Share |

আব্দুল মোমেন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

জামাল হাসান
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য আব্দুল মোমেনের ব্যাপক অবদান ছিল। বাংলাদেশী কমিউনিটির উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল কল্পনাতীত। তিনি ছিলেন সৎ, নিষ্ঠাবান এবং সর্বোপরী একজন সজ্জন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি। কমিউনিটির জন্য কাজ করাই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত।
যতটুকু মনে পড়ে, ১৯৭৭ সালে আমি যখন জয়েন্ট কাউন্সিল ফর দ্যা ওয়েলফেয়ার অফ ইমিগ্রান্টস (জেসিডব্লিওআই)-এ ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ করছিলাম, তখন সংস্থাটির সম্পদক ইয়ান মার্টিন জেসিডব্লিওআই-এর কার্যকরী কমিটিতে যোগদানের জন্য একজন উপযুক্ত বাংলাদেশীকে খুঁজে বের করার জন্য আমাকে বলেছিলেন। ঐ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংস্থার কার্যকরী কমিটিতে কাজ করতে আগ্রহী হবেন এমন একজন উপযুক্ত বাংলাদেশী ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর ছিল। তবে আমার মাথায় এলো আব্দুল মোমেনের কথা। আমি ক্যামডেনের মোমেন ভাইকে একজন একাডেমিক এবং কমিউনিটি এক্টিভিস্ট হিসেবে চিনতাম, আর মোমেন ভাইও আমাকে টাওয়ার হ্যামলেটসের বর্ণবাদবিরোধী এক্টিভিস্ট হিসেবে চিনতেন। তাই আমি মোমেন ভাইকে জেসিডব্লিওআই-এর ইসি কমিটিতে যোগদান করতে সম্মত করাতে পেরেছিলাম।
১৯৮০/৮১ সালে মোমেন ভাই এবং তার স্ত্রী রেজীনা বেগম রোজী সাউথহলে জেসিডব্লিওআই-এর একটি ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানেই আমি এবং আমার স্ত্রী গুলশানের সাথে রোজী ভাবীর প্রথম পরিচয় হয়। এর পর অতি দ্রুত মোমেন পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো যখন মোমেন ভাই, রোজী ভাবী, শেলী আহমেদ এবং গুলশান ক্যামডেনের ২/৩টি স্থানে এডা? ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে পরিচালিত ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার হিসেবে কাজ শুরু করলেন।
অন্যান্যদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আব্দুল মোমেন ছিলেন অদ্বিতীয়। শুধুমাত্র তার হাসিমাখা মুখই নয়, তার আকর্ষণীয় চাহনীও ছিল অন্যদের সাথে যোগাযোগের জন্য সহায়ক। তার চোখও যেন কথা বলতো। তিনি ছিলেন সৎ, নিষ্ঠাবান এবং সর্বোপরী একজন সজ্জন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি। কমিউনিটির জন্য কাজ করাই ছিল যার একমাত্র ব্রত। আমি তাঁকে সব সময় একজন ইতিবাচক মানুষ হিসেবে দেখেছি।
বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য আব্দুল মোমেনের অবদান ব্যাপক। বাংলাদেশী কমিউনিটির উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর দূরদৃষ্টি ছিল সকলের কল্পনাতীত। রেস্তোরাঁ কর্মীদের শোষণের অবস্থা দেখে তিনি একদল বাংলাদেশী রেস্তোরাঁ কর্মী নিয়ে একটি সমবায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কো-অপারেটিভের ‘লাস্ট ডেইজ অফ দ্যা রাজ‘ রেস্তোরাঁটি যাত্রালগ্নেই সুখ্যাতি লাভ করে এবং আশাতীত সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। এরপর মোমেন ভাই কর্মস্থলের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে, বিশেষ করে ক্যামডেনে বাংলাদেশীদের তীব্র হাউজিং সংকট নিরসনের লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেন। কমিউনিটিকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে এবং দাবী আদায়ের লক্ষ্যে সংগঠিত করার জন্য তিনি রেস্তোরাঁ সমবায়ের সদস্যসহ একটি বড় গ্রুপকে সহায়তা করেছিলেন বেঙ্গলী ওয়ার্কার্স এ্যাকশন গ্রুপ (বিডব্লিওএজি) প্রতিষ্ঠার জন্য। তাঁর চিন্তাপ্রসূত বিডব্লিওএজি ছিল আরও একটি বড় সাফল্য। বিডব্লিওএজির অস্থায়ী কার্যালয় হিশেবে ব্যবহারের জন্য ক্যামডেন কাউন্সিল ১নং রবার্ট স্ট্রীটে অবস্থিত ক্যামডেন কমিউনিটি রিলেশন্সের সাবেক অফিসটি বরাদ্দ দিয়েছিল। বিডব্লিওএজি পরবর্তীকালে বেঙ্গলী ওয়ার্কার্স এসোসিয়েশন (বিডব্লিওএ)-এ পরিণত হয়েছিল। বিডব্লিওএ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই এটি ক্যামডেনের একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। বেঙ্গলী হোমলেসদের সমস্যা সমাধানে ক্যামডেন কাউন্সিলকে সম্মত করানোর জন্য বিডব্লিওএ শাক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এক পর্যায়ে বিডব্লিওএ টাউন হল দখল করেছিল এবং বেঙ্গলী কমিউনিটির বিভিন্ন দাবীসমূহ না মানা পর্যন্ত এক নাগাড়ে ২১ দিন এই দখল অব্যাহত রেখেছিল। এর আগে কমিউনিটি এ্যাকশন গ্রুপ কর্তৃক এভাবে লোকাল অথরিটির অফিস দখল করার কথা অজানা ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবী ছিল বেঙ্গলী কমিউনিটির হাউজিং সমস্যার সমাধান। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দাবীটি ছিল, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাই কমিশনকে এই মর্মে একটি মুচলেকা দেয়া যে, যদি ক্যামডেনের কোন বাসিন্দার পরিবারের সদস্যরা এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স পায়, তবে তারা যুক্তরাজ্যে আসার পর বাসস্থান পাবে। কারণ, ঐ সময় যাদের পর্যাপ্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল না, তাদের এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স আবেদন ব্রিটিশ হাই কমিশন নাকচ করে দিত এবং অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে আসার আগ পর্যন্ত কোন লোকাল অথোরিটি তাদের জন্য বাসস্থান বরাদ্দ দিত না।
ক্যামডেন কাউন্সিল কর্তৃক প্রবর্তিত এই বিধানের ফলে ঐ সময় ক্যামডেনের বাসিন্দারা বাংলাদেশ থেকে তাদের পরিবার-পরিজনকে যুক্তরাজ্যে আনতে পেরেছিলেন।
বিভিন্ন প্রকল্পে একসাথে কাজ করার দারুণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন আব্দুল মোমেন। ১৯৮০ সালে আমি ক্যামডেন ল‘ সেন্টারে যোগদান করায় মোমেন ভাই খুব খুশী হয়েছিলেন। ক্যামডেন ল‘ সেন্টারে যোগদানের পর আমি অনুভব করলাম যে, অধিকাংশ বাংলাদেশী, বিশেষ করে মহিলাদের ল‘ সেন্টারে এসে এডভাইস নেয়াটা একটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ল‘ সেন্টার যাতে আউটরীচ সেশন চালাতে পারে, তার জন্য মোমেন ভাইকে জায়গা বের করতে অনুরোধ করার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এডভাইস সেশন চালানোর জন্য দুটি জায়গার ব্যবস্থা করেন।
শুধু তাই নয়, রোববারে পরিচালিত ল‘ সেন্টারের এই দুটি এডভাইস সেশন পরিচালনার কাজে ভলান্টিয়ার হিসেবে সহায়তা করার জন্য তিনি নিজে এগিয়ে এলেন। ক্যামডেন ল‘ সেন্টারের এই দুটি এডভাইস সেশন পারিচালিত হতো সিসিআর-এর অফিস এবং হপ্সস্কচ এশিয়ান উইমেন সেন্টারে। ক্যামডেন কমিউনিটি রিলেশন্স অফিসে সার্বক্ষণিকভাবে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও মোমেন ভাই শনিবারে বয়স্কদের বাংলা শেখাতেন, রোববারে ক্যামডেন ল‘ সেন্টারের এডভাইস সেশন পরিচালনায় সহায়তা করতেন। এর পর যেটুকু সময় পেতেন তা তিনি উৎসর্গ করতেন বিডব্লিওএ-এর স্থায়ী কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য। মোমেন ভাইয়ের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই বিডব্লিওএ-এর স্থায়ী কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে দোতলা পূর্ণাঙ্গ ভবন ‘সুরমা সেন্টার‘ নির্মিত হয়েছিল।
মোমেন ভাই এবং আমার মধ্যে ছিল অনেক মিল। কমিউনিটি ইস্যু, মেইনস্ট্রীম পলিটিক্স, বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও খাবারসহ সব বিষয়েই আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কোন বিষয়ে আমরা দ্বিমত পোষণ করেছি বলে খুঁজে পাইনি।
লন্ডন, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০
লেখক : টাওয়ার হ্যামলেটস ও কেমডেন ল’ সেন্টারের সাবেক ইমিগ্রেশন এডভাইজার।