Share |

প্রফেসর আব্দুল মোমেন : মানুষ ও সমাজ গড়ার এক নির্মোহ কারিগরের বিদায়

শামছুল আলম

...Don't it always seem to go
That you don't know what you've got
Till it's gone...

জনি মিচেলের বিখ্যাত গানটির এই কথাগুলো আজ খুব মনে পড়ছে। গুগল সার্চ প্রফেসর মোমেনকে খুঁজে নাও পেতে পারে। কমিউনিটি হিসেবে আমাদের কিছু কিছু সামষ্টিক অর্জন এতোটাই নিজস্ব যে, এর দলিল দস্তাবেজের কোনও প্রয়োজন নেই, কারণ তা হারাবার নয়। এ বড়ো নৈর্ব্যক্তিক। প্রফেসর মোমেনের সাহচর্য যারা পেয়েছেন, তারা জানবেন কতোটা নির্মোহ ছিলেন মানুষটি। ৭০ এ ৮০’র দশকে বৈষম্য ও বর্ণবাদের সামনে দাঁড়িয়ে “না” বলার এই বলিষ্ঠ ও চৌকষ বিদ্রোহীকে সেসময় দেখিনি, মাথা গোঁজার ঠাইহীন পরিবারগুলোকে রাজপথে নিয়ে আসা অধিকার আন্দোলনের অন্যতম এই স্থপতিকে তখন কাছে থেকে দেখিনি, তবে ২০০৩ সালের পর দীর্ঘ দিন তাঁর সাথে পাশাপাশি কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে। পরবর্তীতে পেয়েছি কাছের একজন বন্ধু হিসেবে, গ্রীবা উচু করে তাকানো যায়, এমন একজন পরম মানুষ হিসেবে। দেখেছি তার মানুষ ও মানসকে।
কর্মক্ষেত্রে দেখেছি কিভাবে যৌবনের কমিউনিটি এক্টিভজমকে প্রফেসর মোমেন নিয়ে এসেছিলেন একাডেমিক বলয়ে। বাংলাদেশী কমিউনিটিতে তখোন অনেক তারুণ্য, অনেক সম্ভাবনা। কিন্তু অনেকেরই স্বীকৃতি নেই, সমানাধিকার নেই। অনেক মেধাবী ও কর্মঠ ছেলেমেয়েরা কাজ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, নয়তো ভলান্টিয়ার হিসেবে কোথাও বছরের পর বছর। অথচ তাদের যথাযোগ্য স্বীকৃতি নেই, পদোন্নতি নেই। প্রফেসর মোমেন অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে হবে। নিজ জীবনের দায় তাদের নিজ নিয়ন্ত্রণেই আনতে হবে। আর এই প্রক্রিয়ার একটি দরকারী অংশ হচ্ছে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত আর পেশাদার হিসেবে দক্ষ করে তোলা। ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেয়ারের দর্শনে খুব প্রভাবিত ছিলেন মোমেন ভাই। তার একটি প্রতিকৃতিও টাঙানো ছিলো তার অফিসের দেয়ালে। পাওলোর দর্শনের মূল কথাটি (কনসায়েন্টেশন) তিনি নিয়ে এসেছিলেন তার কাজের আত্মায়। সুশিক্ষার আলোয় মানুষের ক্ষমতায়ন ও দাসত্বমুক্তি। প্রফেসর মোমেন লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে আলী রাসব্রীজ ও প্রফেসর জাফর খানসহ তার আরো ক’জন সহকর্মীকে নিয়ে প্রবর্তন করেন অউঋ নামের একটি ডিগ্রী কোর্সের। ঈওড ধভ অভঢধশধঢলটফ টভঢ উমববলভর্ধহ ঋবযমষণরবণর্ভ কোর্সটি ছিলো ফাউন্ডেশন পর্যায়ের। কৌশল ছিলো, ভালো এ লেভেল বা প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যাদের নেই অথচ কাজের