Share |

সভ্য দুনিয়ার মুখোশ খুলে পড়ছে : ভাস্কর্য অপসারণ : হঠাৎ বোধোদয়

আফ্রিকান-আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের টুটি চেপে ধরা রাষ্ট্রের পুলিশ সদস্যটি কি কল্পনা করতে পেরেছিলেন তার কুকর্মটি আধুনিক দুনিয়ার বহু হিসাব-নিকাশ পা?ে দিয়ে?শত শত বছর থেকে নির্যাতিত হয়ে?আসা জনগোষ্ঠীকে ফেলে আসা কিংবা ক্ষমতাশালীদের ইচ্ছে করে ভুলে থাকা পুরান দিনের হিসেব নিতে সাহসী করে তুলবে? শুধু সেই পুলিশ সদস্যের কথাই-বা কেনো আমরা কেউ কি ভাবতে পেরেছিলাম সেই নির্মম ঘটনাটি সারা দুনিয়ায়?আগুন ছড়িয়ে দেবে? কিন্তু বাস্তবতা শোষিত আর বঞ্চিত মানুষকে নতুন এক সময়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
গত মঙ্গলবার টেক্সাস রাজ্যের হিউস্টনে জর্জ ফ্লয়েড শেষ শয্যায়?শায়িত হবার আগেই সভ্যতার দাবিদার দেশগুলোতে শত শত বছরের ঢেকে রাখা কুকীর্তি আবার জনসমক্ষে ফিরে আসছে। মিথ্যা গৌরবের স্থাপনাগুলো মাথা নুইয়ে পড়ছে। কোথাও জনরোষের শিকার হচ্ছে। আবার কোন কোন জায়গায়?কর্তৃপক্ষের হঠাৎই বোধোদয় ঘটেছে। এতদিন যা ছিলো গর্ব?করার আর মানুষকে দেখানোর প্রতীক সেগুলো এখন যাদুঘরে ঠাঁই নেওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে। অতীতের এসব চরম অন্যায়কারী আর নির্যাতনকারীদের নানা ‘অর্জনে’ প্রতিষ্ঠিত দেশ হঠাৎ করেই এদের ভার আর বইতে পারছেনা।
আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ইতালীয় অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভাস্কর্যও যুক্তরাষ্ট্রে ভেঙে ফেলা হলো। বোস্টন ও মায়ামিসহ বিভিন্ন শহরে কলম্বাসের ভাস্কর্য নামিয়ে ফেলা হয়েছে এখন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় আদিবাসী আন্দোলনকারীরা কলম্বাসকে সম্মান জানানোর বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন।
সপ্তদশ শতকে কুখ্যাত দাসবণিক এডওয়ার্ড কুলস্টনের ১২৫ বছরের পুরোনো ভাস্কর্যটি ৭ জুন ব্রিস্টল শহরে বিক্ষোভকারীরা তুলে পানিতে ফেলে  দিয়েছে। এরপর থেকেই পুরানো দিনের দিকে ফিরে দেখা এবং যুক্তরাজ্যে শতকের পর শতক ধরে নানাভাবে প্রশ্নহীন সমাদর পেয়ে আসা রাজনীতিক ও সৈনিকদের বিতর্কিত নানা অধ্যায় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায়?বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনে দাসবণিক রবার্ট মিলিগানের ভাস্কর্য সরিয়ে নেয়া হয়েছে। একই কারণে টাওয়ার হ্যামলেটসে জন কাস স্কুলের নাম পরিবর্তনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। এতদিন তারা ছিলেন পরম পূজনীয় এবং জাতির?গর্বের প্রতীক।
বাংলায় তেতাল্লিশের মন্বন্তরে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য যাঁকে দায়ী করা হয়, সেই উইনস্টন চার্চিলের ভাস্কর্য হামলার ভয়ে?বাক্সবন্দী করে রাখা হয়েছে। ব্যাডেন পাওয়েলের ভাস্কর্য প্রহরা দিয়ে রাখতে হচ্ছে।
ঔপনিবেশিক আমলের এই নৃশংসতা অধ্যায় আরও যাঁদের তাড়া করে ফিরছে, তাঁদের মধ্যে আছে সপ্তদশ শতকের নিষ্ঠুর সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের ভাস্কর্যও। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে এই সৈনিক বাংলা দখল করেছিলেন।
ভাস্কর্য বিতর্কে আরও যাঁদের নাম এসেছে তাঁদের মধ্যে আছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে থাকা দাস ব্যবসায়ী লর্ড সেসিল। বর্ণবাদ, দাস ব্যবসা এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে রাজনীতিক ও সেনাপতিদের এসব ভাস্কর্য এখন সরিয়ে নিয়ে জাদুঘরে স্থানান্তরের প্রস্তাবও আলোচনায় উঠেছে।
কিন্তু বড় কথা হচ্ছে, বহুকাল আগের কুকীর্তির এসব নায়কদের ভাস্কর্য জনসম্মুখ থেকে শুধু সরিয়ে নিলেই সমাজে জেঁকে বসা প্রাতিষ্ঠনিক বর্ণবাদ-বৈষম্য দূর হবে না। তাই আমাদের দাবী হবে, ভাস্কর্য অপসারণের বিষয়টি যেনো পচাপে পড়ে হঠাৎ বোধোদয়ের বিষয় না হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, শুধু ‘মূর্তি’ সরালেই হবে না, মনের ভেতরের ‘ভাব’টাও সরাতে হবে।