারী চরিত্রে রঞ্জনা চৌধুরীকে যথেস্ট ক্যামেরাফ্রি বলে মনে হয়েছে। অন্য কোনও সিকোয়েন্সে তেমন ভালো অভিনয় না করলেও সন্তান হারানোর পরে পাগলপ্রায় মা হিসেবে খুবই ভালোই করেছেন। দ্বিতীয় নারী চরিত্রে শার্লী রানি নায়কের কাছে বার বার প্রেম প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরের অংশে অভিনয় খারাপ করেননি।
তৃতীয় নারী চরিত্রে শঙ্করী দে অসুস্থ হয়ে জীবনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ মায়ের ভূমিকায় খুবই মানানসই। যদিও মনে হয়েছে তিনি অভিনয় করেননি; কিন্তু মেক্আপ ও এ্যাট্মোসফিয়ারের কারণে তার অভিব্যক্তিতে অভিনয় ফুটে উঠেছে। রেস্টুরেন্টের শেফের চরিত্রে নুরুল আমিনের অভিনয় মোটামুটি হলেও শেষ দৃশ্যে গুলি খাওয়ার পর তার এক্সপ্রেশন ভালো ছিলো। তবে মেক-আপের ব্যাপারে নুরুল আমিনকে উদাসীন মনে হয়েছে; যা হওয়ার কথা নয়।
পিতৃহত্যার প্রতিশোধ মনে ধারন করে অভিনেতা হিসেবে মিসবাহুল ইসলাম সুরতের চরিত্রটি সর্বক্ষণ ছিলো হিংস্র। শুধুমাত্র প্রেমিকার উপস্থিতির সময় হিংস্রতার আড়ালে তাঁকে কোমল মনে হয়েছে। যেমন প্রীতির ভালোবাসাকে উপেক্ষা করলেও রায়হানের অবচেতন মন, তাকে এক প্যাকেট চকলেট্ উপহার দিতে কিন্তু ভুল করেনি। যদিও চিঠির মাধ্যমে নেতিবাচক প্রেমের কথা লিখেছিলেন ”ইউ ডোন্ট নো মি; সো ডোন্ট স্পয়েল ইয়োর টাইম।”
অন্যান্য চরিত্রের অভিনেতাবৃন্দ; শাহ্ সুহেল আমিন, ইলিয়াস আলী, আব্দুল কালাম, হারুন মিয়া ও আফসার হোসেন গতানুগতিক অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা তা ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি। আরো ভালো করতে পারতেন। অভিনয়ের ব্যাপারে সবার আরো বেশি করে সচেতন ও নিষ্ঠাবান হওয়া দরকার। ভুল কার না হয়; সবারই হয়। ভুল না করলে শেখা যায় না। পৃথিবীর তাবৎ বড় বড় অভিনেতা অভিনেত্রীরাও ভুল করেছেন। অনেকে এখনো করছেন; ভুল করে শুধরে নিচ্ছেন। সুতরাং নবীনদের ক্ষেত্রে ভুল হচ্ছে শুদ্ধির সোপান। নতুন হিসেবে নিজেদের দোষত্রুটিগুলি সংশোধন করতে পারলে, ভবিষ্যতে তারা নিখুত অভিনয় করার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা পাবেন।
পরিচালক মিসবাহুল ইসলাম সুরত কারিগরি দিক থেকে চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদক হিসেবে যথেস্ট ভালো কাজ করেছেন। বিশেষ করে রাস্তায় লো এ্যাংগেলে ক্যামেরা রেখে ওয়াইড ফ্রেমে শুধুমাত্র পায়ের সট্ নেবার সময় বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে যাওয়ার সিম্বলিক্ দৃশ্য সঠিকভাবেই শ্যূট্ করেছেন। তবে একই সট্ বার বার ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। শেষ দৃশ্যে একই ফ্রেমে অভিনেতাদের সাথে মাথার উপর পুলিশের হেলিকপ্টার ব্যবহার ভালো লেগেছে।
এককথায় বলতে হয়, ভালোমন্দ মিলিয়ে “প্রতিফল” নিঃসন্দেহে একটি পছন্দ করার মত ছবি। নির্মাতা মিসবাহুল ইসলাম সুরত ভবিষ্যতে আমাদেরকে আরো ভালো ছবি উপহার দেবেন আশা করি। আমি তার উত্তোরত্তর উন্নতি কামনা করছি।
আঞ্চলিক ভাষায় ছবি নির্মাণ প্রশ্নে মিসবাহুল ইসলাম সুরত বলেন, “আমার মাতৃভাষা সিলেটি। এই ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে আমি সিনেমা তৈরী করে যাবো। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ভাষা-সংস্কৃতি ও সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্যে আমার টেলিফিল্মে সাব্টাইটেল ব্যবহার করবো। আমার আগে অনেকেই সিলেটি ভাষায় নাটক ও সিনেমা তৈরী করেছেন, কিন্তু সেগুলো মূলধারায় দেখা যায়নি। আমি মনে করি ‘প্রতিফল’ সম্পূর্ণই একটি মূলধারা সমমানের চলচ্চিত্র। যারা আমার ছবিটি দেখেছেন তারাও নিশ্চয়ই আমার কথায় সম্মত হবেন বলে আমার ধারনা”।
লন্ডন, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯
লেখক : সাবেক চলচ্চিত্র পরিচালক।