Share |

‘লকডাউন’ শিথিল কিন্তু করোনা বিদায় হয়নি : আতঙ্ক নয়, সতর্কতা ও সংযম দরকার

ব্রিটেনে করোনার তাণ্ডবের ভয়াবহতা কমে আসার সাথে সাথেই সরকারী ঘোষণায় একের পর এক খাত খুলে দেওয়া হচ্ছে। গত মার্চের শেষ সপ্তাহে ‘লকডাউন’ জারির পর এপ্রিল ও মে মাসে বিশ্ববাসীর সাথে যুক্তরাজ্যবাসীও এই ভাইরাসের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে।
প্রাণহানি ও এই ভাইরাসে আক্রান্তের হিসেবে ব্রিটেন ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। মৃত্যুর সংখ্যা বিচারেও পৃথিবীর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের পরই ৪৩ হাজারেরও বেশি মৃত্যু নিয়ে যুক্তরাজ্য এখন তালিকায় তৃতীয় শীর্ষ দেশ।
করোনার প্রকোপ ব্রিটেনে এখন অনেকটা কমে এসেছে বটে। কিন্তু এই ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের উদাসীনতা ও বিলম্বিত পদক্ষেপে শুরুতেই কাবু হয়ে পড়ে দেশটি। গত এপ্রিল মে মাসে অত্যাবশকীয় সেবা ও পণ্যের প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও গত সপ্তাহে দেশের অর্থনীতি বাঁচানোর কথা বলে যেসব সরকারী পদক্ষেপে তড়িঘড়ি করে ‘স্বাভাবিকতা’ ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় চলছে তাতে প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই এই ভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ ধেয়ে আসার আশঙ্কাই কেবল জোরদার হচ্ছে।
দু’সপ্তাহ আগে অত্যাবশকীয় নয় যেমন: গাড়ির শো রুম, গার্ডেন সেন্টার ইত্যাদি খুলে দেওয়ার ঘোষণার পর গত সপ্তাহের ঘোষণা মতে, পাব, বার এবং রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি খুলছে আগামী সপ্তাহ থেকে। ইংল্যান্ডের হোটেল এবং সিনেমাও রয়েছে এই তালিকায়। বাদ যাচ্ছে না উপসনালয়, লাইব্রেরি, কমিউনিটি সেন্টার, খেলার মাঠ এবং ব্যায়ামাগারও। এর অর্থ- সবকিছুই শিথিল করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে গিয়ে জনজীবনকে ভয়ঙ্কর পরিণতির দিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, লকডাউন শিথিল করে সবকিছু খুলে দেওয়ার ফলে জনগণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে। জনগণ ধরেই নেবে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে বোর্নমাউথ সমুদ্র সৈকতে যে দৃশ্য দেখা গেছে তারপর অন্য কোন উদাহরণ টানার প্রয়োজন নেই।
সরকার এতোদিন যেসব বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে জনগণকে ‘লকডাউন’ মানতে এবং করোনা মোকাবেলার নানা নির্দেশনা অনুসরণের নির্দেশ জারী করেছে এখন সেই বিজ্ঞানী এবং সরকারী উপদেষ্টাদের সতর্কবাণী সরকার নিজেই উপেক্ষা করছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
২৮ জুন রোববার বিবিসিতে প্রচারিত ‘এন্ড্রু মার শো’তে সরকারের একজন শীর্ষ উপদেষ্টা করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের আশঙ্কা নিয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্যার জেরেমি ফারার আগামী সপ্তাহের আরো শিথিলতা ঘোষণার আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, তার ধারণা জুনের শেষে এবং জুলাইয়ের শুরুতে করোনা সংক্রমণের ঘটনা বৃদ্ধি পাবে।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারের আরেক উপদেষ্টা পরদিন আবারো বলেছেন, ব্রিটেন যদি আরো এক সপ্তাহ আগে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করতো তাহলে প্রায় ২০ হাজার প্রাণহানি কম হতো। অর্থাৎ শুরুতে সরকারের বিলম্বিত সিদ্ধান্তই এই প্রাণহানির অন্যতম কারণ। এখন তড়িঘড়ি করে ‘লকডাউন’ শিথিল করার অর্থ হবে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনার শামিল।
করোনার প্রথম ধাক্কায় ব্রিটেনের সংখ্যালঘু তথা বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষজন সংখ্যানুপাতে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। সরকারী সংস্থার গবেষণাও বলছে, দরিদ্র এলাকায় করোনার ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক অনেক বেশি। তাই সরকারের শিথিলতা ঘোষণায় করোনা বিদায় নিয়েছে ভেবে সতর্কতা ও সংযমকে বিদায় দেয়া উচিৎ হবে না।
যদি দুর্ভাগ্যবশত করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ হানা দেয় তখন দুর্বল, দরিদ্র ও সংখ্যালঘুরাই আক্রান্ত হবেন বেশি। কারণ গত তিন মাসে এদেশের সামাজিক অবস্থা বা পরিস্থিতির বদল হয়নি। তাই নিজের ও স্বজনদের সুরক্ষার জন্য চলাফেরায় সতর্কতা আরো বেশি করে জারি রাখা দরকার।