Share |

প্রয়াত মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী এমপি : মানুষের ভালোবাসায় উদযাপিত যে জীবন

মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীর ইন্তেকালে সিলেটের জনগণ হারিয়েছে তাদের পরম এক আপনজনকে। কিন্তু তার প্রয়াণে দেশে-বিদেশে মানুষের মনে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তাতে অনুধাবন করা যায় যে, তিনি মানুষের কত কাছাকাছি ছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ার খবরে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মাঝে যে উথলে ওঠা শোক, বিরাট কিছু হারানোর হাহাকার, তাঁর জানাজায় করোনার ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জনসমুদ্র- এসবই তাঁর প্রতি মানুষের অন্তরের টান আর গভীর ভালোবাসারই বহির্প্রকাশ।
এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর প্রয়াণে কেনো এমন প্রতিক্রিয়া মানুষের মাঝে? এর উত্তর কিছুটা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াতেই রয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনই একটি মন্তব্য ছিলো- ‘দেশে যখন চোর, ডাকাত, চাটুকার দালাল, লুটেরার উৎপাতে জনসাধারণ অতীষ্ঠ! চারিদিকে ভাল মানুষের খরা! ধোকা খেয়ে বিশ্বাসের পারদ প্রায় শূন্যের কোঠায়! এর মাঝেও হাতে গোনা যে কয়জন জনপ্রতিনিধি জনসাধারণের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন, মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী হলেন তাদের একজন। এলাকার উন্নয়নে রেখেছেন বিরাট অবদান। করোনাকালে তিনি দিনেরাত খেটেছেন সাধারণ মানুষের জন্য। একজন সত্যিকারের দেশপ্রমিক হারালো আজ দেশ। তাঁর অভাব কখনো পূরণ হবার নয়। বিনম্র শ্রদ্ধা।’
বিলেতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েও এখানকার অপেক্ষাকৃত নিরুদ্বিগ্ন আর আরামের জীবন ত্যাগ করে তিনি জন্মমাটি সিলেটের ফেঞ্জুগঞ্জকেই স্থায়ী ঠিকানা করেছিলেন। শেকড়ের টান তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো, সেখানেই শেষশয্যায় শায়িত হয়েছেন তিনি। ৬৬ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তাঁর কেটেছে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক আর মানবিক কর্মকাণ্ডে। আশির দশকে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে একাধিক সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রথমে নিজের পারিবারিক সম্পদ দিয়ে এলাকার দারিদ্র বিমোচন ও শিক্ষা সামাজিক উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। এমপিতো হয়েছেন তিনি বহু পরে, ২০০৮ সালে। সুতরাং বলা যায়, রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভের আশায় তিনি জনসেবা করেননি বরং তাঁর সত্যিকারের জনসেবাই তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিয়ে গেছে এবং?এতে তাঁর দল, দেশ এবং?সর্বোপরি এলাকাবাসী উপকৃত হয়েছে।
তিনি বিলেতে নিশ্চয়ই আর্থিকভাবে আরো সফল হতে পারতেন কিন্তু তা না করে বাংলাদেশে অর্থ, সময় আর তাঁর জীবন বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ দেশের উন্নয়নে শরীক হয়েছে। আর তাঁর সব সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড, এলাকার উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো - এসবই তাকে মানুষের অন্তরের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। তিনিও মানুষের এই ভালোবাসা উপভোগ করেছেন, একে মর্যাদা দিয়েছেন।
এমপি, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি এসব নানা পরিচয় তো ছিলোই। পাশাপাশি মিডিয়ার পৃষ্ঠপোষক হিশেবেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশে গিয়ে তিনি জড়িত হন মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘সূর্যোদয়’ পত্রিকার সাথে। এরপর, সিলেট থেকে  প্রকাশ করেন ‘ফেঞ্চগঞ্জ সমাচার’ও। এছাড়া লণ্ডন থেকে প্রকাশিত ব্রডশীট বাংলা সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক পত্রিকা’র তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক।
বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনাল বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপনকারী হিশেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে?থাকবেন। কারণ, এর মাধ্যমেই মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের বিচার চলছে, শাস্তি হয়েছে অনেক অপরাধীর, আরো অনেকের বিচার চলছে। পরবর্তীতে এর বিচার প্রক্রিয়া এবং এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে?চলমান বিতর্ক এখানে ভিন্ন ব্যাপার।
প্রয়াত মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী মানুষকে ভালোবেসেছেন। আর নিজের জীবনে যেমন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অগাধ ভালবাসা উদযাপন করেছেন, বিদায় বেলায়ও অসংখ্য মানুষের সেই ভালোবাসাই তাঁর সঙ্গী হলো। এদিক দিয়ে?তিনি সৌভাগ্যবান।
মহান আল্লাহ তাকে পরকালে শান্তিতে রাখুন।