Share |

আবার বাড়ছে করোনা : তৃতীয় ঢেউয়ের পদধ্বনি! : বাধানিষেধ প্রত্যাহার নিয়ে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা

পত্রিকা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ০৭ জুন : আগামী ২১ জুন লকডাউন পুরোপুরি তুলে নেয়ার কথা। ওই দিন থেকে উঠে যাওয়ার কথা জীবনযাত্রার সকল বাধা-নিষেধ। ইংল্যাণ্ডের মানুষ দিনটিকে স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার ঐতিহাসিক দিবস হিসেবে উদযাপনে মুখিয়ে আছেন। কিন্তু তীরে এসে তরী যেন ডুবতে বসেছে! গত কয়েকদিন ধরে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকার কারণে সরকারের পূর্বঘোষিত রূপরেখা
অনুযায়ী ২১ জুন বাধা-নিষেধ পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে কি-না তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সরকার বলছে, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে করোনার তৃতীয় দফা হানার আলামত স্পষ্ট। আরও এক সপ্তাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর ১৪ জুন সরকার লকডাউন তুলে নেয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
কিন্তু যুক্তরাজ্যে আবার করোনার সংক্রমণ বাড়াতে থাকার কারণ কি? এর জবাব খুঁজতে গিয়ে স্বাস্থ্যবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনার ভারতীয় ধরনের কারণেই সংক্রমন বাড়ছে। কেননা এ ধরন যুক্তরাজ্যে পাওয়া করোনার ধরনের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি সংক্রামক। সমালোচকরা বলছেন, করোনা ঠেকাতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে গিয়ে সরকার যে দ্বৈতনীতির আশ্রয় নিয়েছিলো এখন তারই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। ভারতে দিনে লাখ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছিলো এবং দিনে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছিলো। ভারতের করোনার ওই ধরণ যে দ্রুত সংক্রামক এবং মরণঘাতি তাও জানা গিয়েছিলো। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সরকার সময় মত ভারতের সঙ্গে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। অথচ পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ অন্যান্য দেশে করোনা পরিস্থিতি ভারতের মত ভয়াবহ ছিলো না। কিন্তু ওইসব দেশের ওপর আগে-ভাগেই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। সমালোচনার চাপে পড়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে সরকার ১৯ মার্চ ভারতের সঙ্গে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ২৪ মার্চ থেকে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই ভারত থেকে লাখ লাখ লোক করোনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে। যার ফলে যুক্তরাজ্যের মানুষ করোনার ভারতীয় ধরণে আক্রান্ত হতে শুরু করে। এখন করোনার যেসব রোগী শনাক্ত হচ্ছে তাদের বেশির ভাগই ভারতীয় ধরণে আক্রান্ত। অন্য ধরনে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে না। কিন্তু ভারতীয় ধরণে আক্রান্ত রোগীদের অনেককেই হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে যুক্তরাজ্যে দৈনিক ৫ হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যাও আছে প্রতিদিন। পাবলিক হেলথ ইংল্যাণ্ডের নতুন তথ্য অনুযায়ী ব্রিটেনে বর্তমানে ভারতীয় ধরনের করোনায় সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। আগের সপ্তাহের চেয়ে গত সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৭৯ শতাংশ। গত সপ্তাহে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১২ হাজার ৪৩১ জন। বর্তমানে ভারতীয় ধরনের করোনা সমগ্র ব্রিটেনে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকা হচ্ছে বো?ন, ব্লাকবার্ন এণ্ড ডারওয়েন।
অথচ জানুয়ারি থেকে টানা লকডাউন এবং ব্যাপক হারে টিকাদানের ফলে যুক্তরাজ্যে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলো। এক সময় দৈনিক রোগী শনাক্তের হার ৬০ হাজার পেরিয়ে যায়। মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় দৈনিক ১৮শ। সেই পরিস্থিতি থেকে রোগী সনাক্তের সংখ্যা হাজার-দেড় হাজারে নেমে আসে। আর মৃত্যু ছিলো না বললেই চলে।
৬ জুন রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন, ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনার ডেলটা ধরন আগের আলফা ধরনের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি সংক্রামক।  
এদিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনার ধরনগুলোর নতুন নাম দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ভারত থেকে ছড়ানো করোনার ধরনটির নাম দেওয়া হয়েছে ডেলটা। আর যুক্তরাজ্য থেকে ছড়ানো করোনার ধরনের নতুন নাম হয়েছে আলফা। এখন যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া করোনার নমুনার বেশির ভাগ ভারতীয় ডেলটা ধরনের।
এ বিষয়ে ম্যাট হ্যানকক বলেন, করোনার আলফা ধরনের তুলনায় ডেলটা ধরনটি ৪০ শতাংশ বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে রাষ্ট্রায়ত্ত সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি গ্রুপ ফর ইমার্জেন্সিসের (এসএজিই) বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
ম্যাট হ্যানকক আরও বলেন, তবে যাঁরা করোনার টিকার দুটি ডোজ নিয়েছেন, তাঁরা করোনার আগের ধরনগুলোর তুলনায় ডেলটা ধরন থেকেও একই রকমের সুরক্ষা পাচ্ছেন।
২১ জুন করোনাসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অতিসংক্রামক ডেলটা ধরন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে জানান ম্যাট হ্যানকক। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা আরও এক সপ্তাহের পরিস্থিতি ও তথ্য পর্যবেক্ষণ করব। এরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এছাড়া ব্রিটিশ ভ্রমনকারীদের জন্য নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। করোনার সংক্রমন বৃদ্ধি পেতে থাকায় ৮ জুন মঙ্গলবার থেকে পর্তুগালকে সবুজ তালিকার দেশ থেকে এম্বার তালিকায় নিয়ে আসা হয়েছে। ভ্রমনকারীদের পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ভ্রমন না করার আহবান জানানো হয়েছে। সেখান থেকে কেউ ফিরলে তাকে ১০ দিন হোম কোয়ারিন্টিনে থাকতে হবে। একই সাথে মিশর, কোস্টারিকা, শ্রীলংকাসহ ৭টি দেশকে লাল তালিকায় নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখনো লাল তালিকার দেশে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ইতিমধ্যে ২ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ করোনার টিকার দুটো ডোজ নিয়েছেন। আর দেশটিতে ৪ কোটির বেশি মানুষকে করোনার টিকার একটি ডোজ দেওয়া হয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের মোট প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অর্ধেকের বেশি।