Share |

বাদশাহনামা-৩

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বাদশাহ যখন ঢাকায় থাকে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন একাধিক ছাত্রী তার প্রেমে পড়েছিল। তাদের মধ্যে একজন প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে শুনেছি। ব্যাপারটা নিয়ে আমি ঘাঁটাঘাটি করতে যাইনি। এটা বাদশাহের ব্যক্তিগত বিষয়। তাকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করলে চুপ করে থাকত। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় থাকাকালে বাদশাহের সম্পর্কে এরকম গল্প অনেক শুনেছি। সেখানে তার সঙ্গে আমার দু’একবার ছাড়া দেখাও হয়নি। আর এ সম্পর্কে আলাপ হয়নি।
ঢাকায় ফিরে এসে বাদশাহর সঙ্গে দেখা হয়েছে। কিন্তু তখন সে বিলাত গমনের জন্য ব্যস্ত। বঙ্গবন্ধু তাকে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলাত পাঠাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু নিজেই একদিন বললেন, ‘দেশে থাকলে ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাকে বিলেত পাঠিয়ে দিচ্ছি। ব্যারিস্টারি পাশ করে আসুক। তাহলে রাজনীতিতে ভালো করবে’। এটা ১৯৭৩ সালের কথা। ওই সালেই সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যান।

সাংবাদিক হিসেবে আমিও তাঁর সঙ্গী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর প্রাইভেট চিকিৎসক হিসেবে ছিলেন প্রয়াত চিকিৎসক ডা. নুরুল ইসলাম। এই নুরুল ইসলামকে নিয়ে বাদশাহ একটি মজার কাণ্ড ঘটিয়েছিল। ডা. নুরুল ইসলাম এমআরসিপি ডাক্তার। তাঁর যেমন ছিল নামডাক, তেমনি তাঁর রোগীর সংখ্যাও ছিল অনেক। কিন্তু বিলাত থেকে ফিরে এসে তখনও সম্ভবত তিনি বিয়ে করেননি বা করেছেন, তা আমার ঠিক জানা নেই। বাদশাহ একদিন দৈনিক আজাদে রিপোর্ট লিখল, ‘ডা. নুরুল ইসলাম ঢাকায় অবিবাহিতদের একটি সমিতি গঠন করেছেন এবং তিনি নিজেই তার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।’ এই রিপোর্টটি ঢাকার চিকিৎসক মহলে হৈচৈ সৃষ্টি করল। ডা. নুরুল ইসলামের কাছে টেলিফোনের পর টেলিফোন। তিনি শেষ পর্যন্ত আজাদ অফিসে এলেন। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল রোগী হিসেবে। তিনি আমার কাছে এলেন। বললেন, ‘আমাকে বাঁচান। আমি এধরনের সমিতি-টমিতি করিনি এবং সভাপতিও হইনি।’ আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম যে, একটা সংশোধনী ছাপা হবে। তিনি বিদায় নিলেন। বাদশাহ সন্ধ্যার সময় অফিসে আসে। তার দেখা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কী? বাদশাহ হেসে বলল, ‘ডা. নুরুল ইসলাম বিলাত-ফেরত। তার খুব অহঙ্কার। তাই তাকে নিয়ে একটু মজা করলাম।’ আলজিয়ার্সে যাওয়ার সময় বিমানে দেখলাম, বাদশাহ এবং ডা. নুরুল ইসলাম পাশাপাশি আসনে বসে হাসি-তামাশা করছেন। বঙ্গবন্ধুকে গল্পটা বললাম। তিনি বললেন, বাদশাহও তো এখন পর্যন্ত বিয়ে করেনি। বিলাত থেকে লেখাপড়া করে আসুক। ওরও বিয়ের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আলজিয়ার্সে বাদশাহ ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। কারণ বিমানটি বঙ্গবন্ধুকে আলজিয়ার্সে নামিয়ে দিয়ে লণ্ডনে যাবে। বাদশাহও ওই বিমানে লণ্ডনে যাবে।
বাদশাহ লণ্ডনে পাড়ি জমিয়েছে ১৯৭৩ সালে। আমি স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য লণ্ডনে আসি ১৯৭৪ সালে। বাদশাহর সঙ্গে আমাদের হাইকমিশনে দেখা হয়। সে তখন সাপ্তাহিক ‘প্রবাসী’ কাগজের সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু এই কাগজটি প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া বাদশাহকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল লণ্ডনস্থ জনতা ব্যাংকে গণসংযোগ অফিসার পদে। এছাড়াও তাকে আরেকটি চাকরি দেওয়া হয়। সেটা হলো বাংলাদেশ অবজারভারের লণ্ডনস্থ প্রতিনিধি। বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী তখন বদরুন্নেসা। তিনি ওই সময় ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য লণ্ডনে আসেন। বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে বাদশাহকে যে বাড়ি দেওয়া হয়েছিল, সেই বাড়িতেই বদরুন্নেসা উঠেন এবং এখানেই মারা যান। ওই বাড়িটিই ছিল ‘প্রবাসী’র অফিস এবং বাদশাহের বাসস্থান।
আগেই বলেছি, বাদশাহ বাংলাদেশ দূতাবাসে তার বন্ধুদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে খুব খাওয়াত। সেই খাওয়াতে আমিও মাঝে মাঝে অংশ নিতাম। কিছুদিন পর জানা গেল, বাদশাহ ব্যারিস্টারি পড়ছে না। সে ‘মার্কস এণ্ড স্পেন্সারে’ চাকরি নিয়ে সেলসম্যান হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কথাটা জানলে কী করতেন জানি না। কিন্তু তিনি এই খবর জানার আগেই মর্মান্তিকভাবে নিহত হোন। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা তখন জার্মানীতে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় বাদশাহ ঢাকাতে বঙ্গবন্ধুর পাশের বাসাতেই অবস্থান করছিল। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকেরা তাকেও ধরেছিল কিন্তু মারেনি। তাকে বিমানের টিকিট কেটে আবার লণ্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছে। এই খবরটা জেনে বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যাই এত দুঃখ পেয়েছিল যে, তার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখেনি।
সালটা মনে নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমার বন্ধু এবং প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসা লণ্ডনে আসেন। তিনি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই আমার বাসাতেই কয়েকদিন ছিলেন। এই সময় একদিন বাদশাহ এসে আমাকে বলল, আপনাকে আমার একটা উপকার করতে হবে। মুসা ভাইও করবেন রাজি হয়েছেন। আমি বললাম, উপকারটা কী সে বলল, আমি বিয়ে করছি। চট্টগ্রামের মেয়ে। নাম গুল নাহার। আওয়ামী লীগ নেতা এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী একে খানের ভাগ্নি। তবে আগে একবার বিয়ে হয়েছিল এবং একটি বাচ্চা আছে। আমরা পরস্পরের প্রেমে পড়েছি। তাকে আমি বিয়ে করছি। আপনাকে আমার বিয়ের উকিল বাপ হতে হবে। আমি একটু বিস্মিত হলাম এবং মুসার সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করলাম। মুসা বলল, আমি বাদশাহর অনুরোধে রাজি হয়েছি। কী আর করব! আমিও উকিল বাবা হতে রাজি হলাম। এক বন্ধুর বাসাতে অনাড়ম্বরে বিয়ে হলো। এই বিয়েতে আমি এবং মুসা উকিল বাবা হলাম। বাদশাহর নতুন বউকে দেখলাম। খুবই সুন্দরী এবং চটপট কথা বলতে পারেন। তাকে বিদূষী বলেও মনে হলো।
বিয়ে হয়ে গেল। বাদশাহ তখন আর সাউথ লণ্ডনে ‘প্রবাসী’র বাসায় থাকে না। ‘প্রবাসী’ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বাসাও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাদশাহ এসেছে আমার বাসার কাছে। কুইন্সবারির একটা লেনে। পরে সে বাসাটি কিনেছে। এ সময় বাদশাহ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া তিনটি চাকরি হারায়। প্রবাসীর সম্পাদক পদ, ব্যাংকের চাকরি এবং বাংলাদেশ অবজারভারের লণ্ডনস্থ প্রতিনিধি পদ। সে তখন মার্কস এণ্ড স্পেন্সারের চাকরিতে ছিল বলেই জানি।
এই বিয়ের পর বাদশাহকে দেখতাম তার সুন্দরী বউ নিয়ে লণ্ডনের নানা জায়গায় ঘুরছে। কখনো টিউবে দেখা হতো। কখনো কারো বাসায়। দুজনে গভীর প্রেমে এত লিপ্ত থাকত যে কথা বলার সুযোগ পেতাম না। বাদশাহ যেমন সুদর্শন, তেমনি রূপবতী গুল নাহার। আমি তাদের প্রেমের গভীরতা দেখে ভেবেছিলাম, এই বিয়ে চিরস্থায়ী হবে। বাদশাহ সম্পর্কে কোনো সমালোচনামূলক উক্তি করলে তার সুন্দরী স্ত্রী অত্যন্ত রুষ্ট হতো এবং বলত, আমার বাদশাহ সম্পর্কে আপনারা খারাপ কথা বলবেন না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! বাদশাহর এই প্রেমও টেকেনি। কিছুদিনের মধ্যেই দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। কুইন্সবারির বাড়িটা কেনা হয়েছিল দুজনের নামে। কিন্তু ঝগড়া-বিবাদ করার পর বাদশাহকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হতো।
একদিন গভীর রাত। সম্ভবত তিনটা কী চারটা হবে। আমার বাসার দরোজার কলিং বেল বেজে উঠল। আমার স্ত্রী বলল, দরোজা খুলতে যেও না। আমার ভয় হচ্ছে কোনো খারাপ লোক এসেছে। তবু আমি পা টিপে টিপে দরোজার কাছে গেলাম এবং দরোজা একটু খুলে দেখলাম বাদশাহ। তাড়াতাড়ি দরোজা খুললাম। বাদশাহর পরনে লুঙ্গি। গায়ে গেঞ্জি। সে বলল, গাফফার ভাই, আপনার বাসায় কিছুদিন থাকব। তার পেছনে একজন পুলিশ। পুলিশ বলল, স্ত্রীর সঙ্গে তার খুব ঝগড়া হয়েছে। আমরা তাকে আগামী সাত দিন ওই বাড়িতে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। বাদশাহ বলল, তাড়াহুড়ো করে আসার সময় কাপড়-চোপড়ও আনতে পারিনি।
বাদশাহকে ঘরের ভেতর নিয়ে এলাম। আমার স্ত্রী ওই গভীর রাত্রে তাকে খেতে দিল। বাদশাহ তখন তিন দিন আমার বাসায় ছিল। তারপর তার এক বন্ধুর বাসায় চলে যায়। কিছুদিন পর শুনলাম, স্ত্রীর সঙ্গে তার মিটমাট হয়েছে। সে আবার কুইন্সবারির বাসায় এসেছে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া প্রায়ই হতো। বাদশাহ তখন ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন বন্ধুবান্ধবের বাসায় আশ্রয় নিত। এই সময় তার হাতে টাকা-পয়সা কিছুই ছিল না। বেইকার স্ট্রিটের রাজদূত রেস্টুরেন্টের মালিক এবং আওয়ামী লীগের তখনকার একজন নেতা আতাউর রহমান খান ওই সময় বাদশাহকে খুবই সাহায্য করেছেন। বাদশাহ তার রেস্টুরেন্টে কিছুদিন ওয়েটারের কাজ করেছে এবং আতা খান তাকে অর্থ দিয়েছেন এবং অন্যান্য সাহায্য করেছেন।
এই সময় আরেক ব্যক্তি বাদশাহকে সাহায্য করেছেন। তার নাম চিংড়ি মিয়া। তিনি চিংড়ির ব্যবসা করে বিরাট ধনী হয়েছিলেন। একসময় সারা লণ্ডনে তার একচেটিয়া ব্যবসা ছিল। ইংরেজ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা তাকে ডাকত ‘প্রোন মিয়া’। তার চারতলা বিশাল বাসভবন ছিল। বাংলাদেশের মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদসহ আরো অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তাদের কেউ কেউ বিলাতে এলে চিংড়ি মিয়ার বাসায় থাকতেন। চিংড়ি মিয়া শুধু আমাদের বন্ধু নয়, আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রয়াত সাংবাদিক আউয়াল খানের ছোট বোন বিয়ে হওয়ার কিছুদিন পরেই একটি মেয়ে কোলে বিধবা হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন আউয়ালকে জনতা ব্যাংকে চাকরি দিয়ে বিলাতে পাঠান, তখন আউয়াল সঙ্গে করে বিধবা বোনকে নিয়ে এসেছিলেন। এই বিধবা বোনকেই চিংড়ি মিয়া বিয়ে করেন এবং আমাদের আত্মীয় হয়ে উঠেন। বাদশাহ এই আত্মীয়তার সুবাদে তার বাসায় গিয়ে প্রায়ই থাকত। চিংড়ি মিয়ার স্ত্রী আউয়ালের বোন তার যথেষ্ট সেবাযতœ করেছে।
বাদশাহ কুইন্সবারির বাসায় ফিরে এলে আবার তার বাসায় গেলাম। স্বামী-স্ত্রী দুজনের মধ্যে তখন গভীর প্রেম। তাদের মধ্যে যে বারবার ঝগড়া-ফ্যাসাদ হয়, এই গভীর প্রেম দেখে তা বোঝা যেত না। একদিন বাদশাহ আমার বাসায় এসে আমার স্ত্রীকে বলল, ‘ভাবী, একটা সুখবর দেব’। আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুখবরটা কী’? বাদশাহ খুব গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমি বাপ হতে চলেছি। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা’। আমি বললাম, ‘তাহলে তো মিষ্টি কিনে আনতে হয়। কিন্তু এখানে তো বাংলাদেশের মিষ্টি নেই। ইস্ট লণ্ডনে গেলে তোমাকে বাংলাদেশের মিষ্টি খাওয়াব।’
লণ্ডন, ৪ঠা মার্চ ২০২২
(চলবে)