Share |

৭০ বছর পার করলো ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ : গানের মানুষ আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী

অজয় পাল
অনেকের-ই ধারণা, জীবনে একটি মাত্র গান লিখেই বরেণ্য লেখক-সাংবাদিক ও গল্পকার আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বাঙালির মন-মানসকে ছুঁয়ে গিয়ে কেবল এক অনন্য উচ্চতায়-ই নিজেকে নিয়ে যান নি, অনাদিকালের ইতিহাসে নিজের কীর্তিকেও রেখেছেন অমর করে। আসলে এ ধারণাটি কিন্তু একেবারেই অমূলক। গাফ্ফার চৌধুরী কেবল একটি মাত্র গানই লিখেননি। তিনি অনেক অনেক গানের গীতিকার, যা অনেকের কাছেই অজানা। আর ”আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি ” --- এটাও যে তাঁর লেখা প্রথম গান হিসেবে অনেকেই মনে করে থাকেন, তাও কিন্তু সঠিক তথ্য নয়। গতকাল (১৯ ফেব্রুয়ারি) লণ্ডনে রোগ শয্যায় শায়িত আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাথে টেলিফোনে আলাপকালে আমার বক্তব্যের সাথে তিনিও সহমত পোষণ করে জানালেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কোলকাতায় বসে জীবনের প্রথম গানটি তিনি লিখেন, ”শহীদ মিনার ভেঙ্গেছো আমার ভায়ের রক্তে গড়া / দেখো বাংলার হৃদয় এখন শহীদ মিনারে ভরা”। একাত্তরে কোলকাতায় গঠিত স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থার প্রধান উদ্যোক্তা এবং বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক ও রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হক এই গানখানা নিয়ে যান প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর কাছে। তিনি গানটি সুর করে একজন সহশিল্পীকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কোলকাতার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করলে রাতারাতি গানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তিতে গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি গানটি রেকর্ড করিয়ে নেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নির্মলেন্দু চৌধুরী ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে এই গানটি পরিবেশন করলে বাংলাদেশেও গানটি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনপ্রিয় শিল্পীরাও এই গানটি পরিবেশন করতেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে গানটি আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেকেই হয়তো বিতর্ক জুড়ে দিয়ে প্রশ্ন তুলবেন, সত্তর দশকে লেখা এটাই যদি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা প্রথম গান হয়, তাহলে “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”- এটা ছিলো কা’র লেখা? খোলাসা করে দিচ্ছি, এই অমর সৃষ্টির কারিগরও সেই একই ব্যক্তি, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। তবে সেটা ছিলো একটি ঐতিহাসিক কবিতা মাত্র। বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিতে নিহত ভাষা শহীদ রফিকের লাশ হাসপাতালে দেখতে গিয়ে একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, আর তৎক্ষণাৎ-ই বেদনায় দলিত-মথিত এই মানুষটির মুখ গলে উচ্চারিত হয়, “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি?” নিজের অজান্তেই উচ্চারিত এই শব্দবন্ধ-কে দু’দিন সময় নিয়ে ত্রিশটি স্তবকে মেলে ধরে তিনি রচনা করলেন অবিনাশী একটি কবিতা। এই কবিতাটি তখন মুদ্রিত হয় চলমান ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ইশতেহারের পুরো দ্বিতীয় পৃষ্ঠা জুড়ে। ১৯৫৩ সালে প্রথম এই কবিতাটি সুর করেন বরেণ্য কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল লতিফ। ’৫৪ সালে এই কবিতার ছাব্বিশটি স্তবক বাদ দিয়ে কেবল ছয়টি স্তবকে গীতি-আঙ্গিকে সুরারোপ করেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ। সেবছরই ঢাকার রাজপথে প্রভাতফেরীর মিছিলে এটি সর্বপ্রথম গীত হলে এই অবিনাশী সৃষ্টির কথা ও সুর ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। সময়ের বিবর্তনে এই সৃষ্টিটি এখন বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে গেছে, যার পরিধি আসমুদ্রহিমাচল আর আকাশের মতোই বিশাল। বিশ্বের ১৯৩টি দেশে প্রতিবছর এটা এখন গীত হচ্ছে। অনূদিত হয়েছে বহু ভাষায়। গাফ্ফার চৌধুরী নিজেও স্বীকার করেন, এটা গান হিসেবে লিখিনি, লিখেছিলাম একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা হিসেবে।
আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী কখন কোন্ গানটি লিখেছিলেন, সেটা কিন্তু আমার লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। একজন গানের মানুষ হিসেবে এই মানুষটিকে মেলে ধরাটাই আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য। রবীন্দ্র সংগীতের দারুণ অনুরক্ত এই মানুষটিকে বিলেতের ব্যস্ত কর্মজীবনেও আমি বহুদিন গুন গুন করে রবি ঠাকুরের গান গাইতে শুনেছি। তিনি বলেন, রবীন্দ্র সংগীত মানেই স্বস্তিতে বেঁচে থাকার অক্সিজেন। নিজে যেচেই বহুদিন বলেছেন, ভারতীয় শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস (জর্জ বিশ্বাস), কণিকা বন্দোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সলিল চৌধুরী এবং এপার বাংলার আব্দুল আলিম, কলিম শরাফি, আব্দুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ এবং সমর দাসসহ অনেক সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর ছিলো মধুর সম্পর্ক। তবে কেবল নির্মলেন্দু চৌধুরী ব্যতিত অন্য কাউকে দিয়ে তিনি কোনো গান করাননি। কারণ, সেই সময়কালে সাংবাদিকতা ও কলাম লেখার প্রতিই ছিলেন অধিকতর মনোযোগী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অর্থাৎ পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে বিলেতের প্রবাস জীবনে একে একে বহু গান তিনি রচনা করেন, যার সংখ্যা শতের কাছাকাছি। এক্ষেত্রে তিনি বিলেতের প্রতিষ্ঠিত এবং নন্দিত শিল্পী ও সুরকার হিমাংশু গোস্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই মানুষটি আমার পেছনে যদি ছায়ার মতো লেগে না থাকতো, তাহলে এতোগুলো গান লেখা সম্ভবই ছিলো না। হিমাংশু আমার বাসায় এবং কর্মস্থলে প্রায়ই ঢু মারতেন গানের জন্য। তখন তিনি পূর্ব লণ্ডনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের গান শেখাতেন। এদের জন্য লিখে দিয়েছি অনেক শিশুতোষ গান। সবগুলো গানের সুর হিমাংশু নিজেই করতেন। এরপর আরো বহু গান তাঁকে লিখে দিয়েছি। হিমাংশুর নিজের সুর ও কণ্ঠে গীত বেশ কিছু গান রয়েছে তাঁর একাধিক অডিও এলবামে। এর বাইরেও রয়েছে অনেক গান, যা লণ্ডনে গীত হচ্ছে নিয়মিত। হিমাংশু গোস্বামীর গানের ডায়েরি আমার অনেক অনেক গানে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। এছাড়া ওয়ান ইলেভেনের শিকার জননেত্রী শেখ হাসিনার বন্দীদশাকালীন “জননেত্রীর মুক্তি চাই” শীর্ষক একটি গানের এলবাম বের হয় লণ্ডন থেকে। এই এলবামেরও সবগুলো গানেরই গীতিকার আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। সুরকারও শিল্পী হিমাংশু গোস্বামী। এই এলবামে ধারাবর্ণনা করেন নন্দিত আবৃত্তিকার রূপা চক্রবর্তী। ২০১২ সালে গাফ্ফার চৌধুরীর পতœী সেলিমা আফরোজ চৌধুরী প্রয়াত হওয়ার পর প্রিয়তমা পতœীকে নিয়েও তিনি গোটা দশেক হৃদয়ছোঁয়া গান লিখেন, যে গানগুলো এখনো আলোর মুখ দেখেনি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, লণ্ডনে বসে লেখা গাফ্ফার চৌধুরীর এতো এতো গান কেবল যথাযথ প্রচারের অভাবে বাংলা ভাষাভাষী আপামর মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তাঁর সবগুলো গান সংগ্রহ করে নতুন করে বাংলাদেশে রেকর্ড করার উদ্যোগ নেয়া হলে সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের কাছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর আরো একটি নতুন দিক উন্মোচিত হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুবর হিমাংশু গোস্বামীর ডায়েরি ঘেটে গাফ্ফার চৌধুরী রচিত এমন সব গান আবিষ্কার করতে সমর্থ হই, যে গানগুলোর অসাধারণ বাণীর কোনো তুলনাই চলে না। আমি এখানে তাঁর বিপুল সংখ্যক গানের মধ্যে মাত্র কয়েকটি গানের প্রথম কলি উদ্ধৃত করছি, যার প্রত্যেকটিরই সুরকার ও শিল্পী হিমাংশু গোস্বামী।
কিছু গানের হুবহু প্রথম কলি আমি পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে তুলে ধরছি- সুরমা নদীর ঢেউরে তুই পংখী হইয়া আয়/তোরে না দেখিলে আমার পরাণ কান্দে হায়, স্বাধীনতারে তুই আমারে রক্তে ভাসাইলি, আজ দিন বিজয়ের রক্তে রঙিন, ভোরের তারায় ফোটা ফুল, আমার মায়ের ভাষা, মুক্তি চাই মুক্তি-শেখ হাসিনার মুক্তি, জননেত্রীর বেশে এলেন, আকাশ কালো ঝড়ের মেঘে, শোনেন শোনেন ভাইবোনেরা, দেবো না দেবো না এই ইতিহাস মুছতে, আমি যার কথা আজ বলতে এসেছি, এমন সোনার দেশে জন্মেছিলাম, জয়বাংলা জয়বাংলা জয়বাংলার জয়, বঙ্গবন্ধু আবার যখন ফিরবেন, কেউ ফুল চেয়ে ভুল করে-কেউ ভুল করে ফুল পায়, জীবন গাঙ্গে পাল তুলিয়া, প্রদীপ টানে পতঙ্গ, এই দুনিয়ার আলো বাতাস, কালার বাঁশি বাজলো যদি অবেলায়, লণ্ডনে এসে দেখি চারিদিক রূপময়, আমরা বাঙালি ভাই যে দেশেতেই থাকি এবং ছায়াময় মায়াময় বাংলার বনানী।
তাঁর গানের এই মুক্তো দানাগুলো অনাদিকাল দ্যুতি ছড়াক, এই আমার প্রত্যাশা। গাফ্ফার চৌধুরী অনন্তকাল বেঁচে থাকুন তাঁর কীর্তির মাঝে, গানের প্রাণময় বাণী ও সুরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে।
লণ্ডন, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২
লেখক: সাংবাদিক ও গীতিকার।