Share |

সিলেটে ভূমিখেকোর দৌরাত্ম্য : মাজার দখলের অপচেষ্টা

পত্রিকা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ৭ মার্চ: সিলেটের আম্বরখানা এলাকার পবিত্র রায়হুসেন (র:) মাজার দখল করে নেয়ার চেষ্টা করছে এক ভূমি খেকো চক্র। জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল তৈরী করে মাজারের জায়গাকে ‘ভিটি’ শ্রেণীভূক্ত করে মাজারটি দখলে নেয়ার নানা আয়োজন সম্পন্ন করে তারা। তবে আঊলিয়া রায়হুসেন (র:) উত্তরসূরী যুক্তরাজ্য প্রবাসী মুবিন চৌধুরী ও তার সহশরীকানদের চেষ্টায় ভূমিখেকো চক্রের দলিল জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে যায়।
প্রতারণার মাধ্যমে দলিল তৈরি এবং তাতে মাজারের শ্রেণী পরিবর্তনের বিষয়ে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার বরাবরে অভিযোগ করেন মুবিন চৌধুরী। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের তদন্তে ধরা পড়ে ভুয়া দলিল বানিয়ে শ্রেণী পরিবর্তনের বিষয়টি। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার রায় দিয়েছেন মুবিন চৌধুরীর ও তার শরিকানদের পক্ষে। কিন্তু এরপরও থেমে নেই ভূমিখেকো চক্র। মাজারের জায়গা দখলে নানা অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে তারা। যার ফলে পবিত্র রায়হুসেন (র:) সাহেবের উত্তরসূরী এবং মাজারের ভক্তকুলে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় অনেকের কবরও সেখানে। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তারা বলছেন, ভূমিখেকোদের অপচেষ্টা মাজার ও কবরের পবিত্রতাকে লঙ্ঘন করছে। উল্লেখ্য, ১৮৬০ সনের দণ্ডবিধির ১৫ অধ্যায় মোতাবেক মাজার ও কবরের পবিত্রতা নষ্ট করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা ইত্যাদি ফৌজদারি অপরাধ।
বাংলাদেশে প্রবাসীদের ভূমি বেদখল হওয়ার ঘটনা অহরহ। সিলেটে যুক্তরাজ্য প্রবাসী অনেকের ঘর-বাড়ি বেদখল হওয়ার বহু নজির আছে। কিন্তু পবিত্র মাজারের জায়গাকে জাল দলিল বানিয়ে ভিটি শ্রেণীভুক্ত করে দখলের এমন চেষ্টা নজিরবিহীন।
সিলেট শহরের আম্বরখানা এলাকার ইলেট্রিক সাপ্লাই রোডে পবিত্র রায়হুসেন (র:) সাহেবের মাজার। তিনি হযরত শাহ জালাল (র:) এর ৩৬০ আঊলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ ফরিদ রওশন চেরাগ (র:)-এর উত্তর পুরুষ। স্মরণাতীতকাল হতে আল্লার এই অলির নামে স্থানীয় মহল্লাটির নাম রায়হুসেন পাড়া। স্থানীয় জামে মসজিদটিও রায়হুসেন মসজিদ নামে পরিচিত।
মাজার শরীফ ও তৎসংলগ্ন ভূমি আম্বরখানা মৌজার এস.এ. ৮৪২ ও ৮৪১ দাগে অবস্থিত। যারমধ্যে সম্পূর্ণ এস.এ. ৮৪২ দাগটি মাজার শ্রেণীভূক্ত। আর ৮৪১ দাগটি মাজার সংলগ্ন ভূমি।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী মুবিন চৌধুরী আঊলিয়া রায়হুসেন (র:) সাহেবের উত্তরসূরীদের একজন। ওই জায়গার একজন সহশরীকান। অন্যান্য ওয়ারিশগণের অনুরোধে মাজার ও তৎসংলগ্ন জায়গাটি দেখাশুনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন তিনি। কিন্তু ব্যবসায়িক ও পারিবারিক কারণে যুক্তরাজ্য থাকায় এবং অসুস্থ পিতা-মাতাকে (বর্তমানে পরলোকগত) নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগে স্থানীয় ভূমিখেকো নুরুজ্জামান লেচু গং প্রতারণার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে এস.এ. ৮৪২ ও ৮৪১ দাগ দুইটির রেকর্ড নিজেদের নামে হাসিলের চেষ্টায় লিপ্ত হন। তারা বহু বছর আগে আব্দুল হাই নামে একজনকে দাতা দেখিয়ে সম্পূর্ণ গোপনে তঞ্চকতা ও প্রতারণামূলক দলিল তৈরী করেন এবং হাল জরিপে তাদের নামে মাঠ পর্চা ও তসদিক রেকর্ড করান।
বছর তিনেক আগে বাংলাদেশে গিয়ে মুবিন চৌধুরী বিষয়টি জানতে পারেন। ৪২(এ) ধারায় জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার বরাবরে অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তে বেরিয়ে আসে মাজারের জায়গা দখলের এই অপচেষ্টা। তদন্ত কমিটি এস.এ ৮৪২ দাগকে হাল জরিপে একক ব্যক্তির নামে রেকর্ডকে তঞ্চকতা হিসেবে সাব্যস্ত করে। ১৯৫৫ সনের প্রজাতন্ত্র বিধিমালার ৪২ (এ) বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশ করে।  
মুবিন চৌধুরী বলেন, এস.এ. ১০১ খতিয়ানে মোট ১০ জন মালিক থাকা সত্বেও এবং মন্তব্য কলামে স্পষ্টত: এজমালি উল্লেখ থাকা সত্বেও সম্পূর্ণ গোপনে ও প্রতারণামূলকভাবে একজনকে (আব্দুল হাই) একক দাতা দেখিয়ে দলিল তৈরী করে ওই চক্র। তারা মাজারকে ভিটি ভূমি হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করে। অথচ তাদের উপস্থাপিত কথিত দলিলে দেখা যায়, আব্দুল হাই এস.এ. ৮৪২ দাগে তার পূর্ব-পুরুষের কবর থাকার কথা স্বীকার করেছে। এছাড়া ওই চক্র এস.এ. ৮৪১ দাগ সংক্রান্ত যে বানোয়াট দলিল (নং ৩১৯৫২/৮১) দাখিল করেছে তার চৌহদ্দায় দক্ষিণে (অর্থাৎ এস.এ. ৮৪২ দাগে) মাজার শরিফ উল্লেখ আছে।
মুবিন চৌধুরী বলেন, সুষ্ঠু বিচার পেয়ে তিনি সন্তুষ্ট। মাজারের পবিত্রতা রক্ষা করতে তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন। ভবিষ্যতে ভূমিখেকো চক্রের হাত থেকে মাজার রক্ষায় সকলকে সতর্ক থাকার আহবান জানান তিনি। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার এসব ভূমিখেকোদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।