Share |

স্পেনের কর্ডোবা : মুসলিম সভ্যতার বিবর্ণ স্মৃতিচিহ্ন

দিলু নাসের
সেপ্টেম্বরের রোদ ঝলমলে দুপুর। মালাগা থেকে ছোট বড় পাহাড় এবং পর্বতমালা অতিক্রম করে আমাদের বাস দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে স্পেনে মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ঐতিহাসিক নগর কর্ডোভা অভিমুখে। মহাসড়কের দুপাশে দিগন্তজোড়া চোখ জুড়ানো অলিভ আর কমলা বাগান। এই রাস্তা দিয়ে এর আগে আরও অনেক বার গিয়েছি আমি। আন্দালুসিয়ার সবুজাভ পথে যতোবার ঘুরেছি ততোবার মন বিষন্ন হয়েছে বিভিন্ন কারণে। এই এলাকায় মুসলমানদের হারানো ইতিহাস মনে হলেই মন ভারাক্রান্ত হয়। এর পরও বারবার আন্দালুসিয়া আমাকে টানে।
৭১১ সালে সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের জয় করা স্পেইনকে মুসলমানরা নামকরণ করেছিলেন আন্দালুসিয়া। আন্দালুস শব্দটি আরবি থেকে নেয়া যার অর্থ- গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে সবুজের সমারোহ। আর এই আন্দালুসিয়ার রাজধানী ছিলো কর্ডোবা। কর্ডোবা সিয়ারা মোরেনা অর্থাৎ মোরেনা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। এই শহর ৭১১ সালে মুসলমানের হাতে বিজিত হলেও কর্ডোবার জাজ্বল্যমান জীবন ৭৫৬-এর আগে শুরু হয়নি। সিরিয়ায় আববাসীয়দের হাতে উমাইয়াদির পতন হলে ৭৫৬ সালে উমাইয়া বংশীয় আবদ আল রহমান কর্ডোবায় তার রাজধানী সম্প্রসারিত করেন। এবং কালক্রমে এই শহরের হয়ে উঠে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্থানগুলির একটি।
যতবার আমি আন্দালুসিয়া ভ্রমণ করেছি ততবারই কর্ডোবা আর গ্রানাডার পথে পথে ঘুরে হারিয়ে গিয়েছি মুসলমানদের স্বর্ণযুগে। সেখানকার প্রাণ জুড়ানো স্থাপত্যশৈলীর উজ্জ্বল নিদর্শন আমার হৃদয় আলোড়িত করেছে।
মালাগার এক পাশে সাগর আর অন্য পাশে পাহাড়ঘেরা। আন্দালুসিয়া মুসলিম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকাকালে এর নাম ছিলো মালাকা। সাগর তীরের এই এলাকাকে বলা হয় ডর্ম্রট ঢণফ ্রমফ মানে সূর্যের উপকূল। মালাগা থাকে জিব্রা?ার পর্যন্ত গেলে এই অপরূপ উপকূলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। মালাগা থেকে গ্রানাডা অথবা কর্ডোবা যাওয়ার পথে যেসবব পর্বতমালা চোখে পড়ে সে গুলোর সৌন্দর্য ও চোখজুড়ানো। এই এলাকার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত শিল্পী সাহিত্যিক জন্ম দিয়েছে। কর্ডোবার দার্শনিক ইবনে রুশদসহ অসংখ্য নাম এখনো অম্লান। এছাড়াও মালাগার বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো এবং বিশ্ব বরেণ্য আধুনিক স্পানিস কবি লোরকা এখনো অমর। আন্দালুসিয়া যুগ যুগ ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের উর্বর ভূমি। একাদশ শতাব্দীর কবি ইবনে দারাজ আল কাস্টালীকে স্পেইন এখনো মহাকবি বলে সম্বোধন করে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ পর্বতমালা সিয়ারা নাভাডা (তুষার আবৃত পর্বতপুঞ্জ)।
এর গুহায় এক সময় অসংখ্য জিপসির বসবাস ছিলো। লোরকার যৌবন কেটেছে সেইসব জিপসির সাথে। এদের জীবন নিয়ে লেখা লোরকার জিপসি লোকগাঁথা বিশ্ব সাহিত্য আলোকিত করেছে। রাস্তার পাশে পর্বতমালার পাদদেশে দিগন্তজোড়া সবুজাভ গভীর অরণ্য। আর এই অরণ্যে ১৯৩৬ সালের ১৯ আগস্ট রাতের অন্ধকারে বিরল কাব্য ও নাট্য প্রতিভার অধিকারী কবি লোরকাকে ফ্রাঙ্কোর সৈন্যরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলো।
দুপুরের ঝলমলে রোদে এই সবুজাভ অরণ্যকে আমার কাছে লোরকার তপ্ত রক্তের মতো লাল মনে হয়। গাড়ির জানলা দিয়ে তাকাতে তাকাতে আমার দুচোখে ঘুম জড়িয়ে ধরে আমি আর তাকাতে পারিনা। শুধু প্রাণে বাজে লোরকার পংক্তি মালা-

ঘুম দেবো আমি এক মুহূর্ত
এক মুহূর্ত এক মিনিট
এক শতাব্দী
কিন্তু সবাই জেনে রেখো আমি এখনও মরিনি।

গাড়ির ঝাঁকুনিতে একসময় ঘুম ভেঙ্গে যায় চেয়ে দেখি কর্ডোবা আর আর বেশি দূরে নয়। আবারও লোরকার কবিতা মনে পড়ে।

হায়- কি দীর্ঘ এ পথ!
হায়- সাহসী আমার ঘোড়া!
হায়- দেখো মৃত কেমন অপেক্ষায় আছে
কবে আমি পৌছাবো কর্ডোবা
একাকী সুদূর কর্ডোবা।

আমরা যখন কর্ডোবা বাস স্টেশনে এসে পৌঁছলাম তখন বেলা দুটো বাজে। আমরা মানে আমি, বন্ধুবর রুবেল (ব্লুস্টোন ট্রেভেলসের স্বত্বাধিকারী) এবং আরও কয়েকজন। আমি এখানে এর আগে কয়েকবার আসলেও এবার এসেছি টুর ব্লুস্টোনের ট্যুর গ্রুপ নিয়ে। তাই সবাইকে ঘুরে দেখানোর দায়িত্বটা আমার উপরে। বিকেলে আবার বাসে তিন ঘন্টার পথ গ্রানাডায় ফিরতে হবে। তাই বাস থেকে নেমেই টেক্সি নিয়ে কর্ডোবার বিখ্যাত মসজিদের দিকে আমরা ছুটলাম। স্পেনের বেশিরভাগ শহরে দোকানপাট অফিস স্কুল প্রতিদিন দুপুর থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। তাই রোদ ঝলমলে দুপুরে রাস্তা ঘাটে লোকজন নেই বললেই চলে। তবু আমি রাস্তায় সারি সারি খেজুর আর কমলা গাছের দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকি। আমার কানে আসে ঘোড়ার গাড়ির খটখট আর চোখে ভেসে উঠে হাজার বছর আগের কর্ডোবা।
আহা রে কর্ডোবা! একদিন এই শহরকে বলা হতো ইউরোপের বাতিঘর। জ্ঞানী বিজ্ঞানীর পদচারণায় মুখরিত ছিলো এই শহরের অলিগলি। জ্ঞানবিজ্ঞানে কর্ডোভার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। এই নগরীর প্রত্যেক নরপতিই ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞানসেবক। জ্ঞানবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কর্ডোভাই ছিল ইউরোপের পথপ্রদর্শক। প্রখ্যাত মুসলিম ভূগোল বিশারদ ইয়াকুত আল হামাবির মতে, কর্ডোভা ছিল গোটা আন্দালুসের প্রাণকেন্দ্র।
ইউরোপের অনেক শহরে তখনও সভ্যতার আলো পৌঁছেনি। ইউরোপের গণ-গ্রন্থাকার গুলো যেখানে বইয়ের অভাবে হাহাকার করছিল, সেখানে বিদ্যানুরাগী কর্ডোবার সুলতান হাকাম প্রচুর অর্থ ব্যয় করে শত শত লোক নিয়োগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং শহর থেকে প্রায় ছয় লক্ষ মূল্যবান এবং দু?্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং মহানগরী কর্ডোভাতে বিশাল এক গ্রন্থাকার স্থাপন করেছিলেন।
অন্ধকার ইউরোপে তৎকালীন আন্দালুসিয়া (স্পেন) ছিল আলোকবর্তিকাস্বরূপ। শিক্ষাব্যবস্থা ছিল খুবই উন্নত। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল এবং আবিষ্কার ও উদ্ভাবনীতে ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। কর্ডোভার বিশাল বিজ্ঞানাগারে ছাত্রদেরকে আধুনিক যন্ত্রের মধ্যমে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণ শিক্ষা দেওয়া হত।
সাধারণ মানুষের পড়ার জন্য সরকারীভাবে শুধুমাত্র কর্ডোভা নগরীতেই সতেরটি বিশাল গণ-গ্রন্থাকার ছিল এবং গ্রন্থাগারের সাথেই পাঠকদের জন্য ছিল আধুনিক মানসম্পন্ন রিডিং রুম। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেওয়া বেসরকারি গণ-গ্রন্থাকারও ছিল প্রচুর। তথাপি ব্যক্তিগত লাইব্রেরী তো ছিলই।
শুধুমাত্র কর্ডোভাতেই ছিল বত্রিশটি কলেজ এবং ৫০০টি উচ্চ মানসম্পন্ন স্কুল। মহানগরী গ্রানাডাতেও ২০টি কলেজ এবং বহু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আন্দালুসিয়ার সুলতানরা এতই শিক্ষানুরাগী ছিল যে, যেই নতুন সুলতান হতেন তিনি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতেন। শিক্ষার জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তি হতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তিগণ পর্যন্ত স্ব-স্ব সম্পত্তির অধিকাংশ ওয়াকফ এবং অসিয়ত করে যেতেন। তৎকালে যে ব্যক্তি বাড়িতে ছাত্র জায়গীর (লজিং) এবং লাইব্রেরী না রাখতেন, তিনি অশিক্ষিত ও নীচ হিসেবে বিবেচিত হতেন এবং সমাজে উপহাসের পাত্র হতেন। উল্লেখ্য, বালিকা এবং বালিকাদের জন্য স্বতন্ত্র স্কুল এবং কলেজ বিদ্যমান ছিল।
খলিফা হাকামের সময় প্রায় তিন লক্ষ ছাত্র এবং ছাত্রী কর্ডোভাতে অধ্যয়ন করত। ভূগোল শিক্ষার জন্য গোলক (ঐফমঠণ) এবং মানচিত্র ব্যবহৃত হতো। কর্ডোভার মানমন্দিরে (ৃঠ্রণরশর্টমরহ) বহুসংখ্যক নতুন যন্ত্র সংগৃহীত এবং নির্মিত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আগমন করতেন;
জ্যোতির্বিদ্যার আলোচনা এবং নক্ষত্রাদির গতি নির্ণয় করতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০০ টি তারকার আরবি নামকরণ করেছিলেন।
ঘটিকা-যন্ত্রের দোলক এবং টেলিগ্রামের উদ্ভাবন এখানেই সর্বপ্রথম হয়। এখানেই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে ৩২ ফুট উঁচু পর্যন্ত পানি উত্তোলন করা হয়।
কর্ডোভাতে চিকিৎসাবিদ্যা আশাতীত উন্নতি লাভ করেছিল। পরে চিকিৎসা-শাস্ত্রের ভেষজ-তত্ত্ব রোগ-নির্ণয় এবং শরীর-বিদ্যার নানাবিধ অজ্ঞাত এবং দুর্জেয় তত্ত্ব এখানে আবিস্কৃত হয়।
একাদশ শতাব্দীর সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসক আবুল কাশেম এখানেই অস্ত্র-চিকিৎসার উপর অবদান রেখে ছিলেন। তাঁর অস্ত্র-চিকিৎসার পদ্ধতি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত। তাঁর কিছুদিন পরে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসক ইবনে জোহরের আবির্ভাব ঘটে এখানেই। তিনি বিভিন্ন ধরনের প্রকারের ঔষধ এবং অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলেন। আন্দালুসিয়ার সার্জনরা প্রায় ২০০টি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতেন। শুধুমাত্র চোখের রোগ নির্ণয়ে ১৩০টি যন্ত্র করা হতো।
