Share |

‘জীবনের চেয়েও জরিমানার অঙ্ক যখন বড়’ : হাদিসুরের প্রাণ গেল, কান্নার শব্দ কি যাবে উপর মহলে!

‘রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল দুমাসের বেশি সময় ধরে। যে বন্দরে  বাংলা সমৃদ্ধি জাহাজ নোঙর করেছিল তা যুদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষিত ছিল। তারপরও ২৯ নাবিকদে প্রাণ নাশের ঝুঁকিতে ফেলে কেন সেখানে নোঙর করা হল সেটার সদুত্তর কর্তৃপক্ষের কারো নিকট থেকে পাওয়া যায়নি।’ এ তথ্য ঢাকার একটি গণমাধ্যমের।
দেখা গেছে, একটি জীবননাশের পর টনক নড়েছে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের। যুদ্ধাবস্থায় জাহাজটি অলভিয়া বন্দরে নোঙর করা নিয়ে পা?াপা?ি বক্তব্য সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত এবং?ক্ষুব্ধ করেছে। জাহাজটি ভাড়া দেয়া ছিল একটি আন্তর্জাতিক শিপিং প্রতিষ্ঠানের কাছে। এই বন্দরে ঢুকতে দিলে সেই প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা গুনতে হতো- এমন বক্তব্য দেন শিপিং কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা।
সংবাদ সূত্রে প্রকাশ প্রথম থেকেই নাবিকদের আহাজারি ছিল তাদের উদ্ধারের জন্য। আহাজারির ভাষা এমনই হৃদয়বিদারক ছিল যে কোন মানবিকগুণসম্পন্ন মানুষের বুক কেঁপে ওঠার কথা। জাহাজটির সেকেণ্ড ইঞ্জিনিয়ার রবিউল আউয়াল ভিডিওবার্তায় আকুতি জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই, ইর্মাজেন্সী জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চলছে, আমরা মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছি, দয়া করে আমাদের বাঁচান’। কিন্তু বিএসসির কর্মকর্তা পীযূষ দত্তের দাবী, ‘বাইরের চেয়ে নাবিকদের অবস্থান জাহাজে নিরাপদ বিবেচনায় তারা জাহাজে অবস্থান করছেন’। নাবিকদের আহজারির বিপরীতে নিরাপদ দূরত্বে থাকা শিপিং কর্মকর্তার বক্তব্য এই বার্তাটিই দেয় যে, এই ২৯টি জীবন তাদের কাছে তুচ্ছ। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ইউক্রেন হতে বিদেশী নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল, সে স্থলে বাংলাদেশী নাবিকদের সাথে আচরণ ছিল ব্যতিক্রম। শিপিং কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা নাবিকদের সরিয়ে তো আনেননি, বরং অলভিয়া বন্দরে ঢুকতে দিয়েছেন। এইরকম দায়িত্বহীনতাকেই ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো’ বলে। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করা সত্ত্বে¡ও কেন জাহাজ অলভিয়া বন্দরে প্রবেশ করানো হয়, সেটি তো প্রধান প্রশ্ন। ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হয়। আর যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উত্তেজনা ও দামামার মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি অলভিয়া বন্দরে প্রবেশ করে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’।
এই যুদ্ধে পড়ে প্রাণ গেল ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুরের। যদিও পরবর্তীতে দ্রুতই অন্য ২৮ নাবিক এবং হাদিসুরের লাশ সরিয়ে আনা হয় রুমানিয়া ও পোলাণ্ডে নিযুক্ত দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দ্রুত পদক্ষেপের ফলে। কিন্তু লাশ হয়ে আসা হাদিসুরের স্বজনদের কী দিয়ে সান্তনা দেয়া সম্ভব? মাত্র একদিন আগেও ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে হাদিসুর বলেছিলেন, ‘ভাই, আমাদের আর ভাঙা ঘরে থাকতে হবে না’ বাড়িতে এসেই যেভাবে হোক ঘরের নির্মাণ কাজ ধরব’। এই স্বপ্ন কীভাবে একদিনের ব্যবধানে ধুলিস্মাৎ হল, তার উত্তর কে দেবে পথে বসে যাওয়া এই পরিবারকে।
আমরা চাই, এই দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে নজীরবিহিন শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হোক। কারণ, যে রাষ্ট্র এবং?এর ব্যবস্থা তার নাগরিকের প্রাণের চেয়েও জাহাজের জরিমানাকে বড় করে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সে রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ সেই স্বীকৃতি আর থাকে না। যে বাংলাদেশে উদ্ভট সব প্রকল্পের নামে লুটপাটের বাণিজ্য চলছে সেখানে অর্থ বাঁচানোর অজুহাতে ভিনদেশের যুদ্ধে নিজের সন্তানকে প্রাণে মারার হিসাবটা কার কাছ থেকে কে নেবে? এ বেদনার কোনো ভাষা নেই। এ লাশের জন্য ক্রন্দনের কোনো শেষ নেই। পথে বসা হাদিসুরের পরিবারের আহাজারির শব্দ কি পৌঁছবে সরকারের উপরমহলে?