Share |

করোনাকালের কবিতা

গোধূলী লগ্নে দিগন্তের ধূলো উড়িয়ে দুরন্ত ঘোড়ার পিঠে চড়ে যে কবি পরিভ্রমন করেন সুবিশাল শব্দ-বিশ্ব, তিনি আজ গৃহবন্দী। গনগনে সূর্যের দিনে ব্যস্ত জনপদের পথে পথে হেঁটে যে কবি সংগ্রহ করেন কালজয়ী কবিতার রসদ, তিনি আজ গৃহকোণে অবরুদ্ধ। জল টইটুম্বুর দীঘির গভীর অতলে ডুব দিয়ে যে কবি তুলে আনেন কবিতার শাপলা-শালুক তিনি আজ গুনছেন শবের মিছিল। শুক্লা তিথির পূর্ণিমায় যে কবি স্নাত হতেন জারুল কিংবা মেহগনির ছায়ায় শুয়ে তিনি আজ গৃহবন্দী। গৃহবন্দী আমাদের কবি ও কবিতারা! কবি চিত্তের অযুত নিযুত কাব্যভাবনা আর কাব্য মনীষা আজ গৃহকোণে উদগীরণের অপেক্ষায় উন্মুখ।
যে সময়টিতে করোনাক্রান্ত প্রতিকূলতা কবির হৃদয়ের সমস্ত উচ্ছ্বাসকে গ্রাস করতে যুদ্ধংদেহী, সে সময়টিতেও সর্বগ্রাসী অনুজীবের কাছে হার মানেননি আমাদের কবিরা। স্বেচ্ছাবন্দী জীবনে তাঁরা ঠিকই। হাতে তুলে নিয়েছেন তাদের ক্ষুরধার কলম। এগিয়ে এসেছেন গণমানুষের শুশ্রুষায়। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কবিরা লিখছেন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা। মানুষকে আশার বাণী শোনাচ্ছেন তাঁরা। বলছেন- নি?্রভাত কোন রাত্রি নেই, ভয়াবহ এ মহামারী শেষে আলোকিত ভোর একদিন আসবেই আসবে। তাদের কবিতা পড়ে উজ্জ্বীবনের আশায় বুক বাঁধছে কাব্যপ্রেমী মানুষ। সহস্র মৃত্যুর মিছিলে, প্রতিদিনই কোন না কোন প্রিয়জনকে হারানোর শোকে বিহ্বল মানুষ স্বপ্ন দেখছে প্রকৃষ্ট আগামীর; যেখানে আবারো মানুষ হাতে হাত রাখবে, বুকে বুক মেলাবে, ভালবাসবে প্রাণ ভরে একে অপরকে।
করোনাকালীন জীবনের নানা রূপ অনুসন্ধানকারী কয়েকজন কবির কবিতা নিয়ে পত্রিকার এবারকার বিশেষ আয়োজন- করোনাকালের কবিতা।
এ সংখ্যায় যারা লিখেছেন- কাদের মাহমুদ, নূরুজ্জামান মনি, শামীম আজাদ, আতাউর রহমান মিলাদ,
আহমদ ময়েজ, গোলাম কবির, মজিবুল হক মনি, ড. মুকিদ চৌধুরী, ফারুক আহমেদ রনি, কাইয়ূম আবদুল্লাহ, সারওয়ার-ই আলম, মোহাম্মদ ইকবাল, ময়নূর রহমান বাবুল, উদয় শংকর দুর্জয়, এম মোসাইদ খান, দিলু নাসের, কামরুল বসির, অজয় পাল, তৌহিদ শাকীল, এ কে এম আব্দুল্লাহ, মিলটন রহমান, সৈয়দ রুম্মান, শামীম আহমদ, টি এম আহমেদ কায়সার, আবু মকসুদ, মোহাম্মদ হোসাইন ও ফায়সাল আইয়ূূব।
‘করোনাকালের কবিতা’ সংখ্যার জন্য আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কবি সারওয়ার-ই আলম ও কবি আহমদ ময়েজের প্রতি।

 

 

ভাইত্রাস! ভাইরাস!
- কাদের মাহমুদ

ওরে ভাই, ভাই রে, ভাইরাস ছায় রে!
ওরে ভাই, ভাই রে, ভাইত্রাস ছায় রে!
ওরে বোন, বোন রে, ভাইরাস ছায় রে!
ওরে বোন, বোন রে, ভাইত্রাস ছায় রে!
নভেল কভিড ১৯ নাম সবদিক ছায় রে!

ভাইরাস ভাইত্রাস! ভাইরাস ভাইত্রাস!
মানে না সে দেশ তো পৃথিবীটা ছায় রে!
শুধু মানুষ খায় রে গপ্ গপ্ খায় রে রে!
যাকে ধরে সেই যেন মরণকে পায় রে রে!
জীবনটা চিৎপাৎ কুপোকাৎ হয় হয় হয় রে!

ভাইরাস ভাইত্রাস করোনা ভাইরাস হায় রে!
ভাই নয় কেউ নয় করুণা দয়া তার নাই রে!
কী যে ভয় ভয় তার তুলনা যে নাই রে রে!
বা’র ছাড়ি, কাজ ছাড়ি, পথ ছাড়ি আহা রে!
পড়শি স্বজন ছেড়ে শুধু ঘরে বন্দি থাকি যে!

করোনা ভাইত্রাস! ধরো না ভাইরাস রে রে!
ছুয়ো না আমাকে! ধারে কাছে এসে না রে!
দূরে দূরে থাকো রে! ঘরে ঘরে থাকো রে।
নিজ গ্রাম জনপদ শহরেই শুধু থাকো রে!
ঘরমুখো হয়ে সবে নিজ দেশে থাকো রে!

শহর জনহীন নগর শুনশান যান বাহন হারা
মানুষের গতি নেই; মসজিদ মন্দির গির্জা যত
উপসনালয় বেশ্যালয় সরাই নাট্যালয় নিষিদ্ধ
লোকসভা জনসভা শোভাযাত্রা শবযাত্রাও বটে
স্বজনের দাফন হয় চিতা জ্বলে স্বজন ছাড়া রে!

এমন বিপদ মানুষের মাঝে আর আসেনি!
এমন আপদ মানব জাতি কখনো দেখেনি।
বদ্যি চিকিৎসক সেবিকা বটেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী
রাজকুমার প্রধানমন্ত্রী কেউ পায় না রেহাই
পুরোহিতও বাঁচে না এমন সর্বনাশা বালাই!

তবুও মানুষ দাঁড়িয়েছে রুখে ভয়ে কাবু নয়।
রুদ্ধ অবরুদ্ধ তবুও মানুষ গবেষণাগারে রে
অহর্নিশ খুঁজছে করোনা রুধবার নানা উপায়
ধীরে ধীরে বিজ্ঞান ধরছে অজানা শক্রর ঝুঁটি
ধাপে ধাপে ভাইত্রাস যাচ্ছে যাচ্ছে রে টুটি।

মা ভৈঃ রে ! মা ভৈঃ! মা ভৈঃ রে! মা ভৈঃ!
মৃত্যুরই মিছিল-মাঝে মানুষের জয় হবেই!

হেনলি এভিনিউ ।। সাটস ।। সারে ।। ইউকে
রোববার। ৫ই এপ্রিল ২০১০

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

করোনাকালের ছড়া
- নূরুজ্জামান মনি

ব্যাধির ভয়ে আইসোলেশন
পাইনে খুঁজে উপায়,
ঘরের ভেতর বন্দিদশা
বাত জমেছে দু’পায়।

কাকের বাসা চুলগুলো যে
লম্বা হলো খুব,
গলির মোড়ের নাপিত ভয়ে
কই যে দিলো ডুব।

করোনা কাল কাটবে কবে
খুলবে কবে সেলুন
পড়শি বলে বউকে দিয়ে
চুলটা ছেঁটে ফেলুন।

কথা শুনে বউয়ের যেন
পড়লো মাথায় বাজ,
কাঁচি ধরে নাপিত সাজা
তাও কি আমার কাজ?

আজ হয়েছে কাকের বাসা
দেখবে ক’দিন পর
বাবরি চুলে বাউল সেজে
ছুটবে দেশান্তর।

বউকে বলি, আচ্ছা শোনো
নাও না হাতে কাঁচি,
তার নাকি খুব হ্যাঁচোস হুঁচোস
ছিল রাতে হাঁচি!

০৮ মে, ২০২০ ।। ম্যানচেষ্টার, ইউকে
 

 

 

 

 

 

জিজ্ঞাসা
- শামীম আজাদ

আজ আমার মিনতি রাখো পৃথিবী
পুরানো সম্পর্কের দোহাই তোমার
অন্ততঃ আরেক বার সুযোগ দাও
সে বিশ্বাসের হাতখানা বাড়িয়ে দাও
সুযোগ দাও কিছু কথা বলবার।

আমিও তো মানুষ ভাইরে
তাই মানুষের মড়কে পড়ে
বিরান হতে হতে ভাবি
বলবার তো বিস্তরই আছে
কিন্তু সত্যি সে
সুযোগ পেলে কি আমি বলতাম
আমিও তো জানি না।

হয়তো নিরানব্বই বছরের পাপ খুলে ধরিতাম
হয়তো অগ্রহায়ণ আর অন্নের
গোপন সম্পর্কটি আগের মত আবার
বহাল করবার জন্য আর্জি করতাম।

একবার শুধু একবারও যদি
তেমন সময় দাও
তবে তোমার কাছে হে পৃথিবী,
আমার এ চাঁছাছোলা চৌদ্দ প্রজন্মের হয়ে
হয়তো মার্জনা ভিক্ষা করতাম।

স্বীকার করি,
এ অন্ধের দেশে কোন দরকার ছিলো না
জোনাকীর উদর থেতলে
আলো জ্বালবার,
ঘোড়ার খুরের আঘাতে
মৌনকান্তি মৃত্তিকার ধূলা উড়াবার।

আমাদের কোন অধিকার ছিলো না
ঘন আষাঢ়ে রাতের সুযোগে
ইতিহাস বা ঐতিহ্যের বানান পা?ে দেবার,
যথার্থ ছিলনা ব্যাট বা বাদুড়
সর্প কিংবা শার্দুল
মেঘ অথবা ময়নার
আস্তানায় হামলা করবার।

কোন আবশ্যক ছিলো না
তোমার প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে
জরায়ূতে শুয়ে থাকা আগামীর
নিদ্রা-কৌশল পা?ে দেবার।

মানি, আমরা-
এই অর্বাচীন মানুষেরা
মৃত্তিকার জলবায়ু তছনছ করে
মরুতে করেছি মরিচের চাষ
পালা-পার্বণে পরিবহন করেছি
মৃত পশু ও পাখিদের লাশ।
বকুলের বদলে বাসা ভরে ফেলেছি
অবিশ্বাস আর অগ্নিমান্দ্যে।
আমাদের উদ্ভিদ মাতা-পিতাকে
মিউজিয়ামে দাঁড় করিয়ে
গড়ে তুলেছি অনলাইন টিকিট কেটে কেটে তাদের দেখতে যাবার অভ্যাস।

শেষবারের জন্য
সুযোগ পেলে জিজ্ঞেস করতাম,
আমরা না হয় উন্মাদ, বেতমিজ, বদমাশ
কিন্তু তুমি তো ধরিত্রী
শুষে নিতে পারো সকল যন্ত্রণা ও অশক্তি
তবে তুমি কী করে পারলে
তুলে নিতে তাবৎ করুণা তোমার!

হে পৃথিবী,
হে নির্যাতিত অপমানিত পৃথিবী
এইবার বেঁচে থাকবার সুযোগ দিলে
বলতাম আর আমরা কোন ঔদ্ধত্য
দেখাবোনা তোমায়।

এখন একবিন্দুও স্পর্ধা অবশিষ্ট নেই যে প্রান্তজনের মত
শুধু তোমার নখে বসে থাকবার জন্য
জায়গা চাইবো।
এখন আমরা শুধু
দ্রাঘিমা রেখার শেষ সীমান্তে
পোড়া চাঁদের মত
অনুশোচনার সুতোয় লটকে থাকতে পারি।
যদি তার সুযোগ দাও
প্রতিজ্ঞা করছি এবার রসুনের কোয়ার মত
ছোটবড় সকলেই যুথবদ্ধ হয়ে টিকে থাকবো
আর বার্ধক্যে বৃদ্ধ হয়ে বুঝি
তখন আরো একটি কথা জানতে চাইবো-
আমাদের কি ভালবাসতে পারবে আবার?

লণ্ডন, ১ বৈশাখ ১৪২৭, ইংরাজী ১৪ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

 

 

ভয়ের মুখোশ
- আতাউর রহমান মিলাদ

দুঃসময় বড়ো আজ মানুষের
আক্রান্ত কাল
হাত ছেড়ে যাচ্ছে প্রিয় হাত
মুখের আদল
চারপাশে বিষণœ শিশির
অদৃশ্য অশ্রুপাত
আটকে যাচ্ছে বায়ুর নিঃশ্বাস
বিশ্বাসের দূরত্ব
ঝাপসা দৃশ্যে স্পষ্ট হচ্ছেনা কিছু
পাথরের চোখ
ছায়ারা অতিক্রম করছে দেহভার
বিপন্ন বোধ

পৃথিবীজুড়ে শঙ্কা ও ভয়, অবরুদ্ধ কাল
অস্থির সময়ের তর্জনী, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
পুড়ে যাচ্ছে মোমের আখ্যান, বিমূর্ত আগুন
ফ্রেমবন্দী মানুষের মুখ, হাড়ের ফাটল
খসে যাচ্ছে সুরক্ষিত দেয়াল, অলিখিত প্রেম

ভয়ের মুখোশ পরে শাসাচ্ছে অবরুদ্ধ সময়
বিচ্ছিন্নতারও সৌন্দর্য্য আছে
তাই নিয়ে দূর হবে পৃথিবীর যত ভয়।

লন্ডন, করোনাকাল. ২০২০

 

 

 

 


ওঙ্কার
- আহমদ ময়েজ

তুমিও ক্রমশঃ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছ
তোমার প্রতিটি শব্দে ও নিঃশ্বাসে
মৃত্যুর অমোঘ নিয়তি ভেসে বেড়াচ্ছে
‘আমিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবো’ -  
এমন উচ্চারণে কেউ আঁৎকে ও?ঠে
সহসা আমার মুখ চেপে ধরে বলবে না -
    ‘ইয়া আল্লাহ, এমন বলতে নেই’।

অথচ কি আশ্চর্য এমনটি হচ্ছে না আজকাল
ভয় ও শঙ্কা আমাদের মানবিক দূরত্ব,
সকল প্রেমের দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন।

আগামী দিনে যে কবিতা রচিত হবে সে হবে ভয়ের কবিতা
কবিতার শরীর লেপটে রাখবে
করোনার ফুলেল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপড়ি
মানুষ পাঠবন্দী হবে করোনাক্রান্ত কবিতায়।

এতোসবের পর আমার উপলব্ধিতে
কবিতার জীবাণুর চে’ ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর আর কিছুই মনে হয়নি
আসন্ন মৃত্যু জেনেও
ধাবমান করোনাকে সে প্রতিদিন উপেক্ষা করছে
এ এক কঠিন ওঙ্কার!

গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতার রেণু অঞ্জলি ভরিয়ে তুলছে
প্রার্থনায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে সটান
কোমলতায় ভরিয়ে তুলছে প্রাথর্নার প্রতিটি শব্দ
সকল আকাঙক্ষাকে একটি সূতোয় বেঁধে দিয়ে
ভয়কে মানবিক করে তুলতে উদগ্রীব!

কী আশ্চর্য, এমনি এক শূন্য তশতরি
ভাসতে ভাসতে নতুন এক ভরসার খেয়াতরী
আমাকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলে
কবিতার-জীবাণু আমার কোষের ভেতর
    এভাবে এক সাহসী যুদ্ধে মেতে ওঠে...

দোহাই লাগে,
তোমরা কেউ কখনো একে অসমযুদ্ধ বলে
টিটকারী মেরো না।
কবিতা: সে এক জানবাজ লড়াকু ভাইরাস।

চ্যাপম্যান স্ট্রীট, লণ্ডন ।। ৩ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

 

করোনা ভাইরাস
- গোলাম কবির

করোনার ছোবলে
মানুষের মরণে
আতঙ্কে দুনিয়া!
পুঁজিবাদ মারছে
মানুষকে পরাণে
রোগ-ব্যাধি বুনিয়া!

যক্ষায় কলেরায়
এন্থ্রাক্স ইবোলায়
গরিব আজ মরছে,
ক্যান্সার করোনায়
মানুষ আজ যুদ্ধে
জীবনকে গড়ছে!

ভাইরাস বিশ্বে
পশুদের নিঃশ্বাস
পশুরাই ছাড়ছে,
মানুষের কাজ আজ
পশুদের বিনাশে
ক্রমশই বাড়ছে!

করোনার সৃষ্টি
নয় কোনো স্রষ্টার
ল্যাব থেকে সৃষ্ট
পশুরূপী মানুষের
এই হীন কাজটি
এরা নিকৃষ্ট!

মেহনতী মানুষের
ঐক্যের পতাকা
এইসব রুখবেই
অশুভের ধ্বংসে
কল্যাণী মিছিলে
মানুষরা ছুটবেই।

লণ্ডন, ৩০ জানুয়ারি ২০২০

 

 

 

এক সচিত্র অচিনপুর!
- মজিবুল হক মনি

সাদা কাপড়ে মোড়া, কিংবা কফিনবন্দী লাশের সারি।
লাশ! আর লাশ!
যোগ হচ্ছে তার অন্তিম যাত্রার কাফেলায়।
কোথায় যাবে?
চিগওয়েলের গার্ডেনস অফ পিস?
কিংবা খিলগাঁ’র তালতলা?
যেখানেই হোক, স্বজনহীন লাশ যাচ্ছে শেষ ঠিকানায়।

কালো গাড়ির সারি বাঁধা বহর নয়। ফুলের বুকেট নয়,
স্বজনদের নিজ হাতে কবরের মাটি নয়,
কবরের পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে-
মৃতের জন্য আখেরী মোনাজাত নয়।
শুধু কিছু সেবাকর্মী ফেরেস্তার বেশে লাশের সঙ্গী।
পুত্রের কাঁধে পিতার লাশ! আপনজনদের শোকমিছিল!
না! ইয়া নাফসী’র জিকিরে ঐ দৃশ্য শুধুই অতীত।
পিতা আছে করোনায় লাশ হয়ে মর্গে,
পুত্র মৃত্যুভয়ে ঘরবন্দী।
করোনাক্রান্ত মাকে রাস্তায় ফেলে পুত্র পলাতক!

কোন যুদ্ধ নেই, নেই সামরিক জ্যান্তার কারফিউ,
মক্কা থেকে গোয়া-কাশি, বেথলেহেম, সর্বত্রই ভক্তহীন শূন্যতা।
অদৃশ্য বিধাতার কোন ওহি নেই,
নেই কোন বিজ্ঞানীর তড়িৎ আশ্বাস।
করোনাই এ গ্রহে মৃত্যুভয়ের একচ্ছত্র অধিপতি।

এ গ্রহ নির্মল হোক, প্রাণের উচ্ছাসে সজীব হোক, আমিন!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শিয়াল নিশ্চুপে
- ড. মুকিদ চৌধুরী

ঘুমোয় না কেউ।
কেউ নয়।
কেউ না।
স্বপ্ন দেখতেও ভয় হয়
তাই দেখে না কেউ।

কবরস্থানে মৃতের স্তূপ
দূরে-
স্বজনরা, বহুদূরে-
মৃত্তিকা জড়িয়ে ধরে
বিলাপ করে চলে
হাঁটুতে শুকনো মাটি- আজও
সমাধিস্থ করেছে একজনকে
যদিও শিয়াল নিশ্চুপে কুকুরদের
ডেকে আনে নিজের প্রয়োজনে।

জীবন এখন অস্বপ্নময়।
সাবধান!
সাবধান!
সাবধান!

দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক।
ঠোঁটও ভয় পায় চুম্বনে
মুখ বেঁধে চুম্বন- কল্পনাতীত, চিরব্যর্থ

চাঁদ যখন আর্দ্র সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে
মৃতদের মিছিলে, তখন দেখে বসন্তের
ছুরিপ্রান্তে চলছে তুষাররাজত্ব
ভুলে যায় নিজের অস্তিত্ব
এমনকি বরফস্বপ্নের অস্তিত্ব
কেবলই অনুভব করে মৃত্যুর ভয়
পাছে সেও অন্যের কাঁধে চড়ে বসে।

 

 

 

 

লকডাউনে নাফিজা এবং কাশ্মীর
- ফারুক আহমেদ রনি

{দুঃখ করে নাফিজা বলেছিলো, একদিন পৃথিবীর সকল মানুষ ফিরে যাবে যার যার ঘরে আর বিস্মৃত হয়ে উপলব্ধি করবে লকডাউনের বিপন্ন সময়! আসলেই কি নাফিজার প্রার্থনা বিধাতা কবুল করেছেন? কাশ্মীরের মেয়ে নাফিজা ওমরকে নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র দেখে কষ্টবোধ থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে রচিত এই কবিতা}

উফ্ ছাড়ো, প্রার্থনায় দুই হাত, আল্লাহর আরশ কাঁপে!
উফ্ স্পর্শ করোনা, কলঙ্ক ছুঁয়েছে এই জোৎস্নাখচিত শরীর,
কুমারী লউয়ে ভাসছে সূর্যাস্তের ঝিলাম নদী,
উফ্ হাত দিওনা, পাঁজরের অস্থিতে খামছে ধরেছে মৃত্যুমায়া।
বুকের ভাঁজে ভাঁজে শূল বেদনা, অগ্নুৎপাতে শিহরণ,
আমি কারো প্রেমিকা নই, কারো পতœী অথবা দয়িতা,
আমাকে জুড়ে আছে নির্জন, নিস্তব্ধ আর রহস্যময় বিষণœতা!

আমি নাফিসা ওমর
আল্লাহর দোহাই লাগে- থামো পথিক,
একবার দেখে যাও; রহস্যময় সুনসান এই নগরীর আড়ষ্ঠ ঠোঁট,
নিঃসঙ্গ অনন্ত নীলিমা, শোকাচ্ছন্ন মধ্যরাত,
আমাদের নিèিদ্রবাস।
অন্ধকার শ্রীনগরে সশস্ত্র জোয়ান টহল দিচ্ছে
কাঁপছে বিধ্বস্ত শহর, স্তব্ধ পাখীদের শীষ,
মধ্যরাতে মায়ের কোলে আৎকে ওঠে শিশুরা,
নিশ্চুপ, শব্দহীন, স্থবির শূণ্যতা নিয়ে কবরে যাপিত
আটমাস লকডাউনে কাশ্মীর।
জোয়ানদের বুটের আওয়াজ যেন নশ্বরতাকে জানান দেয়
আমরা যেন পরস্পর দীর্ঘশ্বাসের মত একা হয়ে যাচ্ছি...।

নক্ষত্রসমেত আকাশ আমাদের দেখতে নেই
আমাদের ভাবতে নেই-
উদাস দুপুর, ঝিলেরজলে হংসমিথুন জলকেলি উৎসব
কিংবা কূয়াশাঢাকা স্নিগ্ধ ভোরের আপেল বাগান।
দেখতে দেখতে নেই সবুজ উদ্যান, বিস্তৃত মাঠ, নীল আকাশ,
আমাদের দুচোখের সীমানায় আটকে থাকে শুধুই বিস্ময়
আর ভাবনায় বিগলিত হতে থাকে অখণ্ড বিরহের শরীর।

খোদার কসম পথিক, একবার দেখে যাও;
আমরা আটমাস লকডাউনে আছি
টেলিফোন, ইন্টারনেট, টুইটার, ফেইসবুক সব বন্ধ,
স্কুল, কলেজ, বাজার এমনকি হাসপাতাল।
বরফঢাকা সুউচ্চ হিমালয় এখন আর আমাদের নেই
এখানে সুমধুর আযানের ধ্বনি নেই,
বাজেনা গীর্জার ঘন্টা,
নেই মানুষের কোলাহল, না কোন উৎসব,
লাশের জন্য নেই কোন আয়োজন।
হিমালয়ের মত মৌনতা নিয়ে নিস্তব্ধ শ্রীনগর
এবং বিকলাঙ্গ জম্মু ও কাশ্মীর!
রক্তে ভাসছে শিশু-কিশোরের স্কুলব্যাগ,
যুবকেরা জেলখানায়, নারীরা জ্বলছে বা?হীন উনুনে,
বৃদ্ধরা হিজলবৃক্ষের মত নাভিমুল ডুবে আছে
জীবনের পন্কিল জলাশয়ে!
আমরা আটমাস লকডাউনে আছি।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই
আপনি জেনে রাখুন;
আমাদের আটমাস লকডাউনের গল্প
আপনি লিখে রাখুন গণধর্ষণ, গণহত্যা ও গণকবরের কথা
কাশ্মীর থেকে পুরুষের অর্ন্তধান আর
যুবতী মেয়েদের বিধবা হবার কথা,
আমরা সত্তর বছর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছি।
আপনি জানেন-
রক্তাক্ত একটি স্বর্গের নাম কাশ্মীর?
ডাল, গঙ্গাবল, কৃষ্ণাশার, নন্দকোল আর কুনসেনগাং হ্রদে
এখন আর বাহারী নৌবিহার নেই
নান্দনিক হ্রদে হ্রদে ভাসছে আমাদের গলিত লাশ!
সবুজ কুমারী বনভূমি আর বিস্তৃত জাফরানক্ষেত জুড়ে
আজ রক্তের জমাট স্তুপ!
সুদৃশ্য হিমালয়ের বরফ স্রোতে
কাশ্মীর ভ্যালীতে বহে চলে রক্তের নহর,
আজ আমরা অপূর্ণ সুন্দরের প্রতিচ্ছবি।

আপনি নাকি মানবতাবাদী লেখক,
তাহলে আপনি জেনে রাখুন মানবতা নামের
কোন শব্দ আমরা কোনদিন শুনিনি,
বিবেকবান মানুষের কোনও গল্পও আমরা জানিনা,
উদারতা নামক বিস্মিত বাণী আমাদের বিচলিত করেনা।
জম্মু ও কাশ্মীর বিবেকবান মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি,
হিমালয়কন্যা কাশ্মীর আজ বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরিণত হয়েছে।

আমাদের কোন বিকল্প নেই,
আটমাস লকডাউনে আজ অধিকার বঞ্চিত দেড় কোটি মানুষ।
আল্লাহর কসম, আমার প্রার্থনা বৃথা যাবেনা,
একদিন সারা পৃথিবীর মানুষ যার যার ঘরে ঢুকবেই।
উপলব্ধি করবে তুষারপাতে হাড়কাঁপানো শরীরের নিপূণতা!
পুড়ানো কাঠের মেরুদণ্ডহীন কয়লার মত-
বীভৎস ইতিহাস হয়ে থাকবে আজকের লকডাউনের গল্প,
যে গল্পে লেখা হবে আমরাও মানুষ ছিলাম এবং
এখনো বেঁচে আছি নগ্ন মৃত্যুভয়ে হাজার হাজার দিন।

 

 

 

 

 

 

 


করোনা
- কাইয়ূম আবদুল্লাহ

করোনায় কাঁপছে সারা বিশ্ব
রাজা-প্রজা, ধনী ও নিঃস্ব
মসজিদ, মন্দির, পানশালা
সবখানেই ঝুলছে তালা।

কবে হবে এই দশার শেষ-
ফিরবে স্বাভাবিক পরিবেশ?

জানি তা নেই কারো জানা
একজন দিতে পারে ফানা
তার কাছে করি মোনাজাত
আঁধার সরায়ে দাও প্রভাত।

 

 

 

 


মৃত্যুভয়ে কাঁপছি না
আমি ঝলসে উঠছি প্রতিবাদে

- সারওয়ার-ই আলম

বিশ্বাস করো একটি বারের জন্য মৃত্যুভয়ে কাঁপছি না আমি।
মৃত্যুতো অনিবার্য, মৃত্যু অবধারিত।
আমি ঝলসে উঠছি সুতীব্র প্রতিবাদে।
আমার প্রতিটি রক্ত কণিকায় টগবগ করছে  দ্রোহের আগুন।
গৃহবন্দী আমি চিৎকার করে জানিয়ে দিচ্ছি আমার সমস্ত ধিক্কার তাদের প্রতি-
যারা ভয়ংকর মারণাস্ত্র বানিয়েছে;
মানুষকে দাঁড় করিয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে অথচ ভেবে দেখেনি মানুষের চিকিৎসায় কী ছিল প্রয়োজন।

বিশ্বাস করো মৃত্যু নিয়ে আমার কোন আতংক নেই; নেই অহেতুক বেদনাভার।
আমার চোখে মুখে তীব্র ঘৃণার বিষ।
আমি সে ঘৃণা ছড়িয়ে দিচ্ছি মস্ত পৃথিবীর বাতাসে তাদের প্রতি, যারা বোমারু বিমানে বরাদ্দ রেখেছিল কোটি কোটি ডলার, মানবিক উন্নয়নে নয়।

আমি আমার ঘৃণা তাদের প্রতি ছড়িয়ে দিচ্ছি যারা এটম বোমার চেয়ে তিন হাজার চারশ’ গুণ বেশী শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়েছে অথচ ভ্রুক্ষেপ করেনি মানবিক প্রয়োজনে।

বিশ্বাস করো আমি আজ মৃত্যুভয়ে এতটুকু কাতর নই।
আমি আজ প্রচণ্ড প্রতিবাদী।
আমার প্রতিটি ধমনীতে প্রতিবাদের দৃপ্ত মিছিল।
এ মিছিল তাদের বিরুদ্ধে যারা পাঁচ হাজার মাইল দূরের লক্ষ্য বস্তুতে অব্যর্থ আঘাত হানতে ইন্টারকন্টিন্যান্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদন করেছে বছরের পর বছর অথচ একটিবারের জন্য ভাবেনি মানুষের সুরক্ষা কিভাবে সম্ভব।

বিশ্বাস করো আমি এতটুকু শঙ্কিত নই আমার মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুতো অনিবার্য, মৃত্যু অবধারিত।
আমার কবিতার প্রতিটি শব্দ আজ প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ, অস্থির।
আমার এ প্রতিবাদ তাদের বিরুদ্ধে যারা মুক্তবাজারের নামে আমাদের পরিণত করেছে প্রযুক্তির পণ্যে।

বিশ্বাস করো, চারদিকে সহস্র লাশের সারি দেখে আমি এতটুকু পরাভূত নই। কারণ মৃত্যুতো অনিবার্য, মৃত্যু অবধারিত।
আমার মস্তিষ্কে আজ বিদ্রোহের লেলিহান আগুন,
আমার কবিতাগুলো আজ সারিবদ্ধ; দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সমাবেশের সমান,
আমার শব্দগুলো ক্ষুরধার শাণিত,
আমার সমগ্র সত্তা জুড়ে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ,
আমার এ প্রতিবাদ তাদের বিরুদ্ধে যারা আমাদের করের টাকায় বিশ্বসভায় মিলিত হয়ে তামাশায় মেতেছে মানবাধিকার সুরক্ষার কথা বলে।
অথচ সামান্য একটি ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দিতে পারেনি আমাদের।
 
বিশ্বাস করো একটি বারের জন্য মৃত্যুভয়ে কাঁপছি  না আমি,
মৃত্যুতো অনিবার্য, মৃত্যু অবধারিত।
আমি ঝলসে উঠছি সুতীব্র প্রতিবাদে।
আমার প্রতিটি রক্ত কণিকায় টগবগ করছে দ্রোহের আগুন।
গৃহবন্দী আমি চিৎকার করে জানিয়ে দিচ্ছি আমার সমস্ত ধিক্কার তাদের প্রতি-
যারা এক মিলিয়ন টন টিএনটি ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা বানিয়েছে;
মানুষকে দাঁড় করিয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে অথচ ভেবে দেখেনি মানুষের জীবন বাঁচাতে কী ছিল প্রয়োজন।

লণ্ডন, ১৩ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

 

উৎকর্ষের আর্কাইভে বিষাদের পাণ্ডুলিপি
- মোহাম্মদ ইকবাল

উৎকর্ষের আর্কাইভে অকস্মাৎ জমা বিষাদের পান্ডুলিপি
হানসুই, ইয়াংসির জলে প্রতিবিম্বিত হতে দেখা অভিশপ্ত অভিসম্পাতের প্রেতচ্ছায়া
নুহের প্লাবনের পর থেকে কবরস্থ সমস্ত মৃত অভিসম্পাতগুলি আবারও কবর ভেঙে উপরে
মৃত্যুর নীল খাম হাতে ধেয়ে এসে খামছে ধরেছে মনুষ্য আত্মশ্লাঘা
মানুষের পরাক্রম তাচ্ছিল্য করে প্রকাশ্য বেপরোয়া বেলেল্লাপনা
ভয়ানক শারীরিক ভালোবাসায় লাজহীন খেলা
গলা প্যাচিয়ে সামনে থেকে ধরে ঠোঁট মুখে প্রণয়সিক্ত চুম্বন অতঃপর নাসারন্ধ্রের গহ্বরে বাসর
ষাটোর্ধ্বের সাথে চুটিয়ে ভালোবাসা
উহানের রাজপথে বিষাদের পাণ্ডলিপির প্রথম কবিতা
মলয়দ্বীপের দারুচিনি সারি আন্দামানের নারিকেল বীথি
বরফ আচ্ছাদিত আর্টিক উপকূলের সীল পেঙ্গুইন
স্তব্ধ স্থবির জল স্থল অন্তরীক্ষ
যন্ত্রণাদায়ক রক্তাক্ত ভালোবাসার উপাখ্যান
লাশের মিছিল ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর
মর্গে তিল ধারণের ক্ষমতা নেই
শ্মশান কবরস্থান ক্রিমেটরিয়াম শব সৎকারেও নিষেধের কাঁটাতার।
 
অহেতুক খামখেয়ালিপনার সুযোগে অগণন সুরক্ষিত দুর্গের রক্ষাব্যুহ ভেদ করছে অদৃশ্য শত্রু
দৈব অভিশাপ ইতোমধ্যেই সভ্যতার ভীত নাড়িয়ে দিয়েছে।

জিব্রা?ার থেকে হুনুলুলু লম্বাডি থেকে মাদ্রিদ লন্ডন বার্মিংহাম এডিনবরা  
নিউইয়র্ক মায়ামি এলএ
হংকং সিডনি কেপটাউন
কুয়ালালামপুর ম্যানিলা হ্যানয়
দিল্লি রেঙ্গুন ঢাকা
তেহরান বাগদাদ মস্কো
প্যারিস বার্লিন ব্রাসেলস
মক্কা বেথেলহাম ভ্যাটিকান
গয়া কাশি বৃন্দাবন
মানুষের ভয়ের উঠানে নৃত্যে মেতে উঠছে উলঙ্গ মহামারী

মনুষ্য ধীশক্তি মোটেই তাচ্ছিল্যের নয়
ল্যাবে ল্যাবে নির্ঘুম গবেষণা
ঘরে ঘরে প্রার্থনায় মানুষ
চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে চোরা অভিঘাতী প্রতিপক্ষ
ব্যস ক্রমেই কমতে শুরু
ঘোষণা শুধুই সময়ের ব্যাপার মাত্র
কভিড-নাইনটিন চিরতরে কোয়ারেটিনে
তাঁর সম্রাজ্য সম্পূর্ণ লকডাউন
ভ্যাকসিন সিরিঞ্জের সুঁইয়ে করোনার অন্তহীন আজন্ম ভয়...

নটিংহীল গেইট লণ্ডন, ৫ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

 

 

মলাটহীন নগর
- ময়নূর রহমান বাবুল

লণ্ডন নগরীর সুউচ্চ ইমারতের চূড়া বেয়ে
বসন্ত দিনের তেজহীন সূর্যটা ঢলে পড়ে..
গত ক’দিন ধরে এ দেশে, সারা বিশ্বে-
চারিদিকে কেমন এক আতঙ্ক বিরাজ করছে..
এমনি এক সান্ধ্য সময়ে টিভি ক্যামেরায়
ঝলকে ওঠে আলো, ভেসে ওঠে মুখচ্ছবি ..
সোনালী আঁশের মতো এলোমেলো মাথার চুল
সাদা তরমুজের মতো লম্বাটে চেহারা আর  
বিষন্ন মন নিয়ে ধীর পায়ে ‘শুভসন্ধ্যা‘ বলে
জাতির সামনে এসে বক্তৃতা শুরু করেন
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিস্টার বরিস জনসন...

নগরে তখনও ছুটছে গাড়ি, হাঁটছে মানুষ
উড়ছে কবুতর, চলছে কল-কারখানা
প্রচণ্ড ব্যস্ততা কর্মযজ্ঞ কোলহল চারিদিকে...

মানুষ হুমড়ি খেয়ে চেয়ে থাকে টিভির পর্দায়-
ক‘ মিনিটের ভাষণ, তারপর নীরব মানুষজন
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ঘনায়, আরো বেশী নিরবতা
যে নগর ঘুমায়না কখনো, জেগে থাকে রাত দিন
সে নগরে আজ পিন পতনেরও শব্দ শোনা যায়...

ঘরে থাকার আহ্বানে লক্ষ-কোটি মানুষ
স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ে, আবদ্ধ হয় ঘরে,
করোনা ভাইরাস ভয়ে, বাঁচার প্রত্যাশায়।

লক-ডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন
ইত্যকার শব্দগুলো কান দিয়ে বড় বেশী
মাথার খুলির ভেতর কিলবিল করে
‘করোনা ভাইরাস’তো আরো বেশী, অনেক...

যা অদৃশ্য, কখনো দেখা যায়না খালি চোখে
তার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত, গৃহবন্দী মানুষ
বাঘ ভালুক সিংহ কিংবা বন্য হাতি নয়
অথচ এরই ভয়ে নিস্তব্ধ আশরাফুল মাখলুকাত!

লক-ডাউন, জরুরী অবস্থা, বাইরে যেতে মানা
অতএব সবকিছু আজ নীরব নিথর জনমানবশূন্য
নগরী যেন আজ এক মলাটহীন বইয়ের মতো..

লণ্ডন, ২৩ মার্চ ২০২০

 

 

 

 

 


এই বোশেখে এই অন্তরীণে
- উদয় শংকর দুর্জয়

বোশেখ সেতো নির্নিমেষে কোন অবকাশে ছুঁয়ে দিয়ে গ্যাছে আমার সদর দরজা। জাগিয়ে দিয়ে গ্যাছে রুদ্রতার বেশে, এক অপরূপ সজ্জায়। কিন্তু আজ পৃথিবীর সোনালি উদ্যানে এক অচেনা অদৃশ্য-শ্বাপদ দোকান খুলে বসেছে। রক্তের অণুতে নিঃশ্বাসের চৌখুপিতে কোথায় যেন গোপনে গহনে ঘাপটি মেরে আছে জানোয়ারটি। খরতার বেহালায় প্রথম দিনের গান, একটু বৃষ্টি আর কিছু রোদ্দুর অপেক্ষা করে আছে দরজার ওপারে। এক নিষ্ঠুরতার স্বরগ্রাম রোজ বেজে যাচ্ছে, এক ভয়ঙ্কর গাঢ় অরণ্য এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে।
আজ আর যাওয়ার যো নেই কোথাও! আচমকা কালো ছাইয়ে যেন ছেয়ে আছে আবর্তন; দশ মিলিমিটার পুরুত্বের আকাশ আজ ছিন্নভিন্ন এই অচেনা মৃত্যুদূতের কাছে। তবু বোশেখের মৃদঙ্গ বীণায় ডেকেছে সে খুব করে। এখন এই স্তব্ধ দেয়ালের ভাঁজে আটকে পড়েছে মঙ্গলসূত্রাবলি, তবু হৃতগহীনে জেগে উঠছে আবার নতুন দিনের গান।

ব্যাসিলডন, ইউকে
৯ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

 

 

করোনা ক্লান্ত কালের লিপি
- এম মোসাইদ খান

বিশ্বাস ফিরে যাবো, ফিরে যাবো কোয়ারেন্টিনের আগে।

পৃথিবীর হৃদয়ে আজ অনাকাঙ্খিত ছোঁয়াছুঁয়ি গল্প আর
বিয়োগ হিসাবের বর্ণহীন নিঃশ্বাস পোড়া বিষণœতা।
প্রায় প্রতিক্ষণ কারো না কারো দৃষ্টি সুনামীতে ভাসে
কারো না কারো পাঁজর জুড়ে নিচ্ছে স্থায়ী শূন্যতা।
গণ ও সামাজিক মাধ্যমে কেবলই বিষাদের
পয়ার আর বিছিন্ন জনপদের বিদীর্ণ হাহাকার।

নিস্তব্ধ পৃথিবীর মানুষের মানচিত্র জুড়ে শুধু যেন জেগে আছে মৃত্যু, মরা বাহক  
আর কতেক বৈদ্যশালার যোদ্ধা
কতেক জেগে আছে কোভিড-১৯ নির্মূলের অভিপ্রায় খোঁজে।

প্রকৃতির বিপরীতে মানুষ নাকি মানুষের মুখোমুখি মানুষ
আর এর শেষই বা কোথায়
এমনও অসমাপ্ত চিন্তায় উবে আছে কতেক লোক।

হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে মহামারীর শোকাতুর টুংটাং অবিরাম বাজে।
মুঠোফোনের গোঙানিতে টমটমের আওয়াজ শুনি বুকের ভিতর।

মন খারাপের একলা ক্ষণে
নিজেকে টপকে দাঁড়াই আকাশ মুখে
দেয়াল বন্দীর চোখে অনড় ঠোঁটে পাঠ করি বিশ্বাসের খাতা
কুমিরের পিঠের মত দিনরাত পাড়ি দিয়ে এ পৃথিবী পৌঁছাবে একদিন
অনাবৃত সুন্দর এক দিনের কাছে।

বিশ্বাস ফিরে যাবো,
লকডাউন শেষে কোয়ারেন্টিনের আগের মত হাত খোলা সময়ের কাছে।

 

 

গৃহবন্দীর জবানবন্দী
- দিলু নাসের

হাঁটু জলে পড়ে আছি, তবু যেন মৃত্যুর কাছাকাছি
এ কেমন গৃহবাস? সুখ নেই শুধু হা-হুতাশ!
এ যেন মৃত্যু ভয়ে মূর্ছাতুর জীবন। ফোন করে বন্ধু-স্বজন
কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে কোথায় আছেন?
উত্তরে বলি, থাকার তো দুটি জায়গাই আছে গৃহ অথবা হাসপাতাল।
আহা রে ক্রান্তিকাল!
আকাশচুম্বী অট্টালিকার নগর জুড়ে পথে পথে আলোর মিছিল,
ফুলে ফুলে শোভিত উদ্যান, পল্লবিত বৃক্ষ সারি, বনে বনে পাখিদের কুহুতান, জনমানবহীন রাজপথে নির্বিঘেœœ ঘুরে বেড়ায় বেড়াল আর শৃগাল।
শুধু আমাদের স্বেচ্ছায় গৃহবাস। স্বপ্ননীল চোখে কেবলই ভয়-ভীতি!  
সময়কে মনে হয় বরফের টুকরো যেন। হৃদয়ে অশ্রুপাত, অন্তরে কেবলই বাজে বিষণœ সানাই। আলোর ভেতরে বাস, তবু মনে হয় কতকাল আলোহীন খাঁচায়।
কেউ কারো কাছে আসেনা, শীতল স্পর্শ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকে সব!
ঘরের ভেতরে অন্তরে অন্তরে ফোটে শুধু বিষাদের ফুল, আর বয় আষাঢ়ের জল।
প্রত্যহ সূর্য ওঠে, ডুবে যায়, আমাদের দীর্ঘশ্বাস
দীর্ঘতর হয় স্বজনের লাশ গুনে গুনে।
চোখ আটকে থাকে জানালায় কাচেঁর শার্সিতে। বিবর্ণ সবুজ হৃদয়
মনে হয়, হয়ে গেছি ডাঙার শামুক।
এতো ক্ষুদ্র মনুষ্যজীবন ভাবিনি কখনও আগে আর, এখন কেবলই দেখি স্বপ্নের চোরাবালি-অন্ধকার। অশ্রুমথিত চোখে কেবলই কফিন দেখি, দেখি লাশের স্তূপ আর রঙিন পর্দায় মৃত্যুর বিবৃতি পড়ি।
একদিন যারা ছিলো মত্ত ঘোড়সওয়ার, মৃত্যুর মিছিলে পথহারা বালকের মতো তারাও দিশাহারা। এমন অপ্রসন্ন সময়ে সকলেই জীবনের বাহুমূলে হাত রেখে নিস্তব্ধতার আঁচলে ঢেকেছে মুখ।
চেনা পথ, চেনা প্রান্তর, শহর নগর বড় অচেনা লাগে আজ, আলোকিত রাজপথ শোকের বিছানা।
চাঁদের দীপিকা আর নীলাকাশ জুড়ে কেবলই শুভ্র কাফন। মৃত্যু উপত্যকায় বেঁচে আছি যারা শোকের চাদর গায়ে তারা সব নিঝুম কবর!
এমন বিবর্ণকাল জীবনে আসেনি আগে আর
আঁধারে নিমজ্জিত আলোর বাগানে সব পু?িত বৃক্ষসারি
সাদা জোৎস্নায় জনহীন নগরে ছড়ায় বিদ্রুপের হাসি।
এমন দুঃসময়ে কেবলই দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয় রোদেলা দুপুর।
হায়, আসবে কবে আলোকিত ভোর। আলোর আশ্বাসে প্রাণে দেবে পক্ষী উড়াল।
আশায় আশায় আছি দিবস নিশি
আবার বাজাবো বাঁশি কুয়াশা নগরে, অন্তরে অন্তরে।

মৃত্যুচোখ ছিন্ন করে আসুক সুসময় ফিরে জীবনের কোলাহলে শহরে  নগর। রাজপথ, অলিগলি আবার রাঙাবো সবে কুসমিত ভালোবাসা আলিঙ্গনে।
বিষাক্ত নিঃশ্বাস ভুলে বুকে নিবো সূর্যের ঘ্রাণ, পু?িত স্নেহাদ্রে বৃক্ষের ছায়াতলে সুরভিত নিঃশ্বাসে আবার জুড়াবো প্রাণ অমৃতের জলে।
সুতীব্র আলোর ঘাতে নতুন প্রভাতে আবার গাইতে চাই জীবনের গান অফুরান
ফিরে চাই মুক্তির আস্বাদ।

 

 

 

 

বিশ্বাসের ফেনা সনাক্ত করে মহামারীর দীর্ঘশ্বাস
- কামরুল বসির

বিশ্বাস করি যেখানে ধ্বংস, সেখানেই জন্মের উত্থান
বিশ্বাস করি প্রতিটি শক্ত ঢেউ ভেঙে পড়ে ততোধিক
জলদ নিমগ্নে; বাতাসের বারতা মেঘ উড়িয়ে বহুদূর
তারপর বৃষ্টিমাদল, ধূসর দৃষ্টি ঝাপসা করা প্লাবন।

বিশ্বাস করি ক্ষয়ের উইঢিবির নিচেই দোআশলা মাটি
জলের পরে আবারও সবুজ, জলমগ্ন শ্যাওলাতরু;
পাহাড়ের চূড়ার উপর অজেয় আসমান!

বিশ্বাস করি মানুষ বংশপরম্পরায় মৃত্যুর দিকে
কিংবা মৃত্যু রেখে যায় জীবিতের আশ্বাস; কোন কোন
মহামারী বিলুপ্ত হলে তুলে রাখে নকলনবীশ সংখ্যার
বিয়োগব্যথা বিশ্বকোষে-

বিশ্বাস করি বলেই সময়ের উপর দেয়াল তুলে
কুলিকুচি করি দূর্ভোগ; যখন অন্ধকারে নক্ষত্র দেখি
জানালার ফাকে আর নিরোধ করি স্মৃতি থেকে
কমবয়সী আক্ষেপ!

২০.০৪.২০২০
আইল অফ শেফি

 

 

 

 

 

 

কৃপাময়
- অজয় পাল

কৃপাময়, কৃপা কি করিয়াছো কম?
চাহি নাই তবু দিয়াছো অঢেল
হস্তযুগল ভরিয়া
অকৃতজ্ঞ নই,
ভুলিবো কেমন করিয়া?

এইটুকু জানি তোমার কাছে
চাহিতে কিছুই হয়না
মানব-কষ্ট এতোটুকুও
পরাণে তোমার সয় না।

বলো কৃপাময়, এইবার কেনো
কৃপায় তোমার ঘাটতি
প্রতিদিন মরে হাজারে হাজার
ধরাধামে নেই শান্তি।

অপরাধ যদি করিয়াও থাকে
মানুষ তোমার কাছে
মূল্য কি তার এতো বেশী নেবে
দয়া না তোমার আছে?

ক্ষমা করে দাও, তুমি না মহান
তুমিই তো পারো সব
মৃত্যুপুরীতে ফিরাইয়া দাও
প্রাণের কলরব।

লণ্ডন, ২৬ এপ্রিল ২০২০

 

 

 

হিপোক্রেট
- তৌহিদ শাকীল

দয়ার সাগর এখন ওরা! বাজিয়ে ঢোল করছে বড় দান!
যখন এসব করেছে গ্রাস, কোথায় ছিল প্রাণ?
এই চিত্র কমন ভীষণ! সবখানেতেই এক।
ছল চাতুরির আড়াল থেকেই দিচ্ছে ত্রাণের প্যাক।
মৃত্যু শুধু বাঁচুক মানুষ কঙ্কালসার, হাড় হাভাতের পেট!
হোক না অসুখ, টিকা দেবেই, গৌরী সেন নয়, ধনকুবের গেটস!
তোমাদের শ্রম শেষ হবে না, ৮০-র শ্রমেই ভরবে ২০-এর পেট।
ভাবছো সাধু? তোমার মৃত্যু নস্যি ওদের কাছে, ওরাই হিপোক্রেট!
বিশ্বজোড়া রাজ্য ওদের। ওদের পায়েই বল।
প্রোপাগান্ডার যুদ্ধ এসব। আমরা সবাই ঘাটের মড়া, উলুখাগড়ার দল!
করোনায় নয়, করুণায়ও যাচ্ছে কারোর প্রাণ...
গরু মেরেই দিচ্ছে জুতোর দান।

লন্ডন, ২০ এপ্রিল ২০২০

 

 

লকডাউন
- এ কে এম আব্দুল্লাহ

ফুলতোলা রুমালে আটকে গেলে আতঙ্ক-কোয়ারেন্টিনের দেয়ালগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে। আর আমাদের হার্টবিট বেডয় যায়। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হয়ে আসে। অটোমেটিক অন্ হয়ে যায় লেটেস্ট প্রজেক্টর। ডিসপ্লে হতে থাকে তিনরঙের দৃশ্য। যেখানে তরঙ্গায়িত হতে থাকে আমাদের ভেতরের সিম্পটম।

এরপর লকডাউনের দেয়াল ভেঙে-নেমে এলে অদ্ভুত সাইরেন; বাঁচার আকুলতা মাথায় বেঁধে ঝাপ দিই এন্ড্রয়েডঝিলে-গ্লাসের প্রটেক্টর ভেঙে বন্দী করে নেয়-রেডিয়েশনের পলুই। আর এমব্রয়ডারি ঘোষণা শোনে হাতের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে রিচমন্ড পার্ক-সায়েদাবাদ-লঞ্চঘাট কিংবা কমলাপুর। আর্তনাদগুলো বিভক্ত হতে হতে হারিয়ে যায় ভিড়ের ভেতর।

আহা! ছিপ আঁটা বোতলের ভেতর থেকে- কখনও যদি বেরিয়ে আসে নেশাগ্রস্ত দীর্ঘশ্বাসের দানা; বেঁচে থাকা সময়ের স্ক্রিনে আমিও একটি গল্প হব।

২৩/০৩/২০২০

 

 

 

 

 

 

 

 

আমি মৃত্যুতে নেই
- মিলটন রহমান

মহামারী ও মৃত্যুর মিছিলে এখন আর আমি নেই
কত আর গোনা যায়
গুনতে গুনতে হাতের কড় বেয়ে নেমে যাচ্ছে লাশ
মৃত্যুই বড় অভিলাষ!

নারদ মৃত্যুর প্রাখর্য্যে ধসে যাচ্ছে শ্রী মানব পাহাড়
এ কোন অন্তর্ঘাত
সারি সারি মানববৃক্ষ গণহারে রচে শোক বিচতলা
মৃত্যুই প্রিয় শকুন্তলা!

কি এক শঙ্খচূড় সময় একে একে ঢেলে দিচ্ছে বিষ
সান্ত্রীও আজ ঢালহীন
আমি বধির, আমি কিছু শুনতে চাই না কোন বিলাপ
লাশই আমাদের লাভ!

এই শ্রী ভূমি আর নিজের চেহারায় ফিরবে না সহসা
ভুলেছে নিজের মুখ
আমিও জানি না কখন ফের বাড়িমুখো হবে নির্গূঢ় সময়
হা ঈশ্বর গদ্যময়!

করোনা
- সৈয়দ রুম্মান

মানুষ এভাবেই বেড়ে ওঠে-তার সামনে থাকে তীক্ষ¦ লেখনী অথচ সে তুলে নেয় অসি। অহিংসায় যে গিয়েছিলো কয়েকশ আলোকবর্ষের দূরত্ব সে-ই একদিন বুকে বসিয়ে দিলো কথার খঞ্জর। জবাই হওয়া গরুর গলার দিকে তাকিয়ে যে হয়েছিলো ঈদুল আজহা বিমুখ সে-ই এখন রাষ্ট্রের শীর্ষ জল্লাদ।
মানুষ কীভাবে বেড়ে ওঠে- ভাবতে ভাবতেই ধপাস করে পড়ে গেলাম থমথমে রাস্তার ম্যান হোলে। আসলে মানুষ এভাবেই একলা পোড়ে-তার আশেপাশে সবাই কপর্দকশূন্য খরিদ্দার- তার ঠিকানা নেই কোনো ঘরে। মানুষ এভাবেই একলা পোড়ে।
মানুষ এভাবেই বেড়ে ওঠে-তার বেড়ে ওঠার পথে কতো গালগপ্পো এসে জমে, ফুসে ওঠে মাড়গালা ভাতের বলক হয়ে, তার চোখের নিচে পড়ে কয়লার আস্তরণ- সে এগিয়ে যায় সকল হয়ে ওঠার পথে, অথচ এসব সাজঘরের খোঁজ ধর্ষিত হতে থাকে দর্শকের প্রমোদের অন্তরালে।
মানুষ যেভাবে বেড়ে ওঠে- সেভাবেই একদিন খর্ব হতে থাকে; তার বেহায়া সময় তাকে সম্মুখীন করে বিবেকের মীযানে- মানুষ যেভাবে বেড়ে ওঠে সেভাবেই চলে যায় কোনো এক হন্তারক করোনায়। মানুষ তখন সব যাতনা অন্য মানুষে রেখে চলে যায়।

বার্কিং, লণ্ডন ৯ই মার্চ ২০২০

 

 

ইঁদুরের পিঠে যখন জন্ম নেয় ক্লোনসভ্যতা
- শামীম আহমদ

ঝংধরা লৌহদণ্ডের মতো
ক্লান্ত পৃথিবীর মেরুদণ্ড টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে
পড়লো চোখের সামনেই,
আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, দেখলাম
ক্ষুধার্ত কিছু কুকুর, রাজ্যের ক্ষুধা তাদের, চোখের পুতলিতে পৃথিবীর পুরোটা মানচিত্রের হাড় যেনো মধ্যা? ভোজ!
সময়ের ধ্বংসস্তূপে ক্ষয়ে যাওয়া যে হাড়গুলো জমা হচ্ছে,
মহাকাল কি তার হিসাব কষেছে কখনো?

ল্যাবরেটরির খাঁচায় বন্দি ইঁদুরের পিঠে জন্ম নেয় ক্লোনসভ্যতা
আর তাদের বিষাক্ত ঠোঁটে মানব বিধ্বংসী প্লেগ
ভয়ার্ত মানুষ নিজের চামড়ার নিচে খোঁজে অভয়-আশ্রম!
জন্মান্ধ রাতের পাকস্থলিতে পরিপাক হয় মগজ
অতঃপর পায়ুপথে নির্গত বিবেক কেবলই দুর্গন্ধ ছড়ায়!

লণ্ডন, ২১ এপ্রিল ২০২০

 

 

 


ক্রান্তিকাল
- টি এম আহমেদ কায়সার

রতœা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছি
জগতের অন্যান্য নদীর মত রতœাও এখন বিলুপ্ত-প্রায়
ভরা শ্রাবণ মাসে বৃষ্টির একটু ক্ষীণ ধারা বয়ে যায় শুধু
রাখালেরা কথায় কথায় এই নদী ঘিরে যে মিথগুলি
যে উপকথাগুলি আমরা শুনে এসেছি শৈশবে
শুনে এসেছেন আমাদের পূর্ব পুরুষেরাও  
গরু চরাতে চরাতে সেই গল্পগুলো জাবর কাটে
একে অন্যকে শোনায়

এই নদীতীরেই আমাদের শুরু
কোনো না কোনো নদীতীরেই তো আমরা আসলে শুরু করি
তীরের কোনো বাঁকে দাঁড়িয়েই প্রথম আকাশ দেখে আমরা আঁতকে উঠেছিলাম
নদীকূলেই তো আমরা সঞ্চয় করেছি জীবন বিত্ত আর বিবিধ বৈভব
তীরবর্তী বিস্তীর্ণ মাঠে মেষ চরাতে চরাতে আমরা কেউ ত্রাতা হয়েছি, কেউ প্রেমিক আবার কেউবা প্রবঞ্চক
আমাদের প্রণয়, চুম্বন আর ধ্যানোন্মাদ সঙ্গমের ভেতরও
একটা নাতিশীতোষ্ণ নদীই বয়ে যায়; তীরে রাইখেত, আদিগন্ত ইলামের মাঠ!

শৈশবে শুনেছি রতœা নদীর ঢেউয়ে বাণিজ্যের সব ধন হারিয়ে এক শস্য সদাগর কেঁদেকেটে সেই যে দক্ষিণের পথে হেঁটে গিয়েছিলেন, কোনোদিনই আর ফিরে আসেননি। হয়ত কেউই ফেরে না। এই নদীপারে সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত আর হেরে যাওয়া সব মানুষের গল্প শুনতে শুনতেই আমরা বেড়ে উঠেছি।
এই নিষ্ঠুর উপকূলে আমরাও কেউ হারিয়েছি বাণিজ্যের ধন, কেউবা নিজের রক্তোৎসারিত প্রেম ও আরাধনা-মগ্ন সঙ্গমের সঙ্গী
কেউ আবার বিসর্জন দিয়েছি শস্যদানা, আরো আরো কী কী সব যেন

রতœা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছি
তারপর কেঁদে কেটে লোকালয়ে ফেরে কেউ কেউ ...
অন্যসব সব হাঁটে আরো দক্ষিণের পথে
হাঁটে আরো কুয়াশায়...কখনো ফেরে না!

লিখে রাখি করোনাকাল
- আবু মকসুদ

ইতিহাস ঘেটে পরাজয় পড়া হয় না
মানুষের ইতিহাসে পরাজয় লেখা নেই

সৃষ্টির শুরু থেকে লেখা হয়েছে
বিজয় গাঁথা
সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ নিজকে
বসিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে

মানুষের কাছে পদানত থেকেছে
উদ্ভিদ, উট
মানুষের কাছে পদানত থেকেছে
গেরিলা, বাঘ
মানুষের কাছে পদানত থেকেছে
পানি, পাথর

মানুষের পদতলে পিষ্ট হয়েছে এভারেস্ট
মানুষের হাতে পরাজিত হয়েছে অতল সমুদ্র

মানুষের ইতিহাসে পরাজয় লেখা নেই
এই প্রথম পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ
হজম করতে হল, মানুষের ইতিহাসে
এই প্রথম হয়তো মানুষ পরাজিত হল

করোনা বিজয়ের পতাকা নিয়ে ছুটে যাচ্ছে, তার
দাপটে পদানত হচ্ছে একের পর এক জনপদ

মানুষ পরাজিত হচ্ছে
মানুষ পরাজিত হচ্ছে

ফিনিক্স পাখির প্রাণে
মানুষ আবার উড়বে
পরাজয়ের গ্লানি ভুলে
পুনরায় শুরু করবে

মানুষকে উঠতেই হবে
মানুষকে জাগতেই হবে

হার মানা মানুষের ইতিহাসে নেই
মানুষ হারে না, করোনা মানুষের
ইতিহাস বদলাতে পারবে না

করোনার পরেও যা থাকবে
সে মানুষ
মানুষ লিখবে বিজয়ের ইতিহাস

যদি সময় পাই
- মোহাম্মদ হোসাইন

যদি সময় পাই, যদি বেঁচে যাই
যদি আরেকটি জীবন হাতে আসে
মাফ চেয়ে নেব, তার কাছে, তাদের কাছে যারা আমাকে নিরন্তর প্রশ্রয় দিয়েছে।

যারা আমার ভুলগুলো বরাবর ভুলে গেছে
যারা আমার মিথ্যেগুলো, মিথ্যে জেনেও
নীরব থেকেছে এবং
যারা আমাকে, আমার মত বেড়ে ওঠতে দিয়েছে

সময় পেলে সে ভুল, সে মিথ্যেগুলো শোধরে নেব
নিজেকে গড়ে নেব আবার, যদি বেঁচে যাই

যদি সময় পাই, যদি বেঁচে থাকি
আরও কিছুকাল
মাটি কামড়ে পড়ে রবো, মেখে নেব সারা গায় রোদের অলংকার

যদি বেঁচে যাই
যদি সময় পাই
পেছনে তাকাবো না আর...

আবার যদি সময় পাই
ছেড়ে দেব, ছেড়ে দেব সব
অর্থের বাহাদুরি, মিথ্যে অহংকার কিংবা বেসাতি অসত্যের

যদি আরেকটি দিন, আরও কিছুকাল
বেঁচে থাকি, কোনও ভান করব না
কোনও আড়াল রাখব না
এমনকি নিঃশ্বাস, এমনকি ছায়া
এমনকি পাপ, এমনকি ঘৃণা
সব ভুলে যাব, ভুলে যাব সব

বেঁচে যদি থাকি আরেকটিবার
যদি পাই জীবন আবার
কাউকে কষ্ট দেব না, ক্ষোভে, অভিমানে সরে যাব না দূরে

যদি সময় পাই, যদি বেঁচে থাকি, যদি সময় পাই...

লণ্ডন, করোনাকাল. ২০২০

করোনাকালের পঞ্চপদী
- ফায়সাল আইয়ূূব

ক. আততায়ী

করোনা এখন যেনো আততায়ী বাঘ
বাঘভয়ে মানুষেরা ঘরকোণা ছাগ
কবে কাকে ধরে ফেলে
যমঘরে দেয় ঠেলে
সেই ভয়ে জপে সবে বাঘ ও রে ভাগ!

০২.

করোনার কোপানলে কুপোকাত বিশ্ব
রাজারানি বাদশারা তার কাছে নিঃস্ব
নেই চোখ নেই হাত
নেই মুখ নেই দাঁত
তবু ভয়ে বদলালো দুনিয়ার দৃশ্য!

খ. গিনিপিগ

পৃথিবীটা আজ এক গবেষণাগার
নরনারী গিনিপিগ কাতারে কাতার
মারছে মানুষ তারা
মানবতা দিশেহারা
শতকোটি বাড়িঘর হলো কারাগার!

০২

দানবেরা বানিয়েছে নিরাকার যম
যমেরা কাড়ছে আজ মানবের দম
থাকবো আগের মতো
ক্ষয়ক্ষতি হোক যতো-
মুখে বলা যায় তবে সেই আশা কম।

গ. লাশের নামতা

যে বিষ ছড়ালো তারা মানুষের বুকে
মরে না তাদের কেউ সেই বিষে ধুকে
দুশো নয় দেশে আজ
পড়ছে বিষের বাজ
কারোর ক্ষমতা নেই সেই বাজ রুখে!

০২

লাশের নামতা জপে দিন হয় পার
যদিও মনের ঘরে বেদনা অপার
করোনা বানায় যারা
নিরাপদে থাকে তারা
লাশে লাশে স্তূপাকার কবরের পার!

ঘ. এটাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

কামান বন্দুক নেই, নেই লৌহবস্ত্র
বোমারু বিমান নেই সকলে নিরস্ত্র
তবুও মানুষ মরে
পৃথিবীর ঘরে ঘরে
প্রত্যেক ইঞ্চিতে আজ করোনা সশস্ত্র!

০২.

নেই ট্যাংক নেই বোমা নেই ক্ষেপণাস্ত্র
যুদ্ধের দামামা নেই, নেই সমরাস্ত্র
তবুও চলছে যুদ্ধ
পৃথিবীটা অবরুদ্ধ
করোনা মানুষখেকো সূক্ষ্ম মারণাস্ত্র।

ঙ. করোনাবিষাদ

রোদ হাসে ফুল নাচে নিটোল নিখাদ
অথচ মানুষ দেখে সুগভীর খাদ
খাদের কিনারে নর
ভয়ে কাঁপে থর থর
প্রতিটি প্রাণেই আজ করোনাবিষাদ!

০২

প্রতিদিন হাসে না তো সমান আলোয়
প্রতিদিন কাঁদেও না সমান কালোয়
সুখ ও অসুখ ছুঁয়ে
জীবন সীবন দুয়ে
মানুষ থাকে না ভালো কেবল ভালোয়।

চ. ছঁইতেমরা বেমার

তোমাকে দেয় না ছুঁতে ছঁইতেমরা
তিলে তিলে মরি আজ কইতেমরা
কেউ তো চায় না রোগ
চায় না তো শোক ভোগ
তোমার দূরত্বে আমি রইতেমরা।

মার্চ ২৭, ২০২০ ।। প্যারিস, ফ্রান্স ।