Share |

কে ছিলেন আব্দুল্লাহ কুইলিয়াম?

মতিউর রহমান চৌধুরী
আমরা অনেকেই আব্দুল্লাহ কুইলিয়ামের নাম শুনেছি। কিন্তু তিনি কে ছিলেন, কি করেছেন, কিভাবে ইসলামে এলেন বা দাওয়াত দিলেন সে সম্পর্কে হয়তো পুরোপুরি অবগত নই। তিনি ১৮৫৬ সালের ১০ এপ্রিল লিভারপুলের ২২ ইলিওট স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন। পড়ালেখার পর ১৮৭৮ সালে তিনি সলিসিটর হিসাবে লিভারপুলে কর্মজীবন শুরু করেন।
তিনি ১৮৮৭ সালে ৩১ বছর বয়সে মরক্কোতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তখন থেকেই ইসলামের একজন খাদেম হিশাবে আত্মনিয়োগ করেন। ব্রিটেনে ফিরে এসে তিনি বহু লোককে ইসলামের আলোয় আলোকিত করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামকে ব্রিটিশ মূলধারার সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে তিনি ব্রিটিশ সমাজে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও ইসলামের দাওয়াত দিয়ে গেছেন প্রায় এককভাবে। প্রতিকূলতা থাকলেও তিনি দমে যাননি। তার মিশন চালিয়ে গেছেন অক্লান্তভাবে।
পরোপকারি মানুষ হিসাবে তিনি স্থানীয় সমাজে এমনিতেই পরিচিত ছিলেন। ছিলেন ট্রেড ইউনিয়নের সাথে জড়িত। চরম দারিদ্র্যের কারণে স্থানীয় লোকেরা তাদের সন্তানদের তার কাছে সম্প্রদান করে দিত। এদের দেখভালের জন্য তিনি বিশাল এতিমখানা গড়ে তুলেন। যেখানে প্রায় দশ হাজার এতিম বাস করতো। তার এতিমখানার নাম ছিল মদিনা হাউস। এদের লেখাপড়ার জন্য গড়ে তুলেন বোর্ডিং স্কুলও। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি দশ হাজার এতিমের ফ্রি থাকা খাওয়া এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।  
গ্রেট ব্রিটেনের প্রথম রেজিস্টার্ড মসজিদ তার তত্তাবধানে লিভারপুলবাসীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা পায় ১৮৮৭ সালে উইলিয়াম হেনরি ক্যুইলাম নামে। ১৩৫ বছর আগেও সেসময় তিনি সঠিক কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়েছেন। সেই আমলে তিনি ‘পারপাস বি?’ মসজিদ নির্মাণ করেছেন। মসজিদের পাশাপাশি তিনি লিভারপুল মুসলিম ইনস্টিটিউটও গড়ে তুলেন। ইনস্টিটিউট থেকে ১৮৯৩ সালে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘দি ক্রিসেন্ট’ নিজস্ব প্রেস থেকে প্রকাশ করেন এবং পরে মাসিক ‘ইসলামিক ওয়ার্?’ ম্যাগাজিনও এর সাথে যুক্ত করেন। স্থানীয় এবং ব্রিটেনের অন্যান্য শহরে বিতরণের পর পৃথিবীর প্রায় ২০টি দেশে ম্যাগাজিনগুলো বিতরণ করা হতো। তিনি অনেক ইসলামিক বইও লিখেছেন। বইগুলোর মধ্যে ‘দি ফেইথ অব ইসলাম’ ১৩টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
১৮৮৯ সালে মুসলিম হন প্রফেসর নসরুল্লাহ ওয়ারেন, প্রফেসর হাসেম ওয়াই? এবং ৭৩ বছর বয়ষ্ক লর্ড রিচার্ড স্ট্যানলি। স্ট্যানলি স্ট্যানলিব্রিজের তৎকালিন মেয়র ছিলেন।
স্ট্যানলি ইসলাম গ্রহণ করলে তার পরিবারের সদস্যরা তাকে অবজ্ঞা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বিশাল সম্পত্তি এবং ব্যাপক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে তাকে তারা অবজ্ঞা করতে পারেননি। অধিকন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর চেসার এলাকার সব পাব বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আব্দুল্লাহ কুইলিয়াম আটটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। একদিন কায়রো ইউনিভার্সিটিতে লেকাচার দিতে গেলে তাঁর লেকচারের পর প্রায় ১৫% উপস্থিত ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।  তিনি ইসলামের একনিষ্ঠ খাদেম ছিলেন। তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের সর্বশেষ খলিফা সুলতান আব্দুল হামিদ তাকে ১৮৯৪ সালে ‘ব্রিটিশ আইলের শায়খুল ইসলাম’ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন।
সেসময়ই মসজিদের দোতলার জানালা খুলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেয়া হতো। মুয়াজ্জিন যখন আজান দিতেন তখন বাইরে ৩/৪শত মানুষ সমবেত হয়ে মুয়াজ্জিনকে গোবর, পাথর, ডিম দিয়ে ঢিল ছুড়তো। তারা উচ্চস্বরে বলতো, তোমরা আমাদের সিটিতে নামাজ পড়তে পারবে না, অন্য সিটিতে যাও। কিন্তু এসবের পরও তিনি দমে যাননি, বরং তাদের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার কাজ চালিয়ে গেছেন সবসময়।
বিভিন্ন ধরনের প্রতিহিংসার কারণে তিনি এক সময়?লিভারপুল ছেড়ে যেতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে তার পরিবারের সদস্যরা মসজিদ বি?িংটি স্থানীয় কাউন্সিলের কাছে বিক্রি করে দেন। তখন থেকেই এটি কাউন্সিলের ম্যারেজ, জন্ম, মৃত্যু রেজিস্ট্রি অফিস হিশেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। কিন্তু মসজিদটি রেকর্ডরূম এবং স্টোররূম হিশাবে ব্যবহার হতো। পরোপাকারি এ মহান ব্যক্তিটি ১৯৩২ সালের ২৮ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন।
বর্তমানে আব্দুল্লাহ কুইলিয়াম সোসাইটির চেয়ারম্যান গালিব খান। সম্প্রতি আমরা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গেলে আমাদেরকে এসব তথ্য তুলে ধরেন সোসাইটির সিইও মুমিন খান এবং ট্রাস্টি ডা. আব্দুল হামিদ।
প্রায় ১০০ শত বছর মসজিদটি বন্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালে বিবিসিতে একটি প্রমাণ্যচিত্র সম্প্রচারের পরই গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ মুসলিম ‘হ্যারিটেজ’টি সবার নজরে আসে। পুনরায় মেরামতের পর ২০১৪ সালে ১০৬ বছর পর এটি আবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ, জুম্মাহ এবং ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে মসজিদ কর্তৃপক্ষ পাশের বিরাট বি?িং এবং জায়গা খরিদ করতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উপযোগী করে প্রকল্পকে সাজাতে তাদের প্রচুর অর্থের দরকার।

লণ্ডন, ১৭ মার্চ ২০২২
লেখক: সাংবাদিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার বিশেষ প্রদায়ক