Share |

আব্দুল মোমেন : অন্তরে যার কবির ভাষা, কণ্ঠে প্রতিবাদ

এথনি নাইটেঙ্গল
অধ্যাপক আব্দুল মোমেন ১৯৩৮ সালের ২২ অগাস্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন। বেশ কয়েক বছর ডেমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) রোগে ভোগার পর এ বছরের ৩১ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং কমিউনিটির তৃণমূল আন্দোলনে জীবনভর মোমেন যে কাজ করে গেছেন, ক্রমশ দুর্বল করে দেওয়া এই রোগ তাঁর সেই কাজকে কখনও ছাপিয়ে যেতে পারেনি। ১৯৭৬ সালে আমি যখন ‘কেমডেন কমিটি ফর কমিউনিটি রিলেশন্স’ এর এডুকেশন অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হই, তখনই মোমেনের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত হয়। কিংস ক্রস স্টেশনের বিপরীতে চারতলা একটি ভবনের উপর তলায় একই ছাদের নিচে একটা অফিস রুমে আমরা দুজনে ভাগাভাগি করে বসতাম। প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার আগে তিনি উইলিয়াম ব্লেইকের কবিতা থেকে দু’একটি চরণ আবৃত্তি করে শুনাতেন। তাঁর পিএইচডি’র বিষয় ছিল উইলিয়াম ব্লেইক, যা তাঁর শেষ করা হয়নি। কেমডেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য তাঁর কর্মকাণ্ড ছিল সর্বব্যাপী।  
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতেন মোমেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ তখন বসবাস করতেন একসঙ্গে অনেকে থাকেন এমন (মা?ি-অকুপেশনাল) জীর্ণ আবাসনে; সেন্ট্রাল লন্ডনের ক্যাটারিং ইন্ডাস্ট্রিতে কম মজুরিতে লম্বা সময় কাজ করত; এবং কর্মক্ষেত্র ও রাস্তা-ঘাটে বর্ণবাদী আচরণের সম্মুখীন হত। বাংলাদেশিরা যাতে আরও ভালো আবাসনে বসবাস করতে পারে তা নিশ্চিত করতে মোমেন কেমডেন কাউন্সিলের সাথে অক্লান্তভাবে কাজ করতেন। ১৯৮৪ সালে ভয়াবহ পরিবেশের এক বেড-এন্ড-ব্রেকফাস্ট আবাসনে রাতের আগুনে পুড়ে দুই শিশুসহ মৃত্যুবরণ করেন এক বাংলাদেশি মহিলা। সেই ঘটনার প্রতিবাদে তিনি টাউন হল দখল কর্মসূচির ডাক দেন। তিনি সমবায় সমিতির ভিত্তিতে রেস্টুরেন্ট চালুর উদ্যোগ নেন, যার আওতায় প্রথম রেস্টুরেন্ট ছিল ‘লাস্ট ডেইজ অফ দি রাজ’। এই ধারাবাহিকতায় ‘রেড ফোর্ট’সহ আরও কিছু রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরুষ লোকদের এমন অসংখ্য ইমিগ্রেশন সমস্যা নিয়ে তিনি আইনজীবীদের সাথে কাজ করেছেন যারা তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ থেকে আনার চেষ্টা করছিলেন। শিশুদের জন্য স্কুলে আসন খুঁজে বের করার জন্য ‘ইনার লন্ডন এডুকেশন অথরিটি’-এর সাথে তদবির করতে আমি তাঁর সাথে কাজ করেছি। এসব শিশু দেশ থেকে আসার পর স্কুলে আসন পেতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও অপেক্ষা করেছে, বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটসের ফ্যামিলি ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত আরগাইল স্কয়ারের বেড-ব্রেকফাস্টে বসবাসকারী শিশুরা। শিশুরা স্কুলে যাওয়া-আসার পথে যে হয়রানির শিকার হত, তা নিয়ে আমরা স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সাথে কাজ করেছি। খাদ্য-প্রস্তুত শিল্প এবং পোশাক শিল্পের বাইরে তরুণেরা যাতে অন্য পেশায় কর্ম-অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারে, সে লক্ষ্যে একটি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায়ও আমরা একসাথে কাজ করেছি।   
শিশুদের আসার আগে দেশে তাদের শিক্ষার অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করতে আমি যখন সিলেট পরিদর্শনে যাই, তিনি আমাকে ওই অঞ্চলের উত্তরাংশের একটি স্কুল রেজিস্টারে দুই শিশুর নাম আছে কিনা তা যাচাই করার জন্য একটি মিশনে পাঠিয়েছিলেন; কর্তৃপক্ষের সাথে এই দুই শিশুর অস্তিত্ব নিয়ে কিছু দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু তিনি যদি তাঁর সুগভীর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে আমার সাথে ভাগাভাগি না করতেন, তাহলে হয়তো আমার টাওয়ার হ্যামলেটস ট্রেনিং ফোরামের পরিচালক হওয়া হতো না। আমার বাংলাদেশি পোশাক কর্মীদের জন্য কর্মশালার উদ্যোগ নেওয়া এবং ব্রিকলেনের আশপাশের উদীয়মান তরুণদের সংগঠনগুলোর জন্য কাজ করা হয়ে উঠতো না; চাই? মাইগ্রেশন বিষয়ে আমি সম্প্রতি (২০১৯) যে পিএইচডি করেছি, তাও সম্পন্ন করতে পারতাম না। অন্যরাও একইভাবে মোমেনের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত হয়েছেন।  
আমি কেমডেন ছেড়ে আসার পরও অনেক বছর মোমেন সেখানে ছিলেন। সে সময়ের কথা অন্যরা ভালো বলতে পারবে। তিনি গ্রিনিচ ইউনিভারসিটি এবং লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভারসিটিতে ইয়ুথ এন্ড কমিউনিটি ওয়ার্ক বিষয়ে শিক্ষকতা করে কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেছেন। কেমডেনের বাইরেও ব্রিটিশ বাংলাদেশিসহ অন্য কমিউনিটির মানুষ এবং সংগঠনের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন আব্দুল মোমেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে রাজন উদ্দিন জালাল বলেছেনঃ “বাংলাদেশি কমিউনিটির কঠিন সময়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য পাওনা আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন” আব্দুল মোমেন। বিগত বছরগুলোতে আমি তাঁর সাথে মাঝে-মধ্যে যোগাযোগ রেখেছি। কিন্তু তাঁর সাথে আমার সবচেয়ে ভালো মুহূর্তগুলো ছিল তখন, যখন তিনি ঝাপসা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কবিতার চরণ শোনাতেন; এবং যখন আমরা বেঙ্গলি ওয়ার্কার্স একশন গ্রুপের মিছিলের জন্য একসাথে বর্ণবাদবিরোধী ব্যানারের ডিজাইন তৈরি করতাম।   
মোমেনের মৃত্যুতে অনেক মানুষ শোকাহত। এই সময়ে আমি তাঁর পরিবারের জন্য জানাই বিশেষ সমবেদনা। আমরা সবাই তাঁর কৌতুকরসবোধ, ভদ্রতা ও বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি সামাজিক ও বর্ণগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অঙ্গীকার এবং তাঁর মানবিকতার অনুপস্থিতি অনুভব করব।

লন্ডন, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০
লেখক : লেখক, চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। টাওয়ার হ্যামলেটস ট্রেনিং ফোরামের সাবেক পরিচালক ও ‘কেমডেন কমিটি ফর কমিউনিটি রিলেশন্স’-এর সাবেক এডুকেশন কর্মকর্তা।  
অনুবাদ : মুহাম্মদ আব্দুল হাই সঞ্জু