Share |

হামিদ মোহাম্মদের ‘পঙ্খিরাজ’ ‘পাথরকন্যা’ও মাতাল বাঁশি’ : ত্রয়ী সূত্রপ্রসঙ্গ

ড. সেলু বাসিত

‘বিলেতে কমলগঞ্জের শতজন’ একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমার বক্তব্যটি গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করেছিল, প্রসঙ্গটি ছিল ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের কিংবা কর্মকর্তাদের ও প্রবাসীদের লেখা নিয়ে। বাংলা কিংবা ভারতবর্ষ নিয়ে প্রাচ্যচর্চা ছিল ঔপনিবেশিক ভাব-ভঙ্গি শাসন-প্রশাসন আচার-বিচার পরিচালনার সুবিধার্থে সমাজ-ভাষা-সংস্কৃতিকে বিবেচনা করে দালিলিক উপস্থাপনা। আজকে অনাবাসী সাহিত্যসেবীরা তাদের আত্মপরিচয় এবং শেকড়ের সন্ধানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চাকে উপজীব্য করেছেন।
হামিদ মোহাম্মদের ধারাবাহিক রচনা প্রয়াসের সাথে আমরা পরিচিত ১৯৭৪ সাল; তাঁর উত্থিত বেদনা, মানুষের শ্রেণী-চারিত্র্য,পেশাগত, জাতিগত আত্মপরিচয় উদঘাটন, বিশেষত সাম্প্রদায়িকতা ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও মননকে বি-ঔপনিবেশিকরণের এক প্রচেষ্টা বিশেষ।
সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত তাঁর কথাসাহিত্য এর ব্যতিক্রম নয়,‘পঙ্খিরাজ’, ‘পাথরকন্যা’, আর ‘মাতাল বাঁিশ’ এই তিনটি গল্পের ‘বিবৃত বাক্যবন্ধনে’ আত্মসন্দর্শনের পাশাপাশি জাতীয় অস্তিত্বজিজ্ঞাসা সমষ্টিক উপলদ্ধিতে উৎকীর্ণ হয়েছে।
।। ২।।
হামিদ মোহাম্মদ। জন্ম ১১ জানুয়ারি ১৯৫০। কিন্তু স্কুলের খাতায় লিপিবদ্ধ ৩১ জুলাই ১৯৫৬। পুরো নাম মোহাম্মদ আবদুল হামিদ। কৈশোর রঞ্জিত গ্রাম চেলার চর, উপজেলা ছাতক। সিলেটে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ১৯৮৩ সালে শিকড় সংস্কৃতি চক্র প্রতিষ্ঠা, খেলাঘর, উদীচীর কর্মী এবং শিল্পকলা একাডেমীর ১৯৮৩-৮৭ মেয়াদের কার্যকরি সদস্য এবং ১৯৮৮ সালে লণ্ডনে উদীচী প্রতিষ্ঠার প্রধান কর্ণধার হামিদ মোহাম্মদ। ১৯৮৯ সালে লণ্ডনে উদীচীর উদ্যোগে ও জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর সহযোগিতায় সপ্তাহব্যাপী সর্ববৃহৎ বাংলাদেশ বইমেলার অন্যতম আয়োজক ছিলেন হামিদ মোহাম্মদ। সাপ্তাহিক যুগভেরী অধুনা দৈনিক যুগভেরীর ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত স্টাফ রির্পোটার, সাহিত্য সম্পাদক এবং ১৯৭৬ সালে সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্যপদ লাভ ছাড়াও ১৯৭৮ থেকে ’৮২ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে সিলেট প্রেসক্লাবের কার্যকরি সদস্য।
২০১০ সাল থেকে লণ্ডনে বসবাসসূত্রে সাপ্তাহিক পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটার, লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাব সদস্য এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে উদীচী যুক্তরাজ্য সংসদ-এর উপদেষ্টা, প্রগতিশীল সাহিত্যান্দোলনের অন্যতম প্লাটফরম ‘কবিকণ্ঠ’এর প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধার ছাড়াও যেকোনো প্রতিবাদী আন্দোলনে সোচ্চার কণ্ঠ হামিদ মোহাম্মদ। ২০১৮ সালে লণ্ডনে ‘ধর্ষণ বিরোধী-প্রতিবাদের কবিতাপাঠ’ এবং ‘বর্ণবাদ, সাম্পদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী’ কবিতাপাঠ এবং ‘কবি মুজিব ইরম-এর কবিতা ও সাহিত্য’ নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন হামিদ মোহাম্মদ।
হামিদ মোহাম্মদ প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণায় উজ্জীবিত কর্মনিষ্ঠায় যেমন প্রত্যয় দীপ্ত। সাংগঠনিক জীবন সংগ্রামের মানুষের পাশে থেকে সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, তেমনি তাঁর কথাসাহিত্যে এবং কবিতার শব্দবন্ধে বিচরণ। সমাজজীবনের প্রবাহে প্রতিকায়িত করেন।
।। তিন।।
‘পঙ্খিরাজ’ একটি লোকজ কথন থেকে জীবপ্রকৃত অভিব্যক্তি জানা যায়। তিনি বলেন, ‘পক্ষিরাজ’ তাদের কারোর জীবন বৃত্তান্ত নয়, মূলত অনেক বাস্তবতার প্রেক্ষিত, নানা সংকট, সংশ্লিষ্ট জগত ভাবনাকে উপজীব্য করে লেখা একটি আলেখ্যমাত্র। কাহিনি নির্মাণের কৌশল হিসেবে একটি প্রতীকী চরিত্র সৃষ্টি এবং একে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে আলেখ্য। এতে অনেকেরই যাপিত জীবনচিত্র বলে বিভ্রাট ঘটতে পারে, তবে এ কাহিনি সেই অর্থে কারোর জীবনী বা জীবনীর অংশ নয়। একটি কাহিনির ডালপালা অবশ্যই একটি বৃক্ষসম অবস্থান থেকে উৎকীর্ণ হতে হতে এক সময় দাঁড়ায় কারো না কারোর দোরগোড়ায়। এ কাহিনির অঞ্চল সমগ্র সুনামগঞ্জ জেলা। যে এলাকাটির মানুষ ছয় মাস কাজ আর ছয়মাস প্রেম করে, গানে মত্ত থাকে-সেই উন্মাতাল ভাটি এলাকার লোকাচার বিধৃত। ঘেটু প্রথা, ‘আউলি’, আশ্রম বা আখড়া কেন্দ্রিক পীর-ফকির-বাউল এবং তাদের আসর, মালজোড়া গানের যে বৃত্ত এক সময় ছিল ভাবনার জায়গা-সে সব উঠে এসেছে আখ্যানে। উঠে এসেছে জীব বৈচিত্র, প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম, গ্রামীন নানা প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই, গ্রাম্য অপ-রাজনীতির ঘেরাটোপ, শক্তির প্রতিযোগিতা-প্রভাব বিস্তারের সুক্ষ¦ জাল ছিন্ন করার কথাও।
তবে কাহিনির সবকিছু একটি বিন্দুতে স্থির-যেটি আমাদের লোকসাধকদের লড়াই। একতারা-ই তরবারি, একতারা-ই আগুন ছড়ায়-মন, মনন এবং বিশ্বাসে। এই জীবন সংগ্রামীদের উত্তেলিত সে তরবারি নামে না, সে আগুন থামে না। কাহিনিতে, অনেক সময় আমাদের চোখে ভাসে-চরিত্রের সাময়িক পিছু হটা, কিন্তু এই পিছু হটা বিপুল বেগে সামনে যাওয়ার মন্ত্র যোগায়। শাহ ছইফুল্লা বাউল এমনি একটি চরিত্র, যে চরিত্রটি লড়াই করছে একাধারে গ্রাম্য অপসংস্কৃতি, গোষ্ঠীশক্তি এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে। যে লড়াইয়ের বিস্তৃতি ঘটেছে সুনামগঞ্জ থেকে বিলেত পর্যন্ত।
কাহিনিতে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধকালের অগ্নি উত্থিত ঘটনা সমূহ, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ বর্ণনা। আছে, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে আমাদের সমাজে অমোঘ প্রেরণা ও মুক্তির মন্ত্র হয়েছিল-সে দিনগুলোর কথা। যেদিনগুলোর মাঝে আমাদের সার্বিক মুক্তির লড়াই বলে চি?িত করার বিশ্বাস ছিল প্রোথিত। ‘পক্ষিরাজ’ সেই অর্থে মুক্তিযুদ্ধেরও আংশিক দলিল।’
বস্তুত ‘পঙ্খিরাজ’ জীব-প্রকৃিত- অপরাজনীতি, ধর্মীয় সংকীর্ণতার এক গল্প কথন, যা ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সময়ের প্রত্যন্ত ছাতকের একটি জনপদের চালচিত্র। মূল চরিত্র ছইফুল্লাহ ধর্মের নামে মানসিক অত্যাচারে মানবিক বঞ্চনার শিকার হয়েছে- মাটি ও মানুষের, প্রকৃতির নিসর্গের সৃষ্টের পল্লীবাংলার চলমান লোকচেতনার লোকসংস্কৃতির বহমান লড়াই। খাঁচা থেকে মুক্তবৃত্তে নীলাকাশের উদারতায় বিচরণের উচ্চারণ।
‘পাথরকন্যা’ সেই আঞ্চলিক কর্তৃত্বে শাসিত ক্ষমতা আর কর্তৃত্বের দ্বান্দ্বিক বিবর্তনশীল সমাজ বিফলতার উপস্থাপনা। এ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট সাহিত্য বিবেচক জিষ্ণু রায় চৌধুরীর মতামত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,-‘পাথরকন্যা’র মূল চরিত্র জুলেখা। বীর মুক্তিযোদ্ধা চানমিয়ার স্ত্রী। পাথরকন্যা-র মূখ্য চরিত্র জুলেখা। একসময়ের প্রভাবশালী দত্ত পরিবারের কন্যা, যার পিতা পরিবর্তিত সময়ে মানসম্মান আর নিরূদ্রুপ জীবনের আশায় ধর্মান্তরিত হয়েও জাতীয়/আঞ্চলিক রাজনীতিপুষ্ঠ সুযোগসন্ধানী মানুষের কারণে তা পাননি।
জুলেখার স্বামী চান মিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-দোষেগুণে মানুষ। এক সময়ে স্বচ্ছন্দ বেপারী হয়েও আঞ্চলিক ক্ষমতার শিকার হয়ে কারান্তরালে।
ঘটনা বর্ণনাকালে লেখক অত্যন্ত সাবলীল এবং নিরাসক্তভাবে পাকভারত উপমহাদেশ বিভক্তিকালে আসাম হতে সিলেটের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হবার ক্ষেত্রে হিন্দুদের একটা অংশের আগ্রহী ভূমিকা, মাইগ্রেশনের ফলে কোনো অঞ্চলে বহিরাগতরা সংখ্যাগরিষ্ট হয়ে কর্তৃত্ববান হবার বিষয় সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। নারী এবং দরিদ্রদের ক্ষমতায়নের জন্য সুশাসন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক,অন্যথায় সরকার সৃষ্ট যে কোন সুযোগ ও অর্থ সরবরাহ শুধুমাত্র নতুন করে আরেকটি সুবিধা ভোগী গোষ্ঠী-ই তৈরী করে। জীবনযুদ্ধে অসম সাহসী প্রত্যয়ী পাথরকন্যা জুলেখার মৃত্যু তারই প্রমাণক।
 আঞ্চলিক বাক্যালাপের প্রয়োগ উপন্যাসটিকে সুষমা মণ্ডিত করেছে। পাথরকন্যা উপন্যাসের মোড়কে একটি সামাজিক দলিল হিসেবেই আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে।’ এই পটভূমিতে বিবেচ্য ‘মাতাল বাঁশি’ আখ্যান। ‘মাতাল বাঁশি’র কাহিনি বিন্যাস ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশের বাস্তব সমাজ জিজ্ঞাসার চিত্রময়তা, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার করুণচিত্র এবং এ থেকে উত্তরণের এক প্রচেষ্টার বিফল গ্লানি, পুঁজিবাদী সামন্তবাদী ক্ষয়িষ্ণু সমাজের নখদন্ত প্রসারিত বাস্তবতাকে তুলে ধরে নায়িকা মাধুরী বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় ব্যক্তিত্বের উদ্ভাসিত আলোর নিজস্ব মাতৃত্বের ছায়ায়।
স্পষ্টভাবে একটা কথা বলা যায় ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ আর ১৯৭১ থেকে ২০২১ এই অতিমারিকালের বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-আত্মচৈতন্য দ্বিধা-দ্বন্দ্ব জীবনের বহমান সংগ্রাম সংকট সমাজ সম্পর্কে এর বিবরণ পাওয়া যায় হামিদ মোহাম্মদের এই ত্রয়ী কথাসাহিত্যের শস্য-স্বপ্নে।
পাবলো নেরুদার কথায় বলি- ‘প্রকৃতির সঙ্গে প্রথম সংঘাতে কবি এসে দাঁড়ালেন মানুষের পাশে-মানুষের ভাষায় অলংকৃত হল কবিতা। আজকের দিনের গণকবিয়াল সেই আদিম গুহায় পুরোহিতেরই বংশধর। পুরাকালে যে কবি অন্তকরণের সঙ্গে সমতা স্থাপন করেছিলেন, আজ তিনিই বসেছেন আলোর রাস্তায়’।
।।৪।।
ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা, সন্ত্রাসবিরোধী, বৈষম্যবিরোধী, জীবন-সৃষ্টির মৌলিকত্ব আজ অনেকাংশে পীড়িত। মনোজাগতিক বাস্তবতায় রণেশ দাশ গুপ্তের উপলদ্ধি স্পন্দিত করে। তিনি বলেন, সর্বস্তরের মানুষের বৃদ্ধিবৃত্তিক আনন্দ উপন্যাসের মাধ্যমে যেভাবে আনন্দ দেওয়া যায়, প্রভাবিত করা যায় মানসক্ষেত্রকে, সেভাবে আর অন্য কিছুর দ্বারা অত সহজে নয়। ঔপন্যাসিক ক্ষরণের সূত্র খুঁজে চেতনাধারাকে উদ্ভাসিত করেন।
হামিদ মোহাম্মদের ত্রয়ী বর্হিবাস্তবের চিত্ররূপের প্রতিফলনের এক ক্যানভাস- যা কালানুগ দ্যোতনার বন্ধনে দৃশ্যান্তর চিত্র আখ্যান- এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

লেখক: ভাষা বিজ্ঞানি, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও গ্রন্থকার।

কবি হামিদ মোহাম্মদ : প্রিয় হামিদ ভাই, কবিবংশের লোক
মুজিব ইরম
জন্মদিনে ক’লাইন

আমরা যারা
সাত গাঁটি চাকু নিয়ে পথে নেমেছিলাম
রেখেছিলাম লম্বাচুল
দেখো
তোমার নিকটে এসে
তারা কতো সুবোধ হয়েছি...

আমরা যারা
আফালি বাতাসে
লালঝাণ্ডা হাতে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম
দেখো
তোমার বন্দনা গীত গেয়ে গেয়ে
তারা কতো সংসারী হয়েছি...

বয়স হয়েছে ঢের
লোকে বলে বৈদেশী লোক
জন্মদিনে মনে পড়ে ঘরহারা মানুষের মুখ।

নিজের এই কবিতাটি যখনই পড়ি প্রিয় হামিদ মোহাম্মদ ভাইকে চোখের সামনে দেখতে পাই। কবিতাটি মৎ প্রণীত ‘পাঠ্যবই’ গ্রন্থে গ্রন্থিত রয়েছে। মনে পড়ছে হামিদ ভাইকে কোনো এক জন্মদিনে কবিতাটি কোনো এক পত্রিকায় ছেপে প্রীতি উপহার দিয়েছিলাম। সদ্য প্রকাশিত কবিতা সংগ্রহ ‘ইরম পাদানাম’ বইটিও তাঁকে উৎসর্গ করেছি। এত সব ভালোবাসার গূঢ় কারণ নানাবিধ। হামিদ ভাই মায়ার মানুষ, কবিবংশের কবি, কথাসাহিত্যিক, রক্তেমাংশে প্রগতিশীল মানুষ, ঘোরগ্রস্ত লোক, সংগঠক, সাংবাদিক, চির তরুণ। আরও আরও নানাবিধ বিশেষণে তাঁকে ভূষিত করা যায়। হামিদ ভাই নগর লণ্ডনে থাকেন, কিন্তু দেখা হয়নি কখনো। আমাদের অকাল প্রয়াত বন্ধু, কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু সব সময় হামিদ ভাইর কথা বলতেন। হামিদ ভাইর কবিতা ও গদ্যের কথা বলতেন। চিন্তাচেতনার কথা বলতেন। খুব ভালোবাসতেন হামিদ ভাইকে। তাঁরই প্ররোচনায় ‘বাংলা একাডেমি ইউ কে’ হামিদ ভাইকে কবিতার জন্য ‘শ্রী চৈতন্য স্মৃতি পুরষ্কার ২০১৬’ দিয়েছিলো। খুব খুশি হয়েছিলাম। হামিদ ভাইকে কখনো বলা হয়নি, সেই পুরস্কার কমিটিতে জড়িত ছিলাম, এবং একমাত্র হামিদ ভাই এই পুরস্কারের যোগ্য বলে রায় দিয়েছিলাম। সেই অনুষ্ঠানেও হামিদ ভাইর সাথে আমার দেখা হয়নি। কী এক কারণে উপস্থিত থাকতে পারিনি। অভিনন্দনও জানাতে পারিনি। তখনও হামিদ ভাইর সাথে কোনো যোগাযোগই ছিলো না। ফোনে কিংবা ব্যক্তিগত। হামিদ ভাইর সাথে জীবনে একবারই দেখা হয়েছে, তাও অনেক পরে। নগর লণ্ডনে। বছর কয়েক আগে। বলা নেই কওয়া নেই হামিদ ভাই আমাকে নিয়ে হঠাৎ করে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেললেন। আমি খুব শরমিন্দা হলাম। এ-জীবনে প্রকাশনা উৎসব, বা সম্বর্ধনা, বা নিজেকে কেন্দ্র করে কোনো অনুষ্ঠানের কথা উঠলেই আমি দূরে থেকেছি সব সময়। তাই কখনো এসব ঘটেনি। এবারও তাই হামিদ ভাইকে বাঁধা দিতে থাকি। তবে সব ধরণের বাঁধাই ব্যর্থ হয়। কিছুতেই থাকে নিবৃত্ত করা যায়নি। হামিদ ভাইর মায়া ও ভালোবাসায়, পাগলামিতে শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজি হতে হয়, এবং নগর লণ্ডনে উপস্থিত থাকতে হয়। তারও একটি কারণ আছে, হামিদ ভাই কেনো জানি আমার প্রতিটি বই ধরে ধরে দিনের পর দিন তাঁর অন-লাইন পত্রিকায় গদ্য লিখেছেন। সেই গদ্য একত্র করে পাণ্ডুলিপি করে রেখেছেন। জানা নাই, শোনা নাই, একজন অগ্রজ কবি আস্ত একটি বই লিখে ফেলেছেন, ভাবতেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। হামিদ ভাইকে দেখার জন্য নগর লণ্ডনে রওয়ানা দিই। আর দূর থেকে দেখতে পাই ছোটখাট গড়নের হামিদ ভাই নয় যেন ‘আস্ত একটা হৃদয়’ আমার দিকে হেঁটে আসছেন, জড়িয়ে ধরছেন মায়ায়, ভালোবাসায়, মুগ্ধতায়। তারপরও হামিদ ভাই থেমে থাকেননি। তাঁর কবিতাসংগ্রহ-১ প্রকাশিত হলে দেখতে পাই নিজের নাম বইটির উৎসর্গ পাতায় জ্ঝল জ্বল করছে। আবারও আমি আবেগাক্রান্ত হই। এত সব ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশ্যে বলার কারণ, হামিদ ভাই একাত্তর শেষ করেছেন, বাহাত্তরে পা দিয়েছেন; সাপ্তাহিক পত্রিকা তাঁকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন করছে। জন্মদিনের এই সুযোগে হামিদ ভাইর প্রতি নিজের ঋণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সুযোগ নিলাম। প্রিয় হামিদ ভাই, আপনি আমার মায়ার মানুষ, প্রিয়জন। শুভ জন্মদিন হামিদ ভাই। জীবন আপনার কবিতাময় হোক। জয় হোক।

আমি কত দূর

আমি খাসিয়া পাহাড়ের দিকে যাচ্ছি
আমার সামনে সটান শুয়ে আছে পৃথিবী।

দূর থেকে মনে হয়
নীল রমণীর বুক
কে যেন রেখেছে
ক্রুশবিদ্ধ যীশুর দোসর করে।

আাহ! কত সুশ্রী! যুগ যুগ ঠোঁট কাঁপে
চোখের পাতায় নামে বিস্ময়
ধবল মাঠের পা ধরে কৃষাণ তাকায়
কোনো প্রেমিকা বুঝি অগাধ প্রেমে
মাতাল চুমোয় বিদ্ধ। দে

আমার সামনে খাসিয়া পাহাড়।

আহা! ঐ উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে কেমন লাগবে
পৃথিবীকে খুব বিস্তৃত দেখাবে, বিশাল!
ওখানে উঠলে খুব দূর পর্যন্ত দেখা যাবে বুঝি?
দেখা যাবে-প্রিয় শব্দগুলো কত দূর
আমি পৃথিবীর মানুষ থেকে কত দূর!

এই কবিতাটি কবি হামিদ মোহাম্মদ ভাইর কবিতাসংগ্রহ-১ থেকে যখনই পড়ি, ভালো লাগে। কেনো ভালো লাগে বলা হয়তো সহজ নয়। তবে কবিতাটি পড়ার পর মনের ভেতর কী যেনো কী ঘটে। মনে হয় পৃথিবীর কোনো এক খাশিয়া পাহাড় সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার দিকে যাচ্ছি তো যাচ্ছি। কবিতার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। ব্যাখ্যা করা সম্ভবও নয়। তাই কবিতাটি এখানে তুলে দিলাম। পাঠকও হয় তো কবিতাটি পড়ার পর পৃথিবীর কোনো এক খাশিয়া পাহাড়ের দিকে হাঁটতে থাকবেন। খোঁজ করবেন তাঁর আরও আরও কবিতা। সেই সব পাঠকদের জন্য জানিয়ে রাখি, কবি হামিদ মোহাম্মদ বিরচিত কবিতাসংগ্রহ-১ প্রকাশিত হয়েছে অনার্য প্রকাশনী থেকে। ২০১৯ এর বই মেলায়। আগেই উল্লেখ করেছি, বইটি ভালোবেসে আমাকেই উৎসর্গ করেছেন। ৩৪৪ পৃষ্ঠার এই সংগ্রহে যুক্ত হয়েছে চারটি কবিতার বই: স্বপ্নের লাল ঘুড়ি (২০০৬), আমার মৃত্যুর পর কোনো শোকসভা হবে না (২০১৬), উড়াল পাখি (২০১৬), তোমার অনিন্দ্য নাম (অগ্রন্থিত)। হামিদ ভাই মূলত কবি। কথা সাহিত্যিক। গদ্যকার। অসাধারণ তিনটি উপন্যাস লিেেখছেন। গেলো মেলায় বের হয়েছে ‘পঙ্খিরাজ’, নাগরী প্রকাশনী থেকে। তিন তিন বার বইটি পড়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। সিলেট অঞ্চলের একজন বাউলকে কেন্দ্র করে লেখা ‘পঙ্খিরাজ’ সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলা উপন্যাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। হামিদ ভাই দেশের বাইরে থাকেন, নীরবে কাজ করেন, যার জন্য বইটি নিয়ে হয়তো আমাদের মিডিয়া তেমন কথা বলবে না, দেশে থাকা সাহিত্যের লোকেরাও হয়তো এড়িয়ে যাবে। তাতে একজন প্রকৃত উপন্যাসিক হামিদ মোহাম্মদের কিছু যাবে আসবে না। প্রকৃত পাঠক ঠিকই বইটি খুঁজে বের করবে। এবং সমাদৃত হবে। তাঁর অন্য দুটি উপন্যাস ‘পাথরকন্যা’ ও ‘মাতাল বাঁশি’ প্রকাশের পথে। এই তিনটি উপন্যাসে হামিদ ভাই যে অসাধারণ কাজ করেছেন, তার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন বলেই আমার বিশ্বাস। প্রিয় হামিদ ভাই, আপনি আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

