Share |

সিলেট বিএনপি : আরিফ-মুক্তাদির দ্বন্দ্বে স্থগিত কাউন্সিল

সিলেট, ২১ মার্চ : সিলেট বিএনপির সম্মেলন ও কাউন্সিল হঠাৎ স্থগিত করা হয়েছে। রোববার দুপুরে দলের হাইকমান্ড থেকে স্থগিতের বার্তা দেওয়া হয়। অর্ধযুগ পর আয়োজিত সম্মেলন মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে স্থগিতের খবরে পদপ্রত্যাশীরা অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছেন। কাউন্সিল স্থগিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ কাউন্সিলর ও নেতাকর্মীদের অনেকে। দলের সিনিয়র নেতারাও বিস্মিত হয়েছেন। তাদের ভাষায়, ‘গড়তে গিয়ে সিলেট বিএনপি এখন ভাঙার উপক্রম। তবে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই।’ পাশাপাশি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অনিয়ম তদন্তে গঠন করা হয়েছে কমিটি। এদিকে সম্মেলন ও কাউন্সিল স্থগিতের ব্যাপারে কথা বলতে কেন্দ্রীয় বিএনপির একটি টিম রোববার রাতে সিলেট আসছে। রাতেই স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা থাকলেও রাত ৯টা পর্যন্ত টিমের সদস্যদের কেউ পৌঁছাননি। এ সময় হোটেলের নিচে নেতাকর্মীদের ঢল নামে।
সোমবার (২১ মার্চ) অনুষ্ঠেয় সম্মেলন ও কাউন্সিল স্থগিত হওয়ায় বিএনপির দুটি গ্রুপ পরস্পরকে দায়ী করেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে একপক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত ও নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে। আরেক পক্ষের অভিযোগ সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ-সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে আরিফ-মুক্তাদির বলয় নতুন করে বিভাজন সৃষ্টি করছে। তাদের দাবি-চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পর্যায়ের সিলেটের এক নেতা বিদেশ সফরে গিয়ে কাউন্সিল বানচালের ষড়যন্ত্র করেছেন। লন্ডনের ফোনেই সবকিছু তছনছ হয়েছে। ক্ষুব্ধ হলেও কেন্দ্রের নির্দেশে স্থগিত হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে নারাজ।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ কেন্দ্র থেকে কাউন্সিল স্থগিত রাখার নির্দেশ আসে। আহ্বায়ক কমিটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এককথায় অস্বীকার করেন তিনি। বিএনপির জেলা আহ্বায়ক কমিটি ও কেন্দ্রীয় সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীমের মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা হয় কাউন্সিল স্থগিত ঘোষণার পরপরই। রাত পর্যন্ত বন্ধই ছিল তার ফোনটি। অপর সভাপতি প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মেয়র আরিফুল হক রোববার রাতে বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। এরপরও হঠাৎ এত বড় আয়োজন কেন স্থগিত করা হলো আমার বোধগম্য নয়। তিনি দাবি করেন, কাউন্সিল আয়োজনে আমি সিরিয়াস ছিলাম, বানচালের কোনো ষড়যন্ত্রে আমি নেই। অপর সভাপতি প্রার্থী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, দলের নেতা হলে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। আমরাও পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। বিএনপি কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন জানান, জেলার ১৮ ইউনিটের তিনটি কমিটি বিলম্বে দেওয়ার কারণ এবং ১ হাজার ৮১৮ জন কাউন্সিলরের বিষয়ে কোনো আপত্তি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মুক্তাদিরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি বিদেশে থাকায় তার ফেসবুক মেসেঞ্জারে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটি তিনি ‘সিন’ করলেও সাড়া দেননি। জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাজরুল ইসলাম তাজুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যথাসময়ে ইউনিট কমিটি প্রণয়ন না করার দায় কোনোভাবেই বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি এড়াতে পারে না। সম্মেলন না হওয়ায় নেতাকর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ। জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা লোকমান আহমদ বলেন, জেলা বিএনপির সম্মেলন সময়োপযোগী ছিল। সম্মেলন না হওয়ায় নেতাকর্মীরা খুবই হতাশ।
এদিকে সম্মেলন ও কাউন্সিল স্থগিতের ব্যাপারে ব্যাখ্যা করতে বিএনপির কেন্দ্রীয় একটি জরুরি টিমের সদস্যরা আসছেন। রোববার রাতে তারা সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন। এ টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনা, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন। সম্মেলন ও কাউন্সিলের জন্য নির্ধারণ করা সরকারি আলিয়া মাঠঘেঁষা একটি হোটেলে সন্ধ্যা ৭টায় তাদের বৈঠক করার কথা ছিল। তবে রাত ৯টা পর্যন্ত তারা পৌঁছাননি। তবে হোটেলের নিচে গিয়ে দেখা যায় নেতাকর্মীদের ঢল।

তদন্ত কমিটি
জেলা বিএনপির সম্মেলন স্থগিত হওয়ায় কেন্দ্র থেকে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন মিলনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, কেন যথাসময়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি, কারা এজন্য দায়ী-এসব বিষয় নিরূপণ করে প্রতিবেদন দেবে তদন্ত কমিটি।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ জেলা বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে আবুল কাহের চৌধুরী শামীমকে সভাপতি ও আলী আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে কমিটি ভেঙে দিয়ে ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর কামরুল হুদা জায়গীরদারকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয়।