প্রসিদ্ধ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইবনে বতহেরের জন্ম এখানেই। তিনি ঔষধসংক্রান্ত গাছ-গাছড়ার পরীক্ষার জন্য এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশ ভ্রমণ করেছিলেন এবং ভেষজ ঔষধ সম্পর্কিত বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সুপ্রসিদ্ধ ইহুদী চিকিৎসক হাসেদাইও কর্ডোভার আবিষ্কার। প্রসিদ্ধ দার্শনিক ইবনে রুশদ (ইশণভরম্রণ) আজ ইউরোপের গৌরবস্তম্ভ। ইউরোপের আধুনিক দার্শনিকগণ প্রায় সকলেই ইবনে রুশদের নিকট ঋণী। সক্রেটিস এবং এরিস্টটলের দর্শন তত্ত্বের তিনিই সর্বপ্রথম জ্ঞানগর্ভ বিস্তৃত সমালোচনা করে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
আরবী সাহিত্যে এবং ইতিহাস রচনায় আন্দালুসিয়া চরম উন্নতি লাভ করেছিল। ইতিহাস লেখা হত খুবই পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে। স্পেনের ইতিহাস নিয়ে ৭০ খন্ডে রচিত বিশাল গ্রন্থ আজো মাদ্রিদ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
সঙ্গীত এবং কবিতা কর্ডোভাতে সম্যকরূপে পুষ্টি লাভ করেছিলো। পৃথিবীতে সঙ্গীত এবং কবিতার এমন হুড়াহুড়ি ইতিপূর্ব্বে আর কোথাও দেখা যায়নি। ভৃত্য এবং কৃতদাসগণ পর্যন্ত কবিতার আলোচনা করতেন।
প্রযুক্তিতে ইউরোপ অনেক উন্নতি করলেও, সৌন্দর্য, স্থায়িত্ব এবং দৃঢ়তায় আন্দালুসিয়ার রাসায়নিক শিল্প এখনও তাদের কাছে বিস্ময়। বস্ত্র শিল্প এখানে চরম উন্নতি লাভ করেছিল। রেশম কাপড় বোননে আন্দালুসিয়া পৃথিবীকে বিমুগ্ধ করেছিল। এখানে রেশমের নানা ধরনের সূক্ষ্ম এবং মসৃণ বস্ত্র প্রস্তুত হত এবং ইউরোপের খ্রিস্টান রাজধানীগুলোতে রপ্তানি করা হত। পঞ্চম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালকে ইউরোপের অন্ধকার যুগ বলা হয়। কিন্তু সেই অন্ধকার যুগে ইউরোপকে আলোকিত করেছিলেন মুসলমানরা। আটশ বছর আন্দালুসিয়া ছিলো মুসলিম সম্রাজ্যের অন্তর্গত। কিন্তু দূর্ভাগ্য একদিন সেখান থেকে তাদেরকে বিতাড়িত হতে হলো।
কিন্তু তাদের গৌরবময় কীর্তি শিল্পময় কারুকার্য আর জ্ঞানী-গুণীদের পদচি? খুঁজতে এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যাপকসংখ্যক মানুষ এসে কর্ডোবায় ভীড় জমান।
বাস স্টেশন থেকে প্রায় দশ মিনিট সময় লাগলো আমাদের গন্তব্যে পৌছাতে। হাজার বছর আগের নান্দনিক স্থাপত্যগুলোতে চোখ পড়তেই বুক হু হু করে উঠলো। টেক্সি থেকে যেখানে আমরা নামলাম সেখানে বেশ কিছু খেজুর এবং কমলা এবং ডালিমবৃক্ষ পুরনো স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ফেরাতেই দেখি পুরোনো অট্টালিকার সামনে বই হাতে দাড়িয়ে আছেন দার্শনিক ইবনে রুশদ। যিনি পাশ্চাত্যে এভেরোস- ইশণররমণ্র’ নামে পরিচিত। তাঁর