একটি মুগ্ধ করা বিকেল
সৈয়দ হিলাল সাইফ
আমি আত্মভোলা মানুষ। ছিলাম ইংল্যাণ্ডের উত্তরপূর্ব কোণে সমুদ্রপারে। দীর্ঘ বসবাসের স্মৃতি সেখানে সমুদ্রের ঢেউর সাথে আলোড়িত। সম্প্রতি নগর লণ্ডনের ব্যস্ত জীবনে আমি সংযুক্ত হয়েছি। আগে আকুবাকু খেতাম লণ্ডনে আয়োজিত কোন সাহিত্য অনুষ্ঠানের খবর দেখে। অনুপস্থিতিটাই বুক জখম করে তুলতো। আর এ যাতনায় আত্মভোলা হয়ে যেতাম, ক্ষতটি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। এখন থাকি লণ্ডনে। কিন্তু আত্মভোলার দোষ যায়নি। সেদিন ছিল ২৪ জুলাই কবি হামিদ মোহাম্মদের দুটি গ্রন্থ ‘কবিতাসমগ্র’ ও উপন্যাস ‘পঙ্খিরাজ’ পাঠ ও আলোচনা। আয়োজন করেছিল কবিতার প্লাটফরম ‘কবিকণ্ঠ’। স্থান বাংলা টাউনে লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাব কার্যালয়। ভুলে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত দৌঁড় দিতে হল।
 আলোচনা ও আবৃত্তিতে অংশ নেন বিলেতের কবি, সাহিত্য সুহৃদ ও আবৃত্তিকারসহ অনেক তারকা মুখ। কোভিড-১৯-এর ঝড়ের মাঝে এমনি একটি আয়োজন ছিল সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জিং। অনুষ্ঠানটি আয়োজনে মনে হয়নি এ কঠিন সময়ে বোকামি কোন উদ্যোগ সফল হবে, যেখানে থরথর কম্পমান কোভিড-জ্বরাক্রান্ত লণ্ডন। কিন্তু কোভিডকে কোন পাত্তা না-দিয়েই সব শংকাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে কবিকণ্ঠ নেমে পড়ে কবিতার টানে এক উজ্জ্বল ইতিহাসের সন্ধানে।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে লীডস থেকে লণ্ডনে পৌঁছে যান কবি টি এম আহমেদ কায়সার। পাশাপাশি সময়ে ব্রিকলেনের গলির ভেতর অনেকটা চুপচাপ ঘুমিয়ে-থাকা লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে পৌঁছে যান কবি হামিদ মোহাম্মদও। আসেন ক্যামেরাশিল্পী শ্রী সুভাস দাশ। একটু পর আসেন তরুণ লেখক ফেরদৌস কবির টিপু। একে একে আসেন কবি শাহ শামীম আহমদ, শামীম শাহান, সারওয়ার-ই আলম, শিক্ষাবিদ আবদুর রকিব, রীপা রকিব, আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী ও ইয়ামীন মাহমুদ পলিনসহ কাঙিক্ষতজনরা। দেড় বছরের মাথায় এই প্রথম কোন সাহিত্যানুষ্ঠান পূর্ব লণ্ডনে। আগত প্রত্যেকেরই চোখেমুখে ছিল সতর্কতার চাপ। কবি হামিদ মোহাম্মদ বললেন, আয়োজন নিয়ে যাদের সাথেই তিনি কথা বলেছেন, কেউই কোভিডপ্রকোপ নিয়ে কথা না বলে উৎসাহ দেখিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যসুহৃদরা। তিনি বলেন, আগ্রহভরে সকলেই বইগুলোর পিডিএফ কপি চেয়ে নিয়েছেন। কবিতার বইটি অনেক বড়, এটি সমগ্র। উপন্যাসও বেশ বড়, আট ফর্মার। ব্যস্ত জীবনে আলোচকদের জন্য বইগুলো পড়া মহাবিপদ বা বড় চাপই বলা যায়। কবি হামিদ মোহাম্মদ শঙ্কিত ছিলেন আলোচকদের এত কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করার জন্য এক বস্তা গালি বহন করে তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। অনুষ্ঠান শুরুর পর দেখা গেল, সে শংকা নেই। বইগুলোর কন্টেন্ট ধরে ধরে আলোচনা হচ্ছে।
কোভিড-১৯ এর প্রকোপের দীর্ঘ পৌনে দু’বছর পর লণ্ডনে আয়োজিত কোন সাহিত্যানুষ্ঠান সত্যিকার অর্থে ছিল এক অপার মুগ্ধ করা একটি বিকেল।
কিন্তু মুগ্ধ করা বিকেলটা ছিল আলোচনা ও আবৃত্তিতে ভরপুর। কবি ময়নূর রহমান বাবুল, শাহ শামীম আহমদ ও শামীম শাহানের আলোচনায় উঠে আসে সিলেট ও লণ্ডনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, কবিতার ঝড় উঠা বিকেল সন্ধ্যা এমনকি রাত জাগা অনেক স্মৃতি। আহবাব মিয়া ও ফেরদৌস কবির টিপু আলোচনা করেন দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের মাঝে হাবুডুবু খাওয়া নানা মুহূর্ত। সব বিষয়ই ছিল তৃপ্তিদায়ক, আনন্দদায়ক। সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমদ বলেন, কবি হামিদ মোহাম্মদের অনেক দোষ রয়েছে, যে কোন বিষয় নিয়ে সহজে ঝগড়া বাধান। কিন্তু গুণ হল, তাকে রাত দুটায়ও যদি কোন বিষয় দিয়ে বলেন, একটি নিউজ করে দেন বা টাইপ করেন দেন, নির্বিবাদে করে দেবেন। তার অনেক কবিতাই আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। একটি কবিতা খুব ভাল লেগেছে- কবিতাটি ‘আমার মৃত্যুর পর কোনো শোকসভা হবে না’। তার এই অকপটে বলাটাও একটি সাহসের বিষয়।
এরপর আলোচনায় যুক্ত হন কবি সারওয়ার-ই আলম। কবি হামিদ মোহাম্মদের সাথে সারওয়ার ই আলমের পরিচয় বছর তিনেকের, লণ্ডনে। কিন্তু কবির কবিতা, লেখালেখি নিয়ে তীর্যক দৃষ্টি ছিল প্রখর। সারওয়ার-ই আলম কবি হামিদ মোহাম্মদের কবিতার বই থেকে অনেক কবিতার স্তবক উদ্ধৃত করে, কবিতার নির্মাণ কৌশল, চিন্তার ব্যাপকতার ভেতরবাহির নিয়ে আলাপে জমিয়ে তুলেন। কবিতার ছন্দ, গতি ও সৃষ্টি নিয়ে নানা কথা বলেন তিনি।
আলোচনায় যোগ দেন নাট্যকার ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বুলবুল হাসান। তিনি প্রথমে কবিতাসমগ্র নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ষাট ও সত্তর দশকের কবিদের উৎসুক পাঠক হিসেবে বলেন, হামিদ মোহাম্মদের কবিতায় কখন মনে হয় কবি আবুল হাসান, কখনো মনে হয় শামসুর রাহমানে ফর্ম, চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। আবার মনে হয় একটি নতুন ধারার স্রোত প্রবাহিত। কবিতায় ব্যবহৃত ভাষা, শব্দপ্রয়োগ খুব সহজ এবং নিজস্ব।
‘পঙ্খিরাজ‘ উপন্যাস নিয়ে বলেন, হামিদ মোহাম্মদের নিজ সিলেট অঞ্চলের গ্রাম্য অপ-রাজনীতি, মৌলবাদী ঘোর আর বাউল সম্প্রদায়ের প্রতি খড়গহস্ত হওয়ার যে বিবরণ দিয়েছেন, তা সত্যিকারভাবে একটি বিপন্ন সময়ের চিত্র। উপন্যাসে অনেক বিষয় অভিজ্ঞতাসঞ্জাত উঠে আসা চরিত্রটি লেখকেরই অভিজ্ঞতার কথন।
প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় ও আলোচনায় অংশ নিয়ে কবি টি এম আহমেদ কায়সার বলেন, ‘পঙ্খিরাজ’ এমন একটি উপন্যাস যার ভেতর এতো রসদ রয়েছে, ভবিষ্যত লেখকদের জন্য একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। লেখক একজন সংস্কৃতিকর্মী, তাই চিত্রিত চরিত্র ছাপিয়ে নিজেও স্পষ্ট হয়ে কথা বলেছেন। বইটি পাঠে মনে হয়েছে নিজ এলাকার ঘটে যাওয়া চলমান নানা ঘটনার না-থামা এক বাস্তব ভূমির গল্প।
সবশেষে সৈয়দ এনামুল ইসলাম সমাপনি বক্তব্যে বলেন, হামিদ মোহাম্মদের সব বই-ই আমার পড়া। ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত লেখা কবিতাসমগ্র ৩৪৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থ। প্রায় চারশ কবিতা। কবিতার উৎকর্ষতা বিচারে মনে হয়েছে-বহুদিন পাঠক পড়বে। আর ‘পঙ্খিরাজ’ উপন্যাস অনেক সত্য ঘটনার পরম্পরা। এর চরিত্র, চিত্রময়তা আমার পরিচিত। ‘পঙ্খিরাজ’ পাঠে এটা মনে করার উপায় নেই যে গ্রন্থটি কালজয়ী নয়। অন্যান্য গ্রন্থ ‘জাহাঙ্গীরর ডর, পাথরকন্যা, মাতাল বাঁশি’ ও বিভিন্ন কথা ও আলোচনায় উঠে এসেছে।
কবি নিজে কথা বলেন। উত্তর দেন। তবে বিনয়ের সাথে বলেন, আমার নামের আগে কবি বা লেখক শব্দ কোনটাতেই আমি স্বস্তিবোধ করি না। কেননা, আমার লেখালেখি এমন কোন সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম নয়,যার কারণে নিজেকে কবি বা লেখক পরিচয় দেব। আজ সকলে ভালবাসাই আমাকে মুগ্ধ করেছে।
এগুলো ছিল এ দিনের নিরস আলোচনা। কিন্তু উপস্থিত সকলেই আগ্রহ ভরে শুনেছেন, আনন্দবোধ করেছেন। অনুষ্ঠানে সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল অনুষ্ঠানে অনবদ্য আবৃত্তি। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে আবৃত্তিতে অংশ নেন মানবাধিকার কর্মী অজন্তা দেব রায়, সাংস্কৃতিক কর্মী ইয়াসমীন মাহমুদ পলিন, বাচিক শিল্পী শহিদুল ইসলাম সাগর ও সালাউদ্দিন শাহীন এবং মানস চৌধুরী। অনুষ্ঠানে হামিদ মোহাম্মদের একটি কবিতাকে উপস্থিত সময়ে সুর দিয়ে গান পরিবেশ করেন সঙ্গীতশিল্পী সঞ্জয় দে। রেশ কাটতে না কাটতে একটি মধুরতম মুহূর্ত উপহার দেন কণ্ঠ শিল্পী রীপা রকিব। তিনি একটি গান গেয়ে শোনান।
কিন্তু নীরবে যারা অনুষ্ঠানে শ্রোতা ছিলেন তাদের কথাতো না বললে কৃপণতা হবে। সেই দলে ছিলাম আমিও একজন। ছিলেন শিক্ষাবিদ আবদুর রকিব, সংস্কৃতিকর্মী নাসিমা আলী, সুভাষ দাশ, লেখক আনোয়ার শাহজাহান ও বিশ্বজিৎ রায় অপুসহ আরো অনেকে।

কথোপকথন : প্রেমানুভূতিটাই অন্যের কাছে সঞ্চারিত করতে চাই
ফেরদৌস কবির টিপু

প্রশ্ন: আপনি জন্মেছেন পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ছাতকের নিভৃত চেলারচর নামক গ্রামে। আপনার শৈশব এবং বেড়ে ওঠা সম্পর্কে কিছু বলুন।

হামিদ মোহাম্মদ: আমার শৈশব জমানো খেলাধূলায়, মত্ত থাকতাম। ফুটবল, হা-ডু-ডু, ডাঙগুলি, মার্বেল, কত কি। বৃষ্টির দিনে সাঁতারকাটা, লাইখেলা। সর্বোপরি-না বৃষ্টি, না রোদ-ছিল আনন্দে ভরপুর। আর শৈশবের বিশেষ স্মৃতি তো আছেই।
 
প্রশ্ন: শৈশব-কৈশোরে আপনার মনোজগতে প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন এমন দুজন ব্যক্তি সম্পর্কে বলুন। তারা কীভাবে আপনার জীবনকে প্রভাবিত করেছিলেন?

হামিদ মোহাম্মদ: আমার মনোজগতে অপার ভূমিকা পালন করে দুইজন মানুষ,তারা আমার পরম প্রিয় শিক্ষক। একজন আরজাদ আলী স্যার, আরেকজন কবি রিয়াসত আলী। দুজনই আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক। দুজনই লেখক। বইপড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেন আরজাদ আলী স্যার, আর লেখালেখির প্রথম সবক দেন রিয়াসত আলী, তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন।

প্রশ্ন: আপনার লেখালেখির উদ্দেশ্য কী? যেমন ধরুন বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বহু সাক্ষাৎকারে খোলামনে সরাসরি বলেছেন, তার লেখালেখি শুরুর উদ্দেশ্য ছিল তার সন্তানদের জন্য একটা টিভি কেনার পয়সা জোগাড় করা এবং সারা জীবন তিনি রাখঢাক না করে অর্থ কামানোকেই লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য বলে সগর্বে প্রচার করেছেন। আপনার লেখালেখির পশ্চাতে দর্শন কি ছিলো?

হামিদ মোহাম্মদ: লেখালেখি করেছি মনের আবেগে। পয়সা রোজগার করা যে অর্থে, সেটা মোটেই নয়। হুমায়ূন আহমদ লেখক হতে পারেন ছেলেমেয়েদের টেলিভিশন কিনে দেয়ার জন্য। তিনি লেখালেখি করেননি লেখক হিসেবে সমাজকে কিছু দিতে। তাই সারা জীবনই তিনি মানসম্মত লেখা না-লিখে শতাধিক চটিবই, হালকা বই লিখেছেন। অনুকরণ করেছেন বিদেশী লেখকদের কোন ভাল অর্থে নয়, সস্তা বিষয় আহরণ করতে। আমি হুমায়ূন অনুসারী নই।

প্রশ্ন:বলা হয়ে থাকে, প্রতিটি মানুষের মধ্যে কবিসত্ত্বা ঘুমিয়ে থাকে। এরপরও কবিতার প্রতি সাধারণ মানুষ তো বটে, শিক্ষিত শ্রেণির একটা বড় অংশের মধ্যে, বিশেষ করে ‘পেশাদার শিক্ষিত গোষ্ঠীর’ মধ্যে এক ধরনের উন্নাসিকতা লক্ষ করা যায়। আপনার মতে, কেন সেটা ঘটে? এখানে কবি বা কবিতার ব্যর্থতা আছে বলে মনে হয়? তারা অধিকাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে কবিতা আকর্ষণীয় করে তুলতে অসমর্থ/ব্যর্থ হয়েছেন?

হামিদ মোহাম্মদ: কবিতায় সব সময় একটি যাতনা কাজ করতো। সেটা শ্বাশত বিষয়-প্রেম। মূলত প্রেম এক অবিনাশি কম্পন। মনের ভেতর তোলপাড় করা সৃষ্টি নৈবেদ্য। এখানে সমাজের ভাবনাটা প্রখর। শব্দে উঠে আসে সেই ক্রন্দনের মত নানা ইশারা, দ্যুতি। কবিতা এক সময় ছিল একমাত্র ভাব প্রকাশের ভাষা। মানুষ কথাও বলতো কবিতার ভাষায়। এখন বদলেছে। কবিতা জ্ঞানের জায়গা তৈরী করে যেন সরে গেছে সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার বাইরে। অথবা সাধারণ মানুষ বেরিয়ে এসেছে কবিতার ভাষার সেই ঘোর থেকে। এ অর্থে, সাধারণ মানুষের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবে হ্যা, সাধারণ মানুষের মাঝে সত্যিকারভাবেই ‘ঘুমন্ত কবিসত্বা’ রয়েছে। এই কবি সত্বা জাগলে কবি, না জাগলে সাধারণ মানুষ। সবাই যে কবি হতে হবে, সেটাও সমাজ চায় না। কেউ পাঠক, কেউ কবি অথবা কিছুই না।

প্রশ্ন: আপনি সাংবাদিকতা করেছেন। এ সম্বন্ধে কিছু বলুন। কোথায় কীভাবে এর শুরু? বিশেষ করে যুগভেরীতে কাজের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে জানতে চাই।

হামিদ মোহাম্মদ: সেই আগে বললাম, আরজাদ আলী স্যার, আর কবি রিয়াসত আলী স্যারের প্রণোদনা। তারা মনের মধ্যে একটা ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন। এটাই তাড়া করে ফিরেছে সারা জীবন। যুগভেরীতে কাজ নিই সাংবাদিক হওয়ার চিন্তা থেকেই। তবে সাপ্তাহিক পত্রিকা তো, এতে সাংবাদিকতার চেয়ে বেশি প্রুফ দেখা ছিল শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রাথমিক কাজ। ধীরে ধীরে নিউজ লেখা, সাহিত্যপাতার লেখা বাছাই, সাহিত্যপাতা সম্পাদনা, শিশুপাতা-শাপলার মেলার লেখা সংগ্রহ থেকে সম্পাদনার দায়িত্ব ছিল। শিশু লিখিয়েদের জন্য যুগভেরী অফিসে বসতো সাহিত্যপাঠের আসর ‘শাপলার মেলা’। অসম্ভব উত্তেজনা ছিল সেই সময়টি ঘিরে।

প্রশ্ন: আপনি কী একমত যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পুরোটাই ঢাকাকেন্দ্রিক? সাংবাদিক তৈরির প্রতিষ্ঠান বলতে ২/৩টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ ছাড়া আর কিছু নেই। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে বহুল প্রচারিত এই মহৎ পেশার শিক্ষা-প্রশিক্ষণের এই দুরবস্থা কেন?

হামিদ মোহাম্মদ: বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পুরোটাই ঢাকাকেন্দ্রিক এক সময় ছিল, এখন নয়। যুক্ত বাংলায়ও সিলেট ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তখন কলকাতা ছিল মূলত সাংবাদিকতার মূল কেন্দ্র, ঢাকাও ছিল না। সেই সময় দেশভাগের আগে ১৯৩১ সালে যুগভেরী পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং দাপটও ছিল। কলকাতা কেন, ঢাকা চট্টগ্রামসহ অবিভক্ত বাংলার লেখকরা লিখতেন যুগভেরীতে। দেশভাগের পর কিভাবে যেন ঢাকার চরিত্র বদলে গেল। লেখক ও সাংবাদিকতা জগতে একটি কুলিন সম্প্রদায়ের জন্ম দিল একই সময় কলকতা এবং ঢাকা। এটা সত্যি কথা, সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে এই অল্পদিন আগে। অথচ সরকারি বেসরকারি মোট ১৪০টি বিশ্ববিদ্যালয় দেশে আছে। আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র নয়, এগুলো ‘চাকরিজীবী তৈরীর উপনিবেশবাদী’ প্রতিষ্ঠান। এখানে গবেষণা নামমাত্র হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার জন্য তেমন বাজেট দেয়া হয় না। দিলেও কেউ গবেষণা কাজে ব্যয় করে না, এ নজিরও আছে।
গবেষণার মানসিকতাও নেই। ‘ঘুষবান্ধব’ পড়ালেখার দৌড় আছে। বিসিএস দেয়ার জন্য ফাইনাল পরীক্ষার আগেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

প্রশ্ন:  এবারে আপনার উপন্যাস ‘পঙ্খিরাজ’ বেরিয়েছে। গত বছর ‘কবিতা সমগ্র’ বেরিয়েছে, অনেক বড় বই। দুটি বই সম্পর্কে  কিছু বলুন।
হামিদ মোহাম্মদ: উপন্যাস ‘পঙ্খিরাজ’ বেরিয়েছে এবার। বের করেছে নাগরী। ‘কবিতা সমগ্র’ বেরিয়েছে ২০১৯ সালে। ঢাকার অনার্য প্রকাশনী বের করেছে। ৪টি কবিতার বই এক মলাটে পাচ্ছেন পাঠক। নতুন মলাটে নিজের কাছেও পুনর্পাঠ মনে হচ্ছে। লেখকের বাড়তি আনন্দ ছাড়া প্রাপ্তি নেই। লেখালেখি তো আমার জীবনের অংশ। আমি আমার জীবনের বাঁকে বাঁকে যে বিষয়টি অতিক্রম করি, বা উপলদ্ধি করি, অভিজ্ঞতা অর্জন করি, তাকেই কবিতায় বা গল্পে রূপ দিই। নিজের জীবনকে বাদ দিয়ে সৃষ্টি হতে পারে না। নিজের জীবনকে সমাজ জীবনে মেলে ধরে দাঁড়ানোই সাহিত্য, সৃষ্টি হয় গল্প কবিতা।

প্রশ্ন: তাহলে নির্মাণটা নিয়ে বলুন।

হামিদ মোহাম্মদ: নির্মাণ  বলতে নিজের অনুভূতিটাকেই অক্ষরের ফাঁদে/ছাঁচে ফেলে বা একটি কাঠামোতে স্থাপন করতে চেষ্টা করেছি। কখনো কবিতা, কখনো গল্প বানানোর চেষ্ট করেছি। তবে কবিতা বা গল্প হলো কিনা সেটা পাঠক জানে। আমার পাঠক বলতে কেউ নেই। যারা আছে তারা বন্ধু-বান্ধব। বন্ধুরা তো এমনিতেই তালি দেয়। কোনটা তালি কোনটা তালি নয়,  এটা বুঝতে চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: আপনার সৃষ্টিতে মনে হয় আপনিই বিরাজ করছেন। এটা কি সীমাবদ্ধতা নয়?

হামিদ মোহাম্মদ: আমার সৃষ্টিতে তো আমিই থাকবো। না থাকলে কপটতা হবে। যারা থাকে না বলে তারা মিথ্যুক। নিজের জীবন দিয়েই সমাজকে, অন্যকে স্পর্শ করবেন। না হলে কীভাবে নির্মাণ করবেন? নির্মাণ তো নিজের ঘর থেকেই শুরু।

প্রশ্ন: আপনার লেখায় প্রেম বার বার ঘুরে এসেছে। মনে হয় আপনি প্রেম করছেন?

হামিদ মোহাম্মদ: আমার প্রেমানুভূতিটাই অন্যের কাছে সঞ্চারিত করতে চাই। তখন পাঠক মনেই করতে পারে লেখকের নিজের গল্প। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তাঁদের জীবন থেকেই সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। জীবনটাই একটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটা উপস্থাপন কীভাবে করবেন সেটাই মূখ্য। শব্দের ব্যবহারটা নিজ কল্পনা, স্বপ্ন অনুভূতিকে কীভাবে ধারণ করলো সেইটাই তো সাহিত্য। এই মাপকাঠি পাঠক।

প্রশ্ন: আপনার বক্তব্য কবি বা লেখক সমাজ বিচ্ছিন্ন কেউ নন। সমাজেরই অংশ।

হামিদ মোহাম্মদ: হ্যা, অবশ্যই, আজকালকার কবিরা চাকরি-বাকরি করেন। দিনদুনিয়ার খবর রাখেন। আমিও এই দলের। সাংবাদিকতা করি, অসংগতি দেখলে সংবাদ তৈরি করি। মনে দাগ কাটলে গল্পে-কবিতায় উঠে আসে সেই কাহিনি।

প্রশ্ন: আপনার উপন্যাস ‘পঙ্খিরাজ, বা পাণ্ডুলিপি ‘মাতাল বাঁশি’, ‘পাথরকন্যা’ ‘স্কোয়াটিং’ ‘জাহাঙ্গীরর ডর’ কি আঞ্চলিক ইতিহাস নির্ভর হয়ে যাচ্ছে না? বা এক ধরনের ইতিহাস চর্চা হয়ে যাচ্ছে না?

হামিদ মোহাম্মদ: না, আঞ্চলিক ইতিহাস নির্ভর হচ্ছে না বা ইতিহাস চর্চায় পর্যবসিত হচ্ছে না। দেখো, ইতিহাসটা সমাজের অবয়ব। এই অবয়বকে ধারণ করবে সাহিত্য। সাহিত্য ইতিহাস বর্ণনার কাজ নয়। ইতিহাসের অভিঘাত প্রতিফলিত হবে সাহিত্যে। যেমন দেখো, আমার ‘পঙ্খিরাজ’এ রয়েছে সিলেট অঞ্চলের বাউল ঘরানার কাহিনি, ধর্মীয় মৌলবাদী দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার চিত্র। বর্তমান বাংলাদেশের চিত্রই তো তা। তুমি কীভাবে অস্বীকার করবে সমাজকে। এটাও এক ধরনের ইতিহাস, সমাজ চিত্র। ইতিহাসবিদ লেখবেন একভাবে, সাহিত্যিকরা লেখবে এর অভিঘাত নিয়ে অন্যভাবে।

প্রশ্ন: সাহিত্যে শিল্প বলতে আপনার ধারণা কী?

হামিদ মোহাম্মদ:  একজন কবি বা লেখক যা দেখেন, তা-ই লেখেন। তবে বর্ণনা নয়, বস্তুগত বিষয় নয়, তার অর্ন্তগত বিষয়কে বাণীবদ্ধ করেন। বোধের ব্যাপার, এখানে ছুঁয়ে দেখার কিছু নয়। এক চিন্তার ভেতরে অনেক চিন্তা বাস। এটা সৃষ্টিবাহিত। এতে মানবতাই আরাধ্য বিষয় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সমাজ পরিবর্তন করে না। তবে ঐশ্বর্যদান করে। এজন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি দুটি আলাদা শব্দ। সংস্কৃতির ধারা সৃষ্টি করতে সাহিত্য নিয়ামক, কিন্তু শক্তি নয়। শক্তি হলো চেতনা। চেতনাটাকে বহন করে সাহিত্য। স্বপ্ন তৈরি করে। এই স্বপ্ন তৈরি করার বোধটাই শিল্পের কাজ। সাহিত্য সেই বোধটা জাগায়। মানুষকে মানুষ বানায়। তাই শিল্প মানুষের জন্য, কোন টবে/ফুলদানিতে রাখার ব্যাপার নয়। সাহিত্যে যে শিল্প, তার মহিমা মানবিক জাগরণ ঘটায়। মানুষ এ শিল্পমহিমা ধারণ করে বেঁচে থাকে। জীবনকে অর্থপূর্ণ সৌন্দর্যপ্রবণ করে তুলতে প্রয়াসী হয়, নিজে উন্মোচিত হয়।

প্রশ্ন: এই যে বললেন, ’সাহিত্য সমাজ পরিবর্তন করে না’।  কথাটা ব্যাখ্যা করবেন? সমাজ তো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, হচ্ছে না? হুমায়ূন আহমেদ লক্ষ লক্ষ হিমু তৈরি করে গেছেন। সেই হিমুরা এখন কে কোথায় কী করছেন জানি না। তবে তিনি হিমু বানিয়েছেন তার সাহিত্য দিয়ে, তাই নয় কী? তারা তো হাজারে হাজারে হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরছে আমাদের আশেপাশেই। সাহিত্য পরিবর্তন না ঘটালে কোন কোন মাধ্যম সমাজ পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন?

হামিদ মোহাম্মদ: হুমায়ূন আহমদ আমাদের ভঙ্গুর তরুণ সমাজকে আরেকটি ভঙ্গুর পথে ঠেলে দিয়েছেন্। তার সৃষ্ট চরিত্রের আদলে ‘হলুদ পাঞ্জাবিপরা’ যুবকরা কোন সমাজ পরিবর্তন করেনি। তরুণ সমাজের প্রতিনিধিও নয় তারা। বরং সংগ্রামবিমুখ একটি তরুণ সমাজকে অন্যপথে চলতে উসকে দিয়েছেন তার লেখায়। তিনি প্রকৃত সমাজনির্মাণের কোন সাহিত্য সৃষ্টি করেননি। ধরুন, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহিদুল জহির, সৈয়দ মনজুরুল হক কিংবা দেবেশ রায়, অমর মিত্রের পাশে দাঁড়ানোরও সুযোগ নেই হুমায়ূন আহমেদের।  

প্রশ্ন: আপনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, এখনো আছেন। কারণটা বলবেন?

হামিদ মোহাম্মদ: আমি আগেই বলেছি, আমি সমাজেরই অংশ। সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে আমি আমার ভূমি নির্বাচন করেছি সাংস্কৃতিক অঙ্গন। যেমন, এক সময় খেলাঘর উদীচী করেছি। পরে ‘শিকড়’ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে স্বৈরাচার, মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন করেছি। সিলেট আমার নিজের বেড়ে ওঠার জায়গা। আমাদের আন্দোলনের ক্ষেত্র ছিল সিলেট। পরে লন্ডনে আসি ১৯৮৭ সালে। এখানে উদীচীর শাখা প্রতিষ্ঠা করি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির শাখা গড়ি, বই মেলা করি। আবার দেশে যাই। দেশে গিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ি এসবে। বর্তমানে লন্ডনে আছি। লন্ডনে যুক্ত আছি ‘আবৃত্তি সংগঠন ’ছান্দসিক’এর সাথে। এবং ‘কবিকণ্ঠ’ নামে আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে আছি। এখানেও, লন্ডনে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে থাকতে চাই, থাকি।

প্রশ্ন: আপনি মৌলবাদ, স্বৈরাচার বিরোধিতা বলতে কি বোঝাতে চান?

হামিদ মোহাম্মদ:  বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চল, যে অঞ্চলটি কোনোকালেই স্বাধীন ছিলো না। প্রকৃতির দান তাদের কাম্যবস্তু ছিল। নিজে যে দাঁড়াবে, নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রন করবে এটা ভাবেইনি। যার কারণে বারবার লুণ্ঠিত হয়েছে, লুটপাটের শিকার হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, কেন এই লুটপাট? সহজ উত্তর, সম্পদ আছে বলেই। তাই কখনও ধর্মের নামে, কখনও রাজার নামে লুট হয়েছে এ জাতি। এই সুযোগে ভিনদেশীরাও লুটপাট করেছে। লুটপাটকারিরা ধর্মকে ব্যবহার করেছে। আজও করছে। সুতরাং শোষকদের হাতিয়ার ধর্ম। যখনই কোন সৃজনশীল পথে সমাজ এগুতে চাইছে, তখনই ধর্ম গেল বলে চিৎকার উঠেছে। ধর্ম যাবার বিষয় নয়, এটা বিশ্বাসের বিষয়। একটি সমাজে বিভিন্ন বিশ্বাসের লোক থাকতে পারে। সুতরাং সমাজের অগ্রগতি তো কোন এক বিশ্বাসের ভেতর আটকা পড়তে পারে না। সম্মিলিতভাবে যা ঘটার ঘটবে। অন্যদিকে, লুণ্ঠকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নাম স্বৈরাচার। সমাজ বিকাশে মৌলবাদ ও স্বৈরাচার নিকটশত্রু। এই দুই শত্রুকে হটিয়ে সমাজে মৌলিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বাঙালিরা এই দুই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাহিত্য সংস্কৃতি এ লড়াইয়ের সহযোগী। সমাজটা ধর্মনিরপেক্ষ হবে। রাষ্ট্রটাও কোন একক সম্প্রদায়ের নয়। সব সম্প্রদায় মিলে রাষ্ট্র এবং  সমাজ।

প্রশ্ন: আপনার কি কি প্রকাশনা রয়েছে, কবিতা গল্পের বই এবং অন্যান্য?

হামিদ মোহাম্মদ:  আমার প্রথম বই ‘রক্তে ভেজা হাত’। সেটা বাহাত্তরে বেরোয়। কপি নেই। ২০০৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে বেরোয় কবিতার বই ‘স্বপ্নের লাল ঘুড়ি,’ জুলাইয়ে বেরোয় গল্পের বই ‘হৃদয়ে রঙধনু,’ উপন্যাস ‘কালোদানব’। ২০০৮ সালে বেরোয় নিবন্ধসংগ্রহ ‘শিকড়ের দিনগুলি ও অন্যান্য’ ও ‘নন্দিত ভূবনে’।
বর্তমানে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে ৫টি উপন্যাস, যেগুলো বিভিন্ন অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। দুটি কবিতার বই, একটি গল্পের বই, ফিচার বই, সাহিত্যালোচনা ও বিলেতের লেখকদের নিয়ে একটি বই।

প্রশ্ন: আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
হামিদ মোহাম্মদ:  তোমাকেও ধন্যবাদ।

আমার মৃত্যুর পর কোনো শোকসভা হবে না
হামিদ মোহাম্মদ

আামার মৃত্যুর পর কোনো শোকসভার হবে না আয়োজন
স্মরিত হবে না কোনো স্মৃতি
সহসাই ভুলে যাবে স্বজন পাড়া প্রতিবেশি বন্ধুবান্ধব
ঈদে সোনালি পাঞ্জাবি কেনাকাটার ফর্দ থেকে যাবে বাদ
পুত্রকন্যাস্ত্রীর গতিবিধি চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হবে না কারো তর্জনীর ইশারায়।

পয়লা বৈশাখে ব্যস্ত থাকবে না কেউ রঙিন প্রজাপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর
স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও বুদ্ধিজীবী দিবসে কিংবা রবীন্দ্র-নজরুল
সুকান্ত-জীবনানন্দের জন্ম-মৃত্যু দিনে দৌঁড়ঝাঁপ নেই পাড়া-মহল্লায়
বাড়তি কবিতাপাঠ হবে না অডিটরিয়ামে উপস্থিত সুধীবৃন্দকে বিব্রত করে অযথা।

বার্ষিক মিলাদেরও হবে না আয়োজন
নামধাম মুছে যাবে ঘর গেরস্থালিতে-সিগারেটের দোকানে নিয়মিত
ক্রেতা হিশেবেও থাকবে না হালখাতা।

ছিচকে চোর, ডাকাত এমনকি ঠকবাজ দোকানিরাও হাফ ছেড়ে
বেঁচে যাবে
অহেতুক বাগাড়ম্বর নেই, স্বস্তিতে কাটাবে দিন
পত্রিকায় লিখবে না কেউ ইনিয়ে বিনিয়ে খামোকা
দুর্নীতিগ্রস্ত ধড়িবাজ আমলা, নব্য ব্যবসায়ী-রাজনীতিকের কুকর্মের
সচিত্র দলিলসহ দীর্ঘ ফিরিস্তি।

আড্ডায়,গানের আসরে প্রশ্নবানে জর্জরিত করবে না কেউ সরল শ্রোতাদের
শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ, দূর্বীন শাহ, লালন হাছনের
কাব্য-ধ্যানের ক্যারিশমা নিয়ে হবে না বির্তক।

পালের নাও কই যায় নদীতে পা ডুবিয়ে?
উদ্বাহু হাওরের অথৈ জলে ভাসায় বেহুলা বুক
ঢেউয়ের গহীন শব্দের ভেতর দাঁড়টানা মাঝির সারি গান
বউ-ঝিদের নাইওর যাওয়ার ধুমে- শ্রাবণের বৃষ্টির ধারায়
থাকবে না আলোচ্য- কখনো কোনো বেয়াড়া কবির নাম
যে নাকি  বেফাস কবিতা লিখতো . . . প্রেম- দ্রোহ ও বাখানে ভরপুর।

এমন কি রাজাকার-টাজাকারের বাপদাদাকে এক হাত
উদ্ধার করতো মঞ্চে, অনুষ্ঠানে-আড্ডায়
পরোওয়া করতো না কোনও কালে মতবাজ
নেতা-পাতিনেতা টেণ্ডারবাজ, পুঁজিপতিকেও।
তবে, কেউ কেউ প্রশংসা করতো বটে, দায়ে পড়ে নিতান্ত চোখের চশমে।

আল্লাহর কসম, কসম মানুষের
আমার মৃত্যুর পর শোকসভা হবে না, কোনো কারণ নেই শোকসভার
আমি যেহেতু কারো কোনো দিন
কোনো উপকার করতে পারিনি. . .তাই. . .।

আমার আমি
হামিদ মোহাম্মদ
লেখালেখির জগতে আমার পরিচয় কেউ কবি কেউ বা কথাসাহিত্যিক, কেউবা কথাশিল্পী অথবা লেখক এসব নানাবিধ সম্বোধনে আমাকে সম্মানিত করতে চান। কিন্তু আমি কোনটিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। সুহৃদ কবি মুজিব ইরম আমাকে কবি বংশের লোক বলে তৃপ্তি বোধ করেন। সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ভীষ্মদেব চৌধুরী আমাকে কথাশিল্পী বলে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সাহিত্যগবেষক ড. সেলু বাসিত কথাসাহিত্যিক শব্দবন্ধে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ আলোচনা লিখেছেন। অথচ আমি কোনটিতেই স্বস্তি পাই না। কুণ্ঠাবোধই যেন আমাকে ঘিরে আবর্তিত, আমি লজ্জাবোধ করি। যত কিছুই দিয়ে আমার আমিকে মোড়কবদ্ধ করা হউক না কেন, আমি যেন আমার মাঝে আমাকে খুঁজে পাই না। আমার মনে হয় আমি এর কোনটিরই যোগ্য কেউ নই।
সেদিন ছিল ২৪ জুলাই ২০২১। আমার জীবনে এক অনিন্দ্য সুন্দর বিকেল। আমার লেখা বই ‘কবিতাসমগ্র’ ও উপন্যাস পঙ্খিরাজ’ নিয়ে কবিকণ্ঠ যে আলোচনা ও আবৃত্তির আয়োজন করেছিল এবং এই আয়োজনে প্রথিতযশা অনেক ব্যক্তিত্ব যোগ দিয়েছিলেন। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জীবন থেকে বরাদ্দ বা ব্যয় করেছিলেন আমার জন্য কমপক্ষে পাঁচঘণ্টা সময়। আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি, নগর লণ্ডনের ব্যস্ত জীবন থেকে আকাশের ‘তারা’র মত খসে এসেছেন আমার উঠোনে ঐ মায়াময় আলোকোজ্জ্বল মানুষেরা। ভালবাসা, মমতার টান কী গভীর, কত ঔজ্জ্বল্যে ভরা- তা আমার এমন করে জানা ছিল না।
নিজেকে নিয়ে বলতে গিয়ে বহুবার বলেছি- লেখালেখির জগতে প্রবেশ নানা কৌতুহল থেকেই। এর পেছনে আছেন কৈশোরে প্রাপ্ত জ্ঞানতাপস আরজাদ আলী স্যার, কবি রিয়াসত আলী। এ দু’জন ছিলেন মনোজগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারি মহীরূহ। তাদের ছায়ায় বড় হয়ে লাভ করি ভিন্ন স্বাদের এক বিশ্বকে। চোখ রাখি সেই স্বপ্নময় জাদুর ভূবনে। প্রেরণার পর প্রেরণা।
এরপর শুরু হয় এক সময়- কবিতার জন্য আঁকজোক, রাতজাগা, লাইনের পর লাইন জুড়ে দেয়া, সেই অনন্য ভূবন বিনির্মাণের পথে ছুটে চলি কিছু কবিতা নামের শ্লোক বা স্তবকের পিছু, করি কিছু জীবন সন্ধানি উচ্চারণ। এইভাবে ভিড়ে যাই সমাজ বদলের পোড়খাওয়া কিছু জ্ঞানঋদ্ধ গুণী মানুষ ও দীপ্তিময় তরুণদের দলে। শান দেয়া শ্লোগান আর হাতিয়ারের গন্ধ ছড়িয়ে রাজপথ কাঁপাই, কেঁপে উঠি নিজেও। রাতদিন একাকার করি, ক্লান্তিহীন সময় পার করি। শুরু করি সাংস্কৃতিক যুদ্ধও। ধর্মীয় মৌলবাদের ছোবল থেকে সমাজকে বাঁচানোর দীক্ষা নিই। কিন্তু এই বিজ্ঞানমনস্ক প্রতিবেশ আঁকড়ে ধরে চিৎকার দেয়া ছাড়া কি করেছি? আত্মসমালোচনা করলে তো প্রাপ্তির কোঠা-ই শূন্য।
বরেণ্য কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব আবদুল গাফফার চৌধুরী আমাকে খুব ভালবাসেন। তার ভালাবাসা থেকেই এক ধরণের হতাশাজাগানিয়া ক্লান্তি নিয়ে এই সেদিন প্রশ্ন করেছিলেন, সমাজকে কত দিলেন, সমাজ কি দিল? হাসিমুখে উত্তর দিয়েছি- সমাজকে তো প্রস্তুতই করতে পারিনি, পাবার আশা করি কোনমুখে।
এই অবস্থায় আমি হামিদ মোহাম্মদ আবার কে? না কবি, না লেখক কিংবা সংগ্রামী সংস্কৃতিকর্মী-কোন ছার। পরিচয়টা ‘মানুষ’ও যে- তারও তো কোন নিশানা বা কিনারা করতে পারিনি।
সবশেষে বলতে চাই, আলোচনা ও আবৃত্তিতে ঋদ্ধ করা নাট্যকার ও উপস্থাপক বুলবুল হাসান, কবি সারওয়ার-ই আলম, সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমদ, কবি ময়নূর রহমান বাবুল, কবি শাহ শামীম আহমদ, কবি শামীম শাহান, লেখক ও অনুবাদক ফেরদৌস কবির টিপু ও আহবাব মিয়া। কবিতা পাঠ করেন মানবাধিকার নেত্রী অজন্তা দেব রায়, সাংস্কৃতিক নেত্রী ইয়াসমীন মাহমুদ পলিন, আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী, বাচিকশিল্পী শহিদুল ইসলাম সাগর ও বাচিকশিল্পী সালাউদ্দিন শাহিন। আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলুমনাই এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম, এ রকিব, কবি সৈয়দ হিলাল সাইফ, লেখক আনোয়ার শাহজাহান, সংস্কৃতিকর্মী নাসিমা আলী, সংবাদকর্মী সুভাষ দাশ ও বিশ্বজিত রায় অপু। কবিতাকে সুরারোপ করে পরিবেশন করেন সঙ্গীতশিল্পী সঞ্জয় দে ছাড়াও অনুষ্ঠানে গান গেয়ে শোনান কণ্ঠশিল্পী রীপা রকিব। সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় ছিলেন কবি টি এম আহমেদ কায়সার। সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ এনামুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এসব ব্যক্তিত্বের আমাকে দেয়া এক তিল সময়ের মূল্য শোধ করার যোগ্যতাও আমার নেই। আমার কাছে কোন ভাষাও নেই- এ চরম মূল্যবান দানকে কী দিয়ে সাজাই। অনুষ্ঠানে ভালবাসার কথার পু?াঞ্জলি দিয়ে বার বার আমাকে বন্দিত করা হচ্ছিল। ‘আনন্দ’ নামক অনুভূতি অদৃশ্য বৃষ্টির মত ঝরছিল প্রেসক্লাবের ছোট্ট হল রুমে। কিন্তু আমার কাঁন্না আসছিল। মনে হচ্ছিল শিশুর মত ‘ভেউ’ করে কেঁদে দিই।
মনে হচ্ছে- যত পরাজয় সবই আমার। সব জয় মানুষের। জয় হউক মানবতার।