Share |

বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী

বাঙালীর বিজয় দিবস : বিরূপ বিতর্কের ঐতিহাসিক উত্তর
১৯৭১ সাল থেকে ২০২১ সাল- পঞ্চাশ বছর! এ-বছরের ১৬ই ডিসেম্বর হচ্ছে বাঙালী জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধ বিজয়ের পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তি!
আধুনিক কালের একটি স্বাধীন ও বিজয়ী জাতি হিসেবে বাঙালী ক’দিন পর অর্ধ-শতাব্দী পূর্ণ করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, এ-স্বাধীনতার যুদ্ধ ও যুদ্ধের বিজয় নিয়ে আজও বাঙালীর মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কটি ঘুরপাক খাচ্ছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে এবং এর মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে: বিজয়টি কার?

বিতর্কিত দাবী

বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিলো, তারা প্রথমতঃ স্বাধীনতার যুদ্ধকে স্বীকারই করতে চায় না। তাদের কাছে বিষয়টি ছিলো একটি ‘গণ্ডগোল’, যা মূলে ছিলো ভারতের ষড়যন্ত্র। তাদের মতে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পাক হানাদার বাহিনীর পরাজয় হচ্ছে ভারতের বিজয়, বাঙালীর নয়।
কিন্তু, ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধে, বাঙালী মুক্তিবাহিনীর পক্ষে যে ভারতীয়রা পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছে, তাদেরও কেউ কেউ পাক-বাহিনীর সহযোগীদের মতোই দাবী করে থাকে যে, ’বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারতের দান’। এটি স্বাধীনচেতা বাঙালীর জাতীয় গৌরববোধকে স্বভাবতঃ আঘাত করে।
আমি লক্ষ্য করেছি, অনেকেই এর সঠিক ঐতিহাসিক অকাট্য উত্তর না দিয়ে নিজ নিজ বিশ্বাসের জোরে তর্ক করেন। বস্তুনিষ্ঠ যুক্তির অভাবে বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়। আমি ২০১৫ সালে ফেইসবুকে একটি নৌটের মধ্যদিয়ে এর একটি বস্তুনিষ্ঠ উত্তর সরবরাহ করছি, যা বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে পুনরায় উপস্থাপন করছি।

পাক-ভারত-বাংলাদেশ যুদ্ধের ইতিহাস

১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তান চারবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। প্রথম যুদ্ধ ১৯৪৭ সালে কাশ্মীর নিয়ে, দ্বিতীয়যুদ্ধে ১৯৬৫ সালে সেই কাশ্মীর নিয়ে, তৃতীয় যুদ্ধ ১৯৭১ সালে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের সূত্র ধরে এবং চতুর্থবার ১৯৯৯ সালে আবার সেই কাশ্মীর নিয়ে, যা কার্গিল যুদ্ধ নামে সমধিক পরিচিত।
এই যুদ্ধের ফলাফল কী, তা বিশ্ববাসী জানেন। প্রথম যুদ্ধে পাকিস্তান কাশ্মীরের একাংশ দখল করে ‘আজাদ কাশ্মীর’ নাম দেয়, যা এখনও আছে। সেই যুদ্ধ শেষ হয় ভারতের অনুরোধে জাতিসংঘের রেজ্যুলিউশন ১৯৪৭ অনুসারে ‘লাইন অফ কন্ট্রৌল’ তৈরি করে কাশ্মীর ও জম্মু ভারতের অধীনে এবং গিলিত-বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মীর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে যায়, যা এখনও বর্তমান।
১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে পাক-ভারতের মধ্যে সংঘটিত দ্বিতীয় যুদ্ধে দুইপক্ষই বিজয় দাবী করে। কিন্তু বাস্তবে এটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তাসখন্দ চুক্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
১৯৯৯ সালে পাকিস্তান ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীরের কার্গিলের অংশবিশেষ দখল করে নিলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধে বাঁধে। এই যুদ্ধের শেষ হয় মার্কিন প্রেসিডেণ্ট বিল ক্লিণ্টনের হুমকির মুখে পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার করার ফলে।
তো, উপরে বর্ণিত কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের তিনটি যুদ্ধে প্রথমটিতে ভারত কাশ্মীরের অংশ হারালেও সব ক’টি যুদ্ধ মধ্যস্থতায় শেষ হয়। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি।
ইতিহাসে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুধু একবারই বিজয়ী হয়েছে, আর সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের চলমান যুদ্ধে যুক্ত হয়ে। তবে, সে বিজয় ছিলো বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বিজয়, যা পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিলে বিবৃত।

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালী মুক্তিবাহিনী দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধ করার এক পর্যায়ে ভারত এসে যুক্ত হয় দেশটির ওপর পাকিস্তানের আক্রমণের উত্তরে। পাকিস্তান তার নিশ্চিত পরাজয় জেনেও ভারতের ওপর আক্রমণ করে যুদ্ধটাকে পাক-ভারত যুদ্ধের চেহারা দিতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে।
স্পষ্টতঃ পাকিস্তান নিজের ইজ্জত ও জিনিভা কনভেনশনের ট্রীটমেণ্ট পাওয়ার জন্যেই বাঙালী মুক্তিবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণের চেয়ে ভারতীয় পেশাদার বাহিনীর কাছে কিংবা অন্ততঃ ভারতের সম্পৃক্তিতে আত্মসমর্পণ করাটা যৌক্তিক মনে করে। কারণ, মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়া একদিকে যেমন অধিকতর লজ্জার, অন্যদিকে বিপজ্জনকও বটে।
যাক, যুদ্ধের পরিণতি হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণে সম্মত হয় ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশ বাহিনী যৌথ কমাণ্ডের কাছে। আর, সেটি স্পষ্ট বিবৃত আছে ১৯৭১ সালের ইনষ্ট্রুমেণ্ট অফ সারেণ্ডারের, যার প্রথম বাক্যটিই হলো:
“The PAKISTAN Eastern Command agree to surrender all PAKISTAN Armed Forces in BANGLA DESH to Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA, General Officer Commanding in Chief of Indian and BANGLA DESH forces in the Eastern Theater”
অর্থাৎ, “ঈষ্টার্ণ থিয়েটারে ভারতীয় ও বাংলা দেশ বাহিনীসমূহের জেনারেল কমাণ্ডিং অফিসার লেফটেন্যাণ্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে বাংলা দেশে সকল পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ করতে পাকিস্তান ঈষ্টার্ণ কমাণ্ড সম্মত হয়েছে।”
১৯৭১ সালের ইনষ্ট্রুমেণ্ট অফ সারেণ্ডারের বিবৃতি এই সত্যকে ঐতিহাসিক ও দালিলিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ে ভারত ও বাংলাদেশ পরস্পরের পার্টনার বা শরিক। এখানে একা যুদ্ধ জয়ের দাবী কেউই করতে পারে না।

যুদ্ধের ঐতিহাসিক সমীকরণ

এবার যদি আমরা পাক-ভারত-বাংলাদেশের যুদ্ধসমূহকে একটি সরল গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করি, তাহলে দেখতে পাইঃ

 

1947 xJu: I - P = 0

1965 xJu: I - P = 0

1999 xJu: I - P = 0
অর্থাৎ, 3(I - P) = 0
কিন্তু, ১৯৭১ সাল: (I + B) - P = 1
সুতরাং B=1
উপরের সমীকরণ থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, জন্মের পর থেকে পাকিস্তান ও ভারত পরস্পরের বিরুদ্ধে ৪ বার যুদ্ধ করলেও, ১৯৭১ সালের আগে কিংবা পরে কোনো পক্ষই কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ক্লীয়ার-কাট বিজয় দাবী করতে পারেনি। প্রতিবারই তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে যুদ্ধের শেষ হয়েছে এবং উভয় পক্ষই উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে নিজ দেশের জনগণকে বিজয় বুঝাতে চেষ্টা করেছে।

সমীকরণ বিশ্লেষণ

যাহোক, আমারা যদি শুধু পাক-ভারতের যুদ্ধকে যদি ঐতিহাসিক পরম্পরায় বিচার করি, তাহলে কী দেখি? দেখি, ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালের যুদ্ধের সমীকরণে ‘ও’ ও ’চ’-এর বৈরী সম্পর্ক বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে তিনতিন বারই ফলাফল এসেছে শূন্য (০)। কিন্তু ১৯৭১ সালের সমীকরণে ’ই’ ফ্যাক্টরের সাথে ’ও’ যুক্ত হওয়ার পরই চ-এর সাথে উভয়ের দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে বিজয় নির্দেশক ১ মূল্যমান নির্দেশ করেছে।
এ-থেকে এ-সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, ঐতিহাসিকভাবে পাক-ভারতের ৩ বার যুদ্ধে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিংবা পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি, কিন্তু বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার পরই ভারত এক এবং একমাত্র বার শরিকী-বিজয় লাভ করেছে।
সুতরাং পাকিস্তানের পরাজয়ের পেছনে ইনষ্ট্রুমেণ্টাল হচ্ছে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ বা বাঙালী মুক্তিবাহিনী। এই সত্যটি একই সাথে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এবং বিশ্ববাসীকে বুঝতে হবে।

দান কাকে বলে?

দান বলে তাকে, যা নিজের উপার্জিত নয়, অন্যের কাছ থেকে পাওয়া। দানে একজন বৈধ অধিকারী তার অধিকার অন্যকে স্বেচ্ছায় দিয়ে থাকেন। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস পরীক্ষা করি, তাহলে সত্যটা বেরিয়ে পড়বে।
ইতিহাসে দেখি, পাকিস্তান ও ভারত ব্রিটেইনের পার্লামেণ্টে তৈরি ‘ইণ্ডিয়ান ইণ্ডিপেণ্ডেন্স এ্যাক্ট ১৯৪৭’ আইনের ফলে রাষ্ট্র হিসেবেও নয়, মাত্র ‘ডোমিনিয়ন’ হিসেবে পৃথক পৃথক গভর্ণর-জেনারেলের শাসনাধীনে’ স্বাধীনতা’ লাভ করে।
প্র্রকৃত প্রস্তাবে, কারও স্বাধীনতাকে যদি ‘দান’ হিসেবে দেখতেই হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের নয়, সেটি হবে পাকিস্তান ও ভারতের। কারণ, “Indian Independence Act 1947” আইনের ১ম ধারার ১ম উপধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:
As from the fifteenth day of August, nineteen hundred and forty-seven, two independent Dominions shall be set up in India, to be known respectively as India and Pakistan..”
অর্থাৎ, ”ঊনিশশো সাতচল্লিশের পনেরোতম দিবস থেকে ইণ্ডিয়াতে দু’টিস্বাধীন ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হবে যা যথাক্রমে ইণ্ডিয়া ও পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত হবে।”

বাঙালীর স্বাধীনতা কারও দান নয়!

বিপরীতে, বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সেলফ প্রোক্লেমেশন ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাঙালী জাতি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে বাঙালী জাতি।
সুতরাং, সেলফ প্রোক্লেমেশন ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠিত বাঙালীর জাতিরাষ্ট্রকে কারো ‘দান’ বলে নির্দেশ করা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

লণ্ডন, ৬ই ডিসেম্বর ২০২১

বিজয়ের ৫০ বছর : স্বপ্ন-অভিজ্ঞতা-আকাঙক্ষা
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। বাঙালীর জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের দিন।
একাত্তরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়েছিলো অমর পঙতিমালা -
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম
তাঁর এই বাণীকে বুকে ধারণ করে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম করে বহু প্রাণ আর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বরে বীর বাঙালি মৃত্যুজঠর থেকে ছিনিয়ে আনে বিজয়ের লাল সূর্য।

পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, নিপীড়ন আর দুঃশাসনের কুহেলিকা ভেদ করে ১৯৭১ সালের এই দিনটিতে বিজয়ের প্রভাতী সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে উঠেছিল বাংলাদেশের শিশির ভেজা মাটি। অবসান হয়েছিল পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতনের কৃষ্ণ অধ্যায়। সেদিন থেকে পৃথিবীর মানচিত্রে জেগে উঠলো আরেকটি স্বাধীন ভূখণ্ড- বাংলাদেশ।
সেদিনের সেই বাংলাদেশ অনেক বাধা বিপত্তি, আন্দোলন সংগ্রাম আর রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে পূর্ণ করেছে অর্ধ শতক। এই দীর্ঘ দিনের পথচলায় যখন দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
ঠিক সেসময় মহান বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে সমগ্র বাঙালী জাতি। ইতিহাসের এমনই এক সন্ধিক্ষণে উপনীত এবারের বিজয় দিবস।
সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাসঙ্গিকতায় যুক্ত হয়েছে নানা মাত্রা, নানা তাৎপর্য। বিজয়ের মাসে এনিয়ে প্রবাসীরা কী ভাবছেন? গত পঞ্চাশ বছরের
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে কমিউনিটির বিভিন্ন পেশার কয়েকজনের মনের কথাগুলো পত্রিকার পাঠকদের জন্য গ্রন্থনা করেছেন দিলু নাসের।

মাহমুদ এ রউফ
অবসরপ্রাপ্ত চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট,
কমিউনিটি নেতা

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। আমাদের সর্ববোধের মাস। ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ শহীদদের আত্মদান এবং তিন লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দেশের আপামর জনতা এই মাসে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। তখন সাধারণ মানুষের মনে একটা আশা ছিলো হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশে অন্ন, বস্ত্র বাসস্থানের কোনো অভাব হবেনা। ধনী গরীবের মধ্যে ব্যবধান দূর হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত ঘুণে ধরা সমাজ কাঠামো মেরামত হবে। খেটে খাওয়া মেহনতি জনতার মেহনতের প্রাপ্য ফল ভোগ করতে পারবে। সমাজের বৈষম দূর হবে। কিন্তু বিজয়ের ৫০ বছর পরও কি এর প্রতিফলন ঘটেছে? যদিও দেশ এখন উন্নয়নে উর্ধ্বগামী। মানুষের মাথা পিছু আয় বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের সুনাম বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু এতো রক্তদানের বিজয় পরবর্তী বাংলাদেশ কি মেহনতি মানুষের আশা আকাঙক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে? দেশের খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা দেখে তো মনে হয় সাধারণ মানুষের অবস্থার উন্নতি আশানুরূপ হওয়ার অনেক বাকি। তবে কিছু সংখ্যক লোক যে ফুলে ফেঁপে অজগর হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে হচ্ছে এতো মানুষের আত্মদান যেন তাদের স্বার্থে হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকালে সকলের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে চার মূলনীতি- সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপক্ষতা অনুমোদন করা হয়েছিলো ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাও নির্বাসনে দেয়া হয়েছে তা এখনো পুনর্বাসন করা হয়নি।
ফলে দেখা যাচ্ছে সমাজতন্ত্রহীন গঠনতন্ত্র মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষায় বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতা গঠনতন্ত্র সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে অক্ষম। আর গঠনতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র উপড়ে দেওয়ার কারণে ৭৫-এর পর থেকে দেশে অগণতান্ত্রিক চলেছে অথবা গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক প্রহসন চলছে। এই অবস্থায় দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে , এবং এক ধরনের লুটেরা গোষ্ঠীকে লুটেপুটে খাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ এই লুটেরা গোষ্ঠীর হাতেই শাসনক্ষমতা অর্পিত আছে।
অন্য দিকে মৌলবাদিরা গঠনতন্ত্রে ধর্ম নিরপেক্ষতা না থাকায় ধর্মকে পুঁজি করে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর বিভিন্নভাবে অনাচার অরাজকতা সৃষ্টির সুযোগ পাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে- স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে আজকের বাংলাদেশ অনেক দূরে সরে এসেছে। এই দূরে থাকাটা দেশের জন্য দেশের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনতে পারবেনা।

পাশা খন্দকার এমবিই
সাবেক সভাপতি, বিসিএ

হাজার বছরের শোষণ শাসন আর লাঞ্ছনার অবসানে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম। অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এর সমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে। সেই বিজয়ের আমি ও সাক্ষী, তাই গর্ব করে বলি - আমিও বিজয় দেখেছি।
আজ বাংলাদেশ ও স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ৫০ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে। তাই পেছন ফিরে তাকালে আমাদের স্বস্তির অনেক কারণ পাওয়া যায়। অন্তত এ ৫০ বছরে আমাদের অর্জন খুব একটা কম নয়। হয়তো অর্জন আরও বেশি হতে পারত। তবে যা হয়েছে তা খুব সামান্যও নয়, এককথায় অসামান্য। এখন বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে সম্মানজনক দেশ ও রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এটা আমাদের গৌরব।
যদিও বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে তবু ৭১ এ যে মূল লক্ষ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো সেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার, এবং বাকস্বাধীনতার অবস্থা নিয়ে গুরুতর সব প্রশ্ন এখনো জনমনে বিরাজমান। দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা ও উদ্বেগজনক। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে সার্থক হবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আবারও একটি সত্যিকারের শোষণমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, বঞ্চনামুক্ত দুর্নীতিবিহীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে যেন প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব দরবারে এটাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য।
আমি একজন ব্রিটিশ বাঙালী হিসাবে বলতে চাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনকার বাঙালীদেরকে এখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছেনা এখনও তারা নিজের দেশের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে এদেশে বেড়ে উঠা নতুন প্রজন্ম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি কখনোই আকৃষ্ট হবেনা। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমার প্রত্যাশা- দলমত নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের আগামী দিন হোক আরও উজ্জ্বল।

হিমাংশু গোস্বামী
সঙ্গীত শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখেছি এবং যুদ্ধে সশরীরে অংশগ্রহণ করেছি তাই আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমাদের একটি লাল সবুজ পতাকা আছে। সেই পতাকা আমাদের অহংকার। আমি বাঙালী তাই গর্বিত। বাঙালি জাতির মরণপণ সংগ্রামের ফলেই এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এটা আমাদের চূড়ান্ত ত্যাগের প্রতীক।
এই দেশ আর এই পতাকার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, যাদের রক্তের অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা তাদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
পঁচাত্তরে জাতির জনক স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীন দেশের আকাশে দীর্ঘদিন অশুভের ছায়া বিরাজ করছিলো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য দেশের অগ্রগতি বিঘিœত হয়েছে এরও এখন বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছে। জাতি হিসাবে আমরা এখন গর্বিত।
ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণের নাম বাংলাদেশ। সেই আদিকাল থেকেই এ দেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান পাশাপাশি হাত ধরে বসবাস করে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকেও একই পতাকার নিচে আমরা সবাই আজ বসবাস করছি। আমরা চাই না এ দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষবা? ঘিরে ফেলুক। সব ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে। স্বাধীনতার এটাও উদ্দেশ্য। আমাদের সৌভাগ্য আমরা জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করার সুযোগ পেয়েছি। জয়বাংলা।

এম এ মুনিম
সভাপতি, বিসিএ

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশ আজ উন্নত বিশ্বের লক্ষ্যে ধাবিত হচ্ছে। ৭১ সালে স্বাধীনতার পরপর প্রায় শূন্য থেকে শুরু করা একটি দেশ বহু চড়াই-উৎরাই রাজনৈতিক অস্থিরতা পেরিয়ে আজ বিশ্ব দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এটি আমাদের সকলের জন্য গৌরবের অহঙ্কারের। উন্নয়নের মহাযজ্ঞে বদলে যেতে শুরু করেছে দেশের জনপদ। পরিবর্তন আসছে মানুষের জীবনযাত্রায়। ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়া এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সবকিছুই আমাদের স্বাধীনতার সুফল।
তবে স্বাধীনতার অন্যতম গণতন্ত্র, সুশাসন সুরাজনীতি, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং প্রশ্ন রয়েছে।
আজ স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর আমাদের অর্জন যেমন চোখে পড়ছে পাশাপাশি এসব বিষয়গুলোও আমাদেরকে চিন্তিত করে। যেসব ঘটনা সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে তা হলো সামাজিক আস্থাহীনতা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ধর্ষণ, খুন, হিংসা, লোভ, দুর্নীতি, বেকারত্ব।
স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই সুশাসনের জন্য রাষ্ট্রের ন্যায়পরায়ণ আচরণ, এবং মেহনতি মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতি ও নিপীড়নমুক্ত স্বাধীন পরিবেশ এবং নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ কার্যকর হলে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন সার্থক হবে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা সেসময় যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রবাসীরা এখনো বিভিন্ন ভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। নিজের দেশে গেলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন। স্বাধীন দেশে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশের প্রতি আরও আকৃষ্ট হবে। এবং বহির্বিশ্বে তারা ও বাংলাদেশের জন্য প্রতিনিধিত্ব করবে। জয়বাংলা।

সাইস্তা মিয়া
প্রবীণ কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

আমার জন্ম ব্রিটিশ আমলে। আমি ব্রিটিশ দেখেছি, পাকিস্তান দেখেছি এবং গত পঞ্চাশ বছর থেকে বাংলাদেশ দেখছি। শোষণ শাসন থেকে মুক্তির জন্য আমরা একটা স্বাধীন দেশ চেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সেই আশার বাস্তবায়ন করেছিলেন। তার ডাকে আমরা দেশে-বিদেশে স্বাধীনতার জন্য সকলে কাজ করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার পর স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করে আমরা আমাদের স্বাধীনতাকে কলংকিত করেছি। ৭৫ থেকেই দেশে শুরু হয়েছে হত্যা এবং হিংসার রাজনীতি।
গত পঞ্চাশ বছরে দেশে অনেক উন্নতি হয়েছে। বড়লোক আরও বড় হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই কিন্তু আইন কানুন দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। এখন প্রশাসনের চেয়ে দলের নেতা-কর্মীদের দাপট বেশী। দল না করলে কথা বলা যায়না। এটা একটা স্বাধীন দেশের জন্য দুঃখ জনক। আমরা প্রবাসীরা দেশের জন্য এতো কিছু করেছি কিন্তু স্বাধীন দেশে আমার কোনো নিরাপত্তা নেই।

রফিক আলী
প্রবীণ কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

বাংলাদেশ একটা স্বাধীন রাষ্ট্র আমরা সেদেশের নাগরিক এটা আমাদের জন্য একটা গৌরবের বিষয়। যাদের জীবন এবং রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি তাদের তাদের কাছে আমরা ঋণী। গত পঞ্চাশ বছরে দেশে অনেক উন্নতি সাধন হয়েছে, রাস্তাঘাট যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজ হয়েছে এবং আরও হবে ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ এখন সারা পৃথিবীর মানুষ চিনে। ৭৫ এর পর থেকে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিলো এর জন্য আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের মানুষের অনেক আশা-আকাঙক্ষার বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় গত পঞ্চাশ বছরে দেশে কোনো নেতা সৃষ্টি হয়নি আইন-কানুনের অবনতি হচ্ছে দিন দিন। প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত বিশেষ করে পুলিশের উপর মানুষের একেবারেই আস্থা নেই। একজন প্রধানমন্ত্রী তো একা দেশ চালাতে পারেনা? সবকিছুতেই তাকে হস্তক্ষেপ করতে হয় না হলে সমাধান হয়না। এটা একটি স্বাধীন দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকার এবং বিরোধী দল সবাই দেশের স্বার্থে একমত না হলে দেশ সামনে এগুবেনা। এবং সকল জনগণকে ব্যক্তি স্বার্থ পরিহার করে দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করলে আমাদের স্বাধীনতা সমুন্নত থাকবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমাদের প্রত্যাশা দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ।

বদরুল হক
একাউন্টেন্ট, কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

যাদের রক্তে বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা সেই বীর শহীদানদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা জানাই মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানসহ সেইসব কীর্তিমান মানুষদেরকে যাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আমরা স্বাধীন জাতি হিসাবে বিশ্ব মানচিত্রে পরিচিতি লাভ করেছি। সকল শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের ঘাম-রক্তে অর্জিত এই দেশ।
দেখতে দেখতে আমাদের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পাড়ি দিয়েছে অনেক রক্তাক্ত পথ। যে কাঙিক্ষত লক্ষ্যে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম গত পঞ্চাশ বছরে হয়তো আমরা তা অর্জন করতে পারিনি কিন্তু ইতিমধ্যেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়েছে। আমাদের বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি সময় ও প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ঊর্ধ্বগতি পেয়েছে। মাথাপিছু আয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং সম্পদ উৎপাদন ও আহরণ দৃশ্যমান হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, সে কথা নির্মোহভাবেই বলা যায়।
কিন্তু আইনের শাসনের ঘাটতি এবং সর্বস্তরে দুর্নীতির দুষ্টচক্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি খাতকে করেছে প্রকৃতই পঙ্গু, যা আমাদের অন্যান্য সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি দৃঢ়-কঠিন কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে, যা এখন সময়ের দাবি।

ইসলাম হান্নান
সাবেক কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে এরপরও দেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। সামাজিক অবস্থারও অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশের বয়স এখন পঞ্চাশ। একসময় যাকে বলা হয়েছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’, সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল দেশগুলোর একটি।
গত কয়েক বছরে মাথা পিছু আয় বেড়েছে কিন্তু সামাজিক বৈষম্য দূর হয়নি। ধনীরা ধনী হচ্ছে আর গরীবের ভিটে মাটি যাচ্ছে। রাজনীতির নামে চলছে লুটপাট। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যে রাজনীতি ছিল দেশসেবার মাধ্যম, তা আজ রাতারাতি অর্থ অর্জনের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় নেতা কর্মীদের দুর্বৃত্তায়নে মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত। দেশে দুর্নীতি এখন নির্লজ্জভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকলে শত উন্নয়নের পরও দেশের দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হবে। শুধু রাজনীতিবিদ নয় সাধারণ জনগণ কে ও দেশের উন্নয়নে এবং সুষ্ঠু সমাজ গঠনে আরও বেশী করে ভূমিকা রাখা দরকার তাহলেই তিরিশ লক্ষ নরনারীর আত্মত্যাগ সার্থক হবে।

আজিজুর রহমান
সাবেক কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পঞ্চাশ বছর হয়ে গেলো কিন্তু দেশটিতে দুর্নীতি আর লুটতরাজ এখনো চলছে এটি আমাদের জন্য খুবই লজ্জার বিষয়। এখনো দেশে কথা বলার স্বাধীনতা, গণতন্ত্র আর বিচার ব্যবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন!
বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে আমরা স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় সপরিবারে হত্যা করে আমাদের স্বাধীনতায় কলঙ্ক লেপন করেছি এবং দেশে হত্যার রাজনীতি শুরু করেছি।
এখানো দেশে শেখ মুজিব, তাজ উদ্দীন, নজরুল ইসলাম, সামাদ আজাদের মতো কোনো নেতা তৈরি হয়নি, আর হবে কী না এটিও সন্দেহ।
দেশের উন্নতি হচ্ছে ঠিকই। বিভিন্ন কারণে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে এটি অবশ্যই আনন্দের কথা। কিন্তু মানুষ হিসাবে আমরা কতোটুকু উন্নত হচ্ছি এটাই প্রশ্ন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিতে বিলাতের সাধারণ বাঙালীরা অনেক কষ্ট করেছেন কিন্তু তাদেরকে এখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং প্রবাসীদেরকে দেশে গেলে বিভিন্নভাবে অপদস্থ করা হচ্ছে।
তবুও আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ব করি। আমাদের দেশ এগিয়ে চলুক এটাই প্রত্যাশা।

আমিনুল হক মুন্না
সাবেক ছাত্র নেতা, ব্যবসায়ী

ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মাহুতিতে অর্জিত বিজয়ের পঞ্চাশতম বছরে ৫৭ হাজার ৩২০ বর্গমাইলের এ ভূখণ্ড আমাদের গর্বের।।
একবিংশ শতাব্দীর এ বিশ্বে আমাদের অনেক অগ্রসরতার ছাপ প্রতীয়মান হলেও অনেক অসামঞ্জস্যতা বিদ্যমান বলে পরিলক্ষিত।
অদূর ভবিষ্যতে সকল ত্রুটি-বিচ্যুতির অবসান ঘটিয়ে, আগামীর বাংলাদেশ বিশ্বের মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে দেশের এবং জনগণের সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটিয়ে এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা করি।।

জুনায়েদ আহমেদ সুন্দর
কমিউনিটি এক্টিভিস্ট

১৯৬৭ সালে দেশে যখন আমার বয়সী ছেলেরা স্বাধীকারের আন্দোলনে রাজপথে মিছিল মিটিং-শ্লোগানে সময় অতিবাহিত করছিলো আমি তখন জীবন এবং জীবিকার তাগিদে লণ্ডনে পাড়ি জমাই। সেসময় এখানেও সেই আন্দোলনের ছোঁয়া এসে লাগে। প্রতিদিন পূর্ব লণ্ডনের বিভিন্ন জায়গায় বাঙালীরা জমায়েত হতেন দেশমাতৃকার টানে। আমি ও কাজের ফাঁকে এসব জমায়েত মাঝে মাঝে যোগ দিতাম।
একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধের সময় আমার বয়স প্রায় ২০ বছর। বিলেতের সকল বাঙালী যখন মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পথে নামেন আমিও তখন বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তাদের ক্ষুদে সঙ্গী হই। একসময় এখান থেকে কিছু লোকজন ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে আমি ও তাদের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেই। কিন্তু আমরা যাওয়ার দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। লক্ষ প্রাণের বিনিময় অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের অহংকার।
দেখতে দেখতে মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিকূল প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক হানাহানি, গণতন্ত্রের সংকট ইত্যাদি সত্ত্বেও বাংলাদেশ উন্নতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সাধারণ মানুষের আশা আকাঙক্ষার প্রতিফলন না হলেও বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে একটি পরিচিত দেশ এখন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি থাকায় এর সুফল জনগণ সঠিকভাবে পাচ্ছেন না।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারসহ সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

কতটা এগোলো বাংলাদেশ?
সারওয়ার-ই আলম
বায়াত্তরে সাতশ’ ছিয়াশি কোটি টাকার বাৎসরিক বাজেটের দেশটিকে আজ পঞ্চাশ বছরে পদার্পণের পর যখন সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট নিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে বীরদর্পে যাত্রা করতে দেখি, তখন এ দেশটির একজন নাগরিক হিসেবে সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসবাস করেও গর্ব অনুভব করি। গর্বে আমি ও আমার মতো অনেক প্রবাসী আনন্দিত হই যখন দেখি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোকে পাশে ঠেলে বঙ্গপোসাগরের তীরের এই দেশটি ফি বছর নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মাঝেও প্রবৃদ্ধির সূচকে আট দশমিক একের ঘর অতিক্রম করে বিশ্বকে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিচ্ছে।
স্বাধীনতা উত্তর তলাবিহীন ঝুঁড়ির দেশটির তলা পঞ্চাশ বছরে আজ এতটাই সুসংহত যে মাত্র ছ’ বিলিয়ন ইউ এস ডলারের জিডিপি সময়ের পরিক্রমায় আজ তিনশ’ সাতচল্লিশ বিলিয়নে উপনীত- যা যে কোন অর্থনৈতিক বিবেচনায় ঈর্ষণীয় বটে।
দীর্ঘ ন’মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে সগর্বে আত্মপ্রকাশ করা সাতকোটি জনসংখ্যার দেশটি আজ আটচল্লিশ বছরে সতের কোটি সন্তান নিয়ে দণ্ডায়মান। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বিনিয়োগ ও জীবনমানে বহুলাংশে উন্নত মাত্র পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশটিতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় যেখানে মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র সাতচল্লিশ বছর, আজ অর্ধ-শতাব্দীর অগ্রযাত্রায় তা এসে দাঁড়িয়েছে বাহাত্তর বছরে- প্রত্যেক নাগরিক জন্যই বোধকরি বিষয়টি দারুণ সন্তুষ্টির; কারণ আমরা আরো বেশীদিন বাঁচতে পারবো, আরো বেশীদিন উপভোগ করতে পারবো সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামলা সোনার বাংলাদেশের স্নিগ্ধ আলো বাতাস।
বৈশ্বিক বিবেচনায় একটি অতি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ, প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জাতিগত ইতিহাসও যুগপৎ গৌরব ও গর্বের। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জীবনের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারীতে আজ লণ্ডন, প্যারিস ও নিউ ইয়র্কে যখন দেখি বিশ্ব আমাদের ত্যাগের কথা বলছে, শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে আমাদের ভাষা শহীদদের, তখন একজন বাঙালী হিসেবে আমার মত অনেক নাগরিকই গৌরবান্বিত বোধ করেন।
কিন্তু আমাদের এতসব অহংকার, আমাদের এত কাড়ি কাড়ি অর্জন ম্লান হয়ে যায়, যখন দেখি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে হন হন করে এগিয়ে যাওয়া দেশটি মানবিক সূচকে পিছিয়ে পড়ছে আশংকাজনকভাবে।
বাহাত্তরে মাত্র বিয়াল্লিশ মিলিয়ন ইউ এস ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যাত্রা শুরু করা দেশটি বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর আজ প্রায় ত্রিশ বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অবতীর্ণ হলেও মানবিক বোধ, সহনশীলতা, আইনের শাসন, পরমতসহিষ্ণুতার বিবেচনায় দেশটি যেন ততটাই পিছিয়ে পড়ছে- যা প্রকৃত অর্থেই আশংকার।
বাহাত্তরে সদ্যস্বাধীন যে দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র অষ্টআশি ইউ এস ডলার, আটচল্লিশ বছর পর আজ সে দেশটিতে মাথা পিছু আয় প্রায় পাঁচ হাজার ইউ এস ডলার হলেও খবরের কাগজে আমরা যখন দেখি অভাবের জ্বালায় সন্তানের ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অসহায় জননী দু’ সন্তান নিয়ে বিষ পানে আত্মহত্যা করেছেন, তখন সমচ্চ উন্নয়ন সূচককে যেন গোলক ধাঁধার মতো মনে হয়।
সন্তান প্রসবের পর হাসপাতালের খরচ পরিশোধ করতে না পেরে ছাড়পত্র পেতে ব্যর্থ প্রসূতিকে আমরা যখন হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করতে দেখি, তখন প্রবৃদ্ধির এ শনৈ শনৈ অগ্রযাত্রার হিসাব দেখে কেমন যেন ধান্ধা লাগে। মধ্যবিত্তের নিম্ন মধ্যবিত্ত অনুর্বর মস্তিষ্কে কিছুই পরিষ্কার হয় না- পাঁচ লাখ কোটি টাকার এ বিশাল বাজেটের টাকা আসলে যায় কোথায়!
উন্নয়নের সূচকগুলো আমাদের কেমন যেন ধোঁয়াশায় নিমজ্জিত করে! যখন রাজধানী ঢেকে যাওয়া তিলোত্তমা অট্টালিকা দেখি তখন মনে হয় এইতো আমরা এগোচ্ছি তীব্র গতিতে। পর মুহূর্তে অভাবের তাড়নায় কৃষকের কিডনী বিক্রি করার খবর পড়ে, মুক্তিযোদ্ধার রিক্সা চালানোর ছবি দেখে একেবারে চুপসে যাই। এইতো সেদিন ঢাকার কোন এক কাগজে দেখলাম এক শিক্ষিত তরুণ চাকুরীর পেছনে ছুটতে ছুটতে ব্যর্থ হয়ে এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করে নিজের ওপরই যেন নিজে প্রতিশোধ নিয়েছে। উন্নয়ন সূচকের কোন জায়গায় তার মত শিক্ষিত এক বেকার যুবকের মৃত্যুকে বসিয়ে আমাদের অর্থনীতিবিদগন রচনা করবেন নতুন মানবিক সূচক তা আমরা কেউই জানি না। কবে, কোন প্রহরে তা দেখবো আমরা?
এক বিলিয়নেরও বেশী ইউ এস ডলার খরচ করে আমরা সোয়া ছ’ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি, আমাদের নাগরিকদের হাতে হাতে আজ স্মার্টফোন, থ্রিজি সংযোগ, ঘরে ঘরে রঙিন এলসিডি টেলিভিশন, দেশজুড়ে একশ’ উনত্রিশটি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রায় ছ’ হাজার হাসপাতাল, দুই দশমিক আট বিলিয়ন ইউ এস ডলার খরচ করে মেট্রোরেল তৈরী করছি আমরা, দু’শ আটচল্লিশ মিলিয়ন ইউ এস ডলারের বিনিময়ে মহাশূণ্য ঘুরছে আমাদের স্যাটেলাইট ‘ বঙ্গবন্ধু’, কিন্তু তারপরও বিবেকের যুদ্ধে আমরা যেন হার মেনেই চলেছি প্রতিনিয়ত।
পঞ্চাশ বছরের পথপরিক্রমায় দেশটি যেন বিচারহীনতার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে আজ। নাগরিকেরা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চেয়ে মানববন্ধনে মিলিত হয় রাজপথে। শিক্ষার্থীরা যৌন নির্যাতনের শিকার সহপাঠিনীর হত্যার বিচার চেয়ে শ্রেণী কক্ষের পাঠদান ছেড়ে নেমে পডয় রাজপথে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্যায়ভাবে নির্যাতিত বাবার ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর শুনে তার শিশু সন্তান চিৎকার করে বলে উঠে- বাবা তুমি কান্না করতেছো যে, বাবা তুমি কান্না করতেছো কেন?
এরকম কান্না, এরকম ভয়ার্ত চিৎকারের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে । প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতা -কর্মীকে হত্যা ও গুমের এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি চালু হয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে। শুধুমাত্র মতের মিল না থাকায়, কিংবা রাজনৈতিক প্রতিবন্ধক মনে করায় রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অসংখ্য বিরোধী নেতা-কর্মীকে। চারদিকে এখন এক অদৃশ্য হানাদার বাহিনীর ভয়। মানুষ কথা বলতে সাহস পায় না, সমালোচনা করতে যেয়ে পিছু হটে। সারাদেশ জুড়ে গ্রেফতার ও গুম আতংক। মাত্র ছত্রিশ হাজার বন্দীর জায়গায় আটাত্তর হাজার বন্দীকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে কারাগারগুলোতে। মানবাধিকার সংগঠনের সূত্রে জানা যায় এর দুই তৃতিয়াংশই বিনা বিচারে আটক।
কী এক বিস্ময়কর গণতন্ত্র উপভোগ করছি আমরা! এ বিস্ময়কর গণতন্ত্রে বিচারহীনতা অতীতের যে কোন সময়ের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে যেন। শুধুমাত্র গত বছরের প্রথম ছ’মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একশ’ তিরানব্বই জনকে জীবন দিতে হয়েছে। অথচ স্বাধীন এ রাষ্ট্রটির মালিক তারা প্রত্যেকেই। কিন্তু তারা জানেনা কী তাদের অপরাধ, আমরাও জানিনা কোন আইনে, সংবিধানের কোন ধারা মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই অধিকার অর্জন করতে পারলো!
বোধকরি পঞ্চাশ বছরে যেমনি সবচে’ বেশী উন্নতি হয়েছে অর্থনীতিতে তেমনি সবচে’ বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের শাসন ব্যবস্থা। গণতন্ত্র যেন রীতিমতো আমাদের দেশে তামাশায় পরিণত হয়েছে। আমাদের গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ভোটের আগেরদিন রাতেই বাক্স ভর্তি হয়ে যায়। আমাদের গণতন্ত্রে দেশের প্রধান বিচারপতিকে আমেরিকায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হয়। আমাদের গণতন্ত্রে সংসদ চলে গৃহপালিত বিরোধী দল দিয়ে আর প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেত্রীর আশ্রয় হয় কারা প্রকোষ্ঠে। আমাদের গণতন্ত্রে গ্রেনেড হামলা করে একটি দল আরেকটি দলের নেতৃত্বকে একেবারে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে স্থায়ীভাবে কায়েম করতে চায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থা।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আজ জাতির সবচে’ বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমাদের সামনে এমন একজন সৎ, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক নেতা নেই যার নেতৃত্বে দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হতে পারে। রাষ্ট্রে আজ সবচে’ কলুষিত বিষয়টির নাম রাজনীতি। আমরা আজ প্রবৃদ্ধিতে এগোচ্ছি দারুণভাব কিন্তু আশংকাজনকভাব পিছিয়ে পড়ছে বোধ, বিবেচনা, সহনশীলতা ও মানবিকতায়।
এইতো সেদিন খবরের কাগজে দেখলাম বাষোট্টি বার পিছিয়েছে চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার তারিখ। কেন বার বার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হচ্ছেন সে বিষয়ে কারো কোন ব্যাখ্যা নেই। এখন উচ্চ আদালতও আর স্বপ্রণোদিত হন না। বুঝতে কষ্ট হয়না কোন শক্তিশালী মহলকে বাঁচাতে মরিয়া প্রশাসন। আর জনগণও হাজারো ঘটনার মাঝে যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। কতো বিষয়ে আর প্রতিবাদী হওয়া যায়! নিজেদের জীবনে হাজারটা সমস্যা। সকালে ঘুম ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতেই একেকটি রোমহর্ষক ঘটনা এসে হাজির। কোনদিন লেলিহান আগুনে পুড়ে যাচ্ছে চকবাজার। কোনদিন বনানীর সুউচ্চ ভবন। কোনদিন পঞ্চম শ্রেণীর শিশুছাত্রীকে ধর্ষণ করছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। কোনদিন ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারছেন মাদ্রাসা শিক্ষক কিংবা সাত বছরের শিশুকে বলাৎকার শেষে হত্যা করছেন ধর্মশিক্ষক। আবার কখনো নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দেয়ায় ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন জননী। আরেকদিন চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ছাত্রকে মেরে ফেলছেন বাসের হেলপার। কোথাও কন্যাকে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় হাত-পা বেঁধে মা-মেয়েকে মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে অপরাধীরা। আবার কোথাও মেয়েকে ধর্ষণের বিচার না পাওয়ায় ক্ষোভে গ্লানিতে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পডয় আত্মহত্যা করছেন হতভাগা জনক-জননী। কী সব অবিশ্বাস্য ঘটনা! স্বামী সন্তানের সামনে থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে গৃহিণীকে। মানুষকে মানুষ তুচ্ছ ঘটনায় মেরে ফেলছে।এতটুকু বুক কাঁপছে না কারো। অথচ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশে সমাজটা এতোটা ভয়ংকর ছিলনা কখনোই।
অর্থনীতির বিচারে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ঠাঁই করে নিচ্ছি ঠিকই কিন্তু নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতায় অতীতের সকল সময়কে হার মানাচ্ছি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক পরিসংখ্যান সেদিন চোখে পড়লো যাতে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ৬৩৯ জন শিশু। শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১০৫০ জন শিশু। দেখা যাচ্ছে আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম হলেও ধর্ষণ, নির্যাতনের ধরণ ছিলো নির্মম ও নিষ্ঠুর। অপরদিকে, শুধুমাত্র ২০১৭ সালে ৮১৮ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আসক-এর আরেকটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর ২০১৮ সালে দেশে ৪৩৭টি বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করেছে সংস্থাটি।
এভাবে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হলে হত্যা কিংবা হত্যা চেষ্টার ঘটনা ঘটছে। সমাজ দেহে বিবেকের পচন ও মূল্যবোধের সংকটটা আজ তীব্র। সমাজের যে মানুষগুলো নমস্য, যারা আমাদের আশা ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল, যাদেরকে অভিভাবকেরা বিশ্বাস করেন কোনরুপ দ্বিধা ছাড়াই; সেসব শিক্ষকেরাও শ্লীলতাহানী ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত- ভাবতেই গা শিউরে উঠে। অপরদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, যাদের দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ যেন রাষ্ট্র নিজেই কর্তৃত্ববাদী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে নিপীড়কের ভূমিকায়! এরকম অসহায়ত্বের মাঝে একজন নাগরিক হিসেবে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে- স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে প্রকৃত অর্থে কতটা এগোলো বাংলাদেশ?
লণ্ডন, ৫ই ডিসেম্বর ২০২১

কবিতা
ছায়া ধারণের পর

আতাউর রহমান মিলাদ

বহুকাল দাঁড়িয়ে আছি নিঃসঙ্গ সিঁড়িতে
রক্তের দাগ মুছে পবিত্র হয়েছি কবে!
সময় ও সাহসে জেনেছি কার পায়ের ছাপ
      পড়ে আছে এই বাংলার জনপদে

ঘুম ভাঙ্গিওনা জনক ও জননীর
পাতা ও বৃক্ষের
শুয়ে আছে যারা অনন্তকালের স্তব্ধ প্রবাহে
যদি পারো
আয়ত্ব করো তাদের জীবনপ্রণালী

স্বপ্ন ও সম্ভাবনা
ধ্যানে ও জ্ঞানে

কেঁদে ওঠোনা সহস্র ভুলের নীরব আর্তনাদে
আঙুলে বোনে রোদের স্বভাব

সম্পর্কের নাভি ও নাড়িতে
জন্মসূত্রে এঁকে দাও বিবিধ চুম্বন।

পঞ্চাশে বধির আজও...

আহমদ ময়েজ

তুমি যখন ঘুমের ভেতর শব্দের তড়পানি শুনো
গজানো তরুর ভারে লিখে রাখো নিক্তির মাপ
অনেকে বুঝে না এর সরল মাপজোক।

পাজুনের খোঁচায় যতোই হেঁটে যাও আইলপথ
জোয়ালের ভারে নতো হওয়া অবয়ব আজও
            মুক্তির ঠিকানা খুঁজে বহুদূর।
ভাবের সারল্যে লেখা পাতকির চারণভূমি
        কর্ষণে যতোবার উচিয়েছি গলা
আড়ষ্ট কাটেনি আজও বোধের সজ্ঞায়-

এই বোধ গিলে খায় চেতনাবণিক
এই বোধ উজাড় করে বৃত্তের দাস
এই বোধে নাই কোনো মুক্তির স্বাদ।

পঞ্চাশে স্থবির আজও আলোপথ
পঞ্চাশে বধির আজও জাতির বিবেক।

তোমাকে অভিবাদন স্বদেশ

দিলু নাসের

স্বদেশ আমার, তোমার জন্য বুজান আমার
লাল শাড়ীটা আর পড়েনা
তোমার স্বাধীনতার লাগি সেই যে বাবা যুদ্ধে গেলো
আর এলো না, তোমার জন্য মায়ের ছেলে
কোন পথে যে হারিয়ে গেলো কেউ জানে না-

কেউ জানেনা...  
তাই তো আমার মায়ের চোখে জল থামে না ।
স্বদেশ আমার, তোমার এখন অর্ধশতক পূর্ণ হলো
তোমায় দেবার জন্য আমার কিছুই নেই
শুধু আছে হৃদয়খানি, ভালোবাসার অঞ্জলি এক
জন্মদিনে তোমায় অভিবাদন স্বদেশ।

প্রত্যাশা এই...
শান্ত নিঝুম, স্নিগ্ধ পরিপাটি থাকুক তোমার মাটি।
হও তুমি দেশ মায়ের আচল, নরম শরীর, শীতল পাটি
অযুত জনের জন্য তুমি স্নিগ্ধ ছায়া, আশার পিদিম
হও তুমি দেশ।

তোমার সুনীল আকাশ জুড়ে উঠুক আবার রৌদ্র কড়া
সকাল দুপুর সন্ধ্যা বিকেল
তোমার এ বুক উঠুক জেগে বাউল কবির নির্ভাবনার পদচ্ছাপে
হউক অনাবিল জীবনযাপন।

স্বদেশ আমার, তোমার আসুক সানকিতে ভাত
পূর্ণিমা চাঁদ, তোমার জীর্ণ বৃক্ষ আবার
উঠুক হয়ে পল্লবিত,

তোমার আবার ফুটুক হাসি প্রাণ জুড়ানো
হয় যেন ফের মুখরিত শান্ত ঘন বন-বনানী অরণ্য সব পাখির গানে ফুলের ঘ্রাণে।

পদ্মা-তিতাস-সুরমা নদীর কলতানে
সজীবতা আসুক ফিরে তোমার প্রাণে।

হও তুমি দেশ দীর্ঘজীবী-
তোমার যেন ঘুম না ভাঙে মধ্যরাতে শব্দে বুটের
তোমার বুকে আর না মারুক নখের আঘাত
শকুন কিংবা হিংস্র শ্বাপদ।

তোমার আকাশ হয়না যেন
কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলিতে বিশ্রী আবার
হও তুমি দেশ, সৌন্দর্য্য, স্বপ্ন এবং-
টুকটুকে লাল স্বপ্ন বুকে

সম্ভাবনার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ।
দেশ তুমি হও দীর্ঘজীবি
জন্মদিনে তোমায় অভিবাদন আমার।

ক্রান্তিকালের
বালিকারা, এসো

তৌহিদ শাকীল

বকেয়া আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে
ফিরে এসেছে পুরোনো পুরুষ
উত্তরাধুনিক উন্মাদনার প্রেক্ষাপটে তাঁর
ঘন আকাঙক্ষার ঝিল্লি ঝাঁঝরা হয়ে গেছে

অন্তর্ভেদী বেদনায়
চর্চিত অনুধাবনের শৈলীতে আগাম দেখে নিয়েছে
নবজাতকের বিমূর্ত পাণ্ডুলিপি
প্রুফরিডারের পদলোপ হবার অনেক আগেই
অভিধানের পাতা থেকে উঠে গেছে ‘মুদ্রণপ্রমাদ’

বিপ্লবের সম্মিলিত সুরের মতো
বিষণœ পাখির ঝাঁক আকাশ পেরিয়ে গেলেও
দৈনন্দিন ধুলোয় চাপা পড়ে গেছে বেহালার বিষাদগীতি
চাকার নীচে মানুষের পায়ে চলার বিবর্ণ পথ
গিলে নিয়েছে অতিক্রান্ত মিছিলের যাবতীয় দ্রোহস্বর

পড়ে আছে কিছু গল্পকথা শুধু,
তলোয়ারে শান, অশ্বপৃষ্ঠে বিদ্রোহের ঋণ
ঢালাই করা পাটাতনে ঢাকা
তিক্ত স্বাদ অতিক্রম করে
দেউটির মাটি ধরে হেঁটমুণ্ড ছায়াবাহকের মতো

অপেক্ষায় আছে
মোটরবালিকারা কবে রাজ্যশাসন করবে
চোখের কোটরে আর দিগন্ত দেখে না এ নগর...

সেই মহাপুরুষ

আবু মকসুদ

নগরের মানুষের ব্যস্ততা বড় বেশি
তারা এদিক যায়; সেদিকে যায়
অকারণ দিক-বিদিক ঘুরে বেড়ায়।
তাদের হাতে অফুরন্ত সময়
তারা গল্পগুজব, আড্ডায়
সময়কে অসময়ে পর্যবসিত করে।

নগরের মানুষেরা গায়ে হাওয়া
লাগিয়ে বেড়ায়। বাজারে, চায়ের
দোকানে; অহেতুক হাওয়া কথা বলে
বাতাস উত্তপ্ত করে। ঈশানের কোনে
কালো মেঘ জমা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে
ঝডয়র আলামত। নগরের মানুষেরা
উদাসীন; সমূহ বিপদ বিচলিত করছে না।

নগরের মানুষেরা মত্ত নিজেদের নিয়ে
সার্টের বোতামে, হাতের তালুতে,
পাজামার ফিতায় তারা জপে যায়
নিজস্ব গুণগান। তাদের অগোচরে
সাপ বলশালী হচ্ছে, প্রবল তেজে
উঁচিয়ে ফণা তেড়ে আসছে।
আজদাহা আসছে বিষাক্ত শ্বাসে
তছনছ করতে জনপদ।

নগরের মানুষেরা বড় বেশি অগোছালো
তারা দিকনির্দেশনা হীন।
তারা কোন স্বপ্ন দেখে না
শুষ্ক বিছানায় মৃতবৎ পড়ে থাকে।

নগরে যখন কোনো আশার আলো বাকি নেই
চারিদিকে যখন ক্ষুধার্ত শকুন
তখন তিনি এসে দাঁড়ালেন

তর্জনী উঁচিয়ে বললেন ‘ভায়েরা আমার’
তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানালেন
তাঁর ডাকে অগোছালো মানুষ সারিবদ্ধ হল।
তিনি তাদের নিয়ে পৌঁছুলেন।

পৌঁছুলেন সবুজের পাড়ে
তিনি এসেছিলেন বলে আমরা কণ্ঠ পেয়েছি
তিনি এসেছিলেন বলেই গলা খুলে গাইতে পারছি
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায়...’

‘প্রতীক্ষা’

ফারাহ্ নাজ

এই যে এমন মেঘে ঢাকা অন্ধকার আকাশ
থমথমে, দম বন্ধ হয়ে আসা বিষাক্ত অনীল
মায়া ও প্রেমহীন এই সব দিন রাত্রি -
একদিন এইসব উদ্ভট ও অশান্ত সময় বিদায় নেবে!
সন্ধ্যেবেলা বাগানে ফুটে থাকা হাসনাহেনা
সুবাস ছড়াবে রাতভর...
শান্ত নদীর মতোন তিরতির বয়ে যাবে জীবন
রাতের বুক চিরে জোনাকিরা আলো জ্বেলে
সুর তুলবে গুনগুনিয়ে...
কুয়াশা নামা ভোরে শিউলী বৃষ্টি হবে
এই এক ফালি উঠোন জুড়ে...
হেমন্তের ঝরে পড়া বাদামী পাতায়
হেসে উঠবে শুভ্র শিশিরের ঝিলিক!
সকালের চায়ের কাপে খেলা করবে
ঝলমলে রোদ্দুর ও আলো ছায়া।
জীবনের দেনা পাওনার হিসেব কষা
খসে পড়া সময় আর পিছু ডাকবে না।
সে’সব মন খারাপের মেঘ গুণে
মন আর নিভৃতে কাঁদবে না
মুখোশ পড়া অশরীরী আত্মাগুলো বিলীন হবে,
থাকবে কিছু শুদ্ধ মানুষ ও ভালোবাসা!

পালান্তর

শামীম আজাদ
ডিসেম্বর এলেই বাতাসের বদলে
বুকে হরিণ ঢুকে পড়ে
আর আমি শূন্যে উঠে উর্ধ থেকে
উ?ো হয়ে যাই
নিচে পড়ে শিঙ ভেঙে নিষ্ফল তড়পাই।

পঞ্চাশ বছরে
অনেক তো ঘুমিয়েছি
আর আমি ঘুমোবো না
মাথার বাহুল্য ও বিষ হইয়াছে শেষ।

তোমরাও বাবু নগরের
ভূতের গোসলখানার স্নান বাদ দাও
নিজ মাংসে বৈরী না হলেও
নিজ নির্বুদ্ধিতার হবে,
হয়েছো তো অনেকেই।

সমগ্র সরিয়া গেছে
মরে গেছে টলে গেছে
থাকে নাই প্রাণ।
কেবল জমির জাজিমটুকু আছে
দাঁড়াবার দ্যাশ আছে
ক্রন্দন করিবো বলে
আছে আসমান।

আরেকটি আঁক হলেই
নাব্যতা এসে যাবে
আর দু’টো কুটো হলে
কেটে যাবে ভাইস।

যেমন পাঁচটি দশক আগে-
আমাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার
অবশিষ্ট অঙ্গারটুকু ছিলো
আর তা থেকেই
অঙ্কুরিত হয়েছিলো আগুন।

ঘুম চটে গেছে-
আর আমি নেবো না নিদ্রা যখন তখন
আর আমরা বরফের নাও বাইবো না।
অকালকুষ্মাণ্ড যত আছো,
এই বার তোমাদের পালা।।

মনে পড়ে বিজয়ের সেই দিনটি
ঊর্মি রহমান
সাংবাদিক, বিবিসির বাংলার সাবেক প্রযোজক
পাঁচ দশক পার করে ফেললাম আমরা। অনেকটা পথ হাঁটলাম। কিন্তু আমাদের দিক নির্দেশনা কি ঠিক ছিলো এই পুরোটা সময়ে? আজ এত বছর পর সেই প্রশ্ন অনেক সময় বড় হয়ে দেখা দেয়। এর মধ্যে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে আয়োজিত একটি সরকারী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম। সেটা জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী না স্বাধীনতার উৎসব ঠিক বোঝা গেলো না। সেখানে উচ্চারিত হলো না মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। চার নেতা এমনকি অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ বা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নাম। দেশের অগণিত মানুষ - যাঁরা জীবন দিয়েছেন, সম্মান-সম্ভ্রম দিয়েছেন, তাঁদেরও স্মরণ করা হলো না। যে উপহারের ব্যাগ তৈরী করা হয়, তাতেও বোঝা যায়নি সেটা স্বাধীনতার অর্ধ শতক উদযাপনের অনুষ্ঠান। আমার পরিবারে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা আছে। আমার এক ভাই একাত্তরে পাক বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছে। আমার বয়স তখন একুশ বছর। যা দেখেছি আর যে সময়টা পার করেছি, তার কথা মনে এখনো স্পষ্ট ছবি আঁকা হয়ে আছে। কষ্ট আর দুঃখ তাই বড় বেশী বেজেছে।
আমার বড় ভাগ্য যে আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। আমার অহঙ্কার যে, আমি বিজয় দেখেছি। আমরা সে সময় ঢাকায় না-ও থাকতে পারতাম। কারণ, ১৯৭১ সালে আমরা খুলনা থাকতাম। আব্বা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ফরেস্ট ম্যানেজার ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিন পর প্রথম সুযোগে আব্বা আমাদের নিয়ে ঢাকা বড় চাচার বাড়ি চলে আসেন। ১৬ই ডিসেম্বর আমরা সে বাড়িতে অনেকে ছিলাম। আকাশযুদ্ধ শুরু হবার পর পাকিস্তানীদের রাত-বিরাতে হেলিকপ্টারে ফেলা বোমায় বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে আমাদের কিছু আত্মীয় সেখানে এসে আশ্রয় নেন। দুঃসহ দিন পার করেছি আমরা। আশা হারাইনি। মুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখেছি। সেই দিনটি কি ভোলা যায়? আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। তার আগে প্রতি রাতকে আমরা ভেবেছি সেটাই জীবনের শেষ রাত। গভীর রাতে গলিতে জীপের আওয়াজে আমাদের রুদ্ধশ্বাস প্রহর গুণতে হয়েছে। প্রতি রাতই ছিল কালরাত্রি। মনে হয়েছে আর বুঝি সূর্যের মুখ দেখবো না। আর সেরকম রাত আসবে না। প্রতিদিন গোপনে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনেছি। আর সে গোপনীয়তার প্রয়োজন নেই। এবার আমরা স্বাধীনতার কথা জোর গলায় বলতে পারবো, দেশকে ভালবাসি, সেকথা বড় গলায় বলতে পারবো। স্বাধীনভাবে সব কথা বলতে পারবো। সে দিনটি ছিলো এক অবিস্মরণীয় দিন। আনন্দে অধীর আমরা সবাই মিষ্টিমুখ করতে চেয়েছি। কিন্তু কোথায় পাবো মিষ্টি? কোনো রকমে পেট ভরাবার মত খাবারের জোগাড় করাই ছিলো দুষ্কর। তার আগের মাসগুলোতে কোনো রকমে জীবন ধারণ করেছি। ঘরে গুড় ছিল। মিষ্টি বানাবার বা মিষ্টি খাবার কোনো ব্যাপার তখন ছিলো না, তাই গুড়টা অব্যবহৃতই পড়ে ছিলো। তা দিয়েই আমরা স্বাধীন হবার আনন্দ উদযাপন করেছিলাম।
১৬ই ডিসেম্বর আমাদের আনন্দ আমরা রাখতে পারছিলাম না। তবে তার মধ্যেও একটু মন খারাপ ছিলো। কারণ আমাদের যমজ ভাই মিজান-মুনিব, যারা মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকে চিরকূট রেখে এক কাপড়ে বেরিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো, তাদের কোন খোঁজ তখনো পাইনি। কিন্তু মন বলছিলো, ওরা ভাল আছে। ওরা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসবে। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণ করতে যাবার পথে গুলী ছুঁড়েছে বাঙালিদের ওপর। আমার মেজভাই টুবুল, যাকে আমরা টাবী বলে ডাকতাম, তার উৎসাহ প্রচণ্ড। সে বেরিয়ে গেলো। সঙ্গে বড় বোন নীনার দেওর বাবলু। তারা এই গুলীবর্ষণের সাক্ষী। কেউ কেউ এতে আহতও হয়েছিলো। রেস কোর্সে মিত্রবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরা এবং পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর জেনারেল নিয়াজীর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হলো। আমরা সকলে আনন্দে উদ্বেল। আমরা বোনরাও ছুটে বেরিয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু আমাদের সেদিন আটকে রাখা হয় এই সব কথা শুনে। আমরা অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। ঘরে বসেই টের পাচ্ছিলাম গোটা শহর মেতে উঠেছে আনন্দ উৎসবে। পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা সংশয় তখনো ছিলো। তাই আমাদের বয়সী মেয়েদের বেরোতে দেওয়া হচ্ছিলো না। তার আগের ন’মাসের আতঙ্ক সবার ওপর যেন তখনো চেপে বসেছিলো। বিজয়ের আগের সময়টাতে আমাকে ও সমবয়সী চাচাতো বোন পিউকে ঢাকার বাইরে তথাকথিত কোনো নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দেবার চেষ্টা হয়েছিলো। আমরা শক্তভাবে তা প্রতিহত করেছিলাম। কারণ আমরা ‘ঢাকা কিভাবে ফল্ করে’ সেটা না দেখে কোত্থাও যাবো না বলে পণ করেছিলাম। ডিসেম্বর মাসে যখন ভারত-বাংলাদেশ মিত্রবাহিনী ও পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো, তখন গুরুজনদের নিষেধ অমান্য করে বার বার ছাদে ছুটে গিয়েছি কক্ফাইট দেখতে। মিত্রবাহিনীর পক্ষে বার বার পাকিস্তানী বাহিনীকে “হাতিয়ার ডাল দো” শোনার জন্যও ছাদে ছুটে গিয়েছি। কিন্তু সেদিনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে পারিনি। আমি ও পিউ ঠিক করলাম পরদিন আমরা বেরোবোই। কেউ আমাদের আটকে রাখতে পারবে না। সন্ধ্যা হলো, রাত হলো। আমাদের চোখে ঘুম ছিলো না। বেশ রাত। হঠাৎ আমাদের বাড়িতে দরজায় জিপের আওয়াজ। সেই সাথে করাঘাত, বেশ জোরে-সোরেই। আচমকা আগের ন’মাসের আতঙ্ক ফিরে এলো। কিন্তু যা বোঝা গেলো, দরজা না খোলা পর্যন্ত এই তীব্র করাঘাত চলতে থাকবে। তাই বাধ্য হয়ে গেট খোলা হলো। হুড়মুড় করে ঢুকলো একদল টগবগে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। অনেকেরই পরণে লুঙ্গি অথবা গোটানো প্যান্ট। কাদা মাখা পা। নেতৃত্বে মায়াভাই- মোফাজ্জল হোসেন মায়া। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকায় গেরিলা অপারেশনে এসে আমার চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিতেন মায়াভাই, মানু আর সেই সাথে আরো কেউ কেউ। পরে এক পর্যায়ে পাকিস্তানী সেনারা তাঁদের খোঁজে এসে আমাদের মেজভাই টাবীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। কিভাবে তাকে আমরা ফিরে পেয়েছিলাম, সে এক অন্য কাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ চলার সেই সময়গুলোতে মায়াভাই খুব কম কথা বলতেন। এমনকি খাবার সময়ও মুখ নিচু করে নিঃশব্দে খেয়ে যেতেন। সেই মায়াভাইয়ের অন্য এক রূপ দেখেছিলাম সে রাতে। উদ্ভাসিত মুখে অনর্গল কথা বলছিলেন। জানলাম তাঁরা ঢাকার কিছুটা বাইরে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হয়েছে জানার পর ঢাকায় ঢুকেছেন। তাঁরা চাচীকে বললেন, “খালাম্মা আমাদের ক্ষিদে পেয়েছে। কিছু খাওয়ান।” ঘরে বলতে গেলে কিছুই নেই। পাড়ার মুদির দোকানদারকে তাঁর ঘর থেকে ডেকে তোলা হলো। দোকান খুলে মুড়ি, গুড়, বিস্কুট ইত্যাদি যা যা পাওয়া গেল, তাই দিয়ে বিজয়ের রাতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করা হয়েছিলো। আমাদের বিজয়ের আনন্দের ষোলকলা যেন তাতে পূর্ণ হয়েছিলো।
পরদিন পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি, পিউ আর আমার স্কুলের বন্ধু আজমিরী ওয়ারেস অনেক কিছু একসাথে করেছি। আজমিরী বা মীরুর সাথে আমাদের এক ধরনের আত্মীয়তা থাকায় ওদের বাড়িতে আমাদের যাওয়া অথবা আমাদের বাড়িতে ওর আসায় তেমন বাধা ছিলো না। থাকতামও মোটামুটি কাছাকাছি। আমরা ডঃ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এবং আমাদের এক মামা, ডঃ শফিউল্লাহ্র সাথে দেশের ভেতরেই মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক কাজকর্ম করেছি। সেকথা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এবং মোহাম্মদ মোদাব্বেরের বইতে লেখা আছে। আজমিরীর ভাই স্থপতি শামসুল ওয়ারেসের এনে দেওয়া প্রচারপত্র, পুস্তিকা ইত্যাদি অনুবাদ করেছি। সেই সময়ের একটি ঘটনা না লিখলেই নয়। একদিন ওদের বাড়ি থেকে একা রিক্সায় ফিরছিলাম। পিলখানার গেটের কাছে এসে দেখলাম ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এর সদস্যরা প্রতিটি যানবাহন থামিয়ে তল্লাশী চালাচ্ছে। আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। কারণ আমার সঙ্গে একটি ফাইল ছিলো, যার ভেতরে সেলাই-এর নকশার মাঝে লুকানো ছিলো শামসুল ওয়ারেসের দেওয়া প্রচারপত্র, যা আমি অনুবাদ করবো বলে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কি ভেবে যেন ইপিআর সদস্যরা আমার রিক্সার চালককে ইশারা করেছিলো চলে যেতে। হয়ত আমি একা মেয়ে বলে কিংবা তাদের অধিকাংশ বাঙালি ছিলো বলে।
আমি, পিউ আর মীরু সবই একসাথে করেছি, তাই ১৭ই ডিসেম্বরও আমরা এক সাথেই বেরোলাম। তার আগের রাতে আমরা কিছু পোস্টার লিখেছিলাম। বাড়িতে কোনো সাদা কাগজ ছিলো না আর কাগজ কেনার কোন উপায়ও ছিলো না। তাই আমরা পুরনো সংবাদপত্রের পাতায় আলতা দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার কথা লিখেছিলাম। ১৭ই ডিসেম্বর বেরিয়ে সেসব নানা জায়গায় সেঁটে দিয়েছিলাম। শহীদ মিনারে যখন আমরা তিনজন পোস্টার লাগাচ্ছিলাম, তখন মাইক্রোফোন হাতে একজন সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক এসে বলেন, তিনি আমাদের সাক্ষাৎকার নিতে পারেন কিনা। আমরা তার আগের ন’মাস স্বাধীন বাংলা বেতারের পাশাপাশি নিয়মিত লুকিয়ে-চুরিয়ে বিবিসি, অল ইণ্ডিয়া রেডিও এবং আকাশবাণী শুনতাম। ফলে কিছু সম্প্রচারকের ভক্তে পরিণত হয়েছিলাম। তিনি তাঁদের কেউ কিনা জানার জন্য তাঁর নাম জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, তাঁর নাম চঞ্চল সরকার। তাঁর নিয়মিত কথিকা “আমার মতে” শুনতাম আমি আর আব্বা। শুনে শুনে তাঁর ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে তাঁর নাম শুনে প্রায় বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। তিনি অনেক কথাই জানতে চাইলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা। বিজয়ের সংবাদে আমাদের প্রতিক্রিয়া কি ছিলো আর কিভাবে সে আনন্দ উদযাপন করেছি। আমরা গুড় খাবার কথা বললাম। পরে যখন আকাশবাণী শুনলাম, তখন দেখলাম তিনি অন্য অনেক কথা এডিট করে বাদ দিলেও ঐ কথাটা রেখে দিয়েছিলেন আর একই অনুষ্ঠানে ইংরেজী ভাষ্যে বাঙালির মিষ্টি খেয়ে আনন্দ উদযাপনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, বিজয়ের সময়কার সেই অল্প আলাপ এক দীর্ঘকালীন শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্কে গড়িয়েছিলো। সেদিন আমরা সারা ঢাকা ঘুরেছিলাম। স্টেডিয়ামের কাছে এক রাজাকারের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখলাম। শহরে সবে প্রবেশ করা অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে দেখা হয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়নের মাহবুব আলমের সাথেও দেখা হয়। কথা হয়েছিলো। শহরে প্রবেশকারী ভারতীয় বাহিনীকে দেখেছিলাম। গোটা শহরের মানুষ যেন সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিলো। আমরা সবাই বিজয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। আমরা মেয়েরা যেখানে যেখানে গিয়েছিলাম, সেখানে সবাই সরে গিয়ে পথ করে দিয়েছিলো। সম্মান করেছিলো। বলেছিলো, আমরা তাদের বোন। মনে হয়েছিলো আমরা এক পরিবারের সদস্য। বিজয়ের সেই আকাশ ভরা আনন্দ আমরা সব্বাই এক সাথে উদযাপন করেছিলাম।
আজ এত বছর পরও সেই আনন্দে উদ্বেল বিজয়ের উল্লাসে ভরপুর ঢাকা শহরের কথা মনে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। ফিরে পেতে ইচ্ছে সেই ঢাকাকে - সেই স্বাধীন, নিরাপদ, সুন্দর শহরটাকে। ফিরে পেতে ইচ্ছে করে মৌলবাদের হিংস্র থাবামুক্ত দেশকে। ঊনিশ শ’ একাত্তরের বিজয়ের মাসের প্রিয় মাতৃভূমির সেই কলুষমুক্ত পবিত্র রূপটিকে। সেই সুন্দর, পবিত্র, অসাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যে ভরা দিনটি, সাম্য আর বৈষম্যহীন চমৎকার পরিবেশের সেই দিনটির কথা এখন আরো বেশী করে মনে পড়ে। তাকে কি আমরা এই এত বছরে হারিয়ে ফেলেছি?
কলকাতা, ১লা ডিসেম্বর ২০২১

১৯৭১ঃ প্রসঙ্গ শরণার্থী ও অক্সফ্যাম
উদয় শঙ্কর দাশ
কলামিস্ট, বিবিসি বাংলার সাবেক সাংবাদিক
বাংলাদেশের বিজয় দিবসের পঞ্চাশ বছর পূর্তি আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়, এই বিজয় এসেছে অনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেক স্বপ্ন ও জীবনের বিনিময়ে, অনেক আশা ও সাধনার উচ্ছ্বাসে। ন’মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, আদিবাসী তথা ধর্ম, জাতি, শ্রেণী, নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতি। ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয় স্বাধীন মাতৃভূমি- বাংলাদেশ। সেই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য সর্বস্ব ফেলে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল এক কোটি বাঙালি। শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে। সেটাও ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়।
১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে বাঙালী জাতীয়বাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-এর বিশাল বিজয় পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী কোনোমতেই মেনে নিতে পারেনি এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে করছিল গড়িমসি। তারপর, মুক্তি ও স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের আন্দোলন দমনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পঁচিশে মার্চের ‘কালো রাতে’ শুরু কোরলো তাদের বাঙালি নিধন অভিযান ‘অপারেশন সার্চলাইট’। নিরপরাধ, নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর তারা চালালো এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ (সেই রাতেই তাঁকে গ্রেফতারের আগে, বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা)।
শতশত বাঙালিকে সারিবদ্ধ ক’রে, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি ক’রে হত্যা করা ছাড়াও পাকিস্তান সেনাবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম, ধর্ষণ করেছে নারীদের- যার ফলে, নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞের বেদনাদায়ক স্মৃতি নিয়ে লাখ লাখ লোক তাদের প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য, বিশেষ ক’রে, পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এদের বেশীর ভাগই ছিল হিন্দু, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ধারণা, হিন্দুরা ১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের জন্য দায়ী করে হিন্দুদের। তাদের ভোটেই নাকি আওয়ামী লীগ ঐ নির্বাচনে জয়লাভ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্রোধ থেকে রক্ষা পেতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিমও তখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের সামাল দেওয়া ভারতের জন্য একটা বোঝা হয়ে দাঁড়ালো- অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে। কিন্তু ভারত সরকার এবং সেই দেশের সাধারণ জনগণ শরণার্থীদের সাদরে গ্রহণ করলেন এবং তাদের সাহায্য প্রদানে এগিয়ে এলেন। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান জনাকীর্ণ অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয়গ্রহণকারী শরণার্থীদের দুঃখ- দুর্দশা লাঘবে ত্বরিতগতিতে ব্যবস্থা নিতে শুরু করলো। কিছু সংখ্যক শরণার্থী অবশ্য তাদের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়ের বাড়ীতে থেকেছিলেন।
আমাদের পরিবারকেও ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ের পথে হেঁটে রামগড়ে পৌঁছে, সাব্রুমে সীমান্ত অতিক্রম ক’রে প্রবেশ করলাম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। সাব্রুম থেকে সড়ক পথে আগরতলায়, সেখানে একটি কলেজের হোস্টেলে ছিলাম তিনদিন। এরপর, বাসে ও রেলে মেঘালয় ও আসাম হয়ে চারদিনের আরেক কষ্টসাধ্য যাত্রা শেষে পৌঁছালাম কোলকাতায়। সেখানে, পার্ক সার্কাস এলাকায় বাংলাদেশ মিশনের পেছনে মেহের আলি রোডে একটি ভবনে দু’টো কামরায় থাকতাম আমাদের যৌথ পরিবারের আঠারো জন সদস্য।
তখন কোলকাতাতেই আমি আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান অক্সফ্যাম-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। তারা ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী ছয় লাখ শরণার্থীর দেখাশোনা করতো, বিশেষ ক’রে পশ্চিম বঙ্গে, সেই সঙ্গে আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যেও। ঐ সময়, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলির প্রধান কাজকর্ম পরিচালিত হোতো কোলকাতা থেকেই, ত্রাণ সংস্থাগুলি তাদের দফতর গড়ে তুলেছিল সেই শহরেই। আমার মনে আছে, একদিন কোলকাতায় চৌরঙ্গীতে হঠাৎ আমার স্কুলের সাবেক অধ্যক্ষ ব্রাদার রেমণ্ড কোরনোয়ারের সঙ্গে দেখা। তাঁকে সবসময় দেখেছি পাদ্রীর পোষাকে, তাই আমাদের মত সাধারণ পোষাকে প্রথমে তাঁকে চিনতে পারিনি। তিনি আমাকে দেখে খুশী হলেন, আমিও বেশ উচ্ছ্বসিত। কেমন আছি, আমার পরিবারের সবাই কেমন আছে জানতে চাইলেন। তারপর আমাকে নিয়ে গেলেন নিউ কেনিলওয়ার্থ হোটেল-এ। সেখান ছিল অক্সফ্যাম-এর শরণার্থী ত্রাণ কর্মসূচী পরিচালনা ও সমন্বয় দফতর।
ব্রাদার রেমণ্ড ১৯৬৫ সালে কানাডায় ফিরে যান। এরপর, তিনি কুইবেকে অক্সফ্যামে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে তাঁকে ভারতের পূর্বাঞ্চল ও পূর্ব পাকিস্তানে অক্সফ্যামের ফি? ডাইরেক্টর নিয়োগ করা হয়। শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয় গ্রহণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনার জন্য কোলকাতায় একটি প্রশাসনিক দফতর খোলেন। সেই কেনিলওয়ার্থ হোটেলেই আমার পরিচয় হয় আরেক ইংরেজ জুলিয়ান ফ্রান্সিস-এর সঙ্গে, যিনি ছিলেন অক্সফ্যামের ত্রাণ কর্মসূচীর সমন্বয়ক। ব্রাদার রেমণ্ড আমাকে তার পরদিন থেকেই কাজ শুরু করতে বললেন।
আমাকে প্রথমে দেওয়া হল পণ্যাগারের দায়িত্ব। ধর্মতলায় ছিল তাদের বিশাল পণ্যাগার যেখানে ত্রাণ সামগ্রী, যেমন কম্বল, বাসন, ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রী, রাখা হত আর সেখান থেকেই পাঠানো হত অক্সফ্যামের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। আমার মত যারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে তাদের জন্য কিছু করতে পারছি, এটা ভেবে ভালো লাগছিল, আমাকেও তো তাদের মত শিবিরে থাকতে হতে পারতো।
মাসখানেক পণ্যাগারের এই দায়িত্ব পালনের পর, জুলিয়ান আমাকে একদিন অফিসে ডাকলেন এবং আরও বড় একটি দায়িত্ব। আমার কাজ হবে পশ্চিম বঙ্গ সীমান্তে অক্সফ্যাম-পরিচালিত শরণার্থী শিবিরে গিয়ে সেখানকার কাজ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ণ, তারপর শিবিরগুলির প্রয়োজনীয়তা এবং করণীয় সম্পর্কে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন লিখে জুলিয়ানকে দেওয়া। নিজে একজন শরণার্থী হয়ে ঐ বয়সে অক্সফ্যামের মত একটি প্রতিষ্ঠানে এরকম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে বেশ ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল নিজেকে। আমার এই কাজে জুলিয়ান আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন, উৎসাহ দিয়েছিলেন। সপ্তাহে ছ’দিন শিবিরগুলি পরিদর্শনে যেতাম আর সবকিছু লিখে রাখতাম। একদিন অফিসে ব’সে ছ’দিনের কাজ নিয়ে প্রতিবেদন লিখে জুলিয়ানকে দিতাম। তিনি সেগুলি দেখে পাঠিয়ে দিতেন অক্সফোর্ডে অক্সফ্যামের সদর দফতরে। ঐ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এর পরের করণীয় নির্ধারণ করা হত।
আমাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় এমন কোনো ঘটনা আমার মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছিল কি না। প্রত্যেকটা দিনই ছিল মনে দাগ কাটার মত, যখনই দেখতাম শরণার্থীরা ত্রাণ সামগ্রীর জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তাম। আমিও তো তাদের মত একজন। ভাবতাম, এদের তো এই করুণ অবস্থায় থাকার কথা নয়। সবচেয়ে বেশী ভেঙে পড়তাম যখন ঐ সারিগুলিতে পরিচিত লোকজনদের দেখতাম। তবে, এটা ভেবেও ভালো লাগতো যে তাদের সামান্য সাহায্য হলেও কিছুটা করতে পেরেছি এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে অক্সফ্যাম। আমার দেশের মুক্তিযুদ্ধে এটা ছিল আমার অতি সামান্য অবদান।
এই বিশাল ত্রাণ কর্মসূচী ছাড়া, অক্সফ্যাম আর যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ তখন করেছিল সেটা হচ্ছে, ‘দ্য টেস্টিমনি অফ সিক্সটি অন দ্য ক্রাইসিস ইন বেঙ্গল’ নামে একটি দলিল প্রকাশনা। বিশ্ব নেতাদের চোখ খুলে দেওয়ার এবং শরণার্থীদের এই ট্র্যাজেডী সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে বিশ্বের ষাটজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁদের কথা লেখেন এই দলিলে। এঁদের মধ্যে ছিলেন মাদার টেরেসা, সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী, এন্টনী মাসকেরেনহাস, টনি পিলজার, নিকলাস টমালিন এবং মারটিন উলাকটের মত সাংবাদিকবৃন্দ। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী ‘দ্য টেস্টিমনি অফ সিক্সটি’- দলিলের প্রতি মার্কিন সেনেটের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং আটাশে অক্টোবর ১৯৭১-এ এই দলিলের পুরোটাই মার্কিন কংগ্রেসের রেকর্ডে প্রকাশিত হয়। এই দলিল প্রকাশে অক্সফ্যাম এবং জুলিয়ানের অবদান অনস্বীকার্য।
ষোলই ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরে শরণার্থী শিবিরগুলিতে যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের চিত্র দেখেছি তা কোনোদিন ভুলবো না। শরণার্থীরা যে এখন তাঁদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন, এই চিন্তাই ফুটে উঠেছিল তাঁদের চেহারায়। শিবিরের সবখানেই ধ্বনিত হতে লাগলো ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তাঁরা যে ফিরে যাবেন তাঁদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশে।
লাখ লাখ শরণার্থী যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল, তখন সুশৃঙ্খলভাবে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অক্সফ্যাম এক বিশাল প্রত্যাবাসন কর্মসূচী গ্রহণ করে। সীমান্তে দেখা দেয় স্বাস্থ্য ও পয়ঃপ্রণালী সমস্যা। হাজার হাজার শরণার্থীকে দিনের পর দিন বনগাঁয় আটকে থাকতে দেখেছি। আমাদের জরুরীভিত্তিতে তাদের জন্য খাদ্য-সামগ্রী, পানীয় জল এবং সেই সঙ্গে পয়ঃপ্রণালীর সুযোগ-সুবিধা করে দিতে হয়েছিল।
এক কোটি লোকের শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয়গ্রহণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই অধ্যায়ের খুবই ছোট একটি অংশ হতে পেরে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি, ধন্যবাদ জানাই অক্সফ্যামকে তাদের বিশাল ও প্রশংসনীয় শরণার্থী ত্রাণ কর্মসূচীর জন্য।
লণ্ডন, ৫ ডিসেম্বর ২০২১

পঞ্চাশ বছর পরে
কাজী জাওয়াদ
সাংবাদিক ও লেখক। সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রযোজক, বাংলা বিভাগ, বিবিসি ওয়ার্? সার্ভিস ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা
ইয়াহিয়া খান আর জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা থেকে পালিয়ে গেলেন। দিন তারিখ সবারই জানা। আর তাতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথ খুলে গেল। সে ছিল এক গুণগত পরিবর্তন।
১৯৭০ এর নির্বাচনের সময় আমরা যুবক। সবাই খুশিমত ভোট দিয়েছিলাম। তার আগে থেকেই ছাত্র-যুবকদের মধ্যে কিছু করার আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার উত্তেজনা ছিল।
১৯৬৮ সালে মাওলানা ভাসানী প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে একটি বার্তা পান। তিনি তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত হিসেবে কারাবন্দী। মামলার বিচার চলছে। ১৪ই ফেব্রুয়ারী ট্রাইবুনালে খবর সংগ্রহের জন্য উপস্থিত ছিলেন আতাউস সামাদ। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেন ‘হুজুরকে আমার মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করতে বলিস’ (ওই টিরধব, ওদণধপদ ুলনধঠ: করধলবযদ টভঢ করটথণঢহ, ৗণশধ্রণঢ ঋঢর্ধধমভ, খভধশর্ণরর্ধহ রেণ্র্র ীধবর্ধণঢ, ঊদটপট, ২০০৯ [২০০৫], য ১৫১ এবং ইঈু ুল্রট, ইবটর ঈণফট াণ াটধ, রের্মদমবট রেটপট্রদটভ, ঊদটপট, ২০১৪, যয ১৯২)। ভাসানী সেই অনুরোধ পেয়ে আন্দোলন শুরু করেন। ৬ ডিসেম্বর জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালনের কর্মসূচি দিয়ে গভর্নর হাউস (এখনকার বঙ্গভবন) ঘেরাও করেন। ২৯ ডিসেম্বর পাবনার জেলা প্রশাসকের বাসভবন ঘেরাও করে শুরু করেন ঘেরাও আন্দোলন।
ছাত্রদের বিভিন্ন দলও বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করছিল। জানুয়ারী মাসে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১১ দফা দাবী নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে ছাত্র-যুবারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনের ঢেউ আমাদের পড়াশোনা শিকেয় তুলে দিয়েছিল। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ফলে আন্দোলন বেগবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা জনসাধারণের সমর্থন পেতে থাকে। আমরা ছাত্ররা গ্রামে গ্রামে চলে গিয়েছিলাম। সাধারণ মানুষের মধ্যে আন্দোলনের প্রচার করতে। আমি তখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র। দলবেঁধে পদ্মার চরে কৃষকদের বাড়ি বাড়ি যেয়ে আন্দোলনের প্রচার করেছি। প্রশ্ন শুনেছি আন্দোলনে তাঁদের কী লাভ, কী তাঁরা করতে পারেন। বলেছি কৃষক চাষের জমি পাবেন, নদী শিকস্তি জমি জেগে উঠলে জবর দখল হবে না, রোগে চিকিৎসা পাবেন আর সন্তানেরা লেখাপড়ার সুযোগ পাবে। ছাত্ররা গ্রেফতারের ভয়ে পালালে তাদের আশ্রয় দিতে হতে পারে, তারাতো কৃষকদেরই সন্তান। এভাবেই আমরা গণজাগরণের বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিলাম জনগণের মধ্যে।
ছাত্রদের আন্দোলন রাজনীতিকদের টনক নাড়িয়ে দেয়। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর আওয়ামী লীগসহ আটটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাটিক এ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠন করে। এই কমিটি আন্দোলনের বেগবৃদ্ধি না করলেও ফেডারেল পদ্ধতির রাষ্ট্রকাঠামো এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবী তুলেছিল।
অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানেও তখন ছাত্র আন্দোলন চলছিল। খাইবার জেলার লাণ্ডিকোটাল থেকে চোরাচালানের কাপড় কিনে ফেরার পথে কিছু ছাত্র পুলিশের নিগ্রহের শিকার হলে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। আইয়ুব খানের পক্ষে সেই আন্দোলন সামাল দেয়া সম্ভব হলো না। ছাত্রদের দাবীর অনেকগুলো মেনে নিয়েও শেষরক্ষা হলো না - ওদিকে যে ঘোলাজলের শিকারীরা নতুন ফাঁদ রচনা করছেন।
নির্বাচনের আগে ছাত্র-যুবকদের আকাঙক্ষা ছিল এগারো দফা দাবীর বাস্তবায়ন, রাজনৈতিকভাবে মূলতঃ ফেডারেল পদ্ধতির রাষ্ট্রকাঠামো এবং সর্বজনীন ভোটাধিকার। সামাজিকভাবে জনকল্যাণমূলক কিছু ব্যবস্থা আর সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন। এর কোন কিছুই ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের করার ক্ষমতা ছিল না। একটি স্থায়ী সরকারের প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনের ফলাফলে মনে হয়েছিল আমরা বোধহয় সাফল্যের শিখর ছুঁয়ে ফেলেছি। ইতোমধ্যে আমাকে পড়াশোনার বন্ধনে আটকানোর জন্য পাবনা থেকে বরিশালে নেয়া হয়েছিল।
নির্বাচনের পর সন্দেহবাদীদের আশংকা সত্য প্রমাণ করে সামরিক জান্তা জুলফিকার আলী ভুট্টোর উচ্চাকাঙক্ষাকে উস্কে দেয়। ভুট্টো নানা রকম কূটচাল চালতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারী জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের ৬ দফা এবং ১১ দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনার শপথ গ্রহণ করায়। বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক হুমকি এবং খেলা চললেও মার্চের আগে ছাত্র-যুবারা বেশ আনন্দেই দিন কাটিয়েছিলাম।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে যেন বারুদের বাক্সে সলতে জ্বালিয়ে দেয়া হলো। বামপন্থী দলগুলো ৪৭-এর পর পর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার কথা প্রচার করলেও এবারে যেন তা নাগালের মধ্যে এল। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আমরা নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। সে স্বপ্ন স্বাধীনতার, নতুন সমাজ গড়ার। ইয়াহিয়া খানের সামরিক দোসররা আলোচনার পিচ্ছিল পথে নিয়ে যায় আমাদের। ছাত্র-যুবাদের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা দিলেও উত্তেজনা জিইয়ে রাখি প্রশিক্ষণে আবরণে। সেই হিসেবে ১ মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত ছাত্র-যুবাদের চেতনা ও বিশ্বাসের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর পলায়নে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আন্দোলন স্বাধীনতার অবশ্যম্ভাবী পথে যাত্রা শুরু করে।
পঞ্চাশ বছর পরে সেই সময়কার গণতন্ত্রের, অধিকারের এবং সংগ্রামের কথা যখন ভাবি তখন আমার কেবলই মনে হয় ইয়াহিয়া ভুট্টো পালিয়ে না গেলে কী হত। সে সময়ের ইতিহাস যারা লেখেন তাঁরা কী এই কথাটি ভাবেন। ভাবা দরকার। কারণ ইতিহাস লেখার সময় কোন ঘটনার পূর্বাপর, শঙ্কা, সঙ্কট, সম্ভাবনা বিবেচনা করেই কেবল তার পাত্রমিত্র পরিণতির আসল পরিচয় বর্ণনা পাওয়া যেতে পারে।
আমরা তখন সৌাগান দিয়েছি, বিশ টাকা মন দরে চাল চাই, লাঙ্গল যার জমি তার, সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, সবার জন্য শিক্ষা চাই। বক্তৃতায় এক সুরে বলতাম আদমজী-বাওয়ানী-দাউদ-ইস্পাহানী- দাদা- একে খান- মকবুলুর রহমান এমন ২২ পরিবারের হাতে দেশের সব সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে এই ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে।
আজ ভেবে দেখি, সেই ২২ পরিবারের বদলে আমরা ২২০ পরিবার পেয়েছি। পদ্মা সেতু ২০২২ সালেই চালু হবে- তার দশ বছর আগেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তি ভাগ্যের খেলা হয়ে গেছে। নদী শিকস্তি জমি ভূমিহীনদের কাছে যায় না। ব্যাংকগুলো ঝাঁঝরা, পি কে হালদারের দল পুঁজি পাচারের জোরে উচ্চ আদালতের কাছ থেকেও মুচলেকা দাবী করে। আজও বিচারের অধিকার কেবল বিত্তবানের। নারীর মর্যাদা এখনও কেবল সংবাদপত্রের পাতায়। এতো শুধু কথার কথা, যাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁরা হাড়ে হাড়েই জানেন দেশের কী অবস্থা। মুষ্টিমেয় যারা রক্তচাপ পরীক্ষার জন্য বিদেশ যেতে পারেন তাঁদের কথা বলছি না।
তবু আমি আশাবাদী। আশাবাদী পোষাক শিল্পের অগনিত নারী শ্রমিকের দূর্দশার ভরসায়, প্রবাসী শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো উপার্জনের আশায়, কৃষকদের ক্লেশের আশ্বাসে। হিটলারের ইউরোপে ইহুদিরা যেমন আশা বেঁধে রাখতো, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন বুকের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছি, এখনও আমি তেমনি আশাবাদী। বাংলাদেশ চিরঞ্জীব।
বার্মিংহাম, ৫ই ডিসেম্বর ২০২১

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেক্ষাপট
আবু মুসা হাসান
বীর মুক্তিযোদ্ধা ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য। বর্তমানে তিনি সত্যবাণী অনলাইন নিউজ পোর্টালের উপদেষ্টা সম্পাদক।
দেখতে দেখতে ৫০টি বছর কেটে গেল। এই অর্ধ শতাব্দীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঘটেছে অনেক পরিবর্তন। ঘটেছে অনেক মর্মান্তিক ঘটনা। চতুর্থ বিজয় দিবস আসার আগেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে জীবন দিতে হয়েছে ষড়যন্ত্রকারী ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে।
তবে এই লেখায় মূলতঃ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়েই আমি আমার স্মৃতিচারণ সীমাবদ্ধ রাখবো।
আসন্ন বিজয় দিবসের প্রাক্কালে মাকে খুব মনে পড়ছে। আম্মার আশির্বাদ নিয়েই দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলাম। মায়েরা হাসিমুখে তাঁদের সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উৎসাহ যুগিয়েছিলেন বলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। হাজারো শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মায়েরা স্বাধীন হওয়ার পর ছেলে হারানোর শোকে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গেছেন। সেইসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের মহিয়সী মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি।
১৯৬৮ সালে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই ছাত্র রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হয়ে গেলাম। কলেজে পড়াকালীন সময়ে আমি ঐতিহাসিক ১১-দফা ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলাম। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া ও মেনন গ্রুপ, এন এস এফ- এর দোলন গ্রুপ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমন্বয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে প্রণীত ১১-দফা দাবীর মধ্যে স্বায়ত্বশাসনের দাবী সম্বলিত ৬-দফা দাবীগুলো যেমন ছিল, তেমনি ব্যাংক- বীমা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণসহ প্রগতিশীল দাবীগুলোও ছিল।
১১-দফা ছাত্র আন্দোলন ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় এবং মিছিলে ঢাকার বিভিন্ন কলেজ এবং স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ২০ শে জানুয়ারী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলের ওপর পুলিশের গুলীবর্ষনে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ শহীদ হওয়ার পর ছাত্র আন্দোলন আরও দূর্বার হয়ে উঠে এবং ২৪ শে জানুয়ারী গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুবের পতন ঘটে।

৭ই মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের গ্রীন সিগন্যাল
পরবর্তীকালে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হলো পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। নির্বাচনের পর পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী জাতীয় পরিষদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা অর্পণের পরিবর্তে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এই অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রমনা মাঠে (বর্তমানে সোহরায়ার্দী উদ্যান) এক জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঐ ঐতিহাসিক জনসভায় আমারও থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণার পাশাপাশি যার যা আছে তা নিয়ে হানাদারদের মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার গ্রীণ সিগন্যাল।
৭ই মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করলাম। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তৎকালীন ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর্স (ইউওটিসি)-এর ডামি থ্রী নট থ্রী রাইফেল যোগাড় করে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র কাশেম ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের প্রশিক্ষণ চলে। অন্যদিকে, ছাত্রলীগের কর্মীরাও একইভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। প্রশিক্ষণ শেষে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা ডামি রাইফেল নিয়ে ঢাকা শহরে মার্চপাস্ট করেছিলাম। সাদা শাড়ী পড়া মেয়েরা ছিল মিছিলের অগ্রভাগে আর ছেলেরা ছিলাম মিছিলের পেছনে।

২৫শে মার্চঃ প্রতিরোধের রাত
২৫শে মার্চ পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী রাত ১২টার দিকে অতর্কিতে হামলা চালালো। তবে রাত ১০টার দিকেই তাদের আক্রমনের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় চারদিকে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের বাসা ছিল আজিমপুর নতুন প?ন লাইনে। আমার বন্ধু শাহীনসহ কয়েকজন প্রতিরোধের জন্য বেড়িয়ে পড়ি। বাসার কাছে ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) গেটে গিয়ে দেখি শত শত মানুষ কুড়াল দিয়ে দ্রুত বড় বড় গাছগুলো কেটে রাস্তার ওপর বেরীক্যাড তৈরী করছে, আমরাও বেরীক্যাড তৈরিতে হাত লাগালাম। নিউ মার্কেটের গেট পার হয়ে আমরা সব বন্ধুরা মিলে যখন বিউটি রেস্টুরেন্টের কাছে মীরপুর রোডে পৌঁছলাম, তখন বাজে রাত ১২টা। হঠাৎ করে শুরু হলো হানাদার বাহিনীর আচমকা আক্রমণ। গোলাগুলির সময় মাঝে মধ্যে রাতের অন্ধকার আকাশ দিনের চেয়েও বেশী পরিস্কার হয়ে উঠতো। পরে জানতে পেরেছি যে, ঐগুলো ছিল ট্রেসার বুলেট। রাতের অন্ধকারে শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য ট্রেসার বুলেট ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমরা চার বন্ধু দৌড়ে দেয়াল টপকে আজিমপুর কলোনীতে গিয়ে একটি বি?িং-এর সিঁড়ির নীচে কিছু সময় অপেক্ষা করি। পরে আজিমপুর কবরস্থান অতিক্রম করে নতুন প?ন লাইনে ফিরে এলাম। কিন্তু অবিরাম গোলাগুলির জন্য সেই রাতে বাড়ী ফিরতে পারলামনা। দেয়াল টপকে মানিক ভাইদের বাড়ীতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। মানিক ভাই মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে শহীদ হয়েছেন।
ভোর বেলায় বাসায় ফিরে দেখি যে ইপিআর-এর এক সিপাহী আমাদের ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ঐ সিপাহী জানালো যে, ব্যারাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাকিস্তানীদের হামলার শিকার হয়ে তাদের অনেকেই নিহত হয়েছে। যারা সুযোগ পেয়েছে তারা তাদের হাতিয়ার নিয়ে ব্যারাক থেকে পালিয়ে এসেছে। হানাদার বাহিনী ২৫শে মার্চ রাতভর গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি প্রচণ্ড গোলাগুলির মাধ্যমে আতংক সৃষ্টি করে বাঙালী জাতিকে ভয় দেখিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে বিরত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই পরিকল্পনা কাজে লাগেনি। বঙ্গবন্ধুর আহবানে উজ্জীবিত বাঙালী জাতি স্বাধীনতার জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে পিছপা হলোনা।
২৫শে মার্চ রাতে হামলার পর ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছিল। ২৭শে মার্চ কারফিউ শিথিল হলে প্রতিবেশীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক ছুটছে। মা-বাবা ও দুই বোনকে নিয়ে আমি ঢাকা থেকে বের হয়ে জিঞ্জিরা এবং মুন্সীগঞ্জে কয়েকদিন অবস্থান করি। পরে নবীনগর হয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ী কসবার রাইতলায় চলে আসি।
তখনও পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত এলাকা। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য গঙ্গাসাগরে আমার মেঝ মামা মরহুম গোলাম রফিকের বাড়ীতে চলে যাই। পাক হানাদার বাহিনীর হাতে গঙ্গাসাগরের পতন ঘটলে মামা-মামী, নানী এবং ছোট দুই মামাতো ভাই-বোন সহ আমি এবং আমার খালাত ভাই মহিউদ্দিন বুলবুল দ্রুত বের হয়ে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকি। তবে দুঃখের ঘটনা হলো বড় মামা ঘর থেকে বের হতে পারেননি। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মামার বাড়ীতে আগুনের লেলিহান শিখা। ঐ আগুনে বাড়ীর সাথে বড় মামাও ভস্মীভূত হয়ে গেলেন।
মামাদের সীমান্তবর্তী গ্রামের বাড়িতে এক রাত কাটিয়ে পরের দিন আমরা চলে যাই আগরতলায়। মামারা বড় হয়েছেন আগরতলায়। ভারত বিভক্ত হওয়ার আগে নানা আগরতলা রাজবাড়ীর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ঐ সময় ত্রিপুরা রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী সচিন শিং সহ রাজ্যের কর্তাব্যক্তিরা প্রায় সবাই ছিলেন নানার ছাত্র এবং মামার সুপরিচিত। আমরা আগরতলার বটতলায় ধীরেন দত্তের বাসায় উঠি। ধীরেন দত্ত ছিলেন আগরতলা থেকে নির্বাচিত তৎকালীন সিপিএম দলীয় এমপি বীরেন দত্তের ভাই। আমার প্রচণ্ড জ্বর হওয়ায় আগরতলার জি বি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন। এখনও মনে পড়ে হাসপাতালের চিকিৎসক এবং সিস্টারদের অকৃত্রিম সেবা শুশ্রুষার কথা। আমাকে ওরা সবাই ‘জয় বাংলা’ বলে ডাকতো।
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আক্রমণের পর আমার বড় আপা ও দুলাভাই আগরতলায় চলে গিয়েছিলেন। আমার সাথে তাদের কোন যোগাযোগ ছিল না। আগরতলা গিয়ে মামার কাছ থেকে বড় আপা জানতে পারলেন যে, আমি অসুস্থ এবং হাসপাতালে আছি।
বড় আপা চারুকলায় এবং দুলাভাই সরকারী চাকুরী করতেন বিধায় তাদেরকে ক্র্যাফট হোস্টেলের একটি কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বড় আপার সাথে আমি চলে আসি।
ক্র্যাফট হোস্টেলেই ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাম্প ছিল। আমার দলের নেতা-কর্মীদের পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। কিন্তু অচিরেই খুব বিষণœ হয়ে পড়েছিলাম। কারণ আগরতলার রাস্তায় সকালে ‘পিটি’ করা ছাড়া অন্য কোন ট্রেনিংয়ের সুযোগ হচ্ছিল না। তার অন্যতম কারণ ছিল আমাদেরকে ট্রেনিং এবং অস্ত্র দিতে ভারতের কংগ্রেস দলীয় সরকারের অনীহা। এর ফলে তখন কংগ্রেস সরকারের প্রতি খুব রাগ হয়েছিল। কিন্তু এখন উপলব্ধি করি যে, ইন্ধিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকার আমাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র যোগানের ব্যবস্থা না করে তেমন কোন গর্হিত কাজ করেনি। তার কারণ ঐ সময়টা নকশালপন্থী অস্ত্রধারীরা কংগ্রেস সরকারেকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল। নকশালপন্থীরা যাতে রাইফেল ছিনিয়ে নিতে না পারে তার জন্য শিকল দিয়ে রাইফেলগুলো পুলিশ কোমরের সাথে তালা দিয়ে রাখতো। তাই ঐ পরিস্থিতিতে আমাদের মতো কমিউনিস্টদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেস সরকারের অনীহা থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়ানোর পর ভারত সরকার আমাদের ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা এবং অস্ত্র দিতে সম্মত হয়। এক পর্যায়ে ভাসানী ন্যাপের মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কমিউনিস্ট পার্টির মনি সিং, মোজাফফর ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধরসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দলের নেতাদের সমন্বয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্ব গঠিত স্বাধীন বাংলা সরকারের একটি কনসালটেটিভ কমিটি (উপদেষ্টা পরিষদ) গঠন করা হয়।
ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার লম্বা কিউ থাকাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার জন্য ১১-দফা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মরহুম সাইফ উদ্দিন আহমেদ মানিক আমাকে গ্রামের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলেন। আগরতলা থেকে বাড়ী এসে দেখি আমার মা-বাবা দুবোনকে নিয়ে পাকিস্তানী হায়েনাদের হামলার আশংকা করে আরও কয়েক মাইল পশ্চিমে আমার ফুফুর বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন।
দাদীকে নিয়ে কাকা রয়ে গেলেন গ্রামের বাড়ীতে। কারণ এই অঞ্চল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপারের যোগসূত্র ছিলেন আমার কাকা মরহুম ডাঃ ওয়াহেদউদ্দিন আহমেদ ময়না মিয়া। বহু মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের বাড়ী হয়ে দাদীর হাতের রান্না খেয়ে আগরতলা গেছেন। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালও আমাদের বাড়ীতে কয়েকদিন থেকে আগরতলা গিয়েছিলেন। শেখ জামালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাকা নিজেই তাকে সাথে করে নিয়ে আগরতলায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।

আগরতলায় যাওয়ার জন্য ছটফট করছিলাম
এদিকে ফুফুর বাড়ীতে থেকে আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। আগরতলায় আবার ফিরে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিলাম। কিন্তু ঐ সময়টা কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহা সড়ক অতিক্রম করাটা ছিল খুবই বিপদজনক। আগরতলা যাওয়ার কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামের বাজারে আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী শওকতের সাথে দেখা হয়ে গেল। শওকতের বাড়ী নবীনগরে। ভৈরবের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে ঐদিনই আগরতলায় যাওয়ার কথা রয়েছে বলে শওকত জানালো। আমি তাদের সাথে যেতে চাইলে শওকত দলের কমাণ্ডার অধ্যাপক হান্নান সাহেবের সাথে আমাকে আলাপ করিয়ে দেয়। হান্নান সাহেব তাদের সাথে আমাকে নিতে রাজী হলেন। দৌড়ে ফুফুর বাড়ী গিয়ে ঝোলাব্যাগে দুই একটি কাপড় নিয়ে তৈরী হয়ে গেলাম। আমার আগরতলায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুনে আম্মার মুখ ভারী হয়ে গেল। বল্লেন, আমি তো তোকে হাসিমুখে আশির্বাদ করে মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তুই ফিরে এলি কেন? এখন এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আগরতলায় যেতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিতে চাস কেন? কিন্তু আমার কানে কিছুই প্রবেশ করছিল না। সবার আপত্তির মুখে আমি বিদায় নিয়ে চলে গেলাম।
কমাণ্ডারের কথা অনুযায়ী খালের পাশে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকাটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। পড়ন্ত বেলায় মেঘলা দিনে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। সেখানে এক যুবক জাল দিয়ে মাছ ধরছিল। আমি তাকে আমার অপেক্ষার কারণ বলার পর সে বল্লো যে, মনে হয় একটা ‘মুক্তির‘ নৌকা চলে গেছে। তখন আমার মাথায় বাজ পড়লো। সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক, আমাকে আগরতলায় যেতেই হবে। কমাণ্ডার হান্নান সাহেব আমাকে বলেছিলেন যে তারা আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী নিমবাড়ী গ্রামের স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সূদন মিয়ার মাধ্যমে আগরতলায় যাবেন। আমি সূদন মিয়ার বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা, কিছুদূর হেঁটে হাঁটু পানি এবং কোমড় পানি ভেঙ্গে চারগাছ বাজারের কাছে জাঙ্গাইলের সড়ক নামে একটি উঁচু রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। বেশ দূরে একজন নৌকা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁকে ডেকে আমাকে পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ করলাম। আমাদের নৌকাটি সূদন মিয়ার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা থেকে টর্চ জ্বালিয়ে হ?-হ? বলে একজন হুংকার দিয়ে উঠলে আমি পরিচয় দিলাম।

আইজ রাইতে ক্লিয়ারেন্স নেই
এদিকে সূদন মিয়া ঘর থেকে বের হয়ে জানিয়ে দিলেন যে, সি এ্যাণ্ড বি রোড (কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক) এবং রেল লাইনের কালভার্ট পার হওয়ার ক্লিয়ারেন্স নেই। তিনি কাছাকাছি কোথায়ও রাত্রিযাপন করে পরের দিন এসে ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেছে কিনা তা জানার জন্য পরামর্শ দিলেন। আমি তখন ২০-২৫ জনের পুরো মুক্তিযোদ্ধার দলটিকে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে চলে যাই। দাদী রান্না করে সবাইকে খাওয়ালেন। আমরা একটি ছোট নৌকা নিয়ে পরদিন আবার ঐ ব্যবসায়ীর বাড়ীতে যাই। তিনি যথারীতি জানিয়ে দিলেন যে, ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়নি। এভাবে চারদিন কেটে যায় এবং কাকা ও
ুু ১৪

সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা
সুলতান মাহমুদ শরীফ
একমাত্র মোনায়েম খাঁর লোক ছাড়া প্রায় সবাই আমাদের পক্ষে কাজ করেছেন
সুলতান মাহমুদ শরীফ। ব্রিটেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ছেষট্টি সালে ৬ দফা ঘোষণা করা হলে তিনি লণ্ডনে বসবাসবাসরত ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীদের একত্রিত করে ৬ দফার পক্ষে প্রথম জনমত গঠন শুরু করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে লড়ার জন্য স্যার টমাস উইলিয়াম কে ঢাকায় পাঠাতে যে ক’জন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি তাদের মধ্যে একজন। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা দপ্তর সম্পাদক সুলতান শরীফ বর্তমানে সংগঠনটির সভাপতি। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের স্মৃতি নিয়ে সাপ্তাহিক পত্রিকার পক্ষে সারওয়ার-ই আলমের সঙ্গে তাঁর টেলিফোন আলাপচারিতায় উঠে আসে যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথা-
পত্রিকা: প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আপনি কীভাবে উদ্বুদ্ধ হন?
সুলতান শরীফ: যদি জানতে চান কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, তাহলে ফিরে তাকাতে হয় ছেষট্টির দিকে। মুক্তিযুদ্ধতো আসলে বাঙালী জাতীয়তাবোধ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে উচ্চ শিক্ষার্থে আইন পড়তে লণ্ডনে আসার পর আমি সর্বপ্রথম ছয় দফার পক্ষে সাবেক ছাত্রলীগারদেরকে সংগঠিত করি। আমাদের তখনকার মুরুব্বীরা সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জোরালো সমর্থন তৈরী করতে হবে এবং তাঁর পাশে থাকতে হবে। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করতে থাকি এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ব্রিটিশ আইনজীবী পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করি। বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে আমরা স্যার টমাস উইলিয়াম কে পাঠাই। এখানে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাঁরা শতভাগ একাত্ম হয়ে আমাদের সঙ্গে এ কাজে সহযোগিতা করেছেন।
একমাত্র মোনায়েম খাঁর লোক ছাড়া প্রায় সবাই আমাদের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় স্যার টমাস উইলিয়ামকে আমরা টাকা-পয়সা দিতে পারিনি। লেবার পার্টি আমাদের পক্ষে ছিল। স্যার উইলিয়াম ছিলেন লেবার পার্টির লোক। আমরা তাকে সাহায্য করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তিনি সম্মত হয়েছিলেন। তাঁর সম্মানী দেয়ার সামর্থও আমাদের তখন ছিলনা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা অবশ্য তাঁর পাওনা পরিশোধ করি। তখন আমাদের চিন্তা ছিল অন্তত আন্তর্জাতিকভাবে জানানো যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যা করা হচ্ছে তা আইয়ুব খানের সংবিধান অনুযায়ীও অন্যায়। আর এটা জানানোর জন্য একজন ব্রিটিশ আইনজীবী দরকার ছিল যিনি ঢাকায় গিয়ে সব জেনে বিশ্বকে জানান দিতে পারবেন। স্যার টমাস উইলিয়াম সে কাজটি করেছেন।
৬ দফার পর আস্তে আস্তে স্বাধীনতার চেতনা জোরালো হতে থাকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনায় কম সময় দিয়ে দেশের জন্য কাজ করাকেই বেশী প্রাধান্য দিতে শুরু করি। দেশে আন্দোলন সংগ্রাম কোন দিকে যাচ্ছে, কখন কী কর্মসূচী ঘোষণা করা হচ্ছে তা নিয়মিত অনুসরণ করতাম আমরা। একইসঙ্গে সেই কর্মসূচীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে লণ্ডনে কর্মসূচী পালন করতাম। সে এক উত্তাল সময়। আস্তে আস্তে আমরা সংগঠিত হচ্ছিলাম। এর মধ্যে আমরা পশ্চিম পাকিস্তান হাই কমিশন ঘেরাও করি, পশ্চিম পাকিস্তানের পতাকা পোড়াই, হাই কমিশনের কাছে স্মারকলিপি দিই। এরকম আরো কত কী! উনসত্তর সালে বঙ্গবন্ধু লণ্ডনে এলে প্রায় প্রতিদিনই আমরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। তিনি আমাদেরকে সংগঠিত হওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলতেন দেশের মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে, বলতেন অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, অনেক রক্ত দিতে হবে, তোমরা প্রস্তুত হও। তাঁর নির্দেশনায় আমরা উনিশ শ সত্তরের জানুয়ারী মাসে যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ গঠন করি; যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন গাউস খান সাহেব, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বদরুল হোসেন তালুকদার সাহেব আর দপ্তর সম্পাদক ছিলাম আমি।

পত্রিকা: মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আপনাদের কর্মপদ্ধতি কী ছিল?
সুলতান শরীফ: একাত্তরের ২৮ ফেব্রুয়ারী আমরা লণ্ডনের পাকিস্তান হাই কমিশনে একটা মেমোরেণ্ডাম দিয়েছিলাম। সেখানে আমরা পরিষ্কারভাবে তাদেরকে বলেছিলাম গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে তারা যে গড়িমসি করছেন তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। পরবর্তীতে ৭ই মার্চের ভাষণের পর আমার মনে হলো ছাত্রদের একটা আলাদা সংগঠন দরকার যেটা শুধু বাঙালিদের কথা বলবে। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা পাকিস্তান স্টুডেন্টস ফেডারেশনের অফিসে গিয়ে বেঙ্গল স্টুডেন্টস একশন কমিটি নামে একটি একশন কমিটি গঠন করি; যার মাধ্যমে আমরা প্রথম জয় বাংলা শ্লোগান দেয়া শুরু করি।
১৪ মার্চের পর পাকিস্তানীরা দেশে তাণ্ডব শুরু করলে এখানে সবাইকে বলতে শুরু করলাম যে তোমরা প্রস্তুত হও। তখনো তো জানতাম না ঠিক কী করতে হবে। শুধু এটা মনে হচ্ছিল যে, বাঙালীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না হলে ভয়াবহ কিছু হবে। তাই সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার তাগিদ দিতে থাকলাম।

পত্রিকা: একশন কমিটিগুলো কখন করলেন?
সুলতান শরীফ: ঢাকা থেকে কোন নির্দেশনা না পেয়ে আমরা তো ‘সেপারেশন’র কথা বলতে পারছিলাম না। সে কারণে একশন কমিটিগুলো তখনো তৈরী করা হয়নি। ৩রা মার্চে আমরা পাকিস্তানের পতাকায় আগুন দিয়েছি। জিন্নাহর ছবি ভেঙ্গেছি। কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য আমাদেরকে বঙ্গবন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সেদিন আমরা সবাইকে বিভিন্ন শহরে একশন কমিটি গঠন করতে বলি। লণ্ডনে গাউস খান সাহেবের কমিটি গঠন করলেন। বার্মিংহামে আজিজুল হক ভূঁইয়াসহ অন্যান্যরা করেছেন। আমাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট যারা ছিলেন ম্যানচেস্টার, ও?হ্যাম ও অন্যান্য শহরে তারা নিজেদের নেতৃত্বে একশন কমিটি গঠন করেন। পরে আওয়ামীলীগের দেখাদেখি অন্যরাও একশন কমিটি গঠন করে। এক পর্যায়ে একশ’ তিনটা কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি জনমত গঠনে ব্যাপকভাবে কাজ করে।

পত্রিকা: এই কমিটিগুলোর কাজ কী ছিল?
সুলতান শরীফ: প্রথম কাজ ছিল এটা প্রচার করা যে বাংলাদেশের মানুষের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। দ্বিতীয় কাজ ছিল যে এক কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানানো যে কী অমানুষিক অবস্থার মধ্যে তাদেরকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। আর তৃতীয় কাজ হলো বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে বের করে আনা এবং আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরী করার জন্য ব্রিটিশ জনগণকে প্রভাবিত করা। আমাদের পুরো কর্মপরিকল্পনাই ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদের পক্ষে। এবং আমরা সেটা প্রমাণ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি।
পত্রিকা: আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান?
সুলতান শরীফ: আমি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও ন্যায়ানুগ বাংলাদেশ দেখতে চাই। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। আর এরকম একটি বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য আমাদের জনগণকে তৈরী করতে হবে। প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের। এখন সময় আমাদের সে লক্ষ্যে কাজ করার।

মিসেস বদরুন্নেসা পাশা
স্মলহীথ পার্কে ২৮ মার্চে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে- সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি

মিসেস বদরুন্নেসা পাশা। একজন প্রবাসী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক। ব্রিটেনে থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরীতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি বার্মিংহামস্থ বাংলাদেশ উইমেনস এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশী সময় ধরে তাঁর এই সংগঠন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী নারীদের জন্য কাজ করে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয় বার্মিংহামে। সেদিন সমাবেশে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম মিসেস পাশা। সাপ্তাহিক পত্রিকার পক্ষে সারওয়ার-ই আলমের সঙ্গে টেলিফোন আলাপচারিতায় মিসেস পাশা তুলে ধরেছেন তাঁর যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণ-

পত্রিকা: প্রবাসে থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আপনি কীভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন? সে সময়টাতে কী আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল?
মিসেস বদরুন্নেসা পাশা: আসলে দেশের জন্য কাজ করার চেতনা আমার মনে তৈরী হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে। তখন আমি কুমুদিনী কলেজের ছাত্রী ছিলাম। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক শ্রেণী আমাদের ওপর যখন অন্যায়ভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল তখন থেকেই আমরা প্রগতিশীল ছাত্রছাত্রীরা এর প্রতিবাদে সরব হই। আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করি। পরবর্তীতে ব্রিটেনে আসার পর ভাষা আন্দোলনের সে চেতনা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। দেশের জন্য, দেশের মানুষের মুক্তির জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা আমার ও আমার স্বামীর মধ্যে প্রবলভাবে কাজ করে। আমার স্বামী জগলুল পাশা তখন ছাত্র ছিলেন। আর আমি ছিলাম গৃহিনী। দেশের কঠিন সময়ে আমরা তীব্রভাবে একটা দায়িত্ববোধ অনুভব করতে থাকি। সেই দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম থেকেই বার্মিংহাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আমার স্বামী ও আমি সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়ি।

পত্রিকা: আপনাদের কর্মপদ্ধতি কী ছিল?
বদরুন্নেসা পাশা: তখন তো আমরা সংখ্যায় অনেক কম ছিলাম। যাঁরা ছিলেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ছাত্র। আমরা ভাবলাম পশ্চিম পাকিস্তানীদের অবিচার অত্যাচারের কথা সবাইকে জানাতে হবে। না জানালে বিশ্ব জানবে কেমন করে আমাদের মানুষের ওপর কীভাবে নির্যাতন হচ্ছে। প্রতিবাদ হবে কেমন করে? সেই ভাবনা থেকে আমরা সে সময়কার খুব জনপ্রিয় ও দানশীল ব্যক্তিত্ব আফরোজ মিয়ার রেস্টুরেন্টে প্রথম মিলিত হই। আফরোজ মিয়া ছিলেন অত্যন্ত উদারপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। তিনি কমিউনিটিতে হাতেম তাই নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর রেস্টুরেন্টের বেইসমেণ্ট আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য। আরেকজন সক্রিয় ত্যাগী সংগঠক ছিলেন আজিজুল হক ভূঁইয়া সাহেব। তিনি এতটাই ত্যাগী সংগঠক ছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য তিনি তাঁর হাবিব ব্যাংকের চাকুরী ছেড়ে দিয়েছিলেন।
প্রথম দিকে নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল আমাদের মূল কাজ। পরবর্তীতে ব্রিটিশ জনগনের কাছে আমরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের অন্যায় শাসন, অত্যাচার, নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরীতে সক্রিয় হই। ব্রিটেনসহ প্রভাবশালী দেশগুলো যাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন জানায় সে লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করি। নারীদেরকে সংগঠিত করার জন্য আমরা ইস্ট পাকিস্তান উইমেনস এসোসিয়েশন গঠন করি। একইসঙ্গে আমাদের ইস্ট পাকিস্তান এসোসিয়েশন ছিল।

পত্রিকা: আমরা যতদূর জানি দেশের বাইরে বার্মিংহামে আপনারা প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন?
বদরুন্নেসা পাশা: হ্যাঁ! সেটা ছিল ২৮ মার্চের ঘটনা। ঢাকায় রোকেয়া হলে আক্রমণ হলে আমরা জরুরী সভা ডেকে প্রতিবাদ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করি। সিদ্ধান্ত হয় স্মলহীথ পার্কে সমাবেশ হবে। আমার বাসা ছিল পার্কের খুব কাছেই। পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই যথা সময়ে আমার বাসায় জড়ো হন। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আমরা স্মলহীথ পার্কে সমবেত হই। আমাদের মধ্যে মিসির আলি ছিলেন সবচেয়ে কমবয়সী। একুশ বাইশ হবে তখন তাঁর বয়স। আমি তাঁকে বলি পতাকা বহন করার জন্য। তারপর স্মলহীথ পার্কে পৌঁছার পর তিনি পতাকা তুলে ধরেন। প্রতিবাদী জনতার সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে- সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

পত্রিকা: পঞ্চাশ বছর পর আজ মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে কোন পার্থক্য খুঁজে পান কিনা?
বদরুন্নেসা পাশা: দেখুন আমাদের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরচেয়ে বড় অর্জন একটা জাতির ইতিহাসে আর কী হতে পারে! অপরদিকে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও দেশ অনেক উন্নত হচ্ছে। আমার তো প্রায় প্রতিবছরই দেশে আসা-যাওয়া আছে। দেশ বেশ উন্নত হচ্ছে বলেই মনে হয়। উন্নতির এই ধারা ধরে রাখাটাই হবে নতুন প্রজন্মের প্রধান দায়িত্ব।

পত্রিকা: আগামীর বাংলাদেশেকে আপনি কীভাবে দেখতে চান?
বদরুন্নেসা পাশা: নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরো দায়িত্ববোধ তৈরী হবে এবং তারা দেশকে তাদের যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে কাঙ্খিত উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে- এটাই আমি সবসময় আশা করি। এবং আমার বিশ্বাস তারা তা করতে পারবে।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেক্ষাপট

দাদী যতœ করে মুক্তিযোদ্ধাদের দলটির খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
পঞ্চম দিন সূধন মিয়া জানালেন যে, ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেছে। তার তত্ত্বাবধানে আমরা রাতের আঁধারে একটি কালভার্ট অতিক্রম করে রেল লাইনের আরো একটি ছোট সেতু পার হয়ে নিরাপদে আগরতলায় পৌঁছি। কিছুদিন পর ট্রেনিং এ যাওয়ারও সুযোগ পেয়ে যাই।

ট্রেনিং ক্যাম্পের কিছু স্মৃতি
আমি ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ গেরিলা বাহিনীর তৃতীয় ব্যাচের ট্রেনিং-এ অংশ নেই। আসামের তেজপুরে ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিতে এক মাসের গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি।
ট্রেনিং ক্যাম্পের দিনগুলো কখনও ভোলার নয়। ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের ব্যাচে মোট চারশ‘ জন ছিলাম। আমাদের দলনেতা ছিলেন প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মর্তুজা খান। ট্রেনিংয়ের প্রথম দিনের একটি ঘটনা আজও আমার মনে পড়ে। প্রথমেই আমাদেরকে দৌড় দিয়ে একটি বিশাল মাঠ চক্কর দিতে বলা হলো। তারপর কমাণ্ড আসলো লীডারের সাথে পিটি শুরু করার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে মর্তুজা ভাইয়ের দম ফুরিয়ে এসেছে, কমাণ্ডের সাথে সাথেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
ট্রেনিং ক্যাম্পে আর একটি মজার ঘটনা মনে পড়ছে। জয়দেবপুরের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মানব কুমার গোস্বামী মানিক মহা বিপাকে পড়েছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি ছোঁড়ার প্র্যাকটিস করতে গিয়ে। এক চোখ বন্ধ করে নিশানা তাক করতে হয়। কিন্তু মানিক এক চোখ বন্ধ করতে পারতোনা। এক চোখ বন্ধ করতে গেলে তার দু‘চোখই বন্ধ হয়ে যেতো। ভারতীয় আর্মির ইন্সট্রাক্টর ধমক দিয়ে হিন্দিতে বলতো, ‘তুম কিয়া মরদ হায়, লারকিকো কাভি আঁখ নেই মারা।’

জোঁক ভর্তি নদীতে গোসল
ট্রেনিং ক্যাম্পের আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়লে গা এখনও শিহরিয়ে উঠে। ক্যাম্পের পাশে বয়ে যাওয়া একটি সরু নদীতে আমাদের গোসল করতে হতো। ঐ নদীর পানিতে ছিল বড় বড় জোঁক। আমরা লাফ দিয়ে জোঁকে গিজগিজ করা পানিতে নেমে কোন রকমে একটা ডুব দিয়ে উঠে আসতাম।

দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি
এক মাসের ট্রেনিং চলাকালে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষকরা একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ট্রেনিং দিয়েছিলেন। থ্রী নট থ্রী রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এস এম জি), লাইট-মেশিনগান (এল এম জি) এবং টু-ইঞ্চ মর্টার পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেয়ার পাশাপাশি আমরা গ্রেনেড নিক্ষেপ, প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার করে ব্রীজ-কালভার্ট ধ্বংস করা এবং শত্রু সেনাদের অতর্কিতে হামলা বা এমবুশ করার যাবতীয় কলা-কৌশল রপ্ত করেছিলাম।
প্রশিক্ষণ নিয়ে ভিয়েৎনামের মতো দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দীপ্ত শপথ নিয়ে আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলাম। আমাদের স্কোয়াড লীডার ছিলেন মাহবুব জামান। মাহবুব ভাই স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের (ঢাকসু) নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাহবুব ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা মুন্সিগঞ্জের টুঙ্গিবাড়ী থানার হাসাইল গ্রামে অবস্থান নেই।
১৬ই ডিসেম্বর নিয়াজী দলবল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করার পর বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হলো। আমরা ১৭ই ডিসেম্বর ভোরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছি। পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী শহীদ মিনারের মিনারগুলো ভেঙ্গে ফেলেছিল। বিধ্বস্ত শহীদ মিনারের পাদদেশে তখন সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলার মাটিতে আমরা দেশ গড়ার শপথ নিয়েছিলাম। শহীদ মিনারে আমাদের বিজয় উল্লাসকে ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন ফটো সাংবাদিক রশীদ তালুকদার।
লণ্ডন, ৭ই ডিসেম্বর, ২০২১