প্রকৃত নাম আবুল ওয়ালিদ মোহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে রুশদ। ১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে এই নগরীর একটি অভিজাত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ স্পেনের রাজনীতিতে বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর পিতামহ ছিলেন কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি। এছাড়া তিনি কর্ডোভা জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং মালেকী মাজহাবের একজন প্রখ্যাত পণ্ডিতও ছিলেন।
ইবনে রুশদ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সুফি সাধক। কথায় ও কাজে ছিলেন আল্লাহপাকের এক অনুগত বান্দা। বাল্য ও কৈশোরে তিনি কর্ডোভা নগরীতে শিক্ষাগ্রহণ করেন। তিনি যে সকল শিক্ষকের নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন তাঁদের দুজন হলেন ইবনে বাজা এবং আবু জাফর হারুন। জ্ঞান সাধনার প্রতি তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ। তিনি তাঁর মেধা ও প্রতিভার বলে খুব কম সময়ের মধ্যেই কোরআন, হাদীস, বিজ্ঞান, আইন, চিকিৎসা ও তাঁর পাণ্ডিত্য ও কর্মদক্ষতার সুনাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে তাঁকে তাঁর চিকিৎসার খ্যাতি ও বুৎপত্তিতে মুগ্ধ হয়ে সুলতান আবু ইয়াকুব ইউসুফ ১১৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে তোফায়েলের মৃত্যুর পর তাঁকে রাজচিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ করেন এবং পরবর্তীতে ইয়াকুবের পুত্র সুলতান ইয়াকুব আর মনসুরও ইবনে রুশদকে রাজচিকিৎসক পদে বহাল রাখেন। এরূপ রাজকীয় পদমর্যাদা ও প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও এ মহান মনীষী ভোগবিলাসের মধ্যে ডুবে যাননি। সরকারি বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর তিনি জীবনের অবসর সময়ে মানুষের কল্যাণে জ্ঞানসাধনা, দর্শন, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করতেন।
কথিত আছে, তিনি বিবাহ ও পিতার মৃতু্যুর রাত্রি ব্যতীত আর কোন রাত্রিতেই অধ্যয়ন ত্যাগ করেননি। ইবনে রুশদ কখনো অন্যায় ও অসত্যের সামনে সত্য ও ন্যায়কে প্রকাশ করতে ভয় করতেন না। তিনি তাঁর দর্শন ও ধর্মীয় বিষয়ে বলিষ্ঠ মতবাদ ব্যক্ত করতেন। এতে কখনো কখনো সুলতানরা তাঁর নির্ভীক ও স্পষ্ট মতবাদে বিরক্ত ও ক্রোধান্বিত হয়ে উঠতেন। অপরদিকে খ্রিষ্টান পাদ্রীরা প্রচার করেন, “তাঁর নাম পাপের প্রতিশব্দ”। অবশেষে সুলতান ইয়াকুব আল মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। এতেও সুলতান সন্তুষ্ট হলেন না। ১১১৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান তাঁকে কর্ডোভার নিকটবর্তী ইলিসাস নামক স্থানে নির্বাসন দেন এবং তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক ইবনে রুশদ চরম অপমান ও আর্থিক দুরবস্থায় পতিত হন। ১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান তাঁর ভুল বুঝতে পেরে লোক পাঠিয়ে ইবনে রুশদকে ফিরিয়ে আনেন এবং পূর্বপদে পুনর্বহাল করেন। কিন্তু তিনি এ সুযোগ বেশিদিন ব্যবহার করতে পারেননি। ১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দে এ মুসলিম মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন।
রুশদের ভাস্কর্র্যের সামনে আমরা ছবি তুলে সামনের দিকে এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিতেই চোখ পড়লো রোমান গেইট এবং বিখ্যাত নদী গোয়াদ আল কিবির। কিবির আরবি শব্দ। এর অর্থ ভেজা স্থান গোয়াদ মানে বৃহৎ। ইতিহাসে আছে তারিক ইবনে যিয়াদের সৈন্যরা কর্ডোবার কাছে আসলে তারা এই নদীটি দেখে বলে উঠে গোয়াদ আল কিবির। তখন থেকেই এই নদী গোয়াদ আল কিবির নামে পরিচিত।
একটু মোড় নিয়ে বামে চোখ পড়তেই চোখে ভাসে মসজিদের সুউচ্চ মিনার। এখন সেটি গির্জায় রূপান্তরিত। তখন স্থানীয় সময় তিনটা বাজে তাই কানে আসে ঘন্টা ধ্বনি। এর নাম হয়েছে এখন মাজকিটা। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ।আর আমি গুম্বুজের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে ভাবছি -হাজার বছর আগে এখানে মুয়াজজিনের আজানের স্বর ধ্বনিত হতো। সে আজান শুনে রাজা বাদশা এবং সাধারণ মানুষেরা নামাজের জন্য ছুটে আসতো! এটা শুধু মসজিদ ছিলোনা এখানে ছিলো রাজ দরবার বিচারালয় গ্রন্থাগার বিশ্ববিদ্যালয়। আজ কিচ্ছু নেই। কেবলই ধুসর স্মৃতি চি?।
মসজিদটির প্রথম কাজ শুরু করেন আবদ আল রহমান প্রথম ৭৮৫ সালে। আব্দুল আল-রাহমান দ্বিতীয় ৮৪৮ সালে এর পরিবর্ধন করেন এবং আবারো আল হাকাম দ্বিতীয় ৯৬১ সালে এবং আল মানযার ৯৮৭ সালে শেষবারের মতো এর পুর্নর্বার পরিবর্ধন করেন। মোট চার বারে মসজিদটির স্থাপনা কাজ সম্পন্ন হয়। বলা হয়ে থাকে, মসজিদটির নকশা-পরিকল্পনা করেছিলেন বিখ্যাত এক সিরীয়ান মুসলিম স্থপতি। এভাবেই ইউরোপের বুকে প্রথমবারের মতো জন্ম নেয় সবচাইতে সুন্দর এবং বৃহৎ মসজিদ।
২৩ হাজার বর্গমিটারের মসজিদটিতে রয়েছে ৮৫৬টি স্তম্ভ, বর্তমান একটি প্রবেশদ্বার ও বহির্গমন দ্বার থাকলেও পূর্বে ১১টি প্রবেশ পথ আর ৯টি বহির্গমন পথ ছিলো। এখন এগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাথর, সোনা ও রূপা দিয়ে তৈরি হয়েছে মোজাইক, এছাড়া গ্রানাইট আর মার্বেল পাথরের সমন্বয়ে করা হয়েছে স্তম্ভগুলো, যা লাল আর সাদা রঙের এক অভূতপূর্ব নান্দনিক সৌন্দর্যের রূপ মেলে ধরে। আমরা যখন মসজিদের বিশাল আঙিনায় এসে ঢুকলাম তখন ভেতরে ঢোকার জন্য বহু মানুষের ভীড়। আমরা আশেপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। পুরনো দেয়ালে এবং বন্ধ দরজাগুলোতে লেখা পবিত্র কোরানের আয়াত এবং আরবি কবিতাগুলো এখনো ঝলমলে। ঘুরতে ঘুরতে দীর্ঘশ্বাস আর বেদনা অনুভব ছাড়া কিছুই করার ছিল না! ভিতরে গুমরে উঠছিলো না বলা অনেক কথা! চোখও যেনো বাঁধ মানতে চাইছিলা না আর! চারপাশের স্তম্ভগুলো থেকে ভেসে আসছিলো সেই মুসলিম শ্রমিকদের রক্ত আর ঘামের শ্রমে গড়ে তোলা এই সুউচ্চ প্রাসাদের কান্নার করুন আর্তনাদ!
ভেতরে না ঢুকলেও বাইরে থেকে ভিতরের বেশ কিছু অংশ দেখা যায়। ভেতরে জ্বলছিলো মৃদু আলো। সামনের দিকে তাকাতেই চোখ পড়লো লাল আর সাদা মার্বেল পাথরের সমন্বয়ে গড়া স্তম্ভ যা উপরের দিকে ঢেউ খেলানো এক বিশেষ জ্যামিতিক মাপ আকারে পুরো মসজিদ জুড়ে আছে।
উপরের দিকে যতটুকু চোখ যায় ছাদে রয়েছে উচ্চতর জ্যামিতিক কারুকার্য। ভেতরে স্তম্ভগুলো ছাড়া ভেতরের বেশিরভাগই এখন আর মসজিদের আদলে নেই এটাকে গীর্জায় রূপান্তরিত করার কারণে এখানে এখন যীশুর ছবিসহ আরও অনেক খৃষ্ট ধর্মীয় ছবির সমাহার।
যে মুসলমানদের হাতে প্রজ্বলিত জ্ঞানের শিখায় স্পেন হয়ে উঠেছিলো সূর্যকরোজ্জ্বল ভূমি, তৈরী করেছিলো বিদ্যাশিক্ষার তীর্থস্থান এই স্থান আজ মুসলিমদের চাপা কান্না, রুদ্ধ শ্বাস আর শোকের ছায়ায় স্তব্ধ! তাই কর্ডোবা মসজিদের দেয়ালের দিকে তাকালে চোখে ভাসে শুধু অশ্রু আর বিলাপ ধ্বনির নীরব জলপাত।
১৯৮৪ সাল থেকে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ইউনেস্কোর ওয়ার্? হ্যারিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তাই এই প্রাঙ্গন প্রতিদিন সাদাকালো আর বাদামী মানুষের পদচারণায় মুখরিত।
কর্ডোবার সোনালী যুগের অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা দুপুরে খাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ছিলাম। হঠাৎ গীর্জায় বিকেল ৫টার ঘন্টাধ্বনি শুনে আমাদের চেতনা ফিরে আসে। আমরা তাড়াহুড়া করে মসজিদ প্রাঙ্গন থেকে বেড়িয়ে আসি।
পুরনো ইটের রাস্তা মাড়িয়ে যেখানে এসে দাঁড়ালাম ঠিক সামনেই গোয়াদ আল কিবির নদীর রোমান সেতু। বিকেলের সোনা রোদে নদীতীর আলোকিত আর এই আলো মুসলিম সম্রাজ্যের গৌরবোজ্জল ধুসর ইমারত গুলোতে পড়ে যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। এই অপরূপ দৃশ্যে আমার চোখে জমে লবনের পাহাড়। আমি আর তাকাতে পারিনা। হৃদয়ে ঝরে বিষাদ বৃষ্টি। হাজার পা’য়ে যেখানে গিয়েছিলাম সেখান থেকে এক পা’য়ে গাড়িতে উঠে বাস স্টেশনের দিকে রওয়ানা হই। পিছনে পড়ে থাকে লা মেজকুইটার বিবর্ণ স্মৃতিচি?। যেতে যেতে মনে পড়ে আল্লামা ইকবালের কবিতা-

শিল্পীর মহান কাবা! সমুজ্জ্বল ধরমের মণি!
তোমা তরে আন্দালুস মক্কাসম মণিময় খনি!
থাকিলে আকাশতলে সুষমার নজির তোমার,
মুসলিম অন্তরে শুধু, নাহি নাহি, নাহি কোথা আর!
খোদার সেনানি অই অশ্বারোহী আরব-বাহিনী,
‘মহাপ্রাণ অধিকারী’, প্রত্যয়ের প্রতীক-কাহিনী!
যাঁদের শাসনে ব্যক্ত শাসনের নিগূঢ় নিদান;
‘ভোগের বিলাসে নহে, বিতৃষ্ণায় বাদশাহী শান’
পুরব-পশ্চিমে যারা দিয়েছিল দৃষ্টি দীপ্তিমান,
আঁধার ইয়রোপে যারা দিয়েছিল পথের সন্ধান!
তাঁদের শোণিত-ধারে আন্দালুস আজো খোশ্িদল
অতিথিবৎসল আর সকলের সঙ্গে রাখে মিল।
আজও হেথা বিরাজিত হরিণীর চঞ্চল নয়ন,
চিঠির বাণেতে যার বিদ্ধ বটে প্রেমিক পরাণ!
আজিও বাতাসে তার ইয়েমেনের সুরভি বাতাস!
আজিও সঙ্গীতে তার হেজাজের সুরের বিলাস!