Share |

১৯৭১:পাকিস্তানী হারক তদন্তের গল্প

কাজী জাওয়াদ
মুক্তিযুদ্ধের সময় পটুয়া শিল্পী কাময়ল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়া খানের দানবীয় ব্যঙ্গচিত্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর স্থায়ী মানসমূর্তি। পাকিস্তানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান হিলাল-ই-জুরাত, হিলাল-ই-পাকিস্তান, নিশান-ই-পাকিস্তান (খেতাবগুলো পরে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়) বাংলাদেশে পরিচিত ‘জল্লাদ’ হিসেবে। আর পাকিস্তনী ‘ডলোস’ (গ্রীক পুরাণে প্রমিথিউসের কর্মচারী, ধূর্ততার জন্য খ্যাত) জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাগড়া দিয়েছিলেন। যার ফলে যুদ্ধ হলো, গণহত্যা হলো।
ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পনের চার দিন পর ২০শে ডিসেম্বর জেনারেল ইয়াহিয়া ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ভারতীয় দৈনিক ‘দা হিন্দু’ ১৯৭২ সালের ২১শে জানুয়ারি ‘দা সান’ পত্রিকার বরাত দিয়ে জানায় যে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোকে ’৭১-এর ডিসেম্বরে জাতিসংঘ থেকে ফিরে যাওয়ার পর গ্রেফতারের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ঘটনা ঘটলো তার উ?ো। সে সময় সম্ভবত বিশ্বে প্রথমবার কোনো সামরিক সরকার একজন বেসামরিক ব্যক্তি জুলফিকার আলী ভুট্টোকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতা দেয়। ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি জেনারেল ইয়াহিয়াকে গৃহবন্দী করেন এবং ৭১-এর ঘটনাবলীর তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছার কথা বলে পাকিস্তানের তখনকার প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন (হারক) গঠন করেন।
হারক অল্পদিনের মধ্যেই একটি বিশাল প্রতিবেদন রচনা করে এবং পরে ভারত থেকে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির পর তাঁদের মধ্য থেকে কিছু সামরিক কর্মকর্তার জবানবন্দি নিয়ে একটি সম্পুরক প্রতিবেদন দাখিল করে। হারকের প্রতিবেদন পাকিস্তান সরকারের উপর ‘জুজুর ভয়’ সৃষ্টি করে।
হারক প্রতিবেদন সম্পর্কে ভারতীয় সাপ্তাহিক “১৯৮৮ সালে ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইণ্ডিয়ায় এবং ১৯৯০ সালে ইণ্ডিয়া টুডে পত্রিকায় রিপোর্টের যে অংশটি প্রকাশ করা হয়েছে তা ছিল পরবর্তীতে প্রকাশিত সম্পুরক রিপোর্ট . . .” (জগলুল আলম, ১৯৭১ পরাজয় ও আত্মসমর্পনের পাকিস্তানী মূল্যায়ন, বাংলা গবেষণা, ঢাকা, ২০১৭, পৃ ীরর)। ওগুলোয় দাবী করা হয় হারক ভুট্টোর কাছে প্রতিবেদনগুলো দাখিল করলে ভুট্টো তার সকল কপি পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন। কিন্তু তার পরেও অন্তত দুটো কপি রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে ভুট্টোর ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর লারকানায় তাঁর বাড়ি থেকে একটি কপি উদ্ধার করে ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে মোড়কের মধ্যে রাখা হয়। আর অন্য কপিটি উধাও হয়ে যায়। (স্বপন দাসগুপ্ত, হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট আনসেটেলস পাকিস্তান, রেইজেস ডিমাণ্ডস ফর প্রোব ইনটু কারগিল, ইণ্ডিয়া টুডে, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০০০ (হালনাগাদ ডিসেম্বর ১১, ২০১২))। দাসগুপ্ত লিখেছেন, “তাই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে ইণ্ডিয়া টুডে সম্পুরক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে (“বাহাইণ্ড পাকিস্তান’স সারেণ্ডার”, অগস্ট ২১) পাকিস্তানী কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বভাবসিদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়ঃ প্রতিবেদনটা কী করে ফাঁস হলো?” (আসলে ২০০০ সালের অগস্ট মাসে ইণ্ডিয়া টুডে হারক প্রতিবেদনের বাছাই করা অংশ প্রকাশ করার পরে পাকিস্তন সরকার ডিসেম্বর ৩০, ২০০০ সালে মূল ও সম্পুরক উভয় হারক প্রতিবেদন অবমুক্ত করে দেয়। -লেখক)   
খ্যাতনামা ভারতীয় সাংবাদিক এম জে আকবর প্রতিষ্ঠিত ‘দা সানডে গার্ডিয়ান’ পত্রিকার লাইভ সংস্করণের নভেম্বর ২৭, ২০২১ তারিখের সংখ্যায় ‘পাক কোয়াইটলি বেরিজ রিপোর্ট অন জিএইচকিউ জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অভিনন্দন মিশ্র লেখেন ২৫০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনটির “মাত্র ১২টি কপি করা হয়েছিল, . . . একটি কপি ছাড়া সবগুলো কপি ধ্বংস করা হয়। . . . ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছে “সম্পূরক প্রতিবেদন” ৪৭ বছরেরও বেশি সময় পরে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেটি প্রকাশ করা ছাড়া পাকিস্তান সরকারের আর কোন উপায় না থাকায়, ২০০০ সালের আগস্ট মাসে তা অবমুক্ত করা হয়।”
দা ইকোনমিক টাইমস পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে দ্বীপাঞ্জন রায় চৌধুরীর ‘ফিফটি ইয়ারস অব বাংলাদেশ ইণ্ডিপেণ্ডেন্স:রিবাইস্টিং দ্যা হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট’ (হালনাগাদ ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২১) হারকের একটি কপি উদ্ধারের কথা বলা হয়।
ভারতীয় গণমাধ্যমে ১৯৭৯ সালে ভূট্টোর বাড়ি থেকে, তাঁর বালিশের নিচ থেকে হোক বা শৌচাগার থেকেই হোক, টিকে থাকা কপি বা কপি দুটোর একটির উদ্ধার কাহিনীর সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ ১৯৭৮ সালেই এ বাসিত সেই প্রতিবেদনের কাহিনী উদ্ধার করে তাঁর বইটি লেখেন। যাহোক, ভারতীয় সাপ্তাহিক ‘ইণ্ডিয়া টুডে’ পত্রিকায় প্রতিবেদনটির বাছাই করা অংশ প্রকাশ করা হয়। ১৪ আগস্টকে উপলক্ষ করে সেটি প্রকাশ এবং করাচির ডন পত্রিকায় তা পুনঃপ্রকাশিত হয়।
পাকিস্তান ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রতিবেদনটির উপর ঘুমিয়ে ছিল। ডনের খবর নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা হলে সে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখনকার সরকার প্রধান পারভেজ মোশাররফ হারক প্রতিবেদনগুলো পড়ে সেগুলো অবমুক্ত করার ব্যাপারে সুপারিশের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লে. জেনারেল মঈনউদ্দীন হায়দার ছিলেন কমিটির প্রধান। তখনকার মন্ত্রী পরিষদ সচিব ড. মাসুমা হাসান এবং পররাষ্ট্র সচিব ইনামুল হক ছিলেন সদস্য।
ড. মাসুমা হাসান পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘পাকিস্তান  হরাইযন’-এ হারক প্রতিবেদন অবমুক্ত করার বিষয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। তাতে তিনি মন্তব্য করেছেন, “সম্ভবত ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর পাশবিক দমনের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ইণ্ডিয়া টুডে পত্রিকায় ১৪ অগস্টের কাছাকাছি সময়ে তা প্রকাশ করা হয়।” তিনি লিখেছেন, তাঁদের কমিটি বৈদেশিক সম্পর্কের কিছু অংশ বাদ দিয়ে মূল ও সম্পুরক উভয় প্রতিবেদনই অবমুক্ত করার সুপারিশ করে। সুপারিশ অনুযায়ী মহাফেযখানায় সংরক্ষিত দলিল অবমুক্ত করার আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ করে ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে এবং করাচি ও লাহোরে বিভাগের অন্যান্য কার্যালয়ে তা অবমুক্ত করা হয়। আগ্রহী নাগরিক ও সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা তা দেখেন এবং বেশ কিছু পত্রিকায় তার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকাশ করা হয়।
ড. হাসান লিখেছেন- মূল প্রতিবেদনে সামগ্রিকভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ সংকটের রাজনৈতিক পটভূমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের ‘অসহযোগ আন্দোলনকে’ ‘ত্রাসের রাজত্ব’ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে ইয়াহিয়া খানকে মূল অপরাধী বলে দাবী করা হয়। হারক সদস্য বিচারপতিরা বাংলাদেশের দাবী অনুযায়ী নিহত ও ধর্ষিতার সংখ্যা সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত পুরো পাকিস্তানী বাহিনী শুধু একাজগুলো করলেও অত ক্ষতি করা সম্ভব ছিল না। সম্পূরক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়াজী ‘পুরোপুরি মানসিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত’ হওয়ায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনি ঢাকায় থাকা ২৬ হাজার সৈন্য নিয়ে আরও দু’সপ্তাহ ভারতীয়দের ঠেকিয়ে রাখতে পারতেন এবং সেই সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা করা যেত।
হারক ১৫টি অভিযোগে জেনারেল ইয়াহিয়ার এবং অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তার সামরিক আদালতে বিচারের সুপারিশ করে। তাতে ইয়াহিয়া খান, আবদুল হামিদ খান, এম এম পীরজাদা, গুলাম উমর ও এ ও মিঠা প্রমুখ জেনারেলের সামরিক আদালতে বিচারের সুপারিশ করে। কিন্তু তাঁদের কোনো বিচার করা হয়নি। ভুট্টো ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর বা পাকিস্তানের কোন সরকারই দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের ব্যবস্থা করেননি। (এমনকি ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে তখনকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ১৯৫ জন্য পাকিস্তানী বন্দীকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অপরাধে বিচারের কথা উল্লেখ করলেও তাদের বিচারের কোন পদক্ষেপ নেননি। -লেখক)
ড. মাসুমা হাসানের নিবন্ধ সম্মন্ধে ইমেইলের মাধ্যমে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এখানে তার পূর্ণ বিবরণ দেওয়া হলোঃ

প্রশ্নঃ আপনার নিবন্ধে লিখেছেন যে কমিটি হারকের মূল ও সম্পূরক প্রতিবেদনগুলো পড়ে। কিন্তু সাধারণভাবে মনে করা হয় প্রতিবেদনগুলোর সবগুলো কপিই (সম্ভবত ৬টি) ধ্বংস করা হয়েছিল। তাহলে আপনাদের কমিটি মূল প্রতিবেদনগুলো কোথায় পেল। কোথায় এবং কীভাবে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছিল? আপনি কী বলবেন হারক প্রতিবেদনগুলোর কতগুলো কপি করেছিল?
উত্তরঃ প্রতিবেদনগুলোর অনেকগুলো মূল কপি করা হয়েছিল এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে সরকারগুলো যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণ করে এগুলোও সেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সাধারণভাবে যা মনে করা হয় তা ঠিক নয়।

প্রশ্নঃ দাবী করা হয় যে লারকানায় মি. ভুট্টোর বাড়ির একটি শৌচঘর থেকে হারক প্রতিবেদনের সর্বশেষ কপিটি উদ্ধার করা হয়। যেটি ভারতীয় সাময়িকী ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’র একজন সাংবাদিক দেখতে পান এবং ১৯৮৮ সালে তা প্রকাশ করেন। তার অর্থ আপনাদের কমিটি প্রতিবেদনগুলোর কোনো নকল নিয়ে কাজ করে -মন্তব্য করুন।
উত্তরঃ (হারক) প্রতিবেদনগুলো নিয়ে অনেক গালগল্প ও অনুমান রয়েছে। কোথায় দাবী করা হয়েছে এবং কীভাবে একজন ভারতীয় সাংবাদিক মি. ভূট্টোর শৌচঘর থেকে উদ্ধার করা কপি দেখতে পারেন?

প্রশ্নঃ আপনার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে আপনাদের কমিটি ‘কিছু অংশ’ বাদ দিয়ে হারক প্রতিবেদনগুলো অবমুক্ত করার সুপারিশ করে। ঐ ‘কিছু অংশ’ কত বড় ছিল- কত পৃষ্ঠা, কত অনুচ্ছেদ বা কত লাইন।
উত্তরঃ প্রতিবেদনগুলো এখন আমার কাছে নেই তাই গুনে বলতে পারবো না ঠিক কত পৃষ্ঠা, অনুচ্ছেদ বা লাইন। তবে তা সামান্য।

প্রশ্নঃ আপনি লিখেছেন, “কিছু দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে কয়েকটি অনুচ্ছেদ বাদ দিয়ে পুরো প্রতিবেদনগুলোই অবমুক্ত করা হয়।” কোন কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আপনার বিবেচনা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চিন, রাশিয়া (সোভিয়েতের পতনের পর হয়তো নয়), ভারত বা বাংলাদেশ? বাংলাদেশের কথা বিবেচনা করা হলে কমিটি বা সরকার কি আরও কিছু বিবেচনা করেছিল?
উত্তরঃ প্রধান এবং প্রতিবেশি শক্তিগুলো (দেশগুলো)। আপনার প্রশ্নের শেষ অংশ পরিষ্কার নয়। মূল প্রতিবেদনটি তৈরি করার অনেক পরে, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের জনগন এবং রাজনৈতিক নেতারা আশা করেন ১৯৭১ সালের নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আপনি মন্ত্রী পরিষদ সচিব থাকাকালে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠনিক আলোচনা হয়েছিল?
উত্তরঃ ক্ষমা প্রার্থনার কথা আলোচনা করা হয়নি।

প্রশ্নঃ বিশাল প্রতিবেদনগুলো পড়তে আপনাদের কতদিন লেগেছিল? ওগুলো পড়ার পর আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কী হয়েছিল?
উত্তরঃ প্রতিদিন বেশ কয়েকঘন্টা করে পড়ে তিন চারদিন লেগেছিল। প্রতিবেদনে যে পরিমাণ দলিলপত্র যাচাই ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে তা প্রশংসনীয়।

প্রশ্নঃ কিছু বইয়ে, বিশেষ করে এ বাসিত লিখিত ‘দা ব্রেকিং অব পাকিস্তান’ বইটিতে দাবী করা হয়েছে হারক জেনারেল ইয়াহিয়াকে জবানবন্দি তৈরি করার জন্য যথেষ্ট সময় দেয়নি, তাঁকে সামান্য কিছুক্ষনের জন্য হারকের সামনে হাজির করা হয়েছিল এবং তিনি তাঁকে জেরা করার এবং অন্যদের জেরা করার জন্য তাঁকে সুযোগ দেওয়ার দাবী করলেও তা গ্রাহ্য করা হয়নি। প্রধান অভিযুক্তকে এসব অধিকার বঞ্চিত করে তৈরি কোনো প্রতিবেদনকে কী আপনি ন্যায়সঙ্গত বলবেন?
উত্তরঃ আমি বাসিত সাহেবের বইটি দেখিনি, তাই মন্তব্য করতে পারছি না।

প্রশ্নঃ আপনার কী জানা আছে, পাকিস্তান সরকার ২০০৫ সালে লাহোর হাইকোর্টে ২৯/০৫/১৯৭৮ তারিখে এডভোকেট মঞ্জুর আহমেদ রানার দাখিল জেনারেল ইয়াহিয়ার একটি হলফনামা অবমুক্ত করে। (প্রশ্নে জেনারেল ইয়াহিয়াকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এবং বিনা বিচারে আটক রাখার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল।)
উত্তরঃ অন্য কারও লেখা একটি বইয়ের অংশ হিসেবে এটি ইন্টারনেটে উর্দুতে পাওয়া যায়। আমি এর সত্যতা কতটুকু জানি না। তাই মন্তব্য করতে পারছি না।
আপনি আমার যে নিবন্ধের কথা উল্লেখ করেছেন তাতে সামগ্রিকভাবে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

এ বাসিতের দাবী অনুসারে হারক জেনারেল ইয়াহিয়াকে প্রকাশ্যে জবানবন্দী দিতে দেওয়া হয়নি এবং অন্যদের জেরা করার সযোগ না দেওয়ায় তাঁর অধিকার ক্ষুণœ হয়েছে। তাই প্রশ্ন ওঠে হারক কী নিরপেক্ষ নির্মোহ থেকে প্রকৃত দায়ীদের চি?িত করতে পেরেছে? লেখক সাংবাদিক জগলুল আলম হারকের দুটো প্রতিবেদনই পড়েছেন। জবাবে তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের ঘটনাক্রম এবং পাকিস্তানের পরিণতির প্রেক্ষাপটে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রকাশ্য শুনানি এবং প্রকাশ্য বিচার হওয়া যেমন উচিত ছিলো, ঠিক তেমনি বাস্তবতার ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এ ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের প্রকাশ্য বিবৃতি নেয়ারও দরকার ছিলো বলে আমি মনে করি। তার জন্য ইয়াহিয়া খানকে পর্যাপ্ত সময় দেয়ার বিষয়টিও ছিলো জরুরী। কিন্তু বোঝা যায়, ভুটো এবং কতিপয় জেনারেলের পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী হারকের মাধ্যমে আসলে ইয়াহিয়ার ওপর সমস্ত দায়ভার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কমিশনের রিপোর্ট থেকে কিছু অংশ ছেটে ফেলা হয়েছে এবং সর্বোপরি যথাসময়ে পূর্ণাংগ রিপোর্ট প্রকাশই করা হয়নি। এতে করে হারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ করার আগে ভুট্টো গং-এর উদ্দেশ্য এবং বিচার প্রক্রিয়া ও রিপোর্ট প্রকাশে খামখেয়ালিপনাকেই বেশি করে দায়ী করা চলে। হারক প্রকৃত ব্যক্তিদের আসলে দায়ী করেছিলো কি না তা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া জানতেন কি?”
‘পাকিস্তানের ভাঙ্গন’ ‘দ্য ব্রেকিং অব পাকিস্তান, লিবার্টি পাবলিশার্স, লাহোর ১৯৯৭, নামের বইয়ে ইয়াহিয়া খানের জবানীতে বাসিত লিখেছেন- শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে তাঁকে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেওয়ায় ষড়যন্ত্রকারীরা চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তৈরি হয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষিত লোকেরাও বলতেন শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দিলে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যে কোনো মূল্যে বাঁচিয়ে রাখার কথা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন। “শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে তাঁকে আশ্বস্ত করা প্রয়োজন ছিল। কারণ ভারতীয় চরেরা তাঁর মনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সম্মন্ধে ভীতি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এমনকি যখন তার বিচার চলছে তখনও তিনি মনে করতেন সেনাবাহিনী তাঁকে মেরে ফেলবে। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন ধারা সম্মন্ধে মুজিব কতটুকু জানতেন তা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছিলাম। তিনি এত নির্ভুল খবর দিয়েছিলেন যে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে পশ্চিম পাকিস্তানের একজন বিখ্যাত রাজনীতিকের সঙ্গে তিনজন জেনারেলের একটি বিশেষ সভার কথা বলেছিলেন। তিনি সেই সভার স্থান, তারিখ এবং সময় নির্ভুলভাবে বলেছিলেন। অন্য লোকটির চেয়ে আমি মুজিবকে পছন্দ করি তা বলেছিলাম। তিনি বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন।” ঐ ষড়যন্ত্রের কতটুকু হারক জানতে পেরেছিল?
হারক প্রতিবেদন নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে প্রতিক্রিয়া তিন রকম। পাকিস্তানে এটা বিব্রতকর, ভারত পেয়েছে পাকিস্তানকে নাকাল করার অস্ত্র আর বাংলাদেশের মানুষ দেখে ১৯৭১-এর অপরাধীদের তালিকা। কিন্তু সত্যিই কি হারক প্রতিবেদন দায়ী ব্যক্তিদের সবাইকে চি?িত করতে পেরেছে? প্রধান অভিযুক্ত ইয়াহিয়া খান প্রকাশ্য শুনানি ও সকল সাক্ষীকে জেরা করার অধিকার দাবী করলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়। তাই প্রশ্ন ওঠে হারক কি নিরপেক্ষ ছিল? আবার ঘটনার অন্যতম চরিত্র ভুট্টোকে হারক অভিযুক্ত করলো না কেন? জগলুল আলম লিখেছেন (প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৭৯-১৮০)- “কমিশনের বিচারে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোও জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করার ওপরে ঘটনার গভীরতা ও পূর্ব পাকিস্তান এর ওপর সাধারণ প্রতিক্রিয়া নিরূপণে রাজনোইতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কমিশনের সামনে অকপটে বলেছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে এতোটা সহিংসতা হতে পারে এটা তিনি মনে করেননি। শেখ মুজিবুর রহমান যদি তার দাবীতে আপোসহীন হয়ে থাকেন, তাহলে ভুট্টোও তাতে সম-পরিমাণ গোঁয়ার্তুমি করেছেন।” এটুকুই? বাংলাদেশের ইতিহাসের উপাদান হারক প্রতিবেদনের পর্যালোচনা এই লেখাতেই শেষ হতে পারে না।

বার্মিংহাম, ২৯ মার্চ ২০২২
লেখক: সাংবাদিক। সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রযোজক, বাংলা বিভাগ, বিবিসি ওয়ার্? সার্ভিস ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা