Share |

আখতার, মায়া আর জামিনের গোলকধাঁধা

আসিফ নজরুল
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বয়স হয়েছে। নানা অসুখও আছে তাঁর। এসব বিবেচনায় তিনি যথেষ্ট ধৈর্যশীল মানুষ। তবু কয়েক দিন আগে আমার সঙ্গে আলাপকালে হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর সঙ্গে প্রেসক্লাবের সামনে একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ামাত্র তাঁর আশপাশ থেকে ছয়-সাতজন ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। ধরে নেওয়ার পর অনেক আগে করা কিছু মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাদের জামিনের চেষ্টা হয়েছে, জামিন হয়নি। তিনি ক্ষুব্ধ আর হতাশ হয়ে বলেন, তারা দোষ করলে বিচার হবে, কিন্তু জামিন কেন হয় না বলো আমাকে!
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আশপাশে থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ছেলেদের নিয়ে তাঁর কষ্ট বেশি। আমার কষ্ট এই ঘোর করোনাকালে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া নিয়ে। এদের মধ্যে আমারই বিভাগের ছেলে আখতার হোসেনও আছে।
আখতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে একা অনশন করেছিল। পরীক্ষা আবার নেওয়ার সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সে অনশন ভাঙেনি। এরপর সে ক্যাম্পাসে জনপ্রিয় মুখ হয়ে দাঁড়ায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সে অংশ নেয়, রেকর্ড পরিমাণে ভোট পেয়ে ডাকসুর সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। বছরখানেক আগে টাইফয়েডসহ নানা অসুখে সে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। একটু ভালো হয়ে ঢাকায় চিকিৎসা করতে এসে সে ছাত্র অধিকারের পক্ষ থেকে ছিন্নমূল মানুষকে ইফতার বিলানোর কাজে নেমে পড়ে। কিছুক্ষণ পর তারই বিভাগের সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। গরু বাঁধার রশিতে তাকে দেখা গেল কাঠগড়ায়। জামিন নামঞ্জুর, পুলিশের রিমাণ্ড মঞ্জুর।
শুধু আখতার নয়, গ্রেপ্তারকৃত ছাত্র ও যুব অধিকারের নেতা-কর্মীদের সবার একই অবস্থা। মোদিবিরোধী আন্দোলনে তাদের সহিংসতার কোনো খবর আমি পত্রিকায় পড়িনি। কিন্তু এই প্রতিবাদ কর্মসূচির পর তাদের গ্রেপ্তারের হিড়িক শুরু হয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয় কয়েক মাস থেকে কয়েক বছরের পুরোনো বিতর্কিত মামলায়।
এদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে করুণ হচ্ছে মায়া নামের একটি মেয়ের আটকের ঘটনা। ছাত্র অধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রাশেদ খান ফেসবুক পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, মায়া ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করত। ছাত্র অধিকারের পরিচিত কর্মীদের গ্রেপ্তারের খবর শুনে সে থানায় খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ তাকেও আটক করে। মায়াসহ এমন দর্শনার্থী পাঁচজনকে ঢাকায় দায়েরকৃত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। রাশেদ লিখেছেন, ‘তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ১ সপ্তাহ পরেই। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।’

২.
রাশেদ বা আমাদের বিবরণ সত্যি কি না, এ নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। পুলিশের বিবরণ সত্যি কি না, তা নিয়েও বিশ্লেষণ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এদের জামিন পাওয়ার সুযোগ আইনে থাকা সত্ত্বেও তা দেওয়া হচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর ও বিস্ময়জনক বহু ঘটনা ঘটে এ দেশে।
আমার বক্তব্যের পক্ষে বহু উদাহরণ দেওয়া যায়। শুধু সাম্প্রতিক দুটো তুলনামূলক উদাহরণ দিচ্ছি। সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক এবং কারাগারেই অসুস্থ হয়ে পরলোকগমন করা লেখক মুশতাক আহমেদের ঘটনায় আমরা জানতে পারি, আটক থাকাকালে ছয় ছয়বার তাঁর জামিনের আবেদন করা হয়েছিল, প্রতিবারই তা নাকচ করেছিলেন আদালত। অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে হত্যাচেষ্টা মামলায় পালিয়ে যাওয়া ও পরে ঢাকায় নেমেই গ্রেপ্তার হওয়া সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রন হক সিকদারকে আদালত জামিন দেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। সেও শুক্রবার ছুটির দিনে আদালত বসিয়ে। মুশতাক সরকারের প্রভাবশালী লোককে সমালোচনা করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ছিলেন, অন্যদিকে রন হক সিকদার ক্ষমতাসীন সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি পরিবারের সদস্য।
এমন উদাহরণ আরও আছে। এসব দেখে জামিন প্রদানে সরকারের হস্তক্ষেপ, খবরদারি বা প্রভাব আছে কি না, তা নিয়ে যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন তোলা যায়। না হলে ভিন্নমতাবলম্বী হলেও মুশতাক বা এখনকার আখতার বা মায়াদের জামিন পাওয়া এত দুষ্কর হওয়ার কথা নয়।
জামিন না দিয়ে কারাগারে রেখে দেওয়া একধরনের বিচারপূর্ব শাস্তি। এ জন্য অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং বিশ্বাসযোগ্য মামলা ছাড়া উন্নত বিশ্বে কাউকে বিচারকালে আটকে রাখা হয় না। আমাদের দেশের আইনও অনেকটা তাুই। এখানে জামিন-অযোগ্য বা বড় অপরাধের মামলা থাকলেও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় তিনটি বিবেচনায় আদালতের জামিন দেওয়ার সুযোগ আছে। ক) কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ হলে, নারী হলে বা ১৬ বছরের নিচে হলে বা খ) মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে এমন মামলা ছাড়া অন্য মামলায় কেউ অভিযুক্ত হলে বা গ) কারও অপরাধ সম্পর্কে অধিকতর তদন্ত করার যথেষ্ট কারণে থাকলে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আদালত কাউকে জামিন দিতে পারেন।
জামিনসংক্রান্ত নিম্ন আদালতের অতীতের রায়গুলোয় শুধু আসামির পালিয়ে যাওয়ার বা বিচারে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার আশঙ্কা থাকলে (যেমন সাক্ষীকে হুমকি দেওয়া) জামিন প্রদান করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আইনের এসব বিধান থাকার পর রন সিকদার (এবং সরকারি দলের অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তি) জামিন পেতে পারলে প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় ছাত্র অধিকারের ছেলেরা জামিন পাবে না কেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেন পাবে না ছাত্রদল বা অন্য সংগঠনগুলোর বা ভিন্নমতাবলম্বী কোনো মানুষ?

৩.
বাংলাদেশে বিচারিক বা নিম্ন আদালতের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ বহু পুরোনো। নিম্ন আদালতের বিচারকদের পোস্টিং, বদলি, প্রমোশন, ছুটির আবেদন- এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সরকারের হাতে থাকলে এমন হস্তক্ষেপ করা আরও অবাধ হয়ে পড়ে। মাসদার হোসেনের মামলায় প্রধানত এ কারণেই নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা চাওয়া হয়েছিল।
আমাদের সংবিধানে এখনকার বিধানেও নিম্ন আদালতের রক্ষাকবচ রয়েছে অনেকটা। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, নিম্ন আদালতের কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণক্ষমতা রাষ্ট্রপতি (আসলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে, প্রায়োগিকভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে) হাতে ন্যস্ত, তবে তা প্রয়োগ করতে হবে সুপ্রিম কোর্ট বা উচ্চ আদালতের সঙ্গে পরামর্শক্রমে। মাসদার হোসেন মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এ পরামর্শ মানে অর্থবহ পরামর্শ, সুপ্রিম কোর্টের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর উদ্যোগে বাংলাদেশের কয়েকজন অত্যন্ত সম্মানিত নাগরিকসহ ১৮ জন ব্যক্তি তাই অবশেষে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ হয়েছেন। নিম্ন আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে জামিন প্রদানে সবার ক্ষেত্রে উদার মনোভাব প্রদর্শনের সুযোগ আইনে রয়েছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা রয়েছে সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে জোরালো ভূমিকা রাখার।

৪.
গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রদের ঈদের আগে জামিন পাওয়ার চেষ্টা এখনো চলছে। হয়তো তা সফল হবে, হয়তো হবে না। হয়তো এই ঈদটা আমরা কাটাব আখতার আর মায়াদের মতো নির্মোহ তরুণদের জেলে অন্তরীণ রেখেই। যদি তাুই হয়, এই বেদনা আমাদের সবার বুকে বাজুক। জামিন নিয়ে গোলকধাঁধার অবসান ঘটুক।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক।