Share |

ভাইরাস, ভাইরাল, ভার্চুয়াল ও সারভাইভাল

দিদার আলম কল্লোল
করোনা ভাইরাস এখনও প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক মানুষের প্রাণ গোটা পৃথিবী থেকে কেড়ে নিচ্ছে। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারালো। বিশ্বের ২১৩ টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ নামক নির্দয় এ মহামারীটি ইউরোপ আমেরিকা থেকে অনেকটা সরে গিয়ে এখন ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভর করেছে, লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে আছি আমরা ও ভারত। গেল চব্বিশ ঘণ্টায় ভারতে চার শতাধিক ও বাংলাদেশে তেতাল্লিশ জন সরকারি হিসেবে করোনা ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছে। সরকারি ছুটি, লকডাউন, রেড জোন, ঘরে থাকা, মাস্ক পরা, সামাজিক/শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি কোভিড-১৯ প্রতিরোধে গৃহীত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মানার ব্যাপারে মানুষের  চরম উদাসীনতা, অজ্ঞতা ও অসচেতনতা নাকি বাংলাদেশে আসা চীনা চিকিৎসক দলকেও হতবাক করেছে।
আগে আমরা দুই ধরনের ভাইরাসের সাথে পরিচিত ছিলাম। ১. মৌসুমী ভাইরাস জ্বর ২. কম্পিউটারের ভাইরাস। একটু জ্বর হলেই আগে মানুষ বিষয়টাকে মামুলি ও তুচ্ছ জ্ঞান করত। বলত, এটা তেমন কিছু না, ভাইরাস জ্বর, ঔষধ খাইলে সাত দিন, না খাইলে এক সপ্তাহ। আর এখন সেই ভাইরাসের নাম শুনলেই ভূত দেখার মত চমকে উঠে। আগে কম্পিউটার, ল্যাপটপে ভাইরাস আক্রমণ করে সিস্টেম অচল করে দিত, এখনকার ভাইরাস জীবন জীবিকা নিথর নিশ্চল করে দিচ্ছে। কম্পিউটারের জন্য এন্টি ভাইরাস সফটওয়্যার আবিষ্কার করে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে কম্পিউটারকে রক্ষা করা গেলেও করোনা নামক প্রাণসংহারী ভাইরাসটির এন্টি-ভাইরাস বা প্রতিষেধক বা ঔষধ আজ অবধি আবিষ্কার না হওয়ায় এবং অপর্যাপ্ত আইসিইউ, অক্সিজেন ও স্বাস্থ্যসেবার স্বল্পতাহেতু প্যানিক এ্যটাক হয়েও নাকি কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আপন-পরের নিত্য নতুন সংজ্ঞা শিখছে বিপন্ন মানুষ।
এই করোনায় কিছু অমানুষের অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা, অসততা ও স্বার্থপরতার পরিচয় যেমন পাওয়া গিয়েছে, তেমনি বিপুল সংখ্যক মানবিক মানুষেরও দেখা মিলেছে। কোভিডে জর্জরিত দেশমাতার দুর্দিনে যারা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন তাঁদের স্বার্থপরতার কথাও মানুষ মনে রাখবে। কর্মহীন অসহায় মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ প্রথমদিকে যেভাবে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল এখন সেই উদ্যোগ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। অথচ সরকারি বেসরকারি সাহায্যের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল এখন, কারণ এতদিনে আমরা হাঁটি হাঁটি পা পা করে অন্ধকার করোনা টানেলের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছে গেছি। জানিনা টানেলের অপর প্রান্তে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। মানবিক অমানবিক অনেক ঘটনা ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এগুলো পড়ে কখনো আমরা ব্যথিত, বিস্মিত হয়েছি, কখনো বা আশান্বিত। এখন তাও ঝিমিয়ে পড়েছে। তবে যেটি ভাইরাল হয় না সেটি হচ্ছে মানুষের বোবা কান্না। অতিন্দ্রীয় শক্তির অধিকারী না হয়েও এখন কান পাতলে যে কেউ শুনতে পাবে অজস্র মানুষের বোবা কান্না, দিব্যচক্ষে তাঁদের অসহায়ত্ব দেখতে পাবে, বেদনার বালুচরে লীন কাতর মানুষের আহাজারি শুনতে পাবে।
নেই কাজ তো খৈ ভাজ। এখন দেশ বিদেশের বন্ধুদের খুঁজে খুঁজে বের করে আমরা ভার্চুয়াল তথা ডিজিটাল আড্ডা দিচ্ছি, করোনা না এলে এত বন্ধুর সন্ধান কস্মিনকালেও পেতাম না। এটি এ নিদানে বড় পাওয়া।
