Share |

বাদশাহনামা-৫

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বাদশাহর জীবন অত্যন্ত নাটকীয়। তার চরিত্র ছিল অনেকটা রবীন্দ্রনাথের মায়াবর্ণ হরিণির মতো। রবীন্দ্রনাথের মায়াবর্ণ হরিণি ধরতে গেলে ছুটে পালাত। বাদশাহর জীবনও ছিল তাই। তাকে বঙ্গবন্ধুর পরিবার সন্দেহ করে তার আনুগত্য সম্পর্কে। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতি বাদশাহর আনুগত্য ছিল অপরিসীম। মাঝে মাঝে তার চরিত্রে যে স্খলন দেখা দিত, তা ছিল তার স্বভাবজাত। আমার সঙ্গেও বাদশাহ এধরনের ব্যবহার করেছে। আমি তাকে জানতাম বলে তার ওপর রাগ করিনি।
বাদশাহর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর। আমি তখন ‘বাংলার ডাক’ পত্রিকা প্রকাশের আয়োজন করছি। এ পত্রিকা ব্রিকলেনে বিভিন্ন  দোকানে বিলি করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। অধিকাংশ দোকানের মালিক ছিলেন আওয়ামী লীগ-বিরোধী। কিন্তু একদল দোকানদার ছিলেন, যারা ছিলেন আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের কাছে কী করে কাগজ পৌঁছাব, সেটাই ছিল একটা সমস্যা। ‘বাংলার ডাক’ বের হলে ‘জনমতের’ কিছুটা আর্থিক ক্ষতি হবে। কারণ তার গ্রাহক কমবে। এই ভয়ে জনমতের তখনকার মালিক ওয়ালি আশরাফ বাজারে রটিয়ে বেড়াতেন ‘বাংলার ডাক’ ভারতের টাকায় পরিচালিত। এই প্রচারণা সত্ত্বেও বাংলার ডাক যখন বের হয়, তখন তার প্রচার ছিল আশাব্যঞ্জক। সমস্যাটা ছিল কী করে বাংলার ডাক বাজারে পৌঁছানো যায়। বাদশাহকে ধরলাম। তার প্রবাসী পত্রিকা তখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু যে ইংরেজ ছেলেটি তার কাগজ ব্রিকলেনে বিলি করত, তাকে বাংলার ডাক বিলি করার জন্য নিয়োগ করতে চাইলাম। বাদশাহকে ধরলাম। বাদশাহ আমার বাসায় এলো এবং ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, ‘এসব আপনি কী করছেন এসব করে নিজে ডুববেন। আমাদেরও ডুবাবেন’। আমি তার কথা শুনে খুবই ক্ষুব্ধ হলাম। বললাম, ‘তোমার মুখে এ কী কথা’। পরে বুঝেছি, যে হত্যাকাণ্ড সে দেখে এসেছে, তার ভয়ে তখনও সে আড়ষ্ট। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মনমানসিকতা গড়ে উঠেনি। পরে তা গড়ে উঠেছে এবং সে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে আমাদের সাহায্য দিতে এগিয়ে এসেছে।
‘বাংলার ডাক’ ছেড়ে আমি যখন ‘নতুন দিন’, ‘পূর্বদেশ’ ইত্যাদি কাগজ বের করি, তখন বাদশাহ তার অফিসের কাজ ফেলে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসত। অনেক কলামও সে লিখেছে আমার এসব কাগজে। তার গাড়িতে কাগজ নিয়ে যেতাম ছাপাখানায়। আবার নিয়ে আসতাম।
একবার সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে নিউ ইয়র্কে যাই। কাগজের দায়িত্ব কার ওপরে দিয়ে যাই তা নিয়ে চিন্তাভাবনার অবসর ছিল না। বাদশাহকে বলতেই সে সানন্দে এই দায়িত্ব নিতে রাজি হলো এবং আমি যে ক-সপ্তাহ নিউ ইয়র্কে ছিলাম, সে নিয়মিত সাপ্তাহিকটি বের করেছে।
বাদশাহকে নিয়ে আমার বিশ্বভ্রমণ এ সময়েই শুরু হয়। তাকে নিয়ে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকাসহ বহু দেশ ঘুরেছি। সব জায়গাতেই মজার মজার ঘটনা ঘটেছে।
প্রথমেই বলি লস এঞ্জেলেসের কথা। লস এঞ্জেলেসে এক বাঙালি ফার্মাসিস্ট থাকেন। তার নাম আলম। তাঁর স্ত্রী সুন্দরী এবং বিদূষী। তাদের একটি মেয়ে সোনিয়া। তার বিয়ে হয়েছে এয়ার মার্শাল আজগর খানের নাতির সঙ্গে। সোনিয়াও খুব সুন্দরী। একবার লস এঞ্জেলেসে সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত। আমি তখন নিউ ইয়র্কে। সেবার বাদশাহও ছিল সঙ্গে। বাদশাহ আমাকে ধরল সে-ও লস এঞ্জেলেসে যাবে। নিউ ইয়র্ক থেকে লস এঞ্জেলেসে বিমানে ছয় ঘণ্টার পথ। সময়ের ব্যবধান তিন ঘণ্টা। এত দূর দেশে যাব, তাই বাদশাহকেও সঙ্গে নিলাম। যাওয়ার আগে নিউ ইয়র্কে একটি মজার ঘটনা ঘটে। নিউ ইয়র্কে এক মহিলা ডাক্তার আছেন। ডেন্টিস। তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে একটা বই লিখে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিলেন। তিনি হঠাৎ একদিন আমার নিউ ইয়র্কের বাসায় এসে হাজির। আমাকে তার রেস্টুরেন্টে দাওয়াত করলেন। তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় হলো। বাদশাহরও হলো। বাদশাহর এই সময় একটু একটু মাথা ব্যথা করছিল। আমি বললাম, বাদশাহ তোমার কাছে বিদেশে চিকিৎসা পাওয়ার ছাড়পত্র আছে। তুমি একজন ভাল ডাক্তার দেখাও। সে ওই ডেন্টিস্ট মহিলার কাছে গিয়ে কিছু ট্যাবলেট বিনা পয়সায় নিয়ে এসে খেতে শুরু করল।
আমরা লস এঞ্জেলেসে গিয়ে পৌঁছলাম। ওই আলম সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী এসে আমাদের তার বাসায় নিয়ে গেলেন। বিশাল হলিউড নগরীর পাশেই এই বাসা। মালিক সুন্দরী এবং তার বাগানে বাংলাদেশের মতো পেয়ারা থেকে শুরু করে সকল ফল জন্মে। বাদশাহর উৎসাহ দেখে কে! আমাদের হোস্ট বিবাহিত। তা সত্ত্বেও তার প্রতি বাদশাহর আকর্ষণ দেখে তাকে সাবধান করলাম। এই সময় তার মাথাব্যথা বাড়তে থাকে। লস এঞ্জেলেসে গিয়ে দেখলাম, বাদশাহর এক পূর্বপরিচিতও আছেন। সে বাদশাহকে পেয়ে হৈচৈ শুরু করে দিল। একদিন দেখলাম, বাদশাহ কাতর হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করতেই বলল, তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা। আমি তাকে অনুরোধ করলাম একজন ভাল ডাক্তার দেখাতে। সেখানে বেশ কয়েকজন বাঙালি ডাক্তার আছেন। বাদশাহ গেল না। সে ওই মাথাব্যথা নিয়েই লস এঞ্জেলেসে আমাদের সঙ্গে রইল।
লস এঞ্জেলেস থেকে সান ফ্রান্সিসকো শহরটি আট শ মাইল দূরে। আমাদের হোস্ট ঠিক করলেন, তার স্বামী, কন্যা এবং আমাদের নিয়ে একদিন সান ফ্রান্সিসকোতে যাবেন। আমরা একদিন সকালে রওয়ানা হলাম। চার শ মাইল যাওয়ার পরে দেখা গেল রাস্তা অবরোধ করে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করতেই তারা জানালো, গত রাতে প্রচণ্ড ঝড় ও প্লাবন হয়েছিল। সেজন্য রাস্তা বন্ধ। আজ আর সান ফ্রান্সিসকোতে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমরা বেজায় হতাশ হলাম। এতটা পথ এসে ফিরে যেতে হবে! রাস্তা যারা অবরোধ করেছিলেন, সেই সেনাবাহিনির লোকেরা জানালো, সান ফ্রান্সিসকোতে যাওয়ার একটা পাহাড়ি পথ আছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে দশ হাজার ফুট ঊর্ধ্বে সেই পথ। সামরিক বাহিনি ওই পথ ব্যবহার করে। আলম সাহেব গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন। তিনি বললেন, আমরা ভয় পেয়ে চেঁচামেচি না করলে তিনি ঠিকই গাড়ি ড্রাইভ করে ওই দশ মাইল পাহাড়িয়া পথ পাড়ি দিতে পারবেন। কিন্তু কেউ ভয় পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করলে গাড়ি হয় একদিকে দশ হাজার ফুট নিচে পড়ে যাবে অথবা অন্যদিকে সমুদ্রে পড়বে। বাদশাহ বলল, এ ধরনের পথ অতিক্রম করতে সে ভয় পায় না। আমি ভয় পেয়েছিলাম এবং ওই রাস্তায় না উঠার জন্য আলম সাহেবকে অনুরোধও জানিয়েছিলাম। বাদশাহ আমার ভীরুতাকে ঠাট্টা করল। সুতরাং আলম সাহেব গাড়ি নিয়ে পার্বত্য পথে উঠলেন। ওই রাস্তায় উঠে দেখি সামরিক বাহিনি যা বলেছিল, রাস্তা তার চেয়ে ভয়ঙ্কর। রাস্তা এতই সংকীর্ণ যে, অপরদিক থেকে গাড়ি আসলে আমাদের গাড়ি এগোতে পারে না। ডানদিকে দশ ফুট নিচে খাদ বা দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গ। গাড়ি রাস্তার মাঝখানে উঠতেই বাদশাহ চিৎকার শুরু করল, ‘ইয়া আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ’! তারপর চিৎকার করে বলল, ‘আমাকে এখানে নামিয়ে দেন। তবু এই গাড়িতে যাব না’। বাদশাহকে অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে শান্ত করে গাড়িতে উঠানো হলো এবং আমরা নিরাপদে সান ফ্রান্সিসকোতে পৌঁছলাম।
লণ্ডন, ২০ মার্চ ২০২২
(চলবে)