Share |

বিলেতের বাঙালিদের মূল্যায়ন : জন্মঋণের স্বীকৃতির প্রতীক্ষা

ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালি ও ব্রিটিশ নাগরিকদের কাছে রয়েছে বাংলাদেশের জন্মঋণ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ তৎকালীন পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও স্বৈরাচারি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবীর সূতিকাগার ছিল এই ব্রিটেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ছেষট্টি সালের ৬ দফা দাবী প্রণয়নও হয়েছিল এই ব্রিটেনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবাসী নেতাদের সাথে বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই প্রণীত হয়েছিল ঐতিহাসিক এই ৬ দফা। এছাড়া ৬ দফা আন্দোলনের কারণে শেখ মুজিবুর রহমান যখন জেলবন্দী,তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল পাক সামরিক সরকার, তখন ব্রিটেন থেকে কিইউসি প্রেরণ, মামলা পরিচালনার অর্থদানসহ সব ধরনের আইনী লড়াইয়ে প্রবাসী বাঙালিদের  ছিল অগ্রণী ভূমিকা।
শেষ পর্যন্ত মহান মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় ফ্রন্ট হয়ে ওঠেছিল ব্রিটেন। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র কেনা, অর্থদান, কূটনৈতিক আন্দোলনসহ রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য এই বাঙালিরা চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। এই প্রবাসীরাই প্রথম শূন্য তহবিলে পাওয়া সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে চাঁদা তুলে প্রথম রিজার্ভ গঠন করেন। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামে ধারাবাহিকভাবেই সঙ্গে ছিলেন বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ রাজনীতিক ও জনগণ।
তাই বলছিলাম বাংলাদেশের জন্মঋণ রয়েছে ব্রিটেনের নাগরিক ও প্রবাসী বাঙালির নিকট। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের আলোচনায় প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার ও রাজনীতিকবৃন্দ এ ঋণের কথা স্বীকার করেন, সম্মান জানান। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যেভাবে মূল্যায়ন করার কথা সেভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোর উদ্যোগ দেখা যায় না। গত কয়েক বছর যাবৎ বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীদের অবদানের জন্য ‘বিদেশীবন্ধু’ সম্মাননা প্রদান করে সম্মানিত করেছেন বটে, কিন্তু প্রবাসী বাঙালিদের বেলায় কোন উচ্চবাচ্য নেই।
এখানে অকপটে বলতে চাই, প্রবাসে বাংলাদেশের মানুষ যে অবদান রেখেছেন স্বাধিকার থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এবং তারাই ছিলেন মূলশক্তি, এটা ভুলে গিয়ে আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে বঞ্চিত করছি ইতিহাসের একটি অধ্যায় থেকে। তাই প্রবাসীদের প্রকৃতভাবে মূল্যায়ন করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে প্রকৃত ইতিহাস এবং সুরক্ষা দিতে হবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে।
এখানে উল্লেখ্য যে, বর্তমান সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতাসহ নানান সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং কোন মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানদানের মাধ্যমে দাফনের বিধান সংরক্ষণ করছেন। যথাযথ মূল্যায়ন প্রদান করার এই ব্যবস্থা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। একইভাবে প্রবাসে যারা রয়েছেন এমন কোন ব্যবস্থার প্রচলন করা উচিত যে, দেশে-বিদেশে নতুন প্রজন্ম দেশকে ভালবাসতে আরও উৎসাহী, উদ্যোগী এবং অনুপ্রাণিত হয়।
এমন ধরনের মূল্যায়ণ আকাঙক্ষা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনকালে গুঞ্জরিত হচ্ছে প্রবাসে, নানা মহলে। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতিকে সমৃদ্ধ ও ইতিহাস অভিসারী করেছেন। আজ এ শুভক্ষণে, প্রবাসীদের মূল্যায়ন করার ব্যাপারে জন্মঋণ শোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে- এমন দৃঢ় আশাবাদ রেখে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশবাসীসহ প্রবাসীদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই।