Share |

স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী এবং?হত্যামামলায় দণ্ডিতের জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার

এবারের মার্চে আমরা পার হয়ে এলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী। পুরো মার্চ মাসটিই আমাদের জন্য গৌরবোজ্জ্বল ও অমিয় তেজোদীপ্ত। ২৬ মার্চেই বাঙালী প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর পরের সময়টুকু তো ইতিহাস- পাক হানাদার বাহিনিকে রুখে দিয়ে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনে লালসূর্যখচিত পতাকা- যা ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত।
কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী সময়কে বিচার বিশ্লেষণ করলে ত্যাগ আর অর্জন দুটোকে মেলাতে জাতিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বলা যায়, যেখানে অপার আনন্দ থাকার কথা, সেখানে আনন্দও ম্লান। শুধু দেশেই নয়- বিশ্বসভায়ও?নানা প্রশ্নবানে বিদ্ধ হচ্ছে এই জাতির রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আর সরকার পরিচালনা।
দেশবাসী চেয়েছিল শোষণ মুক্তি, সামাজিক ন্যায় বিচার। দ্বিতীয়ত গণতন্ত্র এবং সুশাসন। এছাড়া অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ ছিল কাম্য। স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। কথা ছিলো এই চারটি মূল নীতির ওপরই দাঁড়াবে স্বাধীন রাষ্ট্রটি। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এর কোনটারই স্বাদ জনগণ পায়নি। বরং উ?োটাই বেশি ঘটেছে এবং ঘটছে।
শোষণমুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার কথাটিই তিরোহিত এখন। সুশাসন নির্বাসনে দিয়ে আমরা নিজেদের সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠা করেই কেবল ক্ষান্ত নই। বছরের পর বছর ধরে  নির্মমভাবে জারি রয়েছে নানা নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা- যা দিয়ে এমন শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যা লুটপাটকে সুরক্ষাদান করার কাজেই ব্যস্ত। অথচ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রত্যয় ছিল ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এই ‘মুক্তি’ শব্দটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা কত আর হবে? দেশবাসীর শোষণ মুক্তির এই অঙ্গীকারটিই আজ পদাঘাতে ভূলণ্ঠিত। বিপন্ন জনতা মুক্তির জন্য কোন পথ খোলা আছে কিনা জানে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করতে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান রাজনীতির ব্যবস্থা এমন একটি অবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য নেই। তাই সরকারের বা সরকারি দলের সমালোচনা করা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের বা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সমালোচনা আর রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার মতো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়কে একই কাতারে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
নির্বাচনে স্থুল কারচুপি, বাক্স্বাধীনতা খর্ব করতে আইন প্রণয়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ- এসবই খুব স্পষ্টভাবেই দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশ স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে কতটা দূরে সরে গেছে।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে আর্থিক বহু উন্নতি সাধিত হলেও ন্যায্যতা, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ক্রমশঃ অবক্ষয়?এতটাই হয়েছে যে ক্ষমতাধরের নীতিহীনতা ও জবরদস্তির কথা বলা কঠিন হয়ে দাঁিড়য়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটি কাম্য ছিলো না।
স্বাধীনতার অর্ধ শতক পার হয়ে যখন আমাদের জাতীয় উৎকর্ষ সাধনের উদ্যোগে ব্রতী হওয়ার কথা তখন আরো বড় কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে পড়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননার ব্যবস্থাটি। এবারে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়েছে হত্যামামলায় দণ্ডিত একজন অপরাধীকে। এটি এই পুরস্কারের জন্য উপযুক্তদের প্রতি অপমান নয় শুধু বরং দেশটির মহান স্বাধীনতার প্রতি চরম অপমান প্রদর্শন। তীব্র সমালোচনার পর এই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হলেও প্রশ্ন হলো- এই দৈন্যদশা কেনো হবে? কারা কিভাবে এবং?কোথা থেকে এই ধৃষ্ঠতা দেখানো সাহস পায়? এর আগে আমাদের মাথা হেট হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী বন্ধুদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদত্ত সম্মাননা ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতির ঘটনায়।
এবারের স্বাধীনতা দিবসে বার্তা একটাই- যে জঞ্জাল জমা হয়েছে আমাদের সামনে সেসব সরাতে হবে, নাহলে স্বাধীন দেশটি নিয়ে আমাদের গর্ব ক্রমশঃই মৗান হতে থাকবে।