Share |

‘ষড়যন্ত্রে’ জড়িত মার্কিন কূটনীতিকের নাম জানালেন ইমরান ‘শেষ বলে’ চমক দেখিয়ে বিদায়

পত্রিকা ডেস্ক
লণ্ডন, ০৪ এপ্রিল: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর সরকারের পতন ঘটানোর জন্য বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলে আসছিলেন। একপর্যায়ে তিনি মুখ ফসকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম বলে ফেলেন। এবার তিনি এই ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রে’ জড়িত মার্কিন কূটনীতিকের নাম সরাসরি জানালেন।
৩ এপ্রিল রোববার ইমরান দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক  ডোনা? লু সেই ব্যক্তি, যিনি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িত। পরদিন সোমবার পাকিস্তানের দ্য ডন অনলাইনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।  

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের নেতাদের এক বৈঠকে ইমরান বলেন, বিরোধীদের দিয়ে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব এনে সরকার পতনের লক্ষ্যে যে বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তাতে জড়িত ছিলেন ডোনালড লু।
ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব রোববার দেশটির জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি নাকচ করে দেন। তারপরই পিটিআই নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইমরান। ইমরানের সুপারিশে গতকালই পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি। এর অর্থ, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে দেশটিতে নতুন নির্বাচন হতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ইমরান তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ঠেকিয়ে দিলেন। যদিও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বিরোধী দলগুলো।
ইমরানের দাবি, পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ইসলামাবাদকে হুমকির বার্তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ইমরানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ডোনা? লু। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ডোনালড লু সতর্ক করে আসাদ মজিদকে বলেছিলেন, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাবে ইমরান টিকে গেলে তার প্রভাব দেখা যেতে পারে। ইমরান দাবি করেন, তাঁর কাছে তথ্য রয়েছে যে পিটিআইয়ের পক্ষত্যাগী নেতারা ঘন ঘন মার্কিন দূতাবাসে গেছেন। ইমরান প্রশ্ন রাখেন, ‘যাঁরা আমাদের দল ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁরা গত কয়েক দিন কেন ঘন ঘন মার্কিন দূতাবাসের লোকজনের সঙ্গে  দেখা রেছেন?’
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইমরান বলেন, পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছে।
ইমরানের সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইমরানের বিরোধীরাও এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।

‘শেষ বলে’ চমক দেখিয়ে বিদায় ইমরান খানের
শেষ পর্যন্ত বিদায়ই নিতে হলো ইমরান খানকে। পাকিস্তানের অন্য প্রধানমন্ত্রীদের মতো তাঁকেও পাঁচ বছরের মেয়াদ টপূরণের আগে বিদায় নিতে হলো। গত রবিবার প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি দেশটির পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ইমরান পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেন।
আর ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব খারিজ করে দেন জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার।
তবে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে বিরোধী দলগুলো সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। পাশাপাশি পার্লামেন্টে নিজেরাই স্পিকার নির্বাচন করে ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছে।
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সব উদ্যোগের বিষয়ে সোমবার শুনানি গ্রহণ করবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্টকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ইমরান ভিন্ন রকম এক কৌশল খাটালেন। এই কৌশলে তিনি অনাস্থা ভোটে হেরে মাথা নিচু করে বিদায় নেওয়া থেকে বেঁচে গেলেন। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে যাওয়া ইমরান অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের পর বলেছিলেন, ক্রিকেট ম্যাচের মতো ‘শেষ বল’ পর্যন্ত লড়াই করতে চান। সেটাই যেন করে দেখালেন তিনি। কারণ এটা সবার কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল যে ইমরান প্রেসিডেন্টকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেবেন। এটা নিশ্চিত ছিল অনাস্থা ভোটে হেরে বিদায় নেবেন ইমরান। এখন সংবিধান অনুযায়ী পাকিস্তানে ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন।’ রোববার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর ডেপুটি স্পিকার কাশিম সুরি প্রধানমন্ত্রী ইমরানের বিরুদ্ধে আনা বিরোধী দলের অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ করে দেন। ডেপুটি স্পিকার বলেন, এই অনাস্থা প্রস্তাব সংবিধানের পরিপন্থী। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিককে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা মৌলিক দায়িত্ব।

দেশবাসীকে অভিনন্দন ইমরানের
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইমরান খান। তিনি বলেন, ডেপুটি স্পিকার অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়ে সরকার পরিবর্তনের বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
ইমরান বলেন, তিনি অনেকের কাছ থেকে বার্তা পাচ্ছেন যে তারা ভীত। জাতির সামনে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাই, ভয় পাবেন না। মহান আল্লাহ পাকিস্তানের ওপর নজর রেখেছেন। ’ ইমরান পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে প্রেসিডেন্টকে লিখিত পরামর্শ দেওয়ার বিষয়ে বলেন, গণতন্ত্রকামী নেতাদের জনগণের কাছে যেতে হবে। নির্বাচন হতে হবে, যাতে জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা কাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়।

বিরোধী দল কী বলছে
পিএমএলের (এন) নেতা শাহবাজ শরিফ বলেছেন, ‘আজকের দিনটি পাকিস্তানের সংবিধানের ইতিহাসে কালো দিন হিসেবে স্মরণ করবে মানুষ। ’ তিনি অভিযোগ করেন, অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়ে ডেপুটি স্পিকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
অনাস্থা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ভোটে ইমরান খানের পতন হলে বিরোধী নেতা শাহবাজ শরিফের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত না মেনে অধিবেশনস্থলে নিজেরাই স্পিকার নির্বাচন করেন পিএমএল (্এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ (পিপিপি) ইমরানবিরোধী নেতারা।
পিপিপির কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলি জারদারি বলেন, ডেপুটি স্পিকার ‘সম্পূর্ণভাবে অবৈধ’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পরে বিরোধী দলগুলো পিএমএলের (এন) নেতা আয়াজ সাদিককে স্পিকারের আসনে বসিয়ে ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের আয়োজন করে। সিনেটর শেরি রহমান টুইট বার্তায় বলেন, ১৯৫ জন পার্লামেন্ট সদস্য ইমরানের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।

এখন কী হবে
সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এর আগে বিদায়ি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও প্রধান বিরোধী দলের নেতা শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পরামর্শ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট আলভি একজনকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ইমরান খান দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করতে হবে। পার্লামেন্ট বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়ার পর বিদায়ি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ফারুক হাবিব বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে নতুন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।