Share |

প্রিয়জন আবদুল মোমেন : বিরল চরিত্রের অধিকারী এক অসামান্য স্বাপ্নিক মানুষ

মাহমুদ হাসান
বাঙালি কমিউনিটির অত্যন্ত প্রিয়জন আবদুল মোমেন সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। এই গুণী ব্যক্তির সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং বন্ধুত্ব ছিলো। সর্বোপরি বাঙালির কমিউনিটির বিলেতে নানা সংগ্রামে তিনি আমার সহযোদ্ধা ও নেতা। তাঁর প্রয়াণে কমিউনিটি একজন প্রকৃত বন্ধু হারালো।
আমি যতটুকু জানি, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালিন যুক্তরাজ্যে লীডস ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা কাজে যোগ দেন ১৯৬৯ সালে। এরপর ৭০ দশকে সেন্ট্রাল লন্ডনের ক্যামডেনে এসে বসবাস শুরু করেন।
ক্যামডেনে তখন হাউজিং, শিক্ষা সংকট ছাড়াও বিলেতে বড় ধরনের যে সমস্যা বিদ্যমান ছিল তা বর্ণবাদী আচরণ-যা মারাত“ক পর্যায়ে ছিল, সাধারণের পক্ষে তা মোকাবেলা করাও কঠিন ছিল। ক্যামডেন টাউনেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এই সময়টিতে আবদুল মোমেন তখন তিনি চিন্তা করেন বাঙালিদের একটি সংগঠন দরকার।
ক্যামডেন কমিটি ফর কমিউনিটি রিলেশন (সিসিসিআর) নামক প্রতিষ্ঠানে আবদুল মোমেন ছিলেন সিনিয়র অফিসার। তিনি স্থানীয় বাঙালিদের সাথে তথা সেন্ট্রাল লন্ডনের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে গিয়ে বাঙালিদের সাথে তাদের নানা সংকট ও সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনি বাঙালিদের সংগঠিত করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে বেঙ্গলি ওয়াকার্স এ্যাকশন গ্রুপ (বিডব্লিউএজি) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। সভাপতি হলেন মো. এনামুল হক। আবদুল মোমেন মূল সংগঠক হলেও তিনি সংগঠনের বড় পদ না নিয়েই কাজ করতে পছন্দ করতেন এবং করলেনও তাই।
বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যদিয়ে ধীরে ধীরে সংগঠনটি শক্তিশালি হয়ে ওঠে। সংগঠন প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে ছিলো ইমিগ্রেশন সার্ভিস, ইয়ূথ সার্ভিস, হাউজিং এডভাইস, হেলথ সাপোর্ট এবং শিক্ষা সংক্রান্ত সহায়তা। এই সময় বাঙালিরা বাংলাদেশ থেকে পরিবার নিয়ে আসতে থাকেন। এসেই এসব নানা সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে তাদের। তখন সেসব সংকট সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখে সংগঠনটি।
১৯৭৯ সালে আমি ব্রিটেন আসি এবং তখন ক্যামডেনে বসবাস শুরু করি। এক পর্যায়ে তখন তার সাথে আমার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাঁর সাথে সামাজিক এসব কাজে জড়িয়ে পড়ি। কাজের ব্যাপ্তি বেড়ে যাওয়ায় ১৯৮২ সালে বেঙ্গলি ওয়াকার্স এ্যাকশন গ্রুপ তাদের কাজের সুবিধার জন্য নিজস্ব একটি ভবন পায়। সিসিসিআর-এর প্রাক্তন ভবনটিই তারা লাভ করে। ভবনটির নাম দেয়া হয় সুরমা সেন্টার। সেই বছর থেকেই আমি সুরমা সেন্টারে একনিষ্ঠভাবে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে পড়ি। ফলে আবদুল মোমেন ও সংগঠনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আরো বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখন বাংলাদেশী পরিবার কাউন্সিলের দ্বারস্থ হলে পরিবারগুলোকে বিভিন্ন হোটেলে পাঠিয়ে দিয়েই প্রাথমিক দায় সেরে নিতো। এই পরিবারগুলোকে বাসস্থান পাইয়ে দিতে সংগঠনটির ছিল নিরলস ভূমিকা। ১৯৮৪ সালে দূভার্গ্যবশত সেন্ট্রাল লন্ডনের গ্লোস্টার রোডে একটি ভবনে আগুন লাগে। বাঙালি একটি পরিবারের মা ও মেয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে তখন মারা যান।
এই ঘটনায় কমিউমিনিটি ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে ক্যামডেন টাউন হলে কাউন্সিল কর্তৃপক্ষের সাথে উক্ত সংগঠনসহ হোমলেস বাঙালি পরিবারগুলো ব্যাপকভাবে সংগঠিত হয়ে উপস্থিত হন। উপস্থিত বাঙালিরা ঘটনার জন্য কাউন্সিলকে দায়ী করে প্রতিবাদ করতে থাকে এবং দেন-দরবার শুরু করেন। তখন কর্তৃপক্ষের সাথে ঝগড়াঝাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে টাউন হল কর্তৃপক্ষ পুলিশ দিয়ে আমাদের টাউন হল থেকে বের করে দিতে চেষ্টা করে।
পুলিশ এসে আমাদের বের করে দিতে চাইলে, পুলিশকে আমাদের সমস্যার বিষয়টি অবহিত করা হয় এবং এক পর্যায়ে আবদুল মোমেন জোর গলায় বলেন, আমরা টাউন হল থেকে যাবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদর হোমলেস পরিবারগুলোর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা না করা হয়। আমরা আর বের হইনি, অবস্থান কর্মসূচী চলতে থাকে। এভাবে টাউন হল তিন সপ্তাহ আমরা দখল করে রাখি। এই সময়ের মধ্যে কাউন্সিলের সাথে দেন-দরবার এবং বিভিন্ন পর্যায়ে মিটিং করে শেষ পর্যন্ত ১১০টি পরিবারের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেই আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটে। এই আন্দোলনের নাম ছিল ‘অকুপেশন ৮৪’। এটা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই আন্দোলনের পর ক্যামডেনসহ অন্যান্য কাউন্সিল তাদের হাউজিং পলিসিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। একই সাথে বিভিন্ন এলাকায় ‘হোমলেস ফ্যামেলিজ ক্যাম্পেইন’ নামে সংগঠন গড়ে ওঠে।
এরপর নানা সময় তার সাথে ব্যক্তিগভাবে কমিউনিটির উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মশালার ব্যবস্থা করি। এরই ধারাবাহিকতায় বহু বাঙালি সংগঠন গড়ে ওঠে। বাঙালিরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং কাজের সফলতার কারণে বিডব্লিউএজি একটি আদর্শ সংগঠন হিসেবে কমিউনিটিতে মর্যাদাশীল হয়ে ওঠে।
ততকালিন সময়ে সেন্ট্রাল লন্ডনে বেশিরভাগ বাঙালিরা রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। সেই জন্য তিনি এবং তৎকালিন সিসিসিআর এর ডাইরেক্টর গুরমুখ সিংয়ের সহযোগিতায় সেন্ট্রাল লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেনে আবদুল মোমেনের উদ্যোগে একটি কো-অপারেটিভ রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রেস্টুরেন্টে কাজ করে এবং ব্যবসায়িক সাফল্যে অনেক বাঙালি উপকৃত হয়েছেন।
আবদুল মোমেন এমনই ছিলেন যে, তিনি কখনো নিজের লাভালাভের কথা ভাবতেন না। বাঙালি তথা সাধারণ মানুষের উন্নতির জন্য তার বিশেষ চিন্তাধারা ছিল, নতুন নতুন বিষয় নিয়ে ভাবতেন। যে বিষয়গুলো ছিল বাঙালিদের জীবনমান উন্নয়ন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ সরকারের নিকট থেকে অভিবাসী হিসেবে সুযোগ-সুবিধা আদায়। কমিউনিটির ন্যায্য পাওনা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস যোগানো, প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে বাঙালি সমাজকে প্রতিষ্ঠিত করতে পিছপা হননি। তাঁর এসব বহুমাত্রিক অবদান ছিল অসাধারণ। একজন প্রকৃত মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে তাঁর তুলনা হয় না। তিনি সত্যিকারের বিরল চরিত্রের অধিকারী একজন অসামান্য মানুষ ছিলেন।
আজকে বাঙালিরা নানা বিভেদ ও সংকটে বিলেতে নয়া নয়া সমস্যায় আক্রান্ত এবং ভুক্তভোগী। এই সংকটজনক সময়ে তাঁর মত দিকনির্দেশনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, সৎ ও নিষ্ঠাবান যোগ্য একজন ব্যক্তি দরকার।
এই মহান পুরুষ আমাদের বরণীয় ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন বিরল চরিত্রের অধিকারী এক অসামান্য স্বাপ্নিক মানুষ। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণা আমার এ ক্ষুদ্র জীবনেও প্রতিফলিত। এ ঋণ স্বীকার করেই বলতে চাই, আজ তাঁর তিরোধানে বেশি বেশি করে মনে পড়ছে তাকে।
লন্ডন, ৫ এপ্রিল ২০২০
লেখক : আপসেন-এর প্রধান নির্বাহী। সুরমা সেন্টারের সাবেক কো-অর্ডিনেটর ও চেয়ারম্যান।