যারা আগে থেকেই অসামাজিক ও কিপটে স্বভাবের, অর্থাৎ আত“ীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের ধার ধারত না, দুরত্ব বজায় রেখে চলত, সেইসব ঘরকুনো মানুষের কাছে সামাজিক দুরত্বের কনসেপ্ট নুতন কিছু নয়। তাই সামাজিক দুরত্ব ও ঘরে থাকার ঘোষণায় তাঁরা মোটেই অখুশি নন। তারাতো আগে থেকেই এতে অভ্যস্ত; বাকি জীবনও যদি তাদের দূরত্ব বজায় রেখে চলতে বলা হয় তাঁরা আরো খুশি হবে। এরা স্বভাবে কৃপণ, স্বার্থপর ও লুটেরা প্রজাতির হওয়ায় এবং ব্যাংকে এদের গচ্ছিত টাকার অংক বড় হওয়ায় মধ্যবিত্তের মত সঞ্চয়পত্র ভাঙ্গাতে হয় না। করোনাকাল প্রলম্বিত হলেও তাদের ক্ষতি নেই, তাদের খরচ বাঁচবে, তাঁরা কাজের বুয়া বিদায় করে দিয়েছে, ড্রাইভার বিদায় করে দিয়েছে, অফিসের কর্মচারী ছাঁটাই করেছে। আর এঁরা টিকতে না পেরে দলে দলে ঢাকা ছাড়ছে। কিন্তু আমরা চাই ভাইরাস বিদায় হউক, মানুষে মানুষে দুরত্ব ঘুচে যাক, সুদিন আসুক, সুখে দুঃখে একজন আরেকজনের পাশে গিয়ে দাঁড়াক। আরো চাই মানুষ একে অন্যকে বুকে টেনে, আলিঙ্গন করে, জড়িয়ে ধরে, কোলাকুলি করে তাঁদের হৃদয়ের সমস্ত অর্ঘ্য, উষ্ণতা ও স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আগের মত তাঁদের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখুক।
এখন আমাদের সন্তানরা ভার্চুয়াল ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, ভার্চুয়ালী মিটিং, সম্মেলন, কনফারেন্স সবই হচ্ছে। ফেইসবুকে ভার্চুয়াল টক’ শ, আইন, ইংরেজীসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, সাক্ষাৎকার, রাজশাহীর বাগানের আমের বিজ্ঞাপনের মত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনলাইনে পণ্য কিনে কেউ কেউ প্রতারিত হলেও কোরবানির পশু বেচাকেনার ভার্চুয়াল হাট এখনো ফেইসবুকে বসেনি।
করোনাকালে কম্পিউটারে আমাদের দক্ষতা বাড়ছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত ও স্মার্ট হচ্ছি, সেই অর্থে করোনা কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ বান্ধব। আমরাও সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল কোর্ট করছি, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বিধায় সার্বিক উদ্দেশ্য সাধনে খুব একটা সহায়ক হচ্ছে না। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকজন সতীর্থ আইনজীবীকে হারিয়েছি, প্রতিদিনই এ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে এবং অনেকেই আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন, বারের লাইব্রেরিয়ান মারা গেলেন, বেঞ্চ অফিসার ও স্টাফরা ও আক্রান্ত হচ্ছেন। এহেন কঠিন বাস্তবতা আমলে নিয়ে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে নিয়মিত কোর্ট চালু করার কোন উপায় খুঁজে বের করা যায় কিনা গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। আর যদি একান্ত সম্ভব না হয় তাহলে ভার্চুয়াল কোর্টের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যাতে করে বিচারপ্রার্থী ভূক্তভোগী মানুষ ও আদালতপাড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ স্টেইক হো?ারগণ হয়রানি, ভোগান্তি ও কষ্ট থেকে মুক্তি পায়। অন্যতায় দার্শনিক হারবার্ট স্পেনসারের বিখ্যাত উক্তি ‘সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট’ তত্ত্ব তার বৈশ্বিক আবেদন না হারালেও বাংলাদেশে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট বারের উদ্যোগে করোনা টেস্ট চালু, বারের সদস্য ও পরিবারের করোনা চিকিৎসার জন্য নগরীর তিনটি হাসপাতাল বন্দোবস্ত করা, তম্মধ্যে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ঋণ বিতরণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তথাপি আপনাদের কর্মদক্ষতার কারণে সম্মানিত বিজ্ঞ সদস্যদের আশা আকাঙক্ষা ও প্রত্যাশা আপনাদের কাছে বহুগুণ বেড়ে গেছে।
অন্যভাবে দেখলে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা প্রাণ, প্রকৃতি-পরিবেশ ও কঠিনেরে ভালবাসতে শিখছি। এত দুঃখকষ্টের মধ্যেও সব বয়েসী মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটছে ঘরে ঘরে।

ঢাকা, ২৮ জুন ২০২০
লেখক : আইনজীবী, ঢাকা হাইকোর্ট।