Share |

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ব্রেইকথ্রু : ব্রিটেনে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশী সুহেল আজিজের ম্মৃতিকথা

নজরুল ইসলাম বাসন
ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রথম প্রজন্মের পেশাজীবী সুহেল আজিজ, ‘ব্রেইকথ্রু: মেমোরি অফ এ ব্রিটিশ ট্রেইনড বাংলাদেশী’ নামক এক আত“জীবনীমূলক গ্রন্থ লিখেছেন। মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব মিসেস সালমা সেলিমের কল্যাণে বইটি আমার হাতে এসেছে। এ জন্যে তাকে ধন্যবাদ জানাই। করোনাকালের মধ্যেও বইটি পড়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার উদ্যোগ নিয়েছি বেশ আগে। কিন্তু লেখাতে মনোনিবেশ করতে পারিনি। এ ধরনের একটি বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া অবশ্যই ভালভাবে লিখতে হবে। কারণ এই ধরনের বই লেখার মত মানুষ আমাদের কমিউনিটিতে অল্প এবং লেখা খুবই দুরুহ কাজ। অগ্রজপ্রতীম সোহেল আজিজকে ফোন করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি এই বিরল কাজটি করার জন্যে।
২০২১ এর ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিকে আমি নিজে করোনা আক্রান্ত হই। সেরে উঠার পরও কভিড প্রতিক্রিয়ায় আমার পাঠ প্রতিক্রিয়ায় হয়তো সুবিচার করতে পারিনি। আমি আমার লেখায় অগ্রজপ্রতীম জনাব সোহেল আজিজকে কখনও কখনও শুধু তার নামেই উল্লেখ করব লেখার স্বার্থেই। পাঠকরা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা রাখি।
সুহেল আজিজ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন- ১৯৫২ সালে সিলেট সরকারী পাইলট স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। তারপর কলেজে লেখাপড়া করেন কৃতিত্বের সাথে কলেজের অধ্যয়ন শেষ করে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন সোহেল আজিজ। পাকিস্তান নৌবাহিনীতে চাকুরীতে থাকা কালে উচ্চশিক্ষার জন্যে ইংল্যাণ্ডে আসেন ও ডারটমাউথে ব্রিটানিয়া রয়েল ন্যাভাল কলেজে তিনি ব্রিটিশ এডমিরালিটি কমিশন লাভ করেন। বইটি পড়তে গিয়ে দেখা গেছে লেখক সুহেল আজিজ তার গ্রন্থটিকে নিরস করে লেখেননি বরং ডারটমাউথে অধ্যয়নকালে সুন্দরী ব্রিটিশ তরুণী এ্যানার প্রেমে পড়েন। এই প্রেম পরিণয় পর্যন্ত গড়িয়ে ছিল। বইয়ের এই অধ্যায় একটি সুন্দর প্রেমের গল্প বলে পাঠকদের মনে হতে পারে। সিলেট থেকে আসা একজন যুবক ইংরেজ তরুণীর মন জয় করে তাকে চিরদিনের জন্যে সাথী করে নেয় এটি কি চাট্টিখানি কথা। শুধু প্রেমের কথা নয়, পরের অধ্যায়গুলোতে ফুটে উঠেছে বৈষম্যর কথা যেমন বিদেশী নাগরিককে বিয়ে করার কারনে পাকিস্তান সরকার সুহেল আজিজকে নৌবাহিনী থেকে বরখাস্ত করে। বর্ন বৈষম্যের কারণে সুহেল আজিজের চাকুরি জীবনে বরখাস্তের এই ঘটনা প্রথম হলে ও শেষ ঘটনা ছিল না, আরো অনেকবার তাকে বৈষম্যের মুখোমুখী হতে হয়েছে। লেখক সুহেল আজিজ তার জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা নিয়েই লিখেছেন ‘ব্রেইকথ্রু: মেমোরি অফ এ ব্রিটিশ ট্রেইনড বাংলাদেশী’।
সুহেল আজিজ লিখেছেন, তার বাবা ছিলেন সিলেট কোর্টের একজন আইনজীবী, রাজনীতির সাথেও ছিলেন জড়িত। তিনি আরো লিখেছেন ব্রিটিশ আমল থেকে তিনি মফস্বলের সিলেট শহরে বেড়ে উঠেছেন, স্কুলে পড়ার সময় দেখেছেন, দেখেছেন পাকিস্তান আন্দোলন মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের রাজনীতি। তার আত“চরিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের একটি মফস্বল শহর সিলেটে তার বেড়ে উঠার বেশ কিছু  সামজিক ও পারিবারিক চিত্র বর্ণনা করেছেন। এতে আছে তার প্রতিবেশীদের কথা তাদের খেলার সাথীদের কথা তিনি বর্ণনা করেছেন। তার শৈশব ও তারুণ্যের ঐ সময়টা ছিল পূর্ব পাকিস্তান আমল, ব্রিটিশ থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশ। ১২ শত মাইল দূরে থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরা দেশটি শাসন করতো। ঐ দেশ থেকে তিনি এসেছিলেন ইংল্যাণ্ড, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছিল।
তরুন প্রজন্মের ইংরেজীভাষী বাঙালী পাঠক পাঠিকারা ‘ব্রেইকথ্রু: মেমোরি অফ এ ব্রিটিশ ট্রেইনড বাংলাদেশী’ বইটি পড়লে ঐ সময়কালে আজকের বাংলাদেশের কি অবস্থা ছিল তার একটি খণ্ডচিত্র পাবেন বলে আমার ধারনা। সুহেল আজিজ তার দাদাবাড়ীর ও নানাবাড়ীর আত“ীয়স্বজনদের কথা বলতে গিয়ে তাদের আচার-আচরণের কথা তুলে এনেছেন। এতে তৎকালীন পারিবারিক সংস্কৃতির একটি সামাজিক চিত্রও ফুটে উঠেছে, যা আমাদের তরুণ প্রজন্মের ইংরেজীভাষী ব্রিটিশ বাঙালীদের জন্যে নতুন এক জগতের সন্ধান দিতে পারবে। লেখক সুহেল আজিজ সাহস করে অনেক কথাই লিখেছেন, সব চাইতে বড় কথা তিনি লিখতে গিয়ে সেলফ সেন্সর করেননি। তিনি তার নিজের পরিবারের সদস্যদের কথাও অকপটে লিখেছেন। তার ভাইবোনদের শিক্ষার কথা, তাদের চাকুরী ও ব্যবসার কথা তিনি তার বইয়ে লিখেছেন। বলতে হয় সাহস করেই লিখেছেন, আমার নিজের কথা বললে বলতে হয় আমরা যারা লেখালেখির জগতে আছি তারা জানি বর্তমান পরিস্থিতিতে অবলীলায় সব কিছু লেখা যায় না,লেখকদের সেলফ সেন্সর করতেই হয়। এখন সাহস করে কিছু লেখা দুষ্কর হয়ে গেছে। সৃজনশীল লেখকের জন্ম হচ্ছে না, সৃজনশীল পাঠকের সংখ্যাও কমছে।
বিশেষ করে ফেইসবুকের মত সোশ্যাল মিডিয়ার কারনে এখন সৃজনশীলতার অপমৃত্যু ঘটেছে। মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউব নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
লেখক সুহেল আজিজ তার স্মৃতির পাতা থেকে নিজের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে তাই পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন। এতে পাঠক মাত্রেই উপকৃত হবার কথা। কারণ পাঠক সব সময় সত্য জানতে চায়। ইংরেজীভাষী তরুণ প্রজন্মের যারা বইটি পড়বেন তারা জানতে পারবেন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণের একটি মফস্বল জেলা সিলেট থেকে সুহেল আজিজ ইংল্যাণ্ডে এসে সংগ্রাম করে কি ভাবে তিনি তার নিজেকে ও তার পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। লেখক সোহেল আজিজ যে জায়গায় পৌঁছেছিলেন সে জায়গায় যাওয়া মোটেও সহজ ছিলনা। কিন্তু তিনি সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উপরে পৌঁছেছিলেন। এ জন্যে তাকে প্রচুর অধ্যয়ন করতে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েছিলেন, ট্রেনিং নিয়েছিলেন এসব কথাই তিনি তার বইয়ে লিখেছেন যা তরুণ পাঠককে অনুপ্রাণিত করবে।
এক চাকুরি থেকে আরেক চাকুরিতে গিয়েছেন সোহেল আজিজ, তিনি  কখনও থেমে থাকেননি। তার লেখায় আমরা পড়ি পূর্ব পাকিস্তানের ইনল্যাণ্ড ওয়াটার অথোরিটিতে চাকুরি নিয়ে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জে গিয়ে সস্ত্রীক তিনি থেকেছেন। চট্টগ্রামের ইউনিলিভারের ফ্যাক্টরিতে পার্সোন্যাল ম্যানেজারের পদে চাকুরি করেছেন। চট্টগ্রামে বসবাস করেছেন। ১৯৬৬ সালে আবার ইংল্যাণ্ডে ফিরে আসেন তখন লিসা আজিজের জন্ম হয়েছে। এই লিসা আজিজই পরবর্তীকালে ব্রিটেনের সেলিব্রিটি নিউজ কাস্টার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
লেখক সুহেল আজিজ তার স্মৃতিকথায় পতœী এ্যানার কথা তার দুই কন্যার কথা এনেছেন। তার সংসারে এ্যানার অবদানের কথাও বার বার তিনি তুলে ধরেছেন। তার বইটি পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন প্রেম মানুষকে কত কাছে টেনে আনে। ৫৫ বছর সংসার জীবনের শেষে এ্যানা ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন, এ্যানার তিরোধানে সুহেল আজিজ বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তখন তার স্বজনরা বলেন- আপনার এখন অবসর সময় আছে, স্মৃতিকথা লিখুন। সকলের অনুরোধে সোহেল আজিজ তার স্মৃতিকথা লিখেছেন, এই গ্রন্থটি লেখক সোহেল আজিজকে বহু যুগ বাঁচিয়ে রাখবে।
১৯৬৬ সালে ইংল্যাণ্ডে ফিরে আসার পর সুহেল আজিজের জীবনের সংগ্রামের আরেকটি পর্বের কথা আমরা তার বইয়ে পাই। তিনি ছোট একটি রেলওয়ে স্টেশনে টিকেট ক্লার্ক হিসেবে চাকুরীতে যোগ দেন। কিন্তু তিনি তার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। একের পর এক দরজায় কড়া নেড়েছেন। এক সময় রয়েল এয়ার ফোর্সের দরজা খুললে সেখানে যোগ দেন। সোহেল আজিজ চাকুরী জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশংসনীয় অবদান রেখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: মেম্বার- এডভাইজারি কাউন্সিল অব ইমিগ্রেশন এণ্ড রেইস রিলেশন, কমিশনার- কমনওয়েলথ স্কলারলশীপ কমিশন, মেম্বার- ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাইবুনেল, চেয়ারম্যান- এনএইচএস ট্রাস্ট, চেয়ারম্যান- লণ্ডন প্রবেশন বোর্ড ইত্যাদি। তিনি সরকারের নীতি নির্ধারণী সংস্থাগুলোর পরামর্শক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটেনের বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষপদে দায়িত্ব পালনের পর তার মনে হয়- তিনি যদি পার্লামেন্ট মেম্বার হতে পারেন তাহলে রাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। কিন্তু রাজনীতির দেবী লেখক সুহেল আজিজের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না এ কথা তার বইয়ে তিনি লিখে গেছেন।
লেখক সুহেল আজিজ তার ঈরণটর্পদরমলথদ: ুণবমধর মত ট ঈরর্ধধ্রদ-করটধভণঢ ঈটভথফটঢণ্রদধ ধ্র ওলদটধফ’্রর্ ্রমরহ এই গ্রন্থটিতে তার পরিবারের কথা, ভাই বোনদের কথা যেমন পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন তেমনি  লিখেছেন তার জীবনের অভিজ্ঞতা, ব্রিটেনে তার কর্মক্ষেত্রে বর্ণ বৈষম্য মোকাবেলা করার কথা তিনি লিখেছেন। এ ছাড়াও সিলেটে ও ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির ব্যাপারে তার নিজের পর্যেেবক্ষনের নানা দিক তিনি তার আত“চরিতে তুলে ধরেছেন। যা ইংরেজীভাষীদের বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করবে।
একজন ম্যানেজম্যান্ট কনসালট্যান্ট হিসাবে তার কাজের অভিজ্ঞতা তিনি তার স্মৃতিকথায় তুলে ধরেছেন যা পেশাজীবীদের ভাল লাগতে পারে। তাঁর বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়ায় এটুকু বলতে পারি এ ধরনের বইয়ের সংখ্যা বিরল। জনাব সুহেল আজিজ এই বিরল দৃষ্টান্তমূলক কাজটি করেছেন যা তরুণ পাঠকদের অনেক তথ্য জানার পথ সুগম করে দেবে। এই আত“চরিতের পাঠকদের কাছে সব কথার শেষ কথাটি হলো- লেখক সুহেল আজিজ জীবন সায়া?ে এসে ফিরে যেতে চান তার জন্মভুমিতে। জন্মভুমির প্রতি তার আকুতি ফুটে উঠেছে সমাপ্তি লগ্নে।

লণ্ডন, ১৩ই মার্চ ২০২১
লেখক : সুরমার সাবেক সম্পাদক ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের অবসরপ্রাপ্ত মিডিয়া কর্মকর্তা।