অভিজ্ঞতা আছে, স্পৃহা ও উদ্যম আছে, সম্ভাবনাময় এইসব ছেলেমেয়েরা এই কোর্সটি করতে পারবে এবং পরবর্তিতে টপ-আপ কোর্সের মাধ্যমে পূর্ণ ডিগ্রী। দু’এক বছরেই জনপ্রিয়তা পেলো প্রোগ্রামটি; সফলও হয়ে উঠে উঠলো। পরবর্তীতে এই কোর্সটাই জন্ম দেয় প্রফেশনাল অনার্স কোর্স “কমিউনিটি সেক্টর মেনেজমেন্টের”। এই কোর্সটি শেষ করে বের হওয়া বাংলাদেশীসহ বহু সংখ্যালঘু ছেলেমেয়ে আজ স্ব স্ব পেশায় প্রতিষ্ঠিত। লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে কেবল অউঋ কোর্সই নয়, ইয়ুথ ওয়ার্ক ও ইয়ুথ স্টাডিজ ডিগ্রী প্রোগ্রামসহ অনেক উদ্যোগের কারিগর ছিলেন প্রফেসর মোমেন। লন্ডন মেট্রোপলিটনে আসার আগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন গ্রীনিচ ইউনিভার্সিটিতে। ২০১১ সালের পর কমই যেতে পারতেন অফিসে। তবে ডিপার্টমেন্টের “কারী-ক্লাবে” আসতেন নিয়মিত। গল্পচারিতার লোভ সামলাতে পারতেন না। অফিসে প্রায়ই বেজে উঠতো মোমেন ভাইয়ের ফোন। না, কোন রেফারেন্স লেখার আবদার নিয়ে নয়, গবেষণা বা ভর্তি সংক্রান্তও কিছু না। পুরনো ছাত্রছাত্রীরা খোঁজ নিতো- মোমেন স্যার কেমন আছেন? অফিসে আসছেন কি না, কবে আসতে পারেন - এসব। ছাত্রছাত্রীদের মনের কতোটা গভীরে যে পৌঁছুতে পেরেছিলেন মোমেন ভাই, তা বলাই বাহুল্য।
বর্ণবৈষম্য তখন তরতরে। স্কুলে, কর্মস্থলে, পথে ঘাটে, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালাতেও। মোমেন ভাই কমিউনিটির সেই মেঘলা দিনে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অধিকার আদায়ে সংগঠিত হবার অপরিহার্যতা, প্রতিবাদী হবার প্রয়োজনীয়তা। মোমেন ভাই কমিউনিটিতে অদম্য তারুণ্য ও নেতৃত্বের সম্ভাবনাও দেখতে পেরেছিলেন। তাদের সংগ্রামী ঐতিহ্য ও সাহসিকতাকে পুঁজি করে মোমেন ভাই গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স অ্যাকশন গ্রুপ যা পরবর্তীতে রূপ নেয় বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স এসোসিয়েশনে। ক্যামডেনের সুরমা সেন্টার আজ সেই সংগ্রাম ও অর্জনের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করেই দাাঁড়িয়ে আছে। মোমেন ভাই বিশ্বাস করতেন ঐক্যের শক্তিতে। তার সমগ্রতায় ছিলো একসাথে এগিয়ে যাবার স্পৃহা। ৭০ ও ৮০র দশকে তাই গড়ে তুলেছিলেন রেস্টুরেন্ট কোঅপারেটিভ। কভেন্ট গার্ডেনে ‘দি লাস্ট ডেইজ অব দি রাজ’; তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠে রেড ফোর্টের মতো আরো অনেক প্রতিষ্ঠান যার মৌলিকতায় রয়েছে মোমেন ভাইয়ের আদর্শ - কালেক্টিভিজম।
ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের টর্ভধ-মযযরণ্র্রধশণ যরটর্ডধডণ পড়াতে গিয়ে তার একটি অভিজ্ঞতার কথা প্রায়ই বলতেন মোমেন ভাই। তার মুখ তখন জ্বলজ্বল করে উঠতো গর্ব, তৃপ্তি ও কিছুটা দু:খবোধের এক বিচিত্র মিশ্রণে। ৮০র দশকের কথা। বহু বাংলাদেশী পরিবার তখন গৃহহীন; সন্তান-সন্ততি নিয়ে অনেককে থাকতে দেয়া হয়েছে সাব-স্ট্যান্ডার্ড কিছু বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট হোটেলে। মাস কাটে, বছর কাটে, অথচ কর্তৃপক্ষের কোনই পরোয়া নেই এই হোমলেস পরিবারগুলোকে যথাযথ আবাসন দেবার। ১৯৮৪ সালে যখন সে রকম একটা হোটেলে আগুন লেগে মারা গেলো একটি বাংলাদেশী পরিবার, ফুসে উঠলো কমিউনিটি। সেই মর্মন্তুদ ঘটনাটি ছিলো বর্ণবৈষম্যের একটি নগ্ন প্রকাশ; অবজ্ঞা, অবহেলা আর বৈষম্যমূলক সোসাল পলিসির অনিবার্য জের। হোমলেস কিছু বাংলাদেশী পরিবারকে নিয়ে মোমেন ভাই সেদিন হানা দেন স্থানীয় ক্ষমতাবলয়ের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। গৃহহীন পরিবারগুলো নিয়ে অবস্থান নেন ক্যামডেন টাউনহলে। তাদের আবাসন না দেয়া অব্দি এই অবস্থান কর্মসূচী গুটিয়ে নেয়া হবে না। অবরোধ চলতে থাকলো দিনের পর দিন। লন্ডনের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন পাঠাতে থাকলো খাওয়া দাওয়া, পরিধেয় কাপড় আর রাজনৈতিক ও আদর্শিক সমর্থন। রণকৌশলের অংশ হিসেবে এন্টি-রেইসিস্ট গবেষকরা এভিডেন্স দেখালেন যে, ক্যামডেন ও ওয়েস্টমিনস্টারে আবাসন যোগানের কোনও ক্রাইসিস নেই, ক্রাইসিস শুধুমাত্র আদর্শিক। দীর্ঘ ২৮ দিন পর কর্তৃপক্ষ সবার দাবী মেনে নিতে বাধ্য হলো। হাতে হাতে তুলে দিলো ঘরের চাবী। ইতিহাসের নিরিখে ছোট্টই হতে পারে ঘটনাটি। তবে কমিউনিটির শিকড় সন্ধানে আমাদের পূর্বসূরীদের ত্যাগ ও তেজোদীপ্ততার এরচে’ বড়ো নমুনা আর কি হতে পারে। বাংলাদেশী কমিউনিটির আজকের এই যে অবস্থান, তা কোনও সোনার কাঠি বা রূপার কাঠির ম্যাজিক নয়। বরং আমাদের পূর্বসূরীদের সংগ্রাম ও এক্টিভিজমের ফসল। আর সেই এক্টিভিজমের অন্যতম পুরোধা ছিলেন প্রফেসর মোমেন।
১২ ঘন্টার নোটিশ পেলো সতীর্থ ও বন্ধুরা ব্রিকলেন মসজিদে মোমেন ভাইয়ের জানাযার। উপচে পড়া ভিড় ছিলো না। তবে সমানাধিকার ও বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে মোমেন ভাইয়ের সহযোদ্ধারা অনেকেই ছিলেন চোখে শোকের ছায়া নিয়ে। মসজিদ থেকে বের হতেই একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো সামনে। কোলে একটা ছোট ছেলে। মেয়েটির মুখে ঈসৎ হাসি, চোখে কষ্টের ছায়া। প্রফেসর মোমেনের ছাত্রী। খবর পেয়ে ছুটে এসেছে। বহু আগে পাশ করে বেরিয়েছে। মোমেন ভাই একা থাকতেন, তাই মাঝে মাঝে তার জন্যে খাবার রান্না করে নিয়ে যেতো। এর মতো আরো অনেক ছাত্রছাত্রী মোমেন ভাইয়ের অবসর জীবনে তাঁর দেখাশুনা করতো, খোঁজ রাখতো। এরকম অসংখ্য মানবিক উদাহরণ যা একজন অধ্যাপকের গন্ডি ছাপিয়ে মোমেন ভাইকে তুলে এনেছিলো অন্তরাত্মার পরিধিতে।
ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সীর ২৪ পরগনার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আব্দুল মোমেনের জন্ম। ৪০ এর দশকে দেশ বিভাগের পর তাঁর পরিবার চলে আসে বাংলাদেশের খুলনায়। সেখানেই তাঁর বড়ো হওয়া। ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুব মেধাবী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে শিক্ষকতাও করেছেন কিছুদিন। এক সময় ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে চলে আসেন লীডস ইউনিভার্সিটিতে। তখন থেকেই জড়িয়ে পড়েন কমিউনিটি এক্টিভিজমে। বনেদি পরিবারে জন্মেছিলেন। তবে শ্রেণীর কৌলিন্য তাকে ছুঁতে পারেনি। অন্তরে ও বাইরে প্রফেসর মোমেন ছিলেন সার্বজনীন, হতে পেরেছিলেন অসংখ্য মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।
মোমেন ভাইয়ের মানসে ছিলো ধ্রুপদী রুচি ও অগ্রসর চেতনার দ্যুতি। অবসরে পড়তেন ক্লাসিক্স; উইলিয়াম ব্লেইক, দস্তয়ভস্কি, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি। সুযোগ পেলেই চলে যেতেন রয়্যাল ফেস্টিভাল হলের কোন কনসার্টে কিংবা রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের কোন সেমিনারে। এমন কতো প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন মোমেন ভাই, হিসেব নেই। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে। সিম্পল অথচ পরিপাটি পোষাক। আচরণে এতোটাই বিনয়ী ও হাস্যোজ্জল ছিলেন যে, বোঝাই যেতো না অন্যায্যতার বিপক্ষে কতোটা প্রতিবাদী ও বিপ্লবী হতে পারেন এই মানুষটি।
মোমেন ভাই নেই। সন্ধা গড়িয়ে যাবে, বেল মেকার্স কোর্টে আর যাওয়া হবে না, দেখবো না মোমেন ভাই আলু সেদ্ধ করছেন, স্যামন পোচ করছেন। রিমোর্টের বোতাম চেপে চেপে বিবিসি টুয়েন্টি ফোর খুঁজে বের করছেন। কিংবা সকালে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন কর্নার শপে গার্ডিয়ান কিনতে, নয়তো টার্কিশ টুপি পরে ফোর্ড স্কয়ার মসজিদে ঈদের জামাতে। মৃত্যু যেনো এক নিমিষে সব কিছু নেই করে দেয়। তবে সামষ্টিক স্মৃতির মৃত্যু নেই। মোমেন ভাই যে আলো ছড়িয়েছেন, তা তো জ্বলবেই নিরন্তর। কিছু আলোর ঔজ্জ্বল্য এতোটাই তীব্র যে তার উৎসটুকু চোখে পড়ে না। কিন্তু সেই উৎসের কথা আমরা কোনদিন ভুলে যাবো না। কারণ মোমেন ভাই, আপনিই শিখিয়েছিলেন আইরিশ এক বিপ্লবীর কথা - ৗধ্রণ ষর্ধদ হমলর মষভ, ভর্ম তরমব র্ধ.
লন্ডন, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
লেখক : স্যোশাল পলিসির সিনিয়র লেকচারার, লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি।