Share |

বাদশাহনামা-২

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
ষাটের দশকের শেষদিকে বত্রিশ নম্বরে আমিনুল হক বাদশাহর দাপট দেখে আমার ঈর্ষা হতো। শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে তার খুবই হৃদ্যতা ছিল। এই হৃদ্যতার জন্যই অথবা ছাত্রলীগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে বাদশাহ বঙ্গবন্ধুর নৈকট্য লাভ করেছিল। বাদশাহ বত্রিশ নম্বরে যেত ওই পরিবারের একজন লোকের মতো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যখন বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে আটক এবং গোটা পরিবারকে হানাদার আর্মি একটি ঘরে নজরবন্দি করে রেখেছে, তখন হাসিনা ছিলেন সন্তানসম্ভবা। বাদশাহ মাঝে মাঝে তাঁকে রিক্সায় করে হাসপাতালে নিয়ে যেত।
বত্রিশ নম্বরের পরের বাড়িটাই ছিল জনাব নূর উদ্দিনের। তিনি ছিলেন বনবিভাগের সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর স্ত্রী বদরুন্নেসা আওয়ামী লীগের মহিলা নেত্রী ছিলেন। নূর উদ্দিনের বাড়ি ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ির মধ্যে খুবই যোগাযোগ ছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ আগে আমার সম্পাদিত সান্ধ্য দৈনিক ‘আওয়াজ’ বন্ধ হয়ে যায়। ষাটের দশকে এই কাগজটি বাজারে চালু ছিল। তখন এই কাগজে বনবিভাগের দুর্নীতি সম্পর্কে একটি রিপোর্ট বের হয়েছিল। এই সময় হঠাৎ একদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে বত্রিশ নম্বরে ডেকে পাঠালেন। আমাকে নিতে এল বাদশাহ। বত্রিশ নম্বরে যাওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুমি একটা ভুল করেছ। বনবিভাগের দুর্নীতি সম্পর্কে তোমার কাগজে যে রিপোর্ট ছেপেছ, সেটা নূর উদ্দিনকে ঘায়েল করার জন্য তাঁর প্রতিপক্ষ দিয়েছে। এরপর একটু দেখেশুনে খবর ছেপো।’ তারপর তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে চলো’। আমি বললাম, ‘কোথায়’; তিনি বললেন, ’পাশের বাড়িতে’।
বত্রিশ নম্বর এবং ওই পাশের বাড়িতে যাতায়াতের সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে একটা তারের বেড়া ছিল। বঙ্গবন্ধুর পরনে লুঙ্গি, গায়ে চাদর। তিনি অনায়াসে বেড়া টপকিয়ে পাশের বাড়িতে চলে গেলেন। আমি বেড়া টপকাতে গিয়ে পারলাম না। বাদশাহ এসে আমাকে উদ্ধার করল। এই বাড়িটা এখন নেই। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যা হোক, সেদিন পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখি, বদরুন্নেসা ভাবী চা-নাস্তা সাজিয়ে বসে আছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর পাশে বসলেন। আমি বসলাম নূর উদ্দিন সাহেবের পাশে। বনবিভাগের, বিশেষ করে ভাওয়াল গড়ের দুর্দশা নিয়ে আলাপ হলো। এই ভাওয়াল গড় বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু কাঠের চোরাকারবারিরা সেগুন, মেহগনি প্রভৃতি দামী গাছ রাত্রে কেটে বিদেশে চালান করে দেয়। নূর উদ্দিন সাহেব বনবিভাগের অধিকর্তা। তিনি ভাওয়াল গড় রক্ষার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাতে শত্রুপক্ষ তাঁকে বনবিভাগ থেকে সরাবার উদ্দেশে এই অপবাদ ছড়াচ্ছে। আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম, ‘আমি এ সম্পর্কে না জেনেশুনে আর খবর ছাপব না’। আমরা কথাবার্তা বলছি। বাদশাহকে দেখলাম এই সময় ঘরের ভেতর-বাইরে ছুটাছুটি করছে, যেন তার নিজের বাড়ি। তাকে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, ‘নূর উদ্দিন সাহেব যে আমার মামা এবং বদরুন্নেসা যে আমার মামী তা আপনি জানেন না’ আমি বললাম, ‘আগে জানতাম না, এখন জানলাম’। নূর উদ্দিন সাহেব সত্যিই বাদশাহর মামা কিনা তা আমার জানা হয়নি; কারণ বাদশাহর অভ্যাস ছিল কোনো নতুন লোকের সঙ্গে পরিচয় হলেও তাঁকে আত্মীয় বানিয়ে তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে বাদশাহ কাজ করেছে। আমি তখন দৈনিক পূর্বদেশে কাজ করি। রোজই দেখতাম তার লেখা আওয়ামী লীগের একগাদা প্রেস বিজ্ঞপ্তি নিউজ টেবিলে পড়ে আছে। শত্রুকে মিত্র বানাবার অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল বাদশাহর। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তার যেমন সখ্য ছিল, তেমনি সখ্য ছিল বিপরীত রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও।
প্রায় সব দৈনিকের সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ছিল বিস্ময়কর মৈত্রী। বাদশাহর ব্যক্তিত্বও তার জীবনের প্রথমদিকে যে খুব কম ছিল তা নয়। ক্রান্তিকালের ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রবসহ আরো অনেককে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যে গোপন বিপ্লবী পরিষদ হয়েছিল, বাদশাহ তাদের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। বাজারে এই সময় একটা গুজব রটেছিল, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কারো সঙ্গে তার বিবাহের সম্ভাবনা আছে। বঙ্গবন্ধু তাই তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাতে পাঠাতে চান। আমি এই গুজব বিশ্বাস করিনি। বঙ্গবন্ধু যে বাদশাহকে বিলাতে পাঠাতে চান, সেটা তার প্রতি ভালোবাসার জন্য। বাদশাহ যখন বিএ পরীক্ষা দেয়, তখন সে জেলে রাজনৈতিক বন্দি। জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে সে বিএ পাশ করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু বন্দি হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। বাদশাহ চলে যায় কলকাতায়। সাবেক পাকিস্তানী দূতাবাসের সার্কাস এভেন্যুর বাড়িটি বাঙালিরা দখল করার পর ওই ভবনে জেনারেল ওসমানীর অফিস হয়েছিল। তাঁর সেক্রেটারি ছিল পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর ঘাতক ক্যাপ্টেন নূর। ওখানে খোন্দকার মোশতাক আহমদও বসতেন। প্রবাসী সরকারে বাদশাহকে একটি জনসংযোগের চাকরি দিয়ে ওই সার্কাস এভেন্যুর বাড়িতে বসানো হয়। তাজ উদ্দিন সাহেব থিয়েটার রোডে একটি বাসভবনে নিঃসঙ্গভাবে থাকতেন। কারণ তিনি প্রকাশ্যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবেন না। বেগম তাজ উদ্দিন স্বামীর জন্য রান্নাবান্না করলে বাদশাহ তা বহন করে তাজ উদ্দিন ভাইয়ের কাছে নিয়ে যেত।
আমি ১৯৭১ সালের মে মাসে দেশত্যাগ করে প্রথমে আগরতলায় যাই। সেখানে এক মাস ছিলাম। ভাবছিলাম সেখানেই বাদশাহের দেখা পাব। কিন্তু পাইনি। তখন সে কলকাতায়। আমি এক মাস আগরতলায় থাকার পর সপরিবারে কলকাতায় চলে যাই। কলকাতায় গিয়ে সদর স্ট্রিটের একটা হোটেলে উঠি। ওই হোটেলের সামনেই ঠাকুর পরিবারের বাড়ি, যে বাড়িতে বসে রবীন্দ্রনাথ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি লিখেছিলেন। ওই বাড়ি দেখে আনন্দে আপ্লুত হয়েছি। কিন্তু আবার মনে আতঙ্কও ছিল। এই হোটেলে কদিন থাকতে পারব! কারণ হাতে টাকা-পয়সা নেই। ভাবলাম, সার্কাস এভেন্যুতে যাই। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে দেখা করলে হয়তো তাঁরা আমার একটা ব্যবস্থা করবেন। সার্কাস এভেন্যুতে গিয়ে ভবনটির ভেতরে ঢুকতেই বাদশাহর সঙ্গে দেখা। আমি মনে সাহস পেলাম। বাদশাহ মুজিবনগর সরকারে জনসংযোগ বিভাগে চাকরি করছে। সরকারের মন্ত্রীদের সকলের সঙ্গেই তার খাতির। হয়তো আমারও একটা ব্যবস্থা করতে পারবে। তাকে আমার অসহায় অবস্থার কথা বলতেই সে বলল, ‘আমরা খেয়ে থাকলে আপনি না খেয়ে থাকবেন কেন, ব্যবস্থা একটা হবেই’। তারপর দীর্ঘকাল আর বাদশাহর কোন খোঁজ পাইনি।
তখন ফয়েজ আহমদও কলকাতায়। সে কী করে সদর স্ট্রিটের হোটেলের টেলিফোন নাম্বার জোগাড় করে আমাকে ফোন করল। বলল, ‘তোর হাতে টাকা-পয়সা আছে’ আমি বললাম, ‘না’। ফয়েজ বলল, শিগগির সৈয়দ আলী আহসানের কাছে যা। তিনি একটা ফাণ্ড পেয়েছেন। সেই ফাণ্ড থেকে ঢাকা থেকে আগত বুদ্ধিজীবিদের ভারতীয় মুদ্রায় এক হাজার টাকা করে দিচ্ছেন। তুই গেলেই টাকা পাবি। আমি দৌঁড়ে সেখানে গেলাম। সেখানে আমার সহপাঠী এবং সৈয়দ আলী আহসানের জামাতা মাহমুদ শাহ কোরেশী আমাকে দেখে খুব খুশী হলেন এবং তাঁর শ্বশুরের কাছে নিয়ে গেলেন। আলী আহসান স্যার আমাকে পাঁচ শ টাকা দিয়ে বললেন, ‘ফাণ্ড এখন ফুরিয়ে গেছে। তাই তোমাকে হাজার টাকা দিতে পারলাম না’। পাঁচ শ’ টাকা পেয়ে আমি বেজায় খুশী। তার দ্বারা কিছুদিন তো চলতে পারব। এরপর অবশ্য আমার অসুবিধা হয়নি। কলকাতার যুগান্তর কাগজে কলাম লেখার সুযোগ পাই। আরো অনেক কাগজে লেখা শুরু করি। ডিকসন লেনের একটা বাসায় এসে উঠি। সংসার ভালোভাবেই চলতে থাকে। বাদশাহর দেখা আর পাইনি। সে আমাকে সৈয়দ আলী আহসান স্যারের এই ফাণ্ডের কথাও জানাতে পারত। তার দায়িত্বহীন স্বভাবের জন্য তা জানায়নি।
আমি মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’র নির্বাহী সম্পাদক হয়ে ‘বালু হাক্কাক লেনের’ অফিসে বসতে শুরু করি। কিন্তু বাদশাহের দেখা আর পাইনি। সে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। জয়বাংলা অফিসে কখনো আসেনি। কোনো একদিন খবর পেলাম, কলকাতার রাস্তায় জিপ চালাতে গিয়ে বাদশাহ অ্যাকসিডেন্ট করেছে। তার ডান হাতের কব্জি ভেঙ্গে গেছে। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। আমি একটু উদ্বিগ্ন হয়ে তার হাসপাতালের খোঁজ নিয়ে সেখানে হাজির হলাম। দেখলাম, সে আরো কিছু রোগী নিয়ে উৎফুল্লভাবে আড্ডা জমিয়েছে। রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজের যুদ্ধ সম্পর্কে নানা গল্প বলে বৈঠক মাতিয়ে রেখেছে। বললাম, ‘বাদশাহ তোমাকে দেখতে এসেছি’। বাদশাহ সে কথায় কান না দিয়ে নির্বিকার মুখে বলল, গাফফার ভাই আপনার ব্যবস্থা তো হয়ে গেছে। আমি একটু কঠোর স্বরে বললাম, ব্যবস্থা তুমি করোনি। অন্যেরা করেছে। বাদশাহ আরো নির্বিকার স্বরে বলল, কী বলেন, আমি তো তাজ উদ্দিন ভাইকে আপনার কলকাতায় আসার কথা বলেছিলাম। এই সাক্ষাতের পরে বাদশাহর সঙ্গে আরেকবার দেখা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এক শিবিরে।
আমাকে মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে যেতে হতো। মুজিবনগর সরকার আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমি যেন মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে গিয়ে তাদের মনোবল বাড়াবার চেষ্টা করি। এরকম এক শিবিরে গিয়ে বাদশাহর দেখা পাই। শিবিরে গিয়ে আমি হাত-পা-ভাঙ্গা কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা পাই। ভারত সরকার তাদের চিকিৎসার জন্য একটা ছোট্ট হাসপাতাল সেখানে তৈরি করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা অভিযোগ করল, তাদের খাবার এবং ওষুধপত্র নিয়ে। আওয়ামী লীগের এমপি এবং পশ্চিমবঙ্গের এমএলএ মিলে দেদার দুর্নীতি করছে। আমি বাদশাহকে বললাম, তুমি এই দুর্নীতি সম্পর্কে একটা রিপোর্ট লিখে দয়া করে তাজ উদ্দিন ভাইকে দাও। তিনি নিশ্চয় এর একটা প্রতিকার করবেন। বাদশাহ আমার এই অনুরোধ রেখেছিল কিনা তা জানি না। যুদ্ধাকালীন সময়ে এরপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি।

লণ্ডন, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২
(চলবে)