Share |

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি : মানুষের মৃত্যু নিয়ে আর কত তামাশা দেখতে হবে

সম্প্রতি বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে ঘটনার দিন ৩২ জনের প্রাণহানির খবর আমরা জেনেছি।  পরদিন ৩০ জুলাই পাওয়া গেছে আরও ২ জনের লাশ। এই যে দুর্ঘটনায়?এতো মানুষের মৃত্যু তা কি নিছক দুর্ঘটনা? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া কঠিন।
তবে তদন্ত শুরুর আগেই নৌমন্ত্রী যে তার আগেই বলে দিলেন, এটা একটা পরিকল্পিত ঘটনা! নৌমন্ত্রী কীভাবেই-বা জানলেন এটা পরিকল্পিত ঘটনা! আগের নৌমন্ত্রী বলতেন, কেউ ইচ্ছা করে দুর্ঘটনা ঘটায় না। নতুন মন্ত্রী বলছেন, পরিকল্পনা করে ঘটানো হয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে কী পার্থক্য যা-ই থাকুক দায়িত্বশীল পদে থেকে এই ধরনের মন্তব্য যে, নিরপেক্ষ তদন্তকে প্রভাবিত করে তাতে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সন্দেহ কম।
অভিজ্ঞকা বলছেন, করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে ২৭ জনের বেশি যাত্রী থাকার কথা নয়। অথচ এ ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যুর কথা আমরা জানলাম। কিন্তু পানির তোড়ে কেউ ভাটিতে ভেসে গেলে, তা কোনো দিন জানা যাবে না।
জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ৩০ হাজার নৌযানের মধ্যে ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে মাত্র ৯ হাজারের। এসব ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের। কিন্তু এই কাজের জন্য তাদের জরিপকারী রয়েছেন মাত্র চার-পাঁচজন। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের পরিদর্শন ছাড়াই শুধু মালিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এ নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতিরও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা নদীবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালকের মতে, ‘‘ব্যাগার’ (ব্যাক গিয়ার) দিয়ে মূল চ্যানেলে আসার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, চালকদের অদক্ষতা বা অসাবধানতাই মূল কারণ। এখানে চ্যানেলটা অনেক বড়, পানিও বেড়েছে। কিন্তু তারপরও ময়ূর-২ ব্যাগার দিয়ে মর্নিং বার্ডকে ডুবিয়ে দিয়েছে।’
লঞ্চ পেছনে নেওয়ার সময় নিয়ম হচ্ছে, একজন মাস্টার পেছনে চলে আসবেন এবং লঞ্চের পেছনে যাওয়ার ভেপু (হুইসেল) হবে অন্য রকম, যাতে অন্যরা বুঝতে পারে।
সদরঘাটের আশপাশে চলতি বছরে ঘটা ১৩ নম্বর দুর্ঘটনা ছিল এটা। ১২টির ১টিও আমলে নেওয়া হয়নি। মৃতদেহের সংখ্যা দিয়ে দুর্ঘটনার ঘনত্ব মাপার কালচারের কাছে এসবই ছিল অতি সামান্য ঘটনা ‘সামান্য ক্ষতি’। ১২টির মধ্যে ছিল লঞ্চে-লঞ্চে সংঘর্ষ ৬টি এবং লঞ্চের সঙ্গে ছোট নৌকার সংঘর্ষ ৬টি। এই ছোট ছোট দুর্ঘটনা কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি বলেই আজ এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ধরনের অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে তাঁরা বলছেন, চাইলেই এসব দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। ২০১৯ সালে সারা দেশে লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে ১১৬টি। এগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাক্কার কারণে ডুবেছে ৪৪টি জলযান। ছোট দুর্ঘটনা বা দু-একজন মারা গেলে আমলে নেওয়া হয় না এমন অভিযোগ অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান। তাঁর কথা হচ্ছে, ‘আমরা সব ধরনের দুর্ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এখন কেউ যদি আইন না মানেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ‘১৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার হওয়া’ সুমন বেপারীর বক্তব্য নিয়ে যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে তা যেনো এতোটি প্রাণহানিকে তামাশা করছে। তাঁর বক্তব্যকে ‘অসংলগ্ন’ বলে মন্তব্য করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের অসংখ্য দুর্ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে অভিশপ্ত দুর্নীতির ছায়া। সুতরাং এসব দুর্ঘটনায় দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়ে তাচ্ছিল্য না করে এবং?অভিনব কাহিনী সৃষ্টির সুযোগ না দিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া আশু প্রয